ইসলামী রেনেসাঁর নবজাগরণ: নারী শিক্ষায় আলোকিত উম্মাহ এবং দারুল হুদা গার্লস ক্যাম্পাস, বাংলার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক

সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক নিগূঢ় শৃঙ্খলা ও জ্ঞানের আলোকধারা প্রবাহিত করে রেখেছেন। মানবজাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব বা 'আশরাফুল মাখলুকাত' হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই হলো সেই ঐশী জ্ঞানের অন্বেষণ এবং তার আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সুষম সমাজ বিনির্মাণ। যখন অজ্ঞতার অমানিশা এবং জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল গোটা বিশ্ব, তখন হেরা গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল সেই যুগান্তকারী ঐশী বাণী— 'ইকরা' বা 'পড়ো'। এই একটি মাত্র শব্দের অমোঘ আহ্বানে পৃথিবী থেকে বিদূরিত হয়েছিল অন্ধকারের রাজত্ব, প্রস্ফুটিত হয়েছিল প্রজ্ঞার এক নতুন ভোর। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ইলম বা জ্ঞানের চর্চাকে আত্মিক প্রশান্তি এবং রূহানিয়াতের চূড়ান্ত সোপান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এই জ্ঞানান্বেষণের পবিত্র যাত্রায় ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও অপরিহার্যতা সুনিশ্চিত করেছে।

সমাজ বিনির্মাণে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রবাদ আছে, "একজন পুরুষকে শিক্ষিত করার অর্থ হলো একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করা, কিন্তু একজন নারীকে শিক্ষিত করার অর্থ হলো একটি আস্ত প্রজন্মকে শিক্ষিত করা।" একজন মহীয়সী নারী, একজন সুশিক্ষিতা মা হলেন একটি শিশুর প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। তাঁর কোল থেকেই একটি শিশু গ্রহণ করে ঈমান, আখলাক, আদব এবং তৌহিদের প্রথম পাঠ। মায়ের রূহানি তরবিয়ত এবং সুশিক্ষার আলোকেই একটি জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা গড়ে ওঠে। তাই, নারী যদি অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তবে সমগ্র সমাজই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী লেখনিতে সাম্য ও ন্যায়ের যে শাশ্বত বাণী উচ্চারণ করেছেন, সেখানে নারী ও পুরুষের সমান তালে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসলামও এই সাম্য ও ইনসাফের ধারণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে।

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ইলমে দ্বীন অর্জন করা কেবল মুস্তাহাব বা ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুনিশ্চিত ফরজ ইবাদত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:

طَلَبُ العِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

"জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের (নর-নারী উভয়ের) উপর ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য।" (সুনান ইবনে মাজাহ: ২২৪)

এই হাদিসের মর্মার্থ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এখানে 'মুসলিম' শব্দটি দ্বারা কেবল পুরুষদের বোঝানো হয়নি, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উম্মাহর প্রতিটি সদস্যকে বোঝানো হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন এই জ্ঞানান্বেষণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যাঁর কাছ থেকে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের অসংখ্য জটিল মাসয়ালা এবং ফিকহ সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করতেন।

কন্যা সন্তানদের লালন-পালন ও তাদের সুশিক্ষার বিষয়ে ইসলাম যে অভূতপূর্ব মর্যাদা প্রদান করেছে, তা তৎকালীন আরবের জাহেলী সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। কন্যাসন্তানকে যেখানে অভিশাপ মনে করা হতো, সেখানে ইসলাম কন্যাসন্তানকে জান্নাতের সুসংবাদ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:

مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ

"যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তানকে তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে (এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবে), কিয়ামতের দিন সে এবং আমি ঠিক এভাবে একসাথে আসব—এই বলে তিনি তাঁর আঙুলগুলো মিলিয়ে দেখালেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৩১)

এই হাদিসগুলোর আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে, একটি জাতির আত্মিক, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের জন্য নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর এই সুমহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই, বাংলার বুকে ইসলামী শিক্ষা ও চেতনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সেই আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মাটি আজ ধন্য হয়েছে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করার মাধ্যমে।

দারুল হুদা গার্লস ক্যাম্পাস: বীরভূমের বুকে এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন

গত ২ মে, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ভীমপুরে সম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ রূপে এবং বিপুল উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয়েছে 'দারুল হুদা গার্লস ক্যাম্পাস'। এই মহতী আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলিম নারী শিক্ষার ইতিহাসে একটি সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হলো। এই সুদৃশ্য ও সুবিশাল ক্যাম্পাসের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন দারুল হুদার মাননীয় চ্যান্সেলর, প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক রাহবার পানাক্কাড সৈয়দ সাদিক আলী শিহাব তাঙ্গল। তাঁর পবিত্র হস্তস্পর্শে এবং দোয়ার মাধ্যমে এই বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়, যা আগামী দিনে হাজারো কন্যার হৃদয়ে ইলমের আলো প্রজ্বলিত করবে।

ক্যাম্পাসটি কেবল ইট-পাথরের একটি ইমারত নয়, বরং এটি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও ইসলামী মূল্যবোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই নবনির্মিত ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল 'আল-হুদা লাইব্রেরি', যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজ্যসভার মাননীয় সাংসদ অ্যাডভোকেট হ্যারিস বীরান এমপি। বই হলো জ্ঞানের অবারিত মহাসমুদ্র, আর এই লাইব্রেরি সেই সমুদ্রে অবগাহন করার জন্য ছাত্রীদের সামনে এক উন্মুক্ত দ্বার হিসেবে কাজ করবে।

এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশ ও রাজ্যের বহু বিশিষ্ট ও গুণী ব্যক্তিত্ব, যাঁদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে। কলকাতা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য এবং মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব আহমদ হাসান, মুরারাই-এর মাননীয় বিধায়ক মোশাররফ হোসেন, পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য সাবির সিদ্ধার্থ গাফফার, দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর ড. বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নদভী এবং সাধারণ সম্পাদক ইউ. মোহাম্মদ শাফি হাজী সহ আরও অসংখ্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ, দারুল হুদার ম্যানেজিং কমিটির কর্মকর্তা এবং শুভানুধ্যায়ীবৃন্দ এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিল বুকপ্লাস (BookPlus) কর্তৃক প্রকাশিত মরহুম মুনকির হোসেন সাহেবের স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন। এই গ্রন্থটি তাঁর জীবনের বহুমুখী অবদান এবং সমাজের প্রতি তাঁর নিবেদিত প্রাণ প্রচেষ্টার এক অনন্য দলিল।

দারুল হুদা বেঙ্গল অফ-ক্যাম্পাসের ঐতিহাসিক পরিক্রমা

পশ্চিমবঙ্গে দারুল হুদার এই পথচলা আজকের নয়। ২০১২ সাল থেকে বীরভূম জেলায় দারুল হুদা তাদের অফ-ক্যাম্পাসের কার্যক্রম অত্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালনা করে আসছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার যে ব্রত তারা গ্রহণ করেছিল, তা আজ একটি বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ২০১৯ সালে মূল ক্যাম্পাসের সন্নিকটে মেয়েদের জন্য একটি ডে-স্কুল চালু করা হয়। বর্তমানে সেখানে ১৬০ জনেরও বেশি ছাত্রী অত্যন্ত আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে ইলমে দ্বীন ও জাগতিক জ্ঞান অর্জন করছে।

এই আবাসিক প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টারা অনুধাবন করেছিলেন যে, মেয়েদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ এবং নিরাপদ আবাসিক পরিবেশ একান্ত প্রয়োজন। সেই দূরদর্শিতার আলোকেই, ২০২২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পানাক্কাড সৈয়দ সাদিক আলী শিহাব তাঙ্গল এই গার্লস ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর আজ, সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে ৫৬,৫০৭ বর্গফুটের এক সুবিশাল ও মনোরম ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে, যা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬.৮২ কোটি টাকা। প্রশস্ত শ্রেণিকক্ষ, অত্যাধুনিক হোস্টেল রুম এবং একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই ক্যাম্পাসটি ছাত্রীদের জন্য এক আদর্শ আবাসস্থল।

আগামী জুন মাস থেকে এই গার্লস ক্যাম্পাসে শুরু হতে যাচ্ছে আট বছর মেয়াদী 'সাহারাবিয়া কোর্স' (Sahraviya Course), যা ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার এক অভূতপূর্ব সমন্বিত প্রকল্প। ইসলাম কখনোই কেবল বৈরাগ্যবাদের কথা বলে না; বরং ইসলাম চায় এমন এক প্রজন্ম, যারা একদিকে যেমন কুরআনের হাফেজ ও শরীয়তের আলিম হবে, তেমনি অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনেও পারদর্শী হবে। সাহারাবিয়া কোর্সটি ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছে। এছাড়া, আগামী বছর থেকে এসএসএলসি (SSLC) উত্তীর্ণ ছাত্রীদের জন্য ৫ বছর মেয়াদী 'মাহদিয়া কোর্স' (Mahdiya Course) শুরু করার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

দারুল হুদার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তাদের স্কলারশিপ প্রোগ্রাম। বর্তমানে দারুল হুদা বেঙ্গল অফ-ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে স্কুল, প্রিস্কুল, গার্লস ক্যাম্পাস এবং হুদাবী কোর্সে প্রায় এক হাজার তিনশো (১৩০০) শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, ফুল স্কলারশিপের মাধ্যমে পড়াশোনা করছে। এটি কেবল একটি দাতব্য কাজ নয়, বরং এটি উম্মাহর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এক অমূল্য বিনিয়োগ।

ড. বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নদভীর দূরদর্শী ভাষণ এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দারুল হুদার মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং হৃদয়গ্রাহী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দারুল হুদার মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর ড. বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নদভী। তাঁর এই ভাষণ ছিল উপস্থিত সবার জন্য এক আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে লক্ষ কোটি শুকরিয়া (হামদ) জ্ঞাপন করেন এবং এই ঐতিহাসিক আয়োজনের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য সৈয়দ সাদিক আলী শিহাব তাঙ্গলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ড. নদভী তাঁর বক্তব্যে দারুল হুদার ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতির কথা তুলে ধরেন। আসাম, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশের মতো বিভিন্ন রাজ্যে মেয়েদের ডে-স্কুলগুলোর সফল পরিচালনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন ক্যাম্পাসটি এই অঞ্চলে সাদিক আলী শিহাব তাঙ্গল কর্তৃক উদ্বোধন করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় একটি শীর্ষস্থানীয় ও প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ছয় বছর ধরে বাংলায় ডে-স্কুলটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছিল, কিন্তু আজকের এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়েই প্রকল্পটি সত্যিকার অর্থে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হলো।

জ্ঞানের আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দিয়ে তিনি হাদিসের সেই অমিয় বাণী স্মরণ করিয়ে দেন—জ্ঞানান্বেষণ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। তিনি কেরালার বিখ্যাত 'জামেয়া জাহরাবিয়া'-এর সাথে এই নতুন উদ্যোগের তুলনা করে বলেন, কেরালা যেমন নারী ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক স্থাপন করেছে, পশ্চিমবঙ্গও এখন ঠিক সেইরকম এক রূপান্তরমূলক নতুন পর্বে প্রবেশ করছে। এই ক্যাম্পাসটি এই অঞ্চলের একাডেমিক এবং আধ্যাত্মিক মানকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ড. নদভীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রসারিত। তিনি এই ক্যাম্পাসটিকে কেবল একটি স্কুল হিসেবে নয়, বরং একটি সামগ্রিক 'আলোর কেন্দ্র' (Center of Light) হিসেবে কল্পনা করেছেন। স্কুল ও কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা 'দ্বীনি ক্লাসরুম', বয়স্ক নারী-পুরুষদের জন্য বিশেষ শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম এবং মহিলাদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করার কথা তিনি তুলে ধরেন। অল কেরালা ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন (AKIA)-এর কাজের উদাহরণ টেনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান, যাতে সামাজিক ও ধর্মীয় উন্নয়নের একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে তোলা যায়।

বক্তব্যের শেষে তিনি প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি শাশ্বত হাদিস উদ্ধৃত করেন:

العِلْمُ حَيَاةُ الإِسْلَامِ

"ইলম বা জ্ঞান হলো ইসলামের প্রাণ বা জীবন।"

তিনি শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, একজন মুমিনের ঈমানের পরিপূর্ণতা জ্ঞান অন্বেষণের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যারা ইলম অর্জনে নিজেদের নিবেদিত করে, তারা মূলত নিজেদের দ্বীনকেই সুরক্ষিত করে। আর যারা জ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের আধ্যাত্মিক যাত্রা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তিনি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এই ক্যাম্পাসের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদানের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান, যাতে আমাদের কন্যারা এক আলোকিত ও সফল ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং একটি সোনালী ভবিষ্যতের হাতছানি

অনুষ্ঠানের পর, ড. বাহাউদ্দিন নদভী তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন ও তথ্যবহুল পোস্টের মাধ্যমে এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, "আজ নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের পথে দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।" তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গ হলো ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য। দেড় দশক আগে এই রাজ্যেই দারুল হুদা সামাজিক শিক্ষা ক্ষমতায়নের মহান লক্ষ্য নিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল। হুদাবী ক্যাম্পাসের পাশাপাশি, দারুল ফাউস ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, হিফজ কলেজ এবং প্রিস্কুল সহ আধা ডজনেরও বেশি শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এখানে ইতিমধ্যে একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। হুদাবী গ্রুপ 'হাদিয়া' (Hadiya) কর্তৃক পরিচালিত জাতীয় স্তরের কার্যক্রমগুলোও এক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

ড. নদভী তাঁর পোস্টে নারী সমাজকে নবীদের স্ত্রীদের এবং যুগশ্রেষ্ঠ আলিমদের আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "নারী সমাজই হলো সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যাদেরকে জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে হবে যারা নৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে।" কেরালা থেকে শুরু করে দেশব্যাপী নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের এই কার্যক্রমগুলো দারুল হুদার এজেন্ডায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৮৬ সালে যে দারুল হুদার নেতারা হুদাবী কোর্স শুরু করেছিলেন, তাঁরাই প্রথম দশকের মধ্যেই ১৯৯২ সালে মরহুম আথিপ্পাট্টা ওস্তাদের সুযোগ্য নেতৃত্বে মেয়েদের জন্য সাহারাবিয়া কোর্সের সূচনা করেছিলেন।

দারুল হুদা আজ এই স্বপ্ন দেখে যে, সাহারাবিয়া স্কলাররা যখন কেরালা ও বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশে দ্বীনের খেদমত করার জন্য প্রস্তুত হবে, তখন জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক ক্ষমতায়নের প্রকল্পগুলো এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হবে। সমাজ সংস্কারের এই পবিত্র কাজে নারী আলিমদের ভূমিকা হবে অনবদ্য। তাঁরা কেবল ঘরের চারদেয়ালে আবদ্ধ থাকবেন না, বরং তাঁরা হবেন সমাজের পথপ্রদর্শক, নীতির ধারক এবং ইসলামী সংস্কৃতির পাহারাদার।

পরিশেষ

দারুল হুদা গার্লস ক্যাম্পাসের এই পথচলা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের যাত্রা নয়; এটি বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর একটি প্রতিচ্ছবি। কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটি স্বপ্ন দেখেছিলেন—এমন এক সমাজ যেখানে ধর্ম ও কর্মের অপূর্ব সমন্বয় ঘটবে, যেখানে সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিটি মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবে। বাংলার মুসলিম নারীরা যখন একহাতে পবিত্র কুরআন এবং অন্যহাতে আধুনিক বিজ্ঞানের মশাল নিয়ে পথ চলবে, তখন সমাজের সব অন্ধকার দূর হতে বাধ্য।

আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো এই ধরনের ত্যাগী ও মহতী উদ্যোগগুলোকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো। আমরা পরম করুণাময় আল্লাহ তা'আলার দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত প্রতিটি সহযাত্রীকে তাঁদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য সর্বোত্তম প্রতিদান (জাযায়ে খায়ের) দান করেন। এই বিদ্যাপীঠ থেকে এমন সব নারী রত্ন তৈরি হোক, যারা তাদের প্রজ্ঞা, আখলাক ও ইলমের দ্যুতি দিয়ে গোটা বিশ্বকে আলোকিত করবে এবং ইসলামী উম্মাহর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter