সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকা এবং সূরা নাযিল হলে দুইবার বিসমিল্লাহ আসার কারণ

ভূমিকা: 

পবিত্র কুরআন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ আসমানি কিতাব। এই কিতাব কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; এটি মানুষের জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। কুরআনের প্রতিটি সূরা, প্রতিটি আয়াত এবং প্রতিটি শব্দের মধ্যে রয়েছে গভীর জ্ঞান, অসংখ্য শিক্ষা এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ হিকমত। অনেক সময় কুরআনের কিছু বিষয় আমাদের কাছে সাধারণ মনে হলেও, যখন আমরা তাফসিরের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করি, তখন বুঝতে পারি যে এর পেছনে কত গভীর রহস্য এবং শিক্ষা লুকিয়ে রয়েছে।

কুরআনের প্রায় সব সূরার শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” লেখা রয়েছে। মুসলমানরা যখন কোনো ভালো কাজ শুরু করে, তখন আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করে। কারণ আল্লাহর নামের মধ্যে বরকত, রহমত এবং সফলতা রয়েছে। কিন্তু কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে একটি মাত্র সূরা আছে, যার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। সেই সূরার নাম হলো সূরা তাওবা। আবার এমন একটি সূরা আছে, যেখানে বিসমিল্লাহ দুইবার এসেছে। সেটি হলো সূরা নামল। এই বিষয়টি বহু শতাব্দী ধরে মুফাসসির, মুহাদ্দিস এবং ইসলামী গবেষকদের আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। তারা এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও হিকমত তুলে ধরেছেন।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমের গুরুত্ব

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” অর্থ হলো, “পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।” এটি শুধু একটি বাক্য নয়; বরং একজন মুসলমানের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূলুল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে প্রতিটি ভালো কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করা উচিত। খাওয়া, পান করা, লেখা, পড়া, ভ্রমণ, বক্তব্য দেওয়া, বই লেখা, এমনকি ঘরে প্রবেশ করার সময়ও আল্লাহর নাম নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিসমিল্লাহর মধ্যে আল্লাহ তাআলার দুটি মহান গুণবাচক নাম উল্লেখ করা হয়েছে—আর-রহমান এবং আর-রহিম। “আর-রহমান” অর্থ এমন দয়ালু, যার দয়া সমস্ত সৃষ্টি জগতের উপর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। আর “আর-রহিম” অর্থ এমন দয়ালু, যিনি বিশেষভাবে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি দয়া করেন। তাই কুরআনের অধিকাংশ সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ রেখে আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ কেন নেই?

এটি কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়ে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রথম কারণ: সূরা আনফাল ও সূরা তাওবার বিষয়বস্তুর মিল

হযরত عثمان بن عفان থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন কুরআনকে একত্রিত করে মুসহাফ আকারে সংকলন করা হয়, তখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল যে সূরা তাওবা কি একটি স্বতন্ত্র সূরা, নাকি সূরা আনফালেরই ধারাবাহিক অংশ। কারণ এই দুই সূরার বিষয়বস্তু অত্যন্ত কাছাকাছি।

উভয় সূরাতেই যুদ্ধ, জিহাদ, গনীমতের মাল, ইসলামী রাষ্ট্রের নীতি এবং কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ জীবদ্দশায় এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কোনো নির্দেশ দেননি যে দুই সূরার মাঝখানে বিসমিল্লাহ লিখতে হবে। তাই সাহাবায়ে কেরাম সতর্কতার সঙ্গে দুই সূরার মাঝখানে বিসমিল্লাহ লিখেননি। বিখ্যাত মুফাসসির محمد بن جریر طبری এই মতকে শক্তিশালী মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয় কারণ: সূরা তাওবা রহমতের নয়, সতর্কবার্তার সূরা

হযরত আলী (রা.) থেকে একটি বিখ্যাত উক্তি বর্ণিত আছে। তিনি বলেন,

“বিসমিল্লাহ রহমত ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সূরা তাওবা নাযিল হয়েছে মুশরিকদের বিরুদ্ধে ঘোষণা, সতর্কবার্তা এবং শাস্তির সংবাদ নিয়ে।”

সূরা তাওবার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা বলেন:

بَرَاءَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ

অর্থাৎ, “এটি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা।”

এখানে আল্লাহ তাআলা সেইসব মুশরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ঘোষণা দিয়েছেন, যারা মুসলমানদের সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। তাই অনেক আলেম মনে করেন, যেহেতু সূরার শুরুতে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে, তাই সেখানে রহমতের বাক্য বিসমিল্লাহ উল্লেখ করা হয়নি।

তৃতীয় কারণ: বিসমিল্লাহ নাযিলই হয়নি

বিখ্যাত মুফাসসির فخر الدین رازی বলেন, সবচেয়ে সহজ এবং মূল উত্তর হলো—সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ নাযিল হয়নি। তাই কুরআনের মুসহাফেও তা লেখা হয়নি।

তিনি বলেন, কুরআনের প্রতিটি আয়াত এবং প্রতিটি শব্দ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সংরক্ষিত হয়েছে। যেখানে বিসমিল্লাহ নাযিল হয়েছে, সেখানে তা লেখা হয়েছে। আর যেখানে নাযিল হয়নি, সেখানে তা লেখা হয়নি। তাই সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকার মূল কারণ হলো এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়নি।

চতুর্থ কারণ: চুক্তি বাতিলের ঘোষণা

প্রখ্যাত মুফাসসির ابن کثیر বলেন, সূরা তাওবার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো সেইসব মুশরিকদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করা, যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল।

এই সূরার মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তারা আর আগের চুক্তির সুবিধা পাবে না। তাই সূরাটি শুরু থেকেই সরাসরি ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে। এখানে কোনো ভূমিকা বা কোমল ভাষা ব্যবহার করা হয়নি।

পঞ্চম কারণ: আরবদের প্রচলিত রীতি

কিছু মুফাসসির আরবদের সামাজিক রীতির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তারা বলেন, আরব সমাজে যখন শান্তি, বন্ধুত্ব বা সহযোগিতার কোনো বার্তা পাঠানো হতো, তখন চিঠির শুরুতে নম্র ও সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু যখন কোনো চুক্তি বাতিল করা হতো বা যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হতো, তখন সরাসরি মূল বক্তব্য বলা হতো।

যেহেতু সূরা তাওবাও এক অর্থে চুক্তি বাতিল এবং সতর্কবার্তার ঘোষণা, তাই এটি সেই রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাযিল হয়েছে।

সূরা নামলে দুইবার বিসমিল্লাহ কেন এসেছে?

সূরা নামল কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এর শুরুতে অন্যান্য সূরার মতো একবার বিসমিল্লাহ রয়েছে। কিন্তু এরপর আবার ৩০ নম্বর আয়াতে বিসমিল্লাহ এসেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

অর্থ: “এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে এবং এটি 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' দিয়ে শুরু করা হয়েছে।”

এই আয়াতে হযরত سلیمان-এর সেই ঐতিহাসিক চিঠির কথা বলা হয়েছে, যা তিনি সাবার রানীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি চিঠির শুরুতেই আল্লাহর নাম উল্লেখ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা সেই চিঠির ভাষা হুবহু কুরআনে তুলে ধরেছেন। ফলে এই বিসমিল্লাহও কুরআনের অংশ হয়ে গেছে। এ কারণেই সূরা নামলে বিসমিল্লাহ দুইবার দেখা যায়।

ইমাম তাবারীর ব্যাখ্যা: 

ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে নবীগণও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং চিঠিপত্র আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করতেন। এটি নবীদের একটি সুন্দর সুন্নত।

ইমাম কুরতুবীর ব্যাখ্যা:

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, এই আয়াত মুসলমানদের জন্য একটি শিক্ষা। তারা যেন নিজেদের চিঠি, বই, বক্তব্য, গবেষণা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করে। কারণ এতে বরকত ও সফলতা আসে।

ইমাম রাজীর ব্যাখ্যা: 

ইমাম রাজী (রহ.) বলেন, হযরত সুলাইমান (আ.) ছিলেন একাধারে নবী এবং পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী শাসক। তিনি চাইলে নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদার কথা উল্লেখ করে চিঠি শুরু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে প্রথমেই আল্লাহর নাম নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে প্রকৃত ক্ষমতা, মর্যাদা এবং সম্মান একমাত্র আল্লাহর।

ইবনে আশুরের ব্যাখ্যা: 

প্রখ্যাত মুফাসসির محمد الطاہر ابن عاشور বলেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে ইসলামে নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা এবং দাওয়াত—সবকিছুই আল্লাহর আনুগত্যের অধীন। হযরত সুলাইমান (আ.) তাঁর রাজত্বকে আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়:

এই আলোচনা থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই।

প্রথমত: কুরআনের প্রতিটি শব্দ ও আয়াতের পেছনে গভীর হিকমত রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: সব ভালো কাজ আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করা উচিত।

তৃতীয়ত: মানুষের যত বড় পদ বা ক্ষমতাই থাকুক না কেন, তাকে সবসময় আল্লাহর প্রতি বিনয়ী থাকতে হবে।

চতুর্থত: আল্লাহর আদেশ ও কুরআনের বিধানের মধ্যে কোনো কিছুই অকারণে নেই; প্রতিটি বিষয়ের পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য ও জ্ঞান রয়েছে।

উপসংহার:

সব মুফাসসিরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকা কোনো ভুল নয়, বরং এটি আল্লাহ তাআলার বিশেষ হিকমতের অংশ। কেউ বলেছেন সূরা আনফালের সঙ্গে এর সম্পর্কের কারণে বিসমিল্লাহ লেখা হয়নি, কেউ বলেছেন এটি সতর্কবার্তা ও সম্পর্কচ্ছেদের সূরা হওয়ার কারণে, আবার কেউ বলেছেন আল্লাহ তাআলা সেখানে বিসমিল্লাহ নাযিলই করেননি।

অন্যদিকে সূরা নামলে বিসমিল্লাহ দুইবার এসেছে, কারণ একবার সূরার শুরুতে এবং আরেকবার হযরত সুলাইমান (আ.)-এর চিঠির মধ্যে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁর নাম দিয়ে শুরু করা উচিত।

কুরআনের এই বিষয়টি আমাদের সামনে আল্লাহর অসীম জ্ঞান, কুরআনের সৌন্দর্য এবং ইসলামের গভীর শিক্ষাকে তুলে ধরে। তাই আমাদের উচিত কুরআনকে শুধু তিলাওয়াত করা নয়, বরং তার অর্থ, শিক্ষা এবং হিকমত বুঝে জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন বুঝে পড়ার, তার উপর আমল করার এবং তার শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter