ফোরাত নদীর মৃত্যু, স্বর্ণের পাহাড় ও মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি

ইরাকের রুক্ষ মাটির ওপর দিয়ে বয়ে চলা এক জীর্ণ শীর্ণ জলধারা। এককালে যা ছিল প্রমত্তা, যার দুকূল ছাপানো ঢেউয়ে সিক্ত হতো মেসোপটেমিয়ার বিশাল জনপদ, সেই ঐতিহাসিক ফোরাত নদী আজ যেন মৃত্যুর দিন গুনছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, নাসার স্যাটেলাইট ইমেজ কিংবা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের গবেষণা—সব জায়গা থেকেই আসছে একই অশনি সংকেত। ফোরাত শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর নেমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়তো নিছকই জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ দৃশ্য কিংবা খরার প্রভাব। কিন্তু যারা নবুওয়াতের বাণীতে বিশ্বাস রাখেন, যারা চৌদ্দশ বছর আগের মদীনার সেই মরুঝড়ের মাঝে উচ্চারিত সতর্কবার্তাগুলো বুকে ধারণ করেন, তাদের জন্য এই দৃশ্যটি কেবলই একটি নদীর মৃত্যু নয়। এটি এক মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি। এটি সেই চূড়ান্ত সময়ের ঘণ্টা, যার হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছেন মানবতার মহান শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

আজকের এই আধুনিক বিশ্ব যখন মেটাভার্স আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন ইরাকের ধূসর মরুভূমিতে নীরবে ঘটে চলেছে ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পালাবদল। আজ আমরা এমন এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যখন হাদিসের পাতা থেকে উঠে আসা শব্দগুলো যেন চোখের সামনে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ফোরাত নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং তার গর্ভ থেকে এক বিশাল স্বর্ণভাণ্ডার বা ‘সোনার পাহাড়’ জেগে ওঠার যে ভবিষ্যৎবাণী রাসূল (সা.) করেছিলেন, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে চিন্তাশীল মহলে। কী সেই ভবিষ্যৎবাণী? কেন এই সম্পদকে বলা হয়েছে এক ভয়ংকর ফিতনা? আর কেনই বা আধুনিক জিও-পলিটিক্সের সমীকরণগুলো মিলে যাচ্ছে হাদিসের সেই সতর্কবার্তার সাথে? চলুন, একটু গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখা যাক।

সভ্যতার সূতিকাগার বলা হয় মেসোপটেমিয়াকে, যা গড়ে উঠেছিল দজলা ও ফোরাত নদীর অববাহিকায়। ইতিহাসের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী এই নদী। কিন্তু কিয়ামতের পূর্বে এই নদীটি যে এক বিশাল রহস্য উন্মোচন করবে, তা হয়তো আধুনিক বিজ্ঞান কিছুদিন আগপর্যন্ত কল্পনাও করতে পারেনি। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস মুমিন হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,  لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَحْسِرَ الْفُرَاتُ عَنْ جَبَلٍ مِنْ ذَهَبٍ، يَقْتَتِلُ  النَّاسُ عَلَيْهِ، فَيُقْتَلُ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، وَيَقُولُ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ: لَعَلِّي أَكُونُ أَنَا الَّذِي أَنْجُو  “ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না ফোরাত নদী শুকিয়ে যাবে এবং তা থেকে একটি সোনার পাহাড় বা স্বর্ণের খনি উন্মোচিত হবে। মানুষ তা নিয়ে লড়াই করবে এবং সেই লড়াইয়ে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই নিহত হবে। আর তাদের প্রত্যেকেই বলবে—হয়তো আমিই সেই ব্যক্তি যে বেঁচে যাব এবং এই সম্পদের মালিক হব।”

একটু ভাবুন তো, পরিসংখ্যানটা কতটা ভয়াবহ! শতকরা ৯৯ জন নিহত হওয়া! এটি সাধারণ কোনো যুদ্ধ নয়। এটি তলোয়ার বা বন্দুকের যুদ্ধ হতে পারে না। ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জন মারা যাওয়া মানে হলো এক চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ, যা কেবল আধুনিক যুগের পারমাণবিক বা মারণাস্ত্রের যুদ্ধের মাধ্যমেই সম্ভব। আজকের বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলটি গত কয়েক দশক ধরেই যুদ্ধের এক বিশাল ক্ষেত্র হয়ে আছে। তেল সম্পদের দখল নিয়ে পরাশক্তিগুলোর কামড়াকামড়ি আমরা দেখেছি। কিন্তু হাদিস বলছে, আসল খেলা এখনো বাকি। তেলের চেয়েও দামী, সম্ভবত আক্ষরিক অর্থেই ‘সোনা’ বা এমন কোনো মহামূল্যবান খনিজ সম্পদ ফোরাতের বুকে লুকিয়ে আছে, যা জেগে ওঠার অপেক্ষায়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ফোরাত নদী কি আসলেই শুকিয়ে যাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। একদিকে তুরস্কের বিশাল সব বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প (GAP Project), অন্যদিকে সিরিয়া ও ইরাকের খরা এবং অব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে নদীর প্রবাহ কমে গেছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। অনেক জায়গায় নদী এতটাই শীর্ণ হয়ে গেছে যে, হেঁটেই এক পার থেকে অন্য পারে যাওয়া যায়। নদীর তলদেশ থেকে জেগে উঠছে হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ এবং কবরস্থান। নাসার গ্রেস (GRACE) মিশনের তথ্য অনুযায়ী, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস অববাহিকা বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম হারে পানি হারাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে এই নদী পুরোপুরি শুকিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, হাদিসের প্রথমাংশ—‘নদী শুকিয়ে যাওয়া’—এখন আর কোনো ভবিষ্যৎবাণী নয়, এটি এখন আমাদের চোখের সামনে ঘটা এক রূঢ় বাস্তবতা।

কিন্তু মুমিনের চিন্তার বিষয় নদী শুকিয়ে যাওয়া নয়, বরং এরপর কী হতে যাচ্ছে—তা নিয়ে। রাসূল (সা.) স্পষ্ট শব্দে ‘সোনার পাহাড়’ (জাবালুন মিন জাহাব) এর কথা বলেছেন। কিছু আধুনিক স্কলার মনে করতেন, এই ‘সোনা’ হয়তো রূপক অর্থে ‘কালো সোনা’ বা তেলকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং হাদিসের শাব্দিক বিশ্লেষণ ভিন্ন দিকে ইঙ্গিত করে। হাদিসে বলা হয়েছে, পানি ‘অপসারিত’ হয়ে সোনা জেগে উঠবে। তেল মাটির গভীর থেকে পাম্প করে তুলতে হয়, পানি সরলে তেল ভেসে ওঠে না। কিন্তু পানি সরে গেলে নদীর তলদেশে থাকা খনিজ সম্পদ বা পাহাড় দৃশ্যমান হতে পারে। ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, ইউফ্রেটিস নদীর তলদেশ খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কী আছে সেই মাটির নিচে, যা বিশ্ববাসীকে পাগল করে দেবে? যা দখল করার জন্য ভাই ভাইয়ের বুকে গুলি চালাবে, পরাশক্তিগুলো একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে?

এখানেই আসে হাদিসের দ্বিতীয় অংশের সতর্কতা। রাসূল (সা.) এই সম্পদকে মুসলিম উম্মাহর জন্য কোনো সুসংবাদ হিসেবে দেননি, বরং এটিকে চিহ্নিত করেছেন এক ভয়াবহ পরীক্ষা হিসেবে। অন্য একটি বর্ণনায় তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, “যে ব্যক্তি ওই সময় উপস্থিত থাকবে, সে যেন তা থেকে কিছুই গ্রহণ না করে।” কেন এই নিষেধাজ্ঞা? সাধারণত খনিজ সম্পদ বা গুপ্তধন পাওয়া গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা। কিন্তু ফোরাতের এই সোনা হবে অভিশপ্ত। এটি এমন এক ফিতনা যা মানুষের লোভকে উসকে দেবে চূড়ান্ত পর্যায়ে। মানুষ জানবে যে এই যুদ্ধে নামলে মৃত্যুর সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ, তবুও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে প্রত্যেকে ভাববে, “বাকি ৯৯ জন মরবে, কিন্তু আমিই হব সেই ১ জন যে বেঁচে ফিরব এবং সব সোনার মালিক হব।” এই যে লোভের মরীচিকা, এটিই ডেকে আনবে মানবতার ধ্বংস।

বর্তমান জিও-পলিটিক্যাল প্রেক্ষাপটে এই হাদিসটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই বারুদের স্তূপ। সেখানে যদি হঠাৎ করে ফোরাত নদীর বুকে বিশাল কোনো স্বর্ণের খনি বা ইউরেনিয়ামের মতো দামী কোনো খনিজ আবিষ্কৃত হয়, তবে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইউরোপ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কি বসে থাকবে? কখনোই না। তারা 'মানবতা রক্ষা' বা 'সন্ত্রাস দমন' এর দোহাই দিয়ে সেই সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর সেই সংঘাতই হয়তো রূপ নেবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে, যাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ‘আল-মালহামাতুল কুবরা’ বা মহাযুদ্ধ। হাদিসে বর্ণিত বিপুল প্রাণহানির সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয় যে, সেই যুদ্ধে আধুনিক মারণাস্ত্রের ব্যবহার হবে ব্যাপক।

আমরা যারা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে আছি, আমাদের বোঝা উচিত সময় কতটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিয়ামতের ছোট ছোট আলামতগুলো (Minor Signs) একে একে শেষ হয়ে এখন বড় আলামতগুলোর (Major Signs) দরজা খুলতে শুরু করেছে। ফোরাত নদী শুকিয়ে যাওয়া মানেই হলো আমরা সেই দরজার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি। এরপর হয়তো ইমাম মাহদীর আগমন, দাজ্জালের ফিতনা এবং হযরত ঈসা (আ.) এর অবতরণ—ঘটনাগুলো তাসের ঘরের মতো একটার পর একটা ঘটতে থাকবে।

অথচ আমাদের প্রস্তুতি কী? আমরা আজ ক্যারিয়ার, বাড়ি, গাড়ি আর ব্যাংকের ব্যালেন্স নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, আখেরাতের সেই ভয়াবহ দিনটির কথা বেমালুম ভুলে গেছি। ফোরাতের পানি কমা যেমন সত্য, কিয়ামত তেমনই সত্য। একজন বুদ্ধিমান মুমিন কখনোই আগুনের দিকে ঝাঁপ দেয় না। রাসূল (সা.)-এর বারণ থাকার পরেও যারা সেই সম্পদের লোভে যুদ্ধে জড়াবে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু যারা এই ফিতনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখবে, নিজের ঈমান নিয়ে নির্জনে সরে যাবে, তারাই হবে প্রকৃত সফলকাম।

এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি ওয়েক-আপ কল (Wake-up call)। ফোরাত নদী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নবুওয়াতের প্রতিটি শব্দ সত্য। চৌদ্দশ বছর আগের মরুভূমির সেই নবী (সা.) যা বলেছিলেন, আজকের স্যাটেলাইট যুগ তা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দিচ্ছে। এটা কি আমাদের ঈমান বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট নয়? এটা কি প্রমাণ করে না যে, কুরআন ও সুন্নাহর বাইরে সত্যের আর কোনো অস্তিত্ব নেই?

তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার। ফোরাতের পানি যত কমছে, আমাদের তওবা করার সময়ও তত কমে আসছে। পৃথিবী হয়তো আমাদের শেখাচ্ছে সম্পদ গড়তে, কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখাচ্ছে মোহ ত্যাগ করতে। আগামী দিনগুলোতে যখন বিশ্বজুড়ে সম্পদের জন্য হাহাকার পড়ে যাবে, তখন মুমিনের সম্বল হবে তার সিজদাহ এবং রবের ওপর তাওয়াক্কুল।

আসুন, ফোরাত নদীর শুকিয়ে যাওয়া এই দৃশ্যকে কেবল একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন হিসেবে না দেখে, একে ঈমানের দৃষ্টিতে দেখি। প্রস্তুত হই সেই সময়ের জন্য, যখন সোনা-রুপা বা ডলার কোনো কাজে আসবে না, কাজে আসবে কেবল একটি প্রশান্ত হৃদয় (ক্বালবুন সালিম) । ফোরাতের নিচে সোনার পাহাড় জাগুক বা না জাগুক, আমাদের ঈমানের পাহাড় যেন অটুট থাকে—এটাই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা। ইতিহাসের চাকা ঘুরছে, আর সেই চাকার ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ উড়তে শুরু করেছে ফোরাতের তীরে। আমরা কি সেই আগুনের আঁচ টের পাচ্ছি? নাকি আমরা এখনো ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি এক অমর পৃথিবীর, যা আসলে মাকড়সার জালের চেয়েও ঠুনকো?

সিদ্ধান্ত আপনার। স্রোতস্বিনী ফোরাত আজ ক্লান্ত, কিন্তু তার এই ক্লান্তি মহাবিশ্বের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। সেই অধ্যায়ের সাক্ষী হতে আমরা প্রস্তুত তো?

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter