সাম্রাজ্যবাদের অহমিকা ও প্রতিরোধের জয়গান: ইরান ও আমেরিকার নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মহাকালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। বিশেষত, যখন কোনো স্বাধীনচেতা জাতি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে নিজের আত্মপরিচয় ও ইমানি চেতনায় বলীয়ান হয়ে ওঠে, তখন বিশ্বমোড়লদের দম্ভ চূর্ণ হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আধুনিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্কের আখ্যানটি কেবল একটি রাজনৈতিক রেষারেষি নয়; বরং এটি হলো সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা এবং একটি আত্মমর্যাদাবান জাতির 'প্রতিরোধের' (Resistance) অমোঘ সংঘাতের মহাকাব্য। দীর্ঘ চার দশকের অবর্ণনীয় নিষেধাজ্ঞা, ছায়াযুদ্ধ এবং নানাবিধ প্রতিকূলতার অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে, ইরান আজ যে কূটনৈতিক অবস্থানে উপনীত হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী।

ইতিহাসের অমোঘ ডাক: ১৯৭৯-এর নবজাগরণ

ইরান ও আমেরিকার সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই উত্তাল দিনে, যখন ইরানের মাটি থেকে সাম্রাজ্যবাদের শিকল খসে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব কেবল একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল কয়েক দশকের পশ্চিমাদের নব্য-উপনিবেশবাদী শৃঙ্খল ছিন্ন করে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর এক সাহসী অভিযাত্রা। সিআইএ সমর্থিত সেই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে ইরান যে সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দিয়েছিল, তা ছিল বিশ্বশক্তিগুলোর জন্য এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জ।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা এই বিপ্লবকে মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। তাই তারা ইরানকে ‘একঘরে’ করতে চেয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ তকমা দিয়ে বিশ্বের দরবারে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে, যে জাতি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তাদের ভয় দেখানোর পথটি কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

(তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।) — (সূরা আল-ইমরান: ১৩৯)

‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির ব্যর্থতা: সবরের জয়গান

ট্রাম্প প্রশাসনের সেই তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) নীতির লক্ষ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে নতজানু করা। তারা ভেবেছিল, নিষেধাজ্ঞার কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে ইরানি জাতি তাদের ঈমানি চেতনা বিসর্জন দেবে। কিন্তু তারা একটি সাধারণ সত্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল—একটি ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতিকে কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে দমন করা অসম্ভব। বরং এই কঠিন সময়ে ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) গড়ে তুলেছে।

কাসেম সোলেইমানির শাহাদাত এবং পরবর্তী পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, এই রক্ত কেবল নতুন প্রতিরোধের জন্ম দেয়, পরাজয় নয়। ইরান প্রমাণ করেছে যে, চরম দারিদ্র্য ও অবরোধের মাঝেও একটি জাতি যদি তার নীতিতে অবিচল থাকে, তবে একদিন পরাশক্তিগুলো নিজেরাই আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হয়।

কৌশলগত প্রজ্ঞা: ইরান যে জয় তুলে নিয়েছে

সাম্প্রতিক যে সমঝোতা বা চুক্তির সুর শোনা যাচ্ছে, তা ইরানের দূরদর্শী কূটনীতিরই ফসল। এই চুক্তিতে ইরানের প্রাপ্তি কেবল কিছু আটকে থাকা অর্থ মুক্তি নয়, বরং এটি তাদের সার্বভৌমত্বের এক নীরব স্বীকৃতি।

১. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার: আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে পড়ে যে সম্পদ জব্দ হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ইরান তাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল করার সুযোগ পেয়েছে। কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত ছাড়াই আলোচনার টেবিলে বসে এই অধিকার আদায় করা ইরানের পরিপক্ক কূটনীতির নিদর্শন।

২. মানবিক ও কূটনৈতিক বিজয়: বন্দি বিনিময়ের আড়ালে ইরান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের দর কষাকষির সক্ষমতাকে আরও সুসংহত করেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, মানবিক ইস্যুকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ রক্ষায় তারা কতটা সুনিপুণ।

৩. পরমাণু সক্ষমতা ও প্রতিবন্ধকতা: ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান ওয়াশিংটনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: ইরানকে উপেক্ষা করার দিন শেষ। এই ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা ইরানের ইতিহাসের এক বড় সাফল্য।

ভূ-রাজনৈতিক পালাবদল: আমেরিকার বাধ্যবাধকতা

কেন একটি দাম্ভিক পরাশক্তি ইরানের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হলো? এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতির এক বড় পরিবর্তন। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকটে পড়া পশ্চিমারা আজ ইরানের তেলের বাজারের দিকে তাকাতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া, চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান ঐতিহাসিক পুনর্মিলন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের ‘বিভাজন ও শাসন করো’ নীতির কবর রচনা করেছে। ওয়াশিংটন আজ বুঝতে পেরেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ আর এককভাবে তাদের হাতে নেই। বিশ্ব এখন বহু-মেরুবিশিষ্ট (Multipolar) পথে হাঁটছে, যেখানে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।

প্রতিরোধের ভবিষ্যৎ: এক নতুন যুগের পদধ্বনি

ইসরায়েলের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো আজ এই পরিবর্তনে আতঙ্কিত। তারা দেখছে, তাদের সব ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরানের প্রভাব বলয় ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন—প্রতিরোধের এই অক্ষ এখন এক অখণ্ড শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ইরানের অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই এই প্রতিরোধ শক্তির আরও শক্তিশালী হওয়া।

তবে চ্যালেঞ্জ কি নেই? অবশ্যই আছে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দোলাচল এবং ইসরায়েলি লবির ষড়যন্ত্র যেকোনো সময় এই চুক্তিকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। আইএইএ-এর সাথে বিরোধ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাও এক বড় কাঁটা। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যারা ন্যায়ের পথে থেকে প্রতিরোধের মন্ত্রে দীক্ষিত, কোনো সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।

মহান আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

(আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ করবেনই। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করে রেখেছেন।) — (সূরা আত-তালাক: ৩)

উপসংহার: সার্বভৌমত্বের আলোকবর্তিকা

ইরান ও আমেরিকার এই সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও সমঝোতা বিশ্বকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। তা হলো—সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করে এবং নীতি-আদর্শে অটল থেকে যদি কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকে, তবে এক সময় বিশ্বশক্তিগুলো তাদের শর্ত মেনেই আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হয়।

ইরানের এই ‘প্রতিরোধ কূটনীতি’ আজ বিশ্বের অন্যান্য শোষিত দেশগুলোর জন্য একটি পাঠ্যপুস্তকের মতো। তারা আমাদের শিখিয়েছে যে, সত্যের পথে অটল থাকলে আল্লাহ প্রদত্ত সাহায্যের নূরে পথ চলার পথ মসৃণ হয়। তেহরানের এই জয় কেবল অর্থের জয় নয়, এটি তাদের আত্মমর্যাদার বিজয়, এটি সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের বিপরীতে একটি মজলুম জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার গল্প। আগামী দিনে এই চুক্তি টিকবে কি না তা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো—ইরান প্রমাণ করেছে, তারা এখন কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির এমন এক অপরিহার্য খেলোয়াড়, যাদের উপেক্ষা করার ক্ষমতা আর কারও নেই।

যুগ যুগ ধরে শোষিত মানুষের স্বপ্ন আজ ইরানের সাহসিকতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এটি কেবল তেহরানের জয় নয়, এটি নিপীড়িত মানবতার জয়। সত্যের জয় চিরকালই অনিবার্য, আর মিথ্যা কেবলই বিনাশের অপেক্ষায় প্রহর গোনে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter