কুম্ভমেলার প্রস্তুতি নাকি ঐতিহ্যের সংকট? উজ্জয়িনীর শাহি মসজিদ ঘিরে তীব্র বিতর্ক
মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন শাহি মসজিদকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভমেলা উপলক্ষে সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদের একটি অংশ অপসারণের প্রশাসনিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শত শত মানুষ প্রতিবাদে নেমেছেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) মোতায়েন করতে হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত থেকে বহু মুসল্লি মসজিদের ভেতরে ও বাইরে অবস্থান নিয়ে প্রার্থনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করেন। মধ্যরাতের পর উত্তেজনা বাড়লে প্রশাসন নিরাপত্তা জোরদার করে এবং মসজিদ চত্বর ঘিরে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়।
কেন এই পদক্ষেপ?
উজ্জয়িনীর ছত্রী চৌক এলাকায় অবস্থিত গোপাল মন্দির সড়ককে ১৫ মিটার প্রশস্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে উজ্জয়িন পৌর কর্পোরেশন। প্রশাসনের দাবি, সিংহস্থ কুম্ভমেলার সময় কোটি কোটি ভক্ত উজ্জয়িনীতে আসবেন এবং তাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে শহরের প্রধান সড়কগুলো সম্প্রসারণ করা জরুরি।
কণ্ঠাল থেকে গোপাল মন্দির পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করার অংশ হিসেবেই বিভিন্ন স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কয়েকটি মন্দিরসহ অন্যান্য কাঠামোর অংশও অপসারণ করা হয়েছে এবং এই পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনাকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি; বরং এটি জনস্বার্থে পরিচালিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ।
আদালতের দ্বারস্থ মসজিদ কমিটি
মসজিদ কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। শাহি মসজিদ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চে আবেদন করা হলেও আদালত তা খারিজ করে দেয়।
বিচারপতি সন্দীপ এন ভাট পর্যবেক্ষণে বলেন, সিংহস্থ কুম্ভমেলার মতো বৃহৎ জনসমাগমের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা উপযুক্ত নয়।
তবে মসজিদ ট্রাস্ট বিষয়টি মেনে নেয়নি। তারা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করেছে এবং মামলার শুনানি নির্ধারিত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধান দাবি, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ভাঙার কাজ শুরু করা উচিত নয়।
ঐতিহ্য রক্ষার দাবি
মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, শাহি মসজিদ ১৩৯০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি উজ্জয়িনীর অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা।
তাঁর মতে, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় সড়ক উন্নয়নের বিরোধী নয়। তবে শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপনার সামান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি দাবি করেন, মসজিদের ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং প্রধান নামাজ হলসহ পুরো ভবনটির স্থায়িত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কাছাকাছি খোলা জমি বা বিকল্প পথ ব্যবহার করে সড়ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছে।
এআইএমআইএম প্রধান ও সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি প্রশাসনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয় এবং ঐতিহাসিক মসজিদ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ওয়াইসি আরও দাবি করেন যে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে ধর্মীয় সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, বর্তমান পদক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে অবকাঠামোগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য
উজ্জয়িনীর শাহি মসজিদকে ঘিরে চলমান বিতর্ক ভারতের বহু শহরে দেখা দেওয়া একটি বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে এনেছে—ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ এবং আধুনিক নগর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?
একদিকে রয়েছে কুম্ভমেলার মতো বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটির জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা। অন্যদিকে রয়েছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি।
আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এখন নির্ধারণ করবে উজ্জয়িনীর এই ঐতিহাসিক স্থাপনার ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোবে। তবে আপাতত শাহি মসজিদকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং গোটা এলাকা নিরাপত্তার কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে।