বিহারের ভয়াবহ বন্যায় ডুবছে ঘরবাড়ি ও মানুষের স্বপ্ন, প্রকৃতির রুদ্ররূপের আড়ালে উন্মোচিত এক অদেখা মানবিক সংকট
ভূমিকা: যখন জল শুধু মাটি নয়, মানুষের জীবনও গ্রাস করে
বন্যা মানেই শুধু নদীর পানি বেড়ে যাওয়া নয়। একটি পরিবারের কাছে বন্যা মানে হয়তো বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘর হারানোর আশঙ্কা; একজন কৃষকের কাছে মানে মাঠের ফসল, পরিশ্রম ও আয়ের অনিশ্চয়তা; একটি শিশুর কাছে মানে বই-খাতা ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটানো। আর একজন সাধারণ মানুষের কাছে, বন্যা মানে আগামীকাল কেমন হবে, সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতি নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪টি জেলার ৮৪টি সার্কেল, ৫১৮টি পঞ্চায়েত এবং ২,১৫৭টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; প্রায় ৪০.৫১ লাখ মানুষ বন্যার প্রভাবে পড়েছিলেন। একই সময়ে গঙ্গা পাটনা ও ভাগলপুরে আগের সর্বোচ্চ বন্যাস্তরের রেকর্ডও অতিক্রম করেছিল।
কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে আরও একটি বিহার, যে বিহারকে দেখা যায় ত্রাণশিবিরে, নৌকার ওপর, প্লাস্টিকের অস্থায়ী ছাউনির নিচে এবং সেই মানুষগুলোর চোখে, যারা জানেন না পানি নেমে যাওয়ার পর তাঁদের ঘরে আদৌ কী অবশিষ্ট থাকবে।
নদীর জল বাড়ে, আর মানুষের অনিশ্চয়তাও বাড়ে
বিহারের বন্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু স্থানীয় বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে না। ২০২৬ সালের এই বন্যার সময় জুনের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ পর্যন্ত রাজ্যে সামগ্রিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ২৭ শতাংশ কম ছিল। তবুও গঙ্গা, গণ্ডক, কোসি, বুড়ি গণ্ডক, পুনপুন ও ঘাঘরা নদীর বিভিন্ন অংশে পানি বিপদসীমার ওপরে উঠেছিল।
এর পেছনে ছিল নদীর উজানে পানি বৃদ্ধি, স্থানীয় ভারী বৃষ্টি, নদীগুলোর পারস্পরিক জলপ্রবাহ এবং গঙ্গার উচ্চ জলস্তরের কারণে তৈরি হওয়া ‘backwater effect’, যার ফলে কিছু উপনদীর পানি সহজে গঙ্গায় নামতে পারেনি।
অর্থাৎ বন্যা কখনও শুধু আকাশের বৃষ্টির গল্প নয়। নদীর ভূগোল, পলির সঞ্চয়, নদীর গতিপথ, বসতি এবং মানুষের জীবনযাপন, সবকিছু মিলেই একটি বড় বাস্তবতা তৈরি করে।
জলের নিচে চলে যায় একটি পরিবারের বহু বছরের পরিশ্রম
একটি ঘর তৈরি হতে হয়তো কয়েক বছর লাগে। কেউ একটু একটু করে টাকা জমিয়ে দেয়াল তোলে, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ফসল ফলায়, কেউ ঘরের কোণে রেখে দেয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সামান্য সঞ্চয়। কিন্তু বন্যার পানি যখন সেই ঘরে ঢোকে, তখন ক্ষতি শুধু ইট-কাঠ-মাটির হয় না।
সাম্প্রতিক বন্যায় ভাগলপুরের ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেউ বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন নথিপত্র, টাকা, গয়না ও মজুত শস্য। পানি সরে গেলেও তাঁদের সামনে ছিল ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা।
এই কারণেই বন্যার ক্ষতি শুধু “কতটি বাড়ি ডুবেছে”, এই প্রশ্ন দিয়ে বোঝা যায় না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কতগুলো পরিবারকে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে?
বিহারের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অনেক। তাই বন্যার পানিতে একটি ক্ষেত ডুবে যাওয়া মানে শুধু একটি জমি ডোবা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের শ্রম, বীজ, সার, ঋণ এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। আজ যে জমিতে পানি, সেখানে হয়তো কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল সবুজ ফসল। কৃষকের কাছে সেই ফসল ছিল আগামী মাসের খাবার, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা পরিবারের চিকিৎসার টাকা। তাই বন্যার পানির উচ্চতা মাপা যতটা জরুরি, তার সঙ্গে মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবিকার হিসাব করাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর হাতে বইয়ের বদলে যখন আসে অনিশ্চয়তা
বন্যার সবচেয়ে নীরব ক্ষতিগুলোর একটি হলো শিক্ষাজীবনের ব্যাঘাত। একটি শিশু যখন স্কুলে যাওয়ার বদলে পানিবন্দি বাড়িতে থাকে, তখন শুধু একটি দিনের ক্লাস নষ্ট হয় না। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতে পারে, বই-খাতা নষ্ট হতে পারে এবং পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কারণে শিশুর স্বাভাবিক জীবন বদলে যেতে পারে। সেপ্টেম্বরের বন্যায় বিহারের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একটি শিশুর হাতে আবার বই তুলে দেওয়া তাই বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বন্যার সময় উদ্ধার ও ত্রাণ সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু বন্যা কমে যাওয়ার পরও মানুষের সংকট শেষ হয় না। কোথায় ফিরবে পরিবার? ঘরটি কি বসবাসের উপযোগী আছে? ফসলের কী হবে? হারিয়ে যাওয়া নথিপত্র কীভাবে ফিরে পাওয়া যাবে? কাজ আবার কোথা থেকে শুরু হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অনেক সময় লাগে।
ভাগলপুরের ত্রাণশিবির নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন মানুষের কথা উঠে এসেছে, যারা অস্থায়ী তাঁবুতে থেকেও বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের অনেকের ঘর ডুবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ ছিল অনিশ্চিত। তাই বন্যা শেষ হওয়ার অর্থ শুধু পানি কমে যাওয়া নয়। মানুষের জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেই প্রকৃত অর্থে দুর্যোগের সমাপ্তি ঘটে।
কুরআনের শিক্ষা: বিপদের সময় মানুষের পরীক্ষা
ইসলাম বিপদ ও দুর্যোগকে মানুষের জন্য ধৈর্য, দায়িত্ব ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখতে শেখায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে “অমুক পাপের শাস্তি” বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
অর্থ: আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনে বিপদ আসতে পারে এবং সেই সময় ধৈর্য, ঈমান ও মানবিক দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
অর্থ: যখন তাদের ওপর কোনো বিপদ আসে, তখন তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।
এই শিক্ষা বিপদগ্রস্ত মানুষকে অসহায় করে দেওয়ার জন্য নয়; বরং বিপদের মুহূর্তে ধৈর্য, আশা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়।
বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ইবাদতের অংশ
বন্যার সময় একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, খাবার পৌঁছে দেওয়া, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা কিংবা বিপদগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য করা, এসব মানবিক কাজ ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ
অর্থ: বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।
এই হাদিসের শিক্ষা বন্যার সময় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষকে বিভাজনের চোখে নয়, মানুষের চোখে দেখা দরকার।
প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক: শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, দায়িত্বও
বন্যার মতো দুর্যোগ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু প্রকৃতিকে দোষ দেওয়া যথেষ্ট নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, বন্যাপ্রবণ ভূমিতে বসতি, পলি জমা, বাঁধ, নগর পরিকল্পনা এবং জল নিষ্কাশনের মতো বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়। বিহারের নদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমতে থাকলে নদীর তলদেশের উচ্চতা ও জলধারণক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে নদীর চর ও নিচু এলাকায় মানুষের বসতি থাকায় পানির উচ্চতা বাড়লে ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
তাই বন্যা মোকাবিলার প্রশ্নটি শুধু “বাঁধ আরও উঁচু হবে কি না”, এখানে থেমে থাকতে পারে না। নদী অববাহিকা, ভূমি ব্যবহার, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়, উদ্ধারব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
উপসংহার: পানি নেমে যাবে, কিন্তু স্বপ্নগুলো যেন ডুবে না যায়
বন্যার পানি একদিন না একদিন নেমে যাবে। যে রাস্তা আজ পানির নিচে, সেখানে আবার মানুষের চলাচল শুরু হবে। যে মাঠ আজ জলমগ্ন, সেখানে হয়তো আবার সবুজ ফসল দেখা যাবে। যে শিশুটি আজ ত্রাণশিবিরে বসে আছে, সে আবার বই হাতে স্কুলে ফিরবে, এটাই আমাদের আশা।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, পানি নেমে যাওয়ার পর মানুষগুলো কি সত্যিই আগের জীবনে ফিরে যেতে পারবে? কারণ বন্যা শুধু ঘরের দেয়ালে দাগ রেখে যায় না; কখনও কখনও মানুষের জীবনের ওপরও গভীর দাগ রেখে যায়। কোনো কৃষক হারান তাঁর ফসল, কোনো পরিবার হারায় বছরের সঞ্চয়, কোনো শিশু হারায় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, আবার কেউ হারিয়ে ফেলেন নিজের নিরাপদ আশ্রয়। পানির স্রোত চলে যায়, কিন্তু সেই ক্ষতি পূরণ করতে অনেকের মাস, কখনও বছর লেগে যেতে পারে।
এই কঠিন সময়ে আল্লাহ তাআলার একটি মহান বাণী আমাদের মনে আশা ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়,
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
অর্থ: নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।
এই আয়াত যেন দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য আশার এক বার্তা, কষ্ট যত গভীরই হোক, আল্লাহর রহমত ও স্বস্তির দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। তাই বিহারের বন্যাকে শুধু কয়েক দিনের একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের মানবিকতা, প্রস্তুতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সমাজ হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতারও পরীক্ষা।
কারণ বন্যা থামানো সবসময় আমাদের হাতে নাও থাকতে পারে, কিন্তু বন্যার্ত মানুষের হাতটি ধরে রাখা আমাদের হাতে। শেষ পর্যন্ত বন্যার আসল গল্প শুধু “কতটা পানি উঠেছিল”, তা নয়। আসল গল্প হলো, “পানি নেমে যাওয়ার পর কতগুলো জীবন আবার উঠে দাঁড়াতে পারল।”
আল্লাহ তাআলা বিহারসহ বিশ্বের সব দুর্যোগপীড়িত মানুষকে হেফাজত করুন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ধৈর্য ও শক্তি দিন এবং আমাদের সবাইকে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।