ল্যাব-উৎপাদিত মাংস কি হালাল? ইসলামী আইন, বিজ্ঞান ও নৈতিক সংকট

ভূমিকা

আধুনিক বিশ্বে খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রাণীর অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মাংস ভোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিল্পভিত্তিক মাংস উৎপাদন পদ্ধতির কারণে পরিবেশ দূষণ এবং প্রাণীদের প্রতি নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর ফলে বিকল্প খাদ্য হিসেবে ল্যাব-উৎপাদিত বা কৃত্রিম মাংসের ধারণা সামনে এসেছে। তবে মুসলিমদের জন্য শুধু পরিবেশ বা নৈতিকতা নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই নতুন ধরনের মাংস ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল কি না। এই লেখায় ল্যাব-উৎপাদিত মাংসকে ঘিরে উত্থাপিত এই বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মাংস ভোগ ও ল্যাব-উৎপাদিত মাংস

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে MIT Technology Review-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস ঘোষণা করেন যে, “সব ধনী দেশকে সম্পূর্ণভাবে শতভাগ কৃত্রিম গরুর মাংসের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।” ধনী দেশগুলোর মানুষ বেশি মাংস খায়, এবং এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশে কী প্রভাব ফেলছে—তা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণী ভোগ এবং মাংস শিল্পে চলা নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরা নানা আন্দোলন বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, খাদ্যতালিকা থেকে মাংস কমানো বা বাদ দেওয়ার আহ্বানও বেড়েছে। এই প্রবণতা আমেরিকান মুসলিম সমাজের মধ্যেও ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ভেগান ও নিরামিষভোজীরা এখনো সংখ্যালঘু, তবে দ্রুত উন্নত বিকল্প খাবার এবং সেগুলোর সহজলভ্যতার কারণে এটি একটি জনপ্রিয় জীবনধারা হয়ে উঠেছে। ইউটিউব জুড়ে সৃজনশীল ভেগান বিকল্প ব্যবহার করে তৈরি অসংখ্য রেসিপির ভিডিও পাওয়া যায়।

এমনই এক বিকল্প হলো কালচার্ড মিট বা ল্যাব-উৎপাদিত মাংস, যা আরও একটি বিকল্প খাদ্য হিসেবে গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। এটি স্বাদে আসল মাংসের মতো এবং পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো বলে দাবি করা হচ্ছে। একটি কোম্পানি এমনকি দাবি করেছে যে, বর্তমান মাংস শিল্পের তুলনায় তাদের ল্যাব-উৎপাদিত পণ্য ৯৯% কম জমি ব্যবহার করে, ৯৬% কম বিশুদ্ধ পানি লাগে এবং ৮০% কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও ফিকহি জটিলতা

মুসলিম আলেমরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? জীবপ্রযুক্তি সম্পর্কিত ইসলামী আলোচনার জন্য ইংরেজিতে বেশ কিছু উৎস রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো শায়খ মুসা ফুরবারের প্রবন্ধ ও নিবন্ধসমূহ। ল্যাব-উৎপাদিত মাংস মুসলিমদের জন্য একাধিক সমস্যার সৃষ্টি করে, তবে সবচেয়ে স্পষ্ট সমস্যাটি হলো শরিয়তসম্মত জবাই। উদাহরণস্বরূপ, ঈদুল আযহায় কোরবানি এবং মাংস বিতরণ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। এছাড়া, শিশুর জন্মের মতো উপলক্ষেও কোরবানি একটি সুপারিশকৃত আমল।

শায়খ মুসা ফুরবার তাঁর প্রবন্ধ “Intensive Animal Farming: Wrongs & Responsibilities”-এ  নিবিড় পশুপালনের সমালোচনা করেছেন এবং প্রাণীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার সংশোধনের বিষয়ে আমাদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন: “প্রাণীজাত খাদ্য সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া মুসলিমদের জন্য বাস্তবসম্মত কিংবা কাম্য নয়, কারণ একাধিক ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠানে প্রাণী কোরবানি জড়িত। তাছাড়া, পরিমিতভাবে মাংস খাওয়া রাসূল -এর সুন্নত। তাই শরিয়ত নিরামিষভোজী হওয়ার নির্দেশ দেয়—এমন দাবি করা যায় না, কিংবা এটিকে সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায় না। বরং আমাদের করণীয় হলো—ধর্মীয় নির্দেশনা ও সঠিক চিকিৎসা পরামর্শের আলোকে পরিমিতভাবে মাংস ভোগ নিশ্চিত করা এবং নিশ্চিত করা যে আমরা যে প্রাণী ভোগ করি, সেগুলো শরিয়তের বিধান অনুযায়ী পালন করা হয়েছে।”

সংক্ষেপে বলা যায়, যারা এই ধারণা থেকে খাদ্যতালিকা থেকে মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান যে পশুর মাংস খাওয়া স্বভাবগতভাবেই অনৈতিক বা অন্যায়—এই ধারণা ভুল। আল্লাহ কিছু নির্দিষ্ট মাংস খাওয়াকে হালাল (বৈধ) করেছেন। আসল সমস্যা মাংস শিল্পে প্রাণীদের প্রতি করা দুর্ব্যবহারে। পশুর মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়া না তো বাস্তবসম্মত, না-ই আদর্শ। তাই কেউ কেউ ল্যাব-উৎপাদিত মাংসকে তৃতীয় একটি বিকল্প হিসেবে দেখছেন যার মাধ্যমে বর্তমান শোষণমূলক পদ্ধতিতে যুক্ত না হয়ে পশুর মাংস গ্রহণ কমানো যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে শায়খ ফুরবার প্রশ্ন তুলেছেন,  “ল্যাব-উৎপাদিত মাংস কি ফিকহি (ইসলামী আইনসংক্রান্ত) সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে পারে?”

কোষের উৎস, FBS ও নৈতিক বিতর্ক

কৃত্রিম মাংসের আরেকটি কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো কোষের উৎস। ল্যাব-উৎপাদিত মাংস জীবিত প্রাণী থেকে নেওয়া টিস্যু বা কোষ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো মাংস হালাল হতে হলে তা জীবিত প্রাণী থেকে কাটা হতে পারে না। যদি জীবিত প্রাণী থেকে কোষ বা মাংস আলাদা করা হয়, তবে তা মাইতাহ হিসেবে গণ্য হয়, যার অর্থ মৃত বা পচা মাংস, এবং এটি খাওয়া হারাম। এই কারণে, এমনকি যদি শেষ পর্যায়ে তৈরি মাংসে শুধু অনুকরণকৃত কোষই থাকে, তবুও সেটি হারাম গণ্য হবে।

আমেরিকান ফিকহ একাডেমি (AFA) ল্যাব-উৎপাদিত মাংস বিষয়ে দেওয়া এক সিদ্ধান্তে বলেছে, এই ক্ষেত্রে অনুকরণকৃত কোষও হারাম হবে, কারণ এই মাংসকে হালাল করার জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামী জবাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি।

শায়খ ফুরবার উল্লেখ করেন, প্রাথমিক কোষের নমুনা অবশ্যই এমন প্রাণী থেকে নিতে হবে, যাকে শরিয়ত অনুযায়ী জবাই করা হয়েছে এবং যা মানুষের খাওয়ার জন্য বৈধ। জীবিত প্রাণী থেকে কোষ নেওয়া যাবে না। এই ক্ষেত্রে একটি জবাইকৃত হালাল প্রাণী ও খাওয়ার উপযোগী মাংস আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে। তবে যদি কোনো বৈধ উপায়ে এমন হালাল কোষ ব্যবহার করে আরও বেশি মাংস উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে পশু ভোগের সংখ্যা কমানো যেতে পারে। হালাল উৎস ছাড়াও, ল্যাব-উৎপাদিত মাংস তৈরির জন্য যে পদ্ধতি ও উপাদান ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকেও বৈধ হতে হবে। এই বিষয়ে দেওয়া ফতোয়ার লেখকগণ এবং শায়খ ফুরবার—উভয়েই বলেন যে রক্তের সিরাম খাওয়া হারাম। এখানে যে রক্তের সিরামের কথা বলা হচ্ছে, তা হলো ফিটাল বোভাইন সিরাম (FBS), যা অধিকাংশ কোম্পানি ল্যাব-উৎপাদিত মাংস উৎপাদনে ব্যবহার করে।

এই পদ্ধতি মুসলিম সমাজের বাইরেও বিতর্কিত, কারণ এর উৎস নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এটি আসে গর্ভবতী গাভীর গর্ভস্থিত বাছুরের রক্ত নিষ্কাশনের মাধ্যমে। প্রাপ্তবয়স্ক গরুর সিরামের তুলনায় FBS-এ বেশি পরিমাণে গ্রোথ ফ্যাক্টর থাকে, যা কোষ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রোথ ফ্যাক্টর কোষকে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে, কারণ ল্যাবের পরিবেশে কোষ খুবই সংবেদনশীল এবং সহজেই আত্মধ্বংস -এর শিকার হতে পারে।

ল্যাব-উৎপাদিত মাংস নিয়ে তাঁর লেখা “The Gruesome Truth About Lab-Grown Meat” প্রবন্ধে নিক থিমে FBS ব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, “যদিও বর্তমানে FBS ব্যবহার করা সুবিধাজনক, তবুও এটি ল্যাব-উৎপাদিত মাংসের মূল উদ্দেশ্যকেই নষ্ট করে দেয়। কারণ এতে এখনো গরু জবাই করতে হচ্ছে। তাহলে এত জটিল প্রক্রিয়ায় গরুর কোষ থেকে আবার গরুর কোষ তৈরি করার বদলে সরাসরি গরুর মাংসই বা না খাওয়া কেন? বাস্তবে নৈতিক দিক থেকে দেখলে, জন্ম না নেওয়া বাছুরের রক্ত বের করে মাংস তৈরি করা আরও ভয়ংকর ও অস্বস্তিকর পদ্ধতি।”

এই সমস্যার সমাধানে কিছু কোম্পানি FBS ছাড়াই ল্যাব-উৎপাদিত মাংস তৈরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, বিশেষ করে কারণ FBS অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর বিকল্প তৈরি করা গেলে কোম্পানিগুলোর বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে। এখানে উল্লেখিত ফিকহি সমস্যাগুলোর বাইরেও আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যেমন—এই মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে হবে কি না, কৃষি ও পশুপালন নির্ভর মানুষের জীবিকার ওপর এর প্রভাব, স্বাস্থ্যগত প্রভাব, খাদ্য ব্যবস্থার ওপর বড় প্রযুক্তি কোম্পানির নির্ভরতা বৃদ্ধি, এবং তাদের মালিকানাধীন প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্বের বিষয় ইত্যাদি।ল্যাব-উৎপাদিত মাংস নিয়ে আলোচনা শেষ পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গেই ফিরে আসে এবং মুসলিমরা কীভাবে নিশ্চিত করে যে তারা যা খাচ্ছে তা ইসলামী আইনের সীমার মধ্যে রয়েছে—এই বিষয়টিও সামনে আসে। এই উদ্বেগ শুধু মুসলিমদের নয়; ইহুদি সমাজেও মাংসের বৈধতা নির্ধারিত হয় জবাই পদ্ধতির মাধ্যমে, এবং তারাও ল্যাব-উৎপাদিত মাংস কোশার হবে কি না—তা নিয়ে ভাবছে।

বর্তমানে বাজারে থাকা ল্যাব-উৎপাদিত মাংস হালাল হওয়ার শর্ত পূরণ করে না। তবে আলেম ও গবেষকেরা নতুন উন্নয়নগুলোর দিকে নজর রাখছেন। একই সঙ্গে, ল্যাব-উৎপাদিত মাংসকে স্থায়ী সমাধান ভাবার বদলে আমাদের উচিত প্রাণীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, তাদের প্রতি করা অন্যায় সংশোধন করা, এবং আল্লাহ -এর নামে শরিয়তসম্মতভাবে জবাই করার মাধ্যমে তাদের অধিকার রক্ষা করা—যাতে তারা হালাল খাদ্যের সম্মানিত উৎস হিসেবে বজায় থাকে।

উপসংহার 

 সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, ল্যাব-উৎপাদিত মাংস পরিবেশগত ও নৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখনো বহু জটিলতার মুখে। শরিয়তসম্মত জবাই, কোষের উৎস এবং হারাম উপাদানের ব্যবহার—এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে সমাধান না হলে একে হালাল বলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ইসলাম প্রাণী ভোগ নিষিদ্ধ করে না, বরং তাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়। তাই স্থায়ী সমাধান হিসেবে কৃত্রিম মাংসের ওপর নির্ভর না করে, পশুপালনের ন্যায়সংগত পদ্ধতি উন্নত করা এবং শরিয়তের বিধান মেনে খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter