ম্যালকম এক্স থেকে মামদানি: ইনসাফ ও মুক্তির চিরন্তন সংগ্রাম

ইতিহাসের পাতায় ন্যায়বিচারের সংগ্রাম কখনোই স্থবির হয়ে থাকে না; এটি একটি প্রবহমান নদী, যা যুগে যুগে নতুন বাঁক নেয়। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সেই কিংবদন্তি আইকন ম্যালকম এক্স এবং আজকের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানি—ভিন্ন দুই প্রজন্মের এই দুই প্রতিনিধি যেন একই নৈতিক অবস্থানে দণ্ডায়মান। একদিকে যখন অনেক রাজনীতিবিদ স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে ঘুরপথে হাঁটেন এবং নিরাপদ কিন্তু অন্তঃসারশূন্য বাগাড়ম্বরের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখেন, তখন এই দুই ব্যক্তিত্ব সত্যের পথে আপসহীন।

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের সংগ্রাম কখনোই সত্যিকার অর্থে শেষ হয়ে যায় না। একে কখনো চাপা দেওয়া হয়, কখনো মুছে ফেলার আয়োজন চলে, আবার কখনো বা সযত্নে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়—কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো এটি বারবার ফিরে আসে। ফিরে আসে নতুন রূপে, নতুন মুখে এবং প্রতিবাদের নতুন সুরে।

ভিন্ন দুই কালখণ্ডে জন্ম নেওয়া এই দুটি মানুষ—একজন বিংশ শতাব্দীর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মশালবাহী, অন্যজন একবিংশ শতাব্দীর নিউইয়র্কের উদীয়মান রাজনীতিক—তবুও তাঁদের আত্মার সুর এক, তাঁদের নৈতিক অবস্থান অভিন্ন। ম্যালকম এক্সের শাহাদাতের প্রায় ছয় দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও, জোহরান মামদানি সেই একই সাম্য, ন্যায়বিচার ও মুক্তির মশাল হাতে নিয়ে, কঠোর ও আপসহীন বিশ্বাসকে পাথেয় করে সম্মুখপানে এগিয়ে চলেছেন।

১. ঈমানি চেতনার জাগরণ: বর্ণবাদ থেকে বিশ্বভ্রাতৃত্ব

এই আখ্যানের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—ম্যালকম এক্স এবং জোহরান মামদানি, উভয়েই তাঁদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে লজ্জিত নন, বরং গর্বিত। ম্যালকম এক্সের প্রাথমিক চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিল বর্ণবিভাজনের নির্মম বাস্তবতা ও 'নেশন অব ইসলাম'-এর কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে। সেই আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের বা 'হোয়াইট সুপ্রিমেসি'-র তীব্র বিরোধিতা করেছিল সত্য, কিন্তু পৃথিবীকে তখনও তাঁরা দেখতেন দ্বিখণ্ডিভাবে—কালো ও সাদা, মজলুম ও জালেম হিসেবে।

যে মানুষটি তাঁর জীবনজুড়ে কেবল 'জিম ক্রো' আইনের নিষ্ঠুরতাই প্রত্যক্ষ করেছেন—অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে প্রচলিত বর্ণভিত্তিক বৈষম্য—তাঁর কাছে এই বিভাজনই ছিল এক অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য। কিন্তু এরপর তাঁর জীবনে আসে সেই আধ্যাত্মিক বসন্ত—মক্কায় পবিত্র হজ্জের সফর। বাইতুল্লাহর ছায়ায় তিনি যা দেখলেন এবং অন্তরে যা অনুভব করলেন, তা তাঁর সেই দ্বিখণ্ডিত চিন্তার প্রাচীরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল।

তিনি নিজেই তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন, যা আজও আমাদের শিহরিত করে:

“আমার মুখ থেকে এসব কথা শুনে হয়তো আপনি বিস্মিত হবেন। কিন্তু এই হজ সফরে আমি যা দেখেছি ও যা অনুভব করেছি, তা আমাকে আমার আগের অনেক চিন্তা নতুন করে সাজাতে বাধ্য করেছে এবং আমার কিছু পুরনো সিদ্ধান্ত একেবারে ছুড়ে ফেলতে হয়েছে।” 

