ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তির মরীচিকা: ‘দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি’-র আলোকে পিটার সিঙ্গারের নাস্তিক্যবাদের বিনির্মাণ
এক সত্যান্বেষী শিক্ষার্থীর কলমে আমার পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত 'সি.সি.ই' (CCE)-র অংশ হিসেবে আমাকে এক গুরুগ গম্ভীর কার্যে ব্রতী হইতে হইয়াছিল। প্রখ্যাত নীতি-দার্শনিক তথা নাস্তিক্যবাদী চিন্তাবিদ পিটার সিঙ্গারের যুক্তিজালের বিশ্লেষণ এবং হামজা জর্টিসের কালজয়ী গ্রন্থ 'দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি: গড, ইসলাম অ্যান্ড দ্য মিরাজ অফ এথিজম' (The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism)-এর শাণিত যুক্তিদ্বারা তাহার খণ্ডন—ইহাই ছিল আমার পরীক্ষার বিষয়বস্তু।
পিটার সিঙ্গার ধর্মনিরপেক্ষ নীতিশাস্ত্রে এক এবং অদ্বিতীয় নাম। তাঁহার বাচনভঙ্গি করুণারসে সিক্ত এবং তিনি নাস্তিক্যবাদকে বিদ্রোহের পরিবর্তে 'যৌক্তিক' এবং স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু হামজা জর্টিসের গ্রন্থে নিমজ্জনের পর আমি উপলব্ধি করিলাম, সিঙ্গারের যুক্তিগুলি দূর হইতে দুর্ভেদ্য মনে হইলেও, সত্যের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তাহা মরীচিকার ন্যায় মিলাইয়া যায়। এই প্রবন্ধটি অন্ধ বিশ্বাস প্রসূত নহে, বরং জর্টিসের অকাট্য যুক্তিবাদের ভিত্তিতে গড়িয়া ওঠা আমার তাত্ত্বিক উপলব্ধির সারাংশ।
মহাজাগতিক ভ্রান্তি: "আমার ওরূপ অনুকল্পের প্রয়োজন নাই"
সিঙ্গার তাঁহার আলোচনার প্রারম্ভেই নেপোলিয়নের প্রশ্নের উত্তরে ল্যাপলাসের সেই বিখ্যাত উক্তিটি উদ্ধৃত করেন— "ঈশ্বর নামক অনুকল্পের (hypothesis) আমার কোনো প্রয়োজন ছিল না।" সিঙ্গারের মতে, মহাবিশ্বের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের আবশ্যকতা নাই; মহাবিশ্ব শাশ্বত হইতে পারে কিংবা ক্রমাগত প্রসারণ ও সংকোচনের দোলায় দুলিতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যদি ঈশ্বরের কোনো আদি কারণের প্রয়োজন না থাকে, তবে মহাবিশ্বেরই বা কেন থাকিবে?" সাধারণ দৃষ্টিতে ইহাকে অকাট্য মনে হইতে পারে। কিন্তু 'দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি'-র পাঠকমাত্রই জানেন, ইহা এক তাত্ত্বিক বিভাগ ত্রুটি বা শ্রেণিগত বিভ্রান্তি।
জর্টিস অত্যন্ত নিপুণভাবে 'অসীম পশ্চাদপসরণ' (Infinite Regress) এবং 'নির্ভরশীলতা' (Dependency)-র প্রভেদ বুঝাইয়া দিয়াছেন। তিনি 'স্নাইপার' বা লক্ষ্যভেদীর উপমা ব্যবহার করিয়াছেন: একজন লক্ষ্যভেদী ততক্ষণ গুলি ছুঁড়িতে পারেন না, যতক্ষণ না তিনি তাঁহার উপরস্থ কর্মকর্তার অনুমতি পান; সেই কর্মকর্তা আবার তাঁহার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতির অপেক্ষায় থাকেন। এই শৃঙ্খল যদি অনন্তকাল ধরিয়া চলিতে থাকে, তবে গুলিটি কি আদৌ কোনোদিন ছোঁড়া হইবে? না। ঠিক তেমনই, মহাবিশ্বের অতীত যদি কার্য-কারণের এক অসীম শৃঙ্খল হয়, তবে বর্তমান মুহূর্তটি কখনোই অস্তিত্ব লাভ করিত না। সুতরাং, এমন এক আদি সত্তার প্রয়োজন যিনি স্বয়ম্ভু এবং অনপেক্ষ।
অধিকন্তু, সিঙ্গার 'শাশ্বত' এবং 'স্বাধীন'—এই দুই ধারণাকে এক করিয়া ফেলিয়াছেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরিয়াও লওয়া হয় যে মহাবিশ্ব শাশ্বত, তবুও ইহা 'নির্ভরশীল'। মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদান পরিবর্তনশীল এবং সীমিত। জর্টিস যেমন বলিয়াছেন, একটি নির্ভরশীল বস্তুকে ব্যাখ্যা করিতে গিয়া অনন্তকাল ধরিয়া অপর একটি নির্ভরশীল বস্তুর দোহাই দেওয়া অর্থহীন—যেন শিকলের একটি কড়াকে ব্যাখ্যা করিতে পূর্ববর্তী কড়ার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা। পরিশেষে শিকলটিকে ধরিয়া রাখিবার জন্য একটি শক্ত খুঁটির প্রয়োজন হয়। সিঙ্গারের প্রশ্ন, "ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করিল?"—ইহা জর্টিসের ভাষায় এক "শিশুসুলভ বিবাদ"। ঈশ্বর সংজ্ঞাগতভাবেই 'অমুখাপেক্ষী' এবং 'স্বয়ম্ভু'। যিনি অনাদি, তাঁহার স্রষ্টাকে খোঁজা আর 'বৃত্তাকার ত্রিভুজ' খোঁজা একইরূপ অযৌক্তিকতা।
নৈতিকতার মরীচিকা: চকোলেট বানি ও মানবসত্তা
সিঙ্গারের সবচাইতে আবেগঘন যুক্তিটি নৈতিকতা বিষয়ক। তিনি বলেন, নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নাই; অপরের দুঃখ-দুর্দশা অনুভব করিবার ক্ষমতাই যথেষ্ট। তিনি 'গোল্ডেন রুল' বা সোনালী নিয়মের দোহাই দিয়া বলেন, "আমি অন্যের স্থানে থাকিলে যেইরূপ আচরণ প্রত্যাশা করিতাম, অন্যের সহিত তদ্রূপ আচরণ করাই ধর্ম।"
শুনাইতে ইহা অতি মধুর, কিন্তু 'দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি' হইতে আমি শিখিয়াছি যে, দার্শনিক প্রকৃতিবাদ বা নাস্তিক্যবাদের কাঠামোতে এই যুক্তির কোনো শক্ত ভিত্তি নাই। জর্টিস 'চকোলেট বানি' (Chocolate Bunny)-র উপমা দিয়া বিষয়টি স্পষ্ট করিয়াছেন। যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে মানুষ এবং চকোলেট বানি—উভয়েই কেবল পারমাণবিক কণার বিন্যাস (rearrangement of matter) ভিন্ন আর কিছুই নহে। একটি চকোলেট পুতুল ভাঙা আর একটি মানুষের ক্ষতি করা—বস্তুবাদী দৃষ্টিতে ইহা কেবল পরমাণুর স্থান পরিবর্তন মাত্র।
সিঙ্গার বলেন আমাদের উচিত দুঃখ লাঘব করা। কিন্তু ঈশ্বরহীন বিশ্বে এই 'উচিত'-এর মানদণ্ড কে ঠিক করিবে? বিবর্তন? প্রকৃতি তো নির্মম; সেখানে সবল দুর্বলকে গ্রাস করে। সমাজ? নাৎসি সমাজ তো ইহুদি নিধনকে সঠিক মনে করিত। যদি নৈতিকতা কেবল সামাজিক প্রথা বা বিবর্তনের ফল হয়, তবে তাহা 'বস্তুনিষ্ঠ' (Objective) নহে, তাহা কেবলই এক অনুভূতি মাত্র।
ইসলামি দর্শনে নৈতিকতার শিকড় প্রোথিত আছে ঈশ্বরের সত্তায়—যিনি 'আল-হক' (সত্য) এবং 'আল-আদল' (ন্যায়বিচারক)। সিঙ্গারের নৈতিকতা সেই ছিন্ন পুষ্পের ন্যায়, যাহা দেখিতে সুন্দর হইলেও শিকড়বিহীন হওয়ায় অচিরেই মলিন হইয়া ঝরিয়া পড়িবে।
যুক্তির আত্মহনন: অন্ধ চালক
সিঙ্গার সগর্বে ঘোষণা করেন যে ধর্মবিশ্বাস 'অযৌক্তিক' এবং বজ্রপাতের দেবতা মানিবার মতোই হাস্যকর। তিনি বিজ্ঞানকে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি বলিয়া দাবি করেন।
আমার পর্যালোচনার এই পর্যায়টি ছিল সবচাইতে চমকপ্রদ। 'দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি' প্রমাণ করিয়া দেয় যে, প্রকৃতপক্ষে নাস্তিক্যবাদই যুক্তির সবচাইতে বড় শত্রু।
জর্টিস তৃতীয় অধ্যায়ে 'অন্ধ চালক' (Blind Driver)-এর উপমা উপস্থাপন করেন। সিঙ্গার তাঁহার মস্তিষ্ক ও যুক্তি ব্যবহার করিয়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাই। কিন্তু তাঁহার নিজের দর্শনানুযায়ী, তাঁহার মস্তিষ্ক অন্ধ, উদ্দেশ্যহীন এবং এলোমেলো বিবর্তনের ফসল—যাহার একমাত্র লক্ষ্য ছিল 'টিকিয়া থাকা' (Survival), 'সত্য জানা' (Truth) নহে।
আপনি কি এমন কোনো ট্যাক্সি চালকের উপর ভরসা করিবেন যিনি চোখে কালো কাপড় বাঁধিয়া গাড়ি চালাইতেছেন? নিশ্চয়ই না। একটি অন্ধ প্রক্রিয়া কখনোই আপনাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাইয়া দিতে পারে না। ঠিক তেমনই, যদি আমাদের মস্তিষ্ক কেবল অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল হয়, তবে আমরা কেন বিশ্বাস করিব যে আমাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক ক্রিয়াগুলি আমাদিগকে 'পরম সত্যের' সন্ধান দিতেছে? ডারউইন স্বয়ং এই সন্দেহের পীড়ায় ভুগিয়াছিলেন। ঈশ্বরকে অস্বীকার করিতে গিয়া সিঙ্গার সেই ডালটিকেই কাটিয়া ফেলিতেছেন যাহার উপর তিনি বসিয়া আছেন। একমাত্র একজন প্রজ্ঞাময় স্রষ্টাই আমাদের যুক্তিবোধের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
ডুবন্ত জাহাজের অস্তিত্ববাদ
পরিশেষে, সিঙ্গার জীবনের অর্থহীনতার কথা স্বীকার করেন এবং বলেন যে আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনের অর্থ তৈরি করিয়া লইতে পারি। তিনি বলেন, মহাবিশ্বের কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নাই, তাই এই স্বল্পায়ু জীবনে অন্যের দুঃখ মোচন করাই সার্থকতা।
শুনাইতে মহৎ হইলেও, জর্টিস ইহাকে এক প্রকার 'অস্তিত্ববাদী পলায়নপরতা' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তিনি ইহাকে 'ডুবন্ত জাহাজ'-এর সহিত তুলনা করিয়াছেন। যদি মহাবিশ্ব নামক এই জাহাজটি নিশ্চিত ধ্বংসের (Heat death) দিকে আগাইয়া যায়, তবে জাহাজের ডেকে বসিয়া আসবাবপত্র সাজানো বা নিজের মনগড়া 'অর্থ' তৈরি করা কি নিছক ছেলেমানুষি নহে?
সিঙ্গারের দর্শনে একজন অত্যাচারী এবং একজন সাধু—উভয়েরই পরিণতি এক: মৃত্যু এবং অনন্ত শূন্যতা। সেখানে কোনো ন্যায়বিচার নাই। জর্টিসের মতে, প্রকৃত অর্থ 'তৈরি' করা যায় না, তাহা 'আবিষ্কার' করিতে হয়। আর সেই অর্থ নিহিত আছে স্রষ্টার উপাসনায় এবং পরকালীন অনন্ত ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়।
উপসংহার: এক অনিবার্য আহ্বান
এই সি.সি.ই (CCE) অ্যাসাইনমেন্টটি কেবল পিটার সিঙ্গারের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইহা ছিল ইসলামি তাত্ত্বিক দর্শনের এক বলিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়াস। সিঙ্গারের যুক্তিগুলি—যাহা সেকেলে কার্যকারণ তত্ত্ব এবং আত্মসাংঘর্ষিক যুক্তিবাদের উপর দণ্ডায়মান—হামজা জর্টিসের শাণিত বিশ্লেষণের সামনে টিকিতে পারে নাই।
'দ্য ডিভাইন রিয়ালিটি' কেবল নাস্তিক্যবাদকেই খণ্ডন করে না, বরং বিশ্বাসীর হৃদয়ে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়িয়া তোলে। এই গ্রন্থ হৃদয় এবং মস্তিষ্কের ব্যবধান ঘুচাইয়া দেয় এবং প্রমাণ করে যে, মানুষের সহজাত বিশ্বাস কেবল আবেগ নহে, বরং কঠিন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
আমি প্রত্যেক সত্যপিপাসুকে এই গ্রন্থটি পাঠ করিবার আহ্বান জানাই। সংশয়বাদীর জন্য ইহা এক প্রবল চ্যালেঞ্জ, আর বিশ্বাসীর জন্য ইহা এক অভেদ্য বর্ম। পাশ্চাত্য দর্শন এবং পবিত্র কুরআনের প্রজ্ঞার এই অপূর্ব সংমিশ্রণ এক অনবদ্য সৃষ্টি, যাহা পাঠ না করা হবে এক বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি।