ইসলামী দর্শনে লিঙ্গীয় ন্যায়বিচার: ‘ক্বিওয়ামাহ্’ ধারণার স্বরূপ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
কুরআনুল কারীমে পুরুষকে নারীর ‘ক্বাওয়াম’ (قَوَّام) বা তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষক হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍۢ وَبِمَآ أَنفَقُوا۟ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ ۚ ...
অর্থ: "পুরুষগণ নারীদের উপর তত্ত্বাবধায়ক, এই কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা তাদের অর্থ-সম্পদ থেকে ব্যয় করে..." (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪)
এই আয়াতটি প্রায়শই নারী-পুরুষের এখতিয়ার ও কর্তৃত্বের বিতর্কে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিগণিত হয়। অনেকে এটিকে পুরুষের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণপত্র হিসাবে দেখলেও, শাস্ত্রীয় ও আধুনিক ব্যাখ্যাসমূহ এটিকে এক প্রেক্ষাপট-নির্ভর গুরুদায়িত্ব হিসাবেই প্রতিপাদন করে, যার মূল লক্ষ্য নারীর সুরক্ষা, সহায়তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ধ্রুপদী ইসলামী তাফসীরসমূহের মধ্যে ইমাম আল-তাবারী (রহঃ) ‘ক্বিওয়ামাহ্’-কে আর্থিক ও সামাজিক জিম্মাদারির সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন। তাঁহার মতে, পুরুষের দায়িত্ব হলো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, বিশেষত সেই যুগে যখন নারীদের স্বাধীনভাবে উপার্জনের অবকাশ সীমিত ছিল। আল-তাবারীর ব্যাখ্যা প্রতিভাত করে যে, ‘ক্বিওয়ামাহ্’ কোনো অমোঘ জৈবিক শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন নয়, বরং এটি সমকালীন সামাজিক প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত এক দায়বদ্ধতা। অন্যদিকে, ইমাম ইবন কাছির (রহঃ) এবং আল-বায়দাভী (রহঃ) আপাত ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ অবলম্বন করেছেন। তাঁহারা মনে করতেন যে, পুরুষের স্বভাবজাত ও অর্জিত কিছু বিশেষ ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে তাহাদের নেতৃত্বের জন্য যোগ্য প্রতিপন্ন করে।
আধুনিক ব্যাখ্যাকারগণ ‘ক্বিওয়ামাহ্’-কে পুনরায় এক প্রেক্ষাপট-নির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক দায়িত্ব হিসাবেই নිරূপণ করেন। ড. রিফফাত হাসান ও ড. ইসমাইল ফারুকীর মতো প্রাজ্ঞজনেরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, পুরুষের আর্থিক ও সামাজিক দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রায়োগিক (functional) ছিল। বর্তমান সমাজে নারীরা শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অধিষ্ঠিত হওয়ায়, অর্থনৈতিক দায়িত্বের প্রাচীন ধারণাটি বিবর্তিত হয়েছে। ড. আজিজাহ আল-হিবরি ইহাকে ‘তাকলিফ’ (تَكْلِيف) বা এক বিশেষ দায়িত্বভার হিসাবে বর্ণনা করেন, যা প্রয়োজন অনুসারে নারীর সহায়তা ও দিকনির্দেশনা প্রদানকে বোঝায়। ইহা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, ‘ক্বিওয়ামাহ্’ নারীর উপর আধিপত্য বিস্তারের কোনো ছাড়পত্র নয়, বরং ন্যায়, সুরক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক পবিত্র বন্ধন।
বস্তুত, ‘ক্বিওয়ামাহ্’র প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবন করতে হলে কুরআনের অপরাপর মৌলনীতির শরণাপন্ন হতে হবে। যেমন, ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতিই মানুষের মর্যাদা নিরূপণের একমাত্র মানদণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَـٰكُم مِّن ذَكَرٍۢ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَـٰكُمْ شُعُوبًۭا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَىٰكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌۭ
অর্থ: “হে মানবমণ্ডলী, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি লাভ করতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেযগার (তাকওয়াবান)।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)
এই আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ করে যে, পুরুষের অর্জিত সুবিধা বা ক্ষমতা নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উপলক্ষ হতে পারে না। প্রাচীন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘ক্বিওয়ামাহ্’ এক সুগভীর নৈতিক ও সামাজিক জিম্মাদারি, যা প্রতিটি যুগে প্রাসঙ্গিকতা অনুসারে অভিযোজিত হয়েছে এবং দাম্পত্য ও সামাজিক সম্পর্ককে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত করতে সহায়তা করে।
ইসলামে লিঙ্গীয় সাম্য এবং তাকওয়ার মৌলনীতি
ইসলামী জীবনদর্শনে পুরুষ ও নারীকে সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। কুরআন সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করেছে যে, লিঙ্গ, বিত্ত, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থানের নিরিখে শ্রেষ্ঠত্বের কোনো অবকাশ নাই; বরং ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতিই মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি (যেমনটি পূর্বোক্ত সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩-এ বর্ণিত)। অর্থাৎ, মানব মূল্যায়নের একমাত্র সত্যিকারের ভিত্তি হলো নৈতিকতা, ধর্মীয় দায়িত্ববোধ এবং সততা, যা লিঙ্গ বা আর্থিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়।
লিঙ্গীয় সাম্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাস হলো বিবাহ ও পারিবারিক সম্পর্ক। কুরআন বিবাহকে পারস্পরিক ‘মাওয়াদ্দাহ’ (মমতা) ও ‘রাহমাহ’ (করুণা)-এর অংশীদারিত্ব হিসাবে চিত্রিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنْ ءَايَـٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَٰجًۭا لِّتَسْكُنُوٓا۟ إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةًۭ وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَـَٔايَـٰتٍۢ لِّقَوْمٍۢ يَتَفَكَّرُونَ
অর্থ: "এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক মমতা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।" (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)
স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের ‘লিবাস’ (আভরণ) বা পরিপূরক ও রক্ষক, যা পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সাম্যের প্রতিই ইঙ্গিত করে। সৃষ্টিগত তারতম্যের কারণে নারী যেমন সন্তান ধারণে সক্ষম, এবং পুরুষ প্রায়শই পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালন করে, এই ভিন্নতা শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক নয়। এটি কেবল স্বভাবজাত দায়িত্ব ও সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত কার্যবিভাজন মাত্র।
ইসলাম নারীর শিক্ষার অধিকার, কর্মজীবনের অভিযাত্রা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম নারী শুধুমাত্র গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তাঁরা সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং শিক্ষায় প্রোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন। পুরুষের দায়িত্বও কেবল আর্থিক নয়, বরং নৈতিক দিকনির্দেশনা, সুরক্ষা এবং সহযোগিতার এক বিস্তৃত জিম্মাদারি। তাকওয়ার এই মহান নীতিই প্রমাণ করে যে, অর্জিত কোনো সুবিধা বা ক্ষমতা অযৌক্তিকভাবে নারীর উপর প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কুরআনের মৌলনীতি ও ইসলামের শাশ্বত নৈতিক আদর্শের পরিপন্থী।
বস্তুত, ইসলামে লিঙ্গীয় সাম্য কেবল তাত্ত্বিক স্বীকৃতি নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক এবং ধর্মীয় জিম্মাদারির এক অপূর্ব সমন্বয়। পুরুষ ও নারী নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে সমান দায়িত্বশীল, এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়েই ‘ক্বিওয়ামাহ্’র প্রকৃত রূপ কার্যকর হয়।
‘ক্বিওয়ামাহ্’র ঐতিহাসিক ও সমকালীন দৃষ্টিকোণ
ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ‘ক্বিওয়ামাহ্’র ব্যাখ্যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে বিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীন ইসলামী সমাজে পুরুষদের আর্থিক জিম্মাদারি অনস্বীকার্য ছিল, কারণ নারীদের স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ ছিল সীমিত। ইমাম আল-তাবারীর মতো মুফাসসিরগণ ইহাকে প্রাকৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব অপেক্ষা আর্থিক দায়িত্বের সাথেই অধিক সংশ্লিষ্ট করেছেন। পরবর্তীকালে কিছু তাফসীরকার এই দায়িত্বকে পুরুষের জৈবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশেষত্বের সাথে যুক্ত করেছেন, যার শাব্দিক প্রয়োগ আজকের প্রেক্ষাপটে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হতে পারে।
আধুনিক গবেষকগণ ‘ক্বিওয়ামাহ্’-কে পুনরায় এর প্রেক্ষাপট-নির্ভর তাৎপর্যে অবলোকন করেন। ড. রিফফাত হাসান এবং ড. আজিজাহ আল-হিবরির মতে, পুরুষের এই দায়িত্ব বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য, যেমন—নারীরা যখন নির্ভরশীল বা অভিজ্ঞতাহীন। আজকের নারীরা শিক্ষায়, মননে ও কর্মে স্বমহিমায় ভাস্বর এবং সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সুতরাং ‘ক্বিওয়ামাহ্’ এখন পারস্পরিক দায়িত্ব, ন্যায় এবং সমর্থনের এক সুষম নীতি হিসাবেই কার্যকর হওয়া বাঞ্ছনীয়, আধিপত্যের হাতিয়ার হিসাবে নয়।
ইসলাম পুরুষ ও নারীর সম্পূরক ভূমিকা স্বীকার করে, কিন্তু তা সমতাকে ক্ষুণ্ণ করে না। নারী সন্তান ধারণ ও প্রতিপালনে স্বভাবজাত ক্ষমতার অধিকারী, পুরুষ পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালনে অধিক সক্ষম। তবে এই ভূমিকা আপেক্ষিক এবং পরিবর্তনীয়। নারী শিক্ষায় ও কর্মজীবনে যেমন অংশ নিতে পারেন, পুরুষও গৃহস্থালির কাজ ও যত্নে নিযুক্ত হতে পারেন। কুরআনে বিবাহকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থনের এক পবিত্র অংশীদারিত্ব হিসাবেই চিত্রিত করা হয়েছে।
লিঙ্গীয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে গতানুগতিক ব্যাখ্যার পুনর্বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। তারিক রামাদানের মতে, নারীর জীবনের বাস্তব প্রেক্ষাপট অনুধাবন করে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। নারীর অবদান শুধুমাত্র গৃহকর্ত্রী বা জননী হিসাবে নয়, বরং শিক্ষাগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও সুবিন্যস্ত ও বিস্তৃত।
ঐতিহাসিক ও সমকালীন মুসলিম নারীর প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
ইসলামের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসে মুসলিম নারীরা সমাজে যে প্রোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন, তা ‘ক্বিওয়ামাহ্’ ও লিঙ্গীয় ন্যায়বিচারের অনুধাবনে এক গুরুত্বপূর্ণ বাতিঘর। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাঃ) ছিলেন একজন প্রথিতযশা ফকীহ, শিক্ষিকা ও মুহাদ্দিস। তিনি হাজার হাজার হাদীস বর্ণনা করেছেন, যা ইসলামী আইন ও নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি। ইহা প্রমাণ করে, নারীরা কেবল গৃহে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং জ্ঞান ও নেতৃত্বেও সক্রিয় ছিলেন।
প্রথম উম্মুল মুমিনীন খাদিজাহ (রাঃ) ছিলেন এক প্রজ্ঞা ও সাফল্যমণ্ডিত মহীয়সী ব্যবসায়ী, যিনি স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জন এবং সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি দেখায় যে, নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ এবং তা পুরুষের দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
আধুনিক যুগেও ফাতিমা আল-ফিহরি কর্তৃক মরক্কোর ফেজ-এ বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় (আল-কারাউইন) প্রতিষ্ঠা নারী নেতৃত্বের এক অনন্য নজির। মুসলিম বিশ্বের নারীরা বর্তমানে রাজনীতি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং ব্যবসায় নেতৃত্বের ভূমিকায় সমাসীন। ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ‘ক্বিওয়ামাহ্’র ধারণা পরিস্থিতি-নির্ভর এবং ন্যায়ভিত্তিক।
সর্বোপরি, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনাদর্শ প্রদর্শন করে যে, পুরুষরা কীভাবে তাঁহাদের দায়িত্ব ন্যায়নিষ্ঠভাবে পালন করবেন। তিনি স্বয়ং পারিবারিক দায়িত্ব পালনে ও গৃহকর্মে অংশগ্রহণ করতেন এবং নিজ স্ত্রীদের সুপরামর্শকে গুরুত্ব দিতেন। ইহা প্রমাণ করে যে, ইসলামে লিঙ্গীয় ন্যায়বিচার এক পারস্পরিক দায়িত্ব। আজকের মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য এটি এক সুস্পষ্ট নির্দেশনা যে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝে ভারসাম্য আনয়ন সম্ভব। নারীর শিক্ষা, নেতৃত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন যখন পুরুষের ন্যায়নিষ্ঠ জিম্মাদারির সাথে মিলিত হয়, তখনই ‘ক্বিওয়ামাহ্’ ন্যায়, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সুমহান নীতি হিসাবে কার্যকর হয়।
উপসংহার: ইসলামের কাঠামোতে লিঙ্গীয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
উপসংহারে বলা যায়, ‘ক্বিওয়ামাহ্’ একাধারে দায়িত্ব, নৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রায়োগিক বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত, ইহা পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্যকে নিশ্চিত করে না। প্রাচীন ব্যাখ্যাসমূহ সমকালীন সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হলেও, আধুনিক ব্যাখ্যাসমূহ নির্দেশ করে যে, ‘ক্বিওয়ামাহ্’ শর্তসাপেক্ষ এবং প্রেক্ষাপট-নির্ভর, যা ন্যায়, সমতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার শাশ্বত মূলনীতির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কুরআনের শাশ্বত মৌলনীতি, যেমন ‘তাকওয়া’ (সূরা হুজুরাত: ১৩) এবং বৈবাহিক জীবনে ‘মাওয়াদ্দাহ’ ও ‘রাহমাহ’ (সূরা রূম: ২১), দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিত করে যে, পুরুষ ও নারী আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিকভাবে সমান। আয়িশা (রাঃ), খাদিজাহ (রাঃ) এবং ফাতিমা আল-ফিহরির মতো ঐতিহাসিক ও আধুনিক দৃষ্টান্তসমূহ প্রমাণ করে যে, নারীরা সমাজের সকল ক্ষেত্রে সক্রিয় ও নেতৃত্বশীল হতে পারেন।
আজকের প্রেক্ষাপটে লিঙ্গীয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো গতানুগতিক ব্যাখ্যাসমূহের পুনর্বিবেচনা, আধুনিক বাস্তবতার নিরিখে দায়িত্ব নির্ধারণ এবং নারীর স্বাধীনতা ও পুরুষের ন্যায়নিষ্ঠ জিম্মাদারি নিশ্চিত করা। ইসলামে লিঙ্গীয় ন্যায়বিচারের ধারণা কোনো পশ্চিমী প্রভাবে প্রভাবিত নয়, বরং এটি আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি নিশ্চিত করে যে, পুরুষ ও নারী সমানভাবে আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও নৈতিকভাবে বিকশিত হবে এবং ‘ক্বিওয়ামাহ্’ এক ন্যায়, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সুমহান নীতি হিসাবেই ক্রিয়াশীল থাকবে।