পবিত্র ভূমিতে ম্যালকম এক্স এমন এক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যা আমেরিকা তাঁকে শিখিয়েছিল 'অসম্ভব' বলে। সেখানে নীল চোখের স্বর্ণকেশী মানুষ থেকে শুরু করে আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ—সবাই একই ইবাদতে, একই মর্যাদায় এবং একই উদ্দেশ্যে সিজদাবনত।

ইসলামের এই শাশ্বত সাম্যের বাণী পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

(অর্থ: হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।) [Surah Al-Hujurat, :]

ম্যালকম এক্স সেই ঐশী বাণীর বাস্তব প্রতিফলন দেখেছিলেন মক্কার জমিনে। তিনি লিখেছিলেন, “এত আন্তরিক আতিথেয়তা এবং প্রকৃত ভ্রাতৃত্ববোধ আমি আগে কখনো দেখিনি। আমরা সবাই একই ইবাদতে অংশ নিচ্ছিলাম, এমন এক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের চেতনাকে প্রকাশ করছিলাম—যা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ মানুষের মধ্যে কখনোই সম্ভব নয়।” 

২. কাঠামোগত নির্যাতন ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি

হজ্জ কেবল ম্যালকমের রাজনীতির ভাষাই বদলায়নি, বরং তা তাঁর রুহ বা আত্মাকেও বদলে দিয়েছিল। তিনি এক নবজাগরণ ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তখন তাঁর সামনে কেবল কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তির স্বপ্ন ছিল না, বরং সমগ্র মানবজাতির মর্যাদা ও সম্মানের একটি সর্বজনীন ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমেরিকার ইসলামকে বোঝা দরকার। কারণ ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা সমাজ থেকে বর্ণবৈষম্যের সমস্যাকে মুছে দেয়।” 

ম্যালকম এক্স এরপর বর্ণবাদকে কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা বন্ধ করলেন; তিনি একে দেখতে শুরু করলেন একটি বৈশ্বিক কাঠামোর অংশ হিসেবে। তিনি অনুধাবন করলেন, এটি সেই উপনিবেশবাদী বা কলোনিয়াল ব্যবস্থারই অংশ, যা আফ্রিকান-আমেরিকানদের সংগ্রামকে আলজেরিয়া, ঘানা, ভিয়েতনাম এবং ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে।

তিনি জায়োনিজম বা ইহুদিবাদী চিন্তাধারাকে কঠোর সমালোচনা করে “Zionist Logic” শীর্ষক প্রবন্ধে একে আখ্যায়িত করেছিলেন “উপনিবেশবাদের এক নতুন রূপ” হিসেবে—এমন এক প্রকল্প, যা মানবিক ও হিতাকাঙ্ক্ষী ভাষার আড়ালে ভূমি দখল ও বঞ্চনাকে ঢেকে রাখে। তিনি এমন এক রূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, যা আমেরিকার নেতারা স্বীকার করতে চাননি—নিপীড়ন কোনো স্থানীয় বিষয় নয়; এটি কাঠামোগত, এটি বৈশ্বিক।

৩. জোহরান মামদানি: ছায়া থেকে আলোয় ফেরা

সেই ইতিহাসের ছয় দশক পর, নিউইয়র্কের একটি মসজিদে দাঁড়িয়ে এক তরুণ রাজনীতিক এমন কিছু কথা উচ্চারণ করলেন, যা শুনলে ম্যালকম এক্স সহজেই তাঁকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে চিনে নিতে পারতেন। তিনি বললেন:

“আমি আমি কে, তা বদলাব না। আমি কী খাই, তা বদলাব না। আমি যে বিশ্বাসের সঙ্গে গর্বের সঙ্গে যুক্ত, সেই ধর্মও বদলাব না। কিন্তু একটি বিষয় আমি অবশ্যই বদলাব—আমি আর নিজেকে ছায়ার ভেতরে খুঁজে বেড়াব না।” 

মামদানি যখন প্রথম রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন, তখন তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল নিজের ধর্মীয় পরিচয় বা 'মুসলিম আইডেন্টিটি' একটু আড়ালে রাখতে। বলা হয়েছিল, আমেরিকার জনজীবনের জন্য যা 'অতিরিক্ত মুসলমান' মনে হতে পারে, সেটাকে যেন তিনি নরম করে উপস্থাপন করেন। এটি পশ্চিমা দুনিয়ার অনেক মুসলমানের জন্য এক অলিখিত শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে—কম চাইতে শেখো, কম পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকো, এবং যা সামান্য দেওয়া হয়, সেটুকুর জন্যই কৃতজ্ঞ থাকো।

কিন্তু ম্যালকম এক্সের মতোই, মামদানি নিজেকে অদৃশ্য করে রাখতে বা নিজের অস্তিত্বকে সংকুচিত করতে রাজি হননি। তিনি নিজের ধর্মকে কোনো দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সাম্প্রতিক এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন:

“প্রতিটি মুসলমানের স্বপ্ন খুব সাধারণ—নিউইয়র্কের অন্য যেকোনো নাগরিকের মতোই সমান আচরণ পাওয়া। কিন্তু অনেক দিন ধরে আমাদের বলা হয়েছে, এর চেয়েও কম চাইতে, আর যা সামান্য পাওয়া যায় সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে। আর নয়।” 

৪. অস্তিত্বের হুমকি এবং সাহসী অবস্থান

৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী জোহরান মামদানি বিতর্ক বা সাহস—কোনোটার সঙ্গেই অপরিচিত নন। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বিডিএস (BDS - Boycott, Divestment and Sanctions) আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং এই অবস্থান আজও তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

তিনি প্রকাশ্যেই ইসরায়েলি সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছেন। এমনকি তিনি ঘোষণা করেছেন, মেয়র নির্বাচিত হলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যদি নিউইয়র্কে আসেন, তবে তিনি তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেবেন—যে বক্তব্য সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা এবং বিরোধীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

স্বাভাবিকভাবেই, এর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে করপোরেট গোষ্ঠী ও রিয়েল এস্টেট লবি মামদানিকে থামানোর জন্য বিপুল অর্থ ঢেলেছে—যার পরিমাণ ২২ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এটি ছিল শহরের সবচেয়ে ধনী গোষ্ঠীর শেষ মরণকামড়—যাকে তারা তাদের ক্ষমতার জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ মনে করে, সেই প্রচারণাকে যেকোনো মূল্যে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা।

মামদানি কেবল ইসরায়েলের ভাবমূর্তি বা ডেমোক্র্যাটিক দলের স্বস্তির জায়গাকেই চ্যালেঞ্জ করছেন না, তিনি আসলে এক প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতীক। এই নতুন প্রজন্ম ইসরায়েলকে আর শুধু 'চাপে পড়া মিত্র' হিসেবে দেখে না; বরং অনেকের চোখে এটি এখন এক দায়িত্বহীন শক্তি, যেখানে স্পষ্ট ক্ষমতার ব্যবধানে ফিলিস্তিনিরাই নিপীড়িত ও মজলুম পক্ষ। বিলিয়নেয়ার ও ভূস্বামীদের লবি যতই সক্রিয় হোক না কেন, মামদানির সমর্থকদের জোট সংকুচিত হয়নি—বরং তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

৫. ইতিহাস এবং অপপ্রচারের পুনরাবৃত্তি

ম্যালকম এক্স এমন এক রাজনীতির প্রতীক ছিলেন, যা আমেরিকার ক্ষমতাশালী মহলের কাছে অসহনীয় ঠেকেছিল। এটি ছিল ইসলামের সঙ্গে এক র‍্যাডিকাল, সর্বজনীন ও উপনিবেশবিরোধী চিন্তার সংযোগ। তাদের ভয় শুধু তাঁর কঠোর অবস্থানের জন্য ছিল না; তাদের আসল ভয় ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নিয়ে। ম্যালকম বলেছিলেন, “বর্ণবাদ ছাড়া পুঁজিবাদ টিকে থাকতে পারে না।”  ১৯৬৫ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়া ছিল না; এটি ছিল এমন একটি আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনাশ করার চেষ্টা—যে আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদী শোষণকে মূল থেকেই চ্যালেঞ্জ করছিল।

আজ মামদানি এক ভিন্ন ধরনের, কিন্তু একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণের মুখে—তা হলো চরিত্র হনন। একটানা অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে। ফিলিস্তিনের পক্ষে তাঁর সংহতিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে তাঁর বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ক্ষমতা যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন সে ঠিক এভাবেই আচরণ করে। যদি কোনো আন্দোলনকে নিজের পক্ষে টেনে নিতে না পারে, তবে সেটাকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। যদি বার্তাকে চুপ করাতে না পারে, তবে বার্তাবাহককেই কলঙ্কিত করতে চায়। যে শক্তিগুলো একসময় ম্যালকম এক্সের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভয় পেয়েছিল, আজ তারা তার আধুনিক রূপকেও ভয় পাচ্ছে—যিনি গর্বিতভাবে মুসলমান, দৃঢ় আন্তর্জাতিকতাবাদী, ন্যায়বিচারের ওপর দণ্ডায়মান এবং সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হতে ভয়হীন।

৬. বাড়তে থাকা ফাটল ও নতুন প্রজন্মের ভাবনা

এই লড়াইয়ের গুরুত্ব শুধু নিউইয়র্ক সিটির (New York City) সীমানায় আবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের বাইরে সবচেয়ে বড় ইহুদি জনসংখ্যার এই শহরটি এখন গভীর এক আত্মসমালোচনার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু ক্ষমতা ও নীতির প্রশ্ন নয়, বরং আমেরিকার ইহুদি সমাজের মতামত কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও।

সাম্প্রতিক এক জরিপ এক অভাবনীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—নিউইয়র্ক সিটির ৪৩ শতাংশ ইহুদি ভোটার মামদানিকে ভোট দিতে প্রস্তুত। আরও বিস্ময়কর হলো, ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই সমর্থনের হার ৬৭ শতাংশ। এটি স্পষ্টভাবে এক প্রজন্মগত ভাঙন বা 'Generational Divide'-এর ইঙ্গিত বহন করে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনাই করা যেত না।

জাতীয় পর্যায়েও জরিপগুলো এক বাড়তে থাকা বিভাজনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন অধিকাংশ আমেরিকান ইহুদি মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। ক্রমেই আরও বেশি মানুষ এই সংঘাতকে জাতিগত বা দলীয় দৃষ্টিতে নয়, বরং মানবাধিকার ও ইনসাফের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছেন।

ইসরায়েলের গণমাধ্যমও বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—এই নির্বাচনগুলো আসলে ইঙ্গিত দিচ্ছে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে (United States) ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনকে 'বোঝা' হিসেবে দেখা হবে, নাকি রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে। এবং মামদানির জয় হলে, সেটি কি ভবিষ্যতের ডেমোক্র্যাট নেতাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন দিকনির্দেশনা হয়ে উঠবে কি না।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়—মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদি নেতাদের পক্ষ থেকে আগের মতো একজোট ও প্রকাশ্য বিরোধিতা দেখা যায়নি, যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত অবস্থান থেকে এক উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। গণমাধ্যম বারবার তাঁকে চাপ দেয়—তিনি কি ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে থাকার অধিকার সমর্থন করেন? এর জবাবে মামদানি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বলেন:

“ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে যেখানে নাগরিকদের মধ্যে স্তরভেদ করা হয়, এমন কোনো রাষ্ট্রকে সমর্থন করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। আমার বিশ্বাস হলো—যেভাবে এই দেশে (United States) সমতার কথা বলা হয়, ঠিক সেভাবেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই সমতা নিশ্চিত করা উচিত। এই বিশ্বাসেই আমি দাঁড়িয়ে আছি।” 

৭. মুক্তির অবাধ্য স্পন্দন ও পারিবারিক উত্তরাধিকার

ম্যালকম এক্স ছিলেন প্রথম দিকের সেই প্রভাবশালী কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের একজন, যিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি গাজা (Gaza) সফর করেন, ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Zionist Logic” রচনা করেন। ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের ভেতরে তিনি ঠিক সেই বাস্তবতাই দেখেছিলেন, যা তিনি আলবামায় (Alabama) দেখেছিলেন—দখলদারিত্ব, সহিংসতা এবং মানুষের মানবিক অস্তিত্ব মুছে ফেলার অপচেষ্টা। তিনি লিখেছিলেন, “আরব ফিলিস্তিনের বর্তমান দখলদারিত্বের ইতিহাসে কোনো যুক্তিসংগত বা আইনগত ভিত্তি নেই।” 

মামদানিও অন্যদের মতো এই সত্যকে এড়িয়ে যাননি। যেখানে অনেকে ঘুরিয়ে কথা বলেন, তিনি সেখানে স্পষ্টবাদী। গাজায় চলমান সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “গাজায় প্রতিদিন এমন এক জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে শোকেরও আর ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।” যেখানে অন্য রাজনীতিবিদরা নিরাপদ কিন্তু ফাঁপা কথার আড়ালে সরে দাঁড়ান, মামদানি সেখানে নৈতিক স্পষ্টতায় অটল থাকেন। এই দিক থেকে তিনি ম্যালকম এক্সের সেই নির্ভীক মনোভাবকেই পুনরুজ্জীবিত করেন।

ম্যালকম এক্স ও মামদানি—দু’জনের কাছেই আফ্রিকা শুধু বংশের পরিচয় নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি। ম্যালকম এক্সের প্যান-আফ্রিকান চিন্তাধারা তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে তুলেছিল। ঘানা, মিশর এবং নাইজেরিয়া সফর তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে উপনিবেশবাদ বা কলোনিয়ালিজম শুধু কোনো এক দেশের সমস্যা নয়—এটি একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, মামদানি এই দৃষ্টিভঙ্গি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তাঁর বাবা মাহমুদ মামদানির (Mahmood Mamdani) কাছ থেকে—যিনি 'সেটলার-কলোনিয়ালিজম' বা উপনিবেশ স্থাপন এবং উপনিবেশ-পরবর্তী ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে কাজ করা একজন বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ। তাঁর বাবার তাত্ত্বিক কাজগুলো আজ এই বিষয়ে অপরিহার্য পাঠ। তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস উঠে এসেছে From Citizen to Refugee গ্রন্থে—যেখানে অভিবাসন, সাম্রাজ্য ও পরিচয়ের প্রশ্নগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছে।

উপসংহার: আলোর সন্ধানে

ভাবা যায় কি—ম্যালকম এক্সের (Malcolm X) জন্মের ১০০ বছর এবং তাঁর হত্যার ৬০ বছর পূর্তির এই সন্ধিক্ষণে এসে, নিউইয়র্ক সিটি (New York City) কি তার ইতিহাসে প্রথম একজন মুসলিম মেয়রের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে? 

ম্যালকম এক্স একবার বলেছিলেন, “যদি তুমি এর জন্য মরতেও প্রস্তুত না থাকো, তবে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটাই তোমার শব্দভাণ্ডার থেকে বাদ দাও।” আর মামদানি বলেন, “আমি নিজেকে আলোর মধ্যেই খুঁজে নেব।”  দু’জন মানুষ। দু’টি ভিন্ন সময়। কিন্তু দু’জনের ভেতর দিয়েই বয়ে চলেছে একই স্রোত—মুক্তির সেই জেদি, অবাধ্য স্পন্দন। এটি কোনো আন্দোলনের শেষ অধ্যায় নয়। এটাই সেই আন্দোলন—যা অসম্পূর্ণ হলেও অটুট, আঘাতপ্রাপ্ত হলেও ভাঙেনি, এবং থেমে না থেকে প্রবল বেগে এগিয়েই চলেছে।

এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার বা 'আদাল' কোনো স্মৃতিচিহ্ন নয়, কোনো জাদুঘরের বস্তু নয়। এটি জীবিত থাকে মানুষের সাহসে, অবস্থানে এবং স্পষ্ট ভাষায় হক কথা বলার ক্ষমতায়। ম্যালকম এক্স দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ঈমান, আন্তর্জাতিক সংহতি ও নৈতিক স্পষ্টতা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। আজ সেই একই মশাল নতুন সময়ে, নতুন ভাষায় বহন করছেন জোহরান মামদানি—ভয় না পেয়ে, নিজেকে লুকিয়ে না রেখে।

এটা কোনো পুরোনো আন্দোলনের ছায়া মাত্র নয়; এটা বর্তমানের জ্বলন্ত বাস্তবতা। যেখানে মানুষ আর কম চাইতে রাজি নয়, যেখানে ন্যায়বিচারকে ‘অতিরিক্ত দাবি’ বলা যায় না, এবং যেখানে নিজের পরিচয় লুকানো নয়—বরং তা শক্তির আধার। মুক্তির এই স্রোত থামে না। রূপ বদলায়, মুখ বদলায়, কণ্ঠ বদলায়—কিন্তু অনন্তকাল ধরে তা এগিয়েই চলে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter