মহাকালের রথযাত্রায় আত্মস্মৃতির পুনরুদ্ধার: মুসলিম মানসে গ্রেগরিয়ান বর্ষবরণের এক তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
১. সূচনা: কাল-চেতনার ঔপনিবেশিকতা ও আত্মবিস্মৃতির সংকট
মানব সভ্যতার বিশাল ও বৈচিত্র্যময় চিত্রপটে 'সময়' বা 'কাল' কদাচ এক নিরপেক্ষ আধার মাত্র নহে। বরং ইহা এক নির্মিত মাত্রা—যেখানে ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি ও সংস্কৃতি এক মোহনায় মিলিত হইয়া মানব অস্তিত্বের স্পন্দন ও লয় নির্ধারণ করে। একবিংশ শতাব্দীর এই চঞ্চল সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া সমসাময়িক মুসলিম উম্মাহর নিকট সময়ের এই স্রোতধারা অতিক্রম করা এক গভীর ও স্বতন্ত্র পরীক্ষার শামিল। প্রশাসনিক সুবিধার ছদ্মবেশে গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জি বা সৌরপঞ্জিকা আজ বিশ্বজুড়ে যে সর্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে, তাহা মুসলিম মানসে এক সূক্ষ্ম অথচ প্রবল আধিপত্যবাদ (Hegemony) কায়েম করিয়াছে। ইহা কেবল সময়ের হিসাবই দাবি করে না, বরং দাবি করে এক প্রকার সাংস্কৃতিক বশ্যতা—যাহার ফলে ১লা জানুয়ারি তারিখটি আসিলেই সমগ্র বিশ্ব একযোগে নতুনের আবাহনে, উৎসবে ও মত্ততায় ডুবিয়া যায়।
এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হইল—বিচারহীনভাবে এবং অন্ধের ন্যায় গ্রেগরিয়ান নববর্ষ উদযাপন মুসলিম মানসে "সময়ের সার্বভৌমত্ব" (Temporal Sovereignty) হারাইবার এক গভীর সংকট। এই দিনপঞ্জি মহাজাগতিক সময়ের কোনো ধ্রুব সত্য বা নিরপেক্ষ মাপকাঠি নহে; বরং ইহা রোমান পৌত্তলিকতা ও খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্যবাদের এক বিশেষ সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এই উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ এক প্রকার "সাংস্কৃতিক পরাজয়বরণ"-এর (Cultural Defeatism) দিকে ধাবিত হইতেছে। ইহার ফলে ইসলামের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের ধ্রুবতারা—দিব্যজ্ঞানসম্ভূত হিজরি সন—অবহেলার ধূলায় ম্লান হইয়া পড়িতেছে এবং একটি বিজাতীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু দখল করিয়া লইতেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন তাঁহার 'সভ্যতার সংকট' বা অন্যান্য প্রবন্ধে বলিয়াছিলেন, "যে জাতি পরের দ্বারে ভিক্ষাপাত্র লইয়া দাঁড়ায়, তাহার আর যাহাই থাকুক, আত্মমর্যাদা থাকে না"—ঠিক তেমনই, আজিকার মুসলিম সমাজ পশ্চিমের দ্বারে উৎসবের ভিক্ষা চাহিতেছে। এই প্রবন্ধে ইতিহাস, ইসলামি ফিকহশাস্ত্র এবং আধুনিক সমাজতত্ত্বের সমন্বয়ে এই "নববর্ষ" উদযাপনের অন্তঃসারশূন্যতা বিশ্লেষণ করা হইবে। সেই সাথে ওমর সুলেইমান ও মেহেদী হাসানের ন্যায় আধুনিক চিন্তাবিদদের "আপোষহীন" (Unapologetic) দৃষ্টিভঙ্গি তুলিয়া ধরা হইবে, যাহারা সমকালকে অস্বীকার না করিয়াও নিজস্ব ঐতিহ্যের শিকড় আঁকড়াইয়া ধরিবার আহ্বান জানান। আমাদের লক্ষ্য কোনো সংকীর্ণতা প্রচার নহে, বরং এক গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন সভ্যতার পুনজাগরণ।
২. গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার প্রত্নতত্ত্ব: জানুস ও স্যাটার্নালিয়ার ছায়া
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি হইতে গ্রেগরিয়ান নববর্ষ উদযাপনের বিরোধিতা কেবল আবেগপ্রসূত নহে, বরং ইহার পশ্চাতে রহিয়াছে গভীর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক কারণ। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম প্রায়শই উৎসবের গাত্র হইতে তাহার আদি ইতিহাসের দাগ মুছিয়া ইহাকে নিছক নির্দোষ আনন্দ বা অভ্যাসের মোড়কে পরিবেশন করে। কিন্তু কোনো বৃক্ষের "ফল" (Fruits) বিচার করিতে হইলে তাহার "মূল" (Roots) অনুসন্ধান অপরিহার্য। গ্রেগরিয়ান নববর্ষ মূলত এক পালিম্পসেস্ট (Palimpsest)—এমন এক পাণ্ডুলিপি যাহার উপরিভাগের আধুনিক উৎসবের আস্তরণ সরাইলে নিচ হইতে উঁকি দেয় প্রাচীন পৌত্তলিকতার আদিম লিপি।
২.১ জানুস দেবতা: তোরণ ও রূপান্তরের প্রভু
"জানুয়ারি" মাসের নামকরণ হইয়াছে রোমান দেবতা জানুস (Janus)-এর নামানুসারে। রোমান পুরাণে জানুস ছিলেন তোরণ, দ্বার, সূচনা ও সমাপ্তির দেবতা। তাঁহার মূর্তিতে দুইটি মুখমণ্ডল অঙ্কিত থাকিত—একটি পশ্চাতে অতীতের দিকে এবং অন্যটি সম্মুখে ভবিষ্যতের দিকে নিবদ্ধ। এই "জানুস বাইফ্রন্স" (Janus Bifrons) বা দ্বিমুখী অবয়ব কেবল এক শিল্পকর্ম নহে, বরং ইহা আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের মনস্তাত্ত্বিক নীল নকশা।
আজিকার দিনে মানুষ যখন বিগত বছরের স্মৃতিচারণ করে এবং অনাগত বছরের জন্য "রেজোলিউশন" বা সংকল্প গ্রহণ করে, তখন তাহারা অজ্ঞাতসারেই সেই জানুস দেবতার আরাধনারই এক সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ সংস্করণ পালন করে। প্রাচীন রোমে জানুয়ারির প্রথম দিনে জানুসের সন্তুষ্টির নিমিত্তে শপথ ও বলিদান করা হইত। আধুনিক "নিউ ইয়ার্স রেজোলিউশন" সেই মানত বা বলিদানেরই নামান্তর—যাহা সময়ের নিকট বা নিজের নিকট করা এক অঙ্গীকার।
একেশ্বরবাদী মুসলিমের নিকট, যাহার বিশ্বাস বা ঈমান কঠোরভাবে তাওহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এই বিষয়টি এক গুরুতর সমস্যা। সময় বা কাল একমাত্র মহান আল্লাহর সৃষ্টি, কোনো দ্বিমুখী দেবতার ক্রীড়ানক নহে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে কুদসিতে কঠোরভাবে সতর্ক করিয়াছেন: "আদম সন্তান কালকে (আদ-দহর) গালি দিয়া আমাকেই কষ্ট দেয়, কেননা আমিই মহাকাল; রাত ও দিনের আবর্তন আমারই হুকুমে হয়।" এমতাবস্থায়, যে উৎসবের মূল কাঠামোটিই গড়িয়া উঠিয়াছে জানুসের গুণাবলি অনুকরণে—অর্থাৎ অতীত ও ভবিষ্যতের দ্বিমুখী দর্শনে—তাহাতে অংশগ্রহণ করা প্রতীকী অর্থে শিরকের শামিল, যদিও বা অংশগ্রহণকারীর মনে সেই দেবতার প্রতি ভক্তি না থাকে।
২.২ স্যাটার্নালিয়া: বিশৃঙ্খলার আদি উদযাপন
গ্রেগরিয়ান নববর্ষের উৎসবের মূলে রহিয়াছে রোমান পঞ্জিকার আরেকটি উৎসব: স্যাটার্নালিয়া (Saturnalia)। ডিসেম্বরের শেষ ভাগে দেবতা স্যাটার্নের সম্মানে পালিত এই উৎসবে রোমানরা সামাজিক ও নৈতিক শৃঙ্খল ভাঙিয়া ফেলিত।
- বিপরীতমুখী আচার: এই সময়ে দাসেরা প্রভুর আসনে বসিত এবং প্রভুরা দাসের সেবা করিত; জুয়াখেলা বৈধ করা হইত এবং সমাজের কঠোর নৈতিক নিয়মগুলি স্থগিত রাখা হইত। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, এই সাময়িক বিশৃঙ্খলা বা "কেওয়াস" (Chaos)-এর মধ্য দিয়াই মহাবিশ্বের পুনর্জন্ম সম্ভব।
- উন্মত্ততা: ইতিহাসবিদ লিভি ও অন্যান্যদের বর্ণনায় দেখা যায়, এই উৎসবগুলি মদ্যপান, অবাধ যৌনাচার ও লাম্পট্যে পর্যবসিত হইত।
আধুনিক "থার্টিফাস্ট নাইট" বা নববর্ষের পূর্বরাত্রির উদযাপনে সেই বিশৃঙ্খলার ডিএনএ (DNA) আজও বিদ্যমান। বিশ্বজুড়ে মদ্যপানের বন্যা, মধ্যরাত্রির আতশবাজির বিকট কোলাহল, এবং পার্টি বা উৎসবের নামে অবাধ মেলামেশা—এই সবই সেই স্যাটার্নালিয়ান প্রবৃত্তির ধারাবাহিকতা। ইসলামি পরিভাষায় ইহাকে বলা হয় "গাফলত" বা বিস্মৃতি। ইসলামের ঈদ উৎসব যেখানে তাকবির (আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা) ও সাদাকাহ (দান)-এর মাধ্যমে নৈতিক শৃঙ্খলার ওপরে জোর দেয়, সেখানে নববর্ষ মানুষকে নৈতিকতা ভুলিয়া যাওয়ার শিক্ষা দেয়। সুতরাং, মদ্যপানহীন তথাকথিত "হালাল" নববর্ষ পালন করাও সেই কদর্য সংস্কৃতিরই অনুকরণ, যাহা মুমিনের 'হায়া' বা লজ্জাশীলতার পরিপন্থী।
২.৩ খ্রিষ্টীয় ও সাম্রাজ্যবাদী স্তর
রোমানদের পরেই এই পঞ্জিকার বিবর্তন থামিয়া থাকে নাই; মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চ ইহাকে আপন করিয়া লইয়াছিল।
- যিশুর সুন্নতে খৎনা: মধ্যযুগীয় চার্চ ১লা জানুয়ারিকে যিশু খ্রিষ্টের সুন্নতে খৎনার (Feast of the Circumcision) দিবস হিসেবে পালন করিত। সুতরাং, এই দিনটি ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানদের নিকট এক বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে, যাহাকে সেক্যুলার বলা কঠিন।
- গ্রেগরিয়ান সংস্কার (১৫৮২): আজ আমরা যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তাহা পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির নামানুসারে। তাঁহার এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইস্টার সানডের সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা। অর্থাৎ, আধুনিক বিশ্বের সমগ্র সময়-কাঠামোটি মূলত খ্রিষ্টীয় উপাসনার সুবিধার্থে নির্মিত।
একজন মুসলিম যখন "শুভ নববর্ষ" বলিয়া হর্ষধ্বনি করে, তখন সে প্রকারান্তরে পোপের এক নির্দেশনামাকেই উদযাপন করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা এক কথা, আর ইহাকে ভক্তিভরে উদযাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এই উদযাপন খ্রিষ্টীয় বা পাশ্চাত্য সময়-চেতনাকে "সার্বজনীন" বলিয়া মানিয়া লওয়ার নামান্তর, যাহা হিজরি সনের অস্তিত্বকে বিলীন করিয়া দেয়।
৩. স্বাতন্ত্র্যের ধর্মতত্ত্ব: আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা ও তাশাব্বুহ
গ্রেগরিয়ান নববর্ষ বর্জনের সিদ্ধান্ত কেবল ইহার পৌত্তলিক অতীতের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নহে; বরং ইহা ইসলামের ইতিবাচক স্বাতন্ত্র্যবোধ (Tamayyuz) ও আত্মপরিচয় রক্ষার অপরিহার্য দাবি। ফিকহশাস্ত্রে ইহাকে "তাশাব্বুহ" বা অনুকরণের নিষিদ্ধতা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হইয়াছে।
৩.১ তাশাব্বুহ-এর ব্যবচ্ছেদ: অনুকরণের নিষিদ্ধতা
নবীজি (সা.) উম্মাহকে সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন: "যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য (তাশাব্বুহ) অবলম্বন করে, সে তাহাদেরই দলভুক্ত" (সুনানে আবু দাউদ)। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁহার কালজয়ী গ্রন্থ ইকতিদা আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম-এ অনুকরণের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করিয়াছেন। তিনি দেখাইয়াছেন যে, অনুকরণ কেবল বাহ্যিক সাদৃশ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তাহা অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে।
- উৎসবের অনুকরণ: ইবনে তাইমিয়া বলেন, বিজাতীয়দের উৎসব পালন করা তাহাদের ধর্মীয় আচার ও মূল্যবোধের প্রতি এক প্রকার স্বীকৃতি। যখন কোনো মুসলিম অমুসলিমদের উৎসবে মাতিয়া উঠে, তখন সে নিজের অজান্তেই তাহাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া মানিয়া লয়।
- সিভিল বা নাগরিক উৎসবের দাবি: অনেকে যুক্তি দেখান যে, নববর্ষ এখন আর ধর্মীয় উৎসব নাই, ইহা নাগরিক বা সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু "আপোষহীন" দৃষ্টিভঙ্গি এই যুক্তি খণ্ডন করে। একটি পৌত্তলিক প্রতীক বহুবার ব্যবহারের ফলে "সাধারণ" হইয়া যায় না। নববর্ষের কাউন্টডাউন, আতশবাজি ও হইহুল্লোড়—এই সবই সেই আদিম ধর্মীয় আচারেরই প্রতিরূপ।
৩.২ আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা (আনুগত্য ও বিমুক্তি)
কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, মুমিনের হৃদয়ের আনুগত্য (ওয়ালা) থাকিবে কেবল আল্লাহ, তাঁহার রাসুল ও মুমিনদের প্রতি; এবং বিমুক্তি (বারা) থাকিবে সেই সকল প্রতীক ও বিশ্বাস হইতে যাহা তাওহিদের পরিপন্থী। নববর্ষ উদযাপন করা এক বিদেশি কাল-চেতনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শামিল। ইহা প্রমাণ করে যে, ইসলামি পঞ্জিকা বা উৎসব মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ সৃষ্টিতে ব্যর্থ, তাই তাহাকে অন্যের দুয়ারে হাত পাতিতে হয়। ইহাকেই ওলামায়ে কেরাম "সাংস্কৃতিক পরাজয়" বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
৩.৩ আধুনিক আত্মপরিচয় ও ওমর সুলেইমানের দর্শন
আমেরিকার প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ওমর সুলেইমান এই আলোচনাকে কেবল "হারাম-হালাল"-এর গণ্ডি হইতে বাহির করিয়া "আত্মমর্যাদা" (Agency)-র স্তরে উন্নীত করিয়াছেন।
- সময়ের আমানত: তিনি বলেন, সময়কে গালি দেওয়া বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হওয়া (যেমন—২০২৪ সালটি অশুভ ছিল) নিষিদ্ধ। আল্লাহ সময়ের স্রষ্টা। নববর্ষে লোকে বিশ্বাস করে যে, একটি সংখ্যার পরিবর্তনে ভাগ্য বদলাইয়া যাইবে—ইহা তাকদিরে বিশ্বাসের পরিপন্থী।
- প্রতিরোধের সংস্কৃতি: বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব পরিচয় আঁকড়াইয়া ধরাই এক প্রকার বিপ্লব। ওমর সুলেইমান বা মেহেদী হাসানের মতে, যখন একজন মুসলিম ১লা জানুয়ারিকে উপেক্ষা করে, তখন সে ঘোষণা করে—"আমি রোমের বাদ্যের তালে নাচিব না, আমি মদিনার সুরে চলিব।" এই প্রতিরোধ মুসলিম যুবসমাজের মনে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস গড়িয়া তোলে।
৪. হিজরি সনের অপরিহার্যতা: চন্দ্রকলায় দিব্য সাক্ষী
গ্রেগরিয়ান নববর্ষের সমালোচনার পাশাপাশি হিজরি সনের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব অনুধাবন করা জরুরি। হিজরি ক্যালেন্ডার কেবল দিন গণনার যন্ত্র নহে, ইহা মহাজাগতিক সত্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।
৪.১ কোরআনিক কাল-দর্শন
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করিয়াছেন: "তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করিয়াছেন এবং উহার তিথি নির্দিষ্ট করিয়াছেন যাহাতে তোমরা বৎসর গণনা ও সময়ের হিসাব জানিতে পারো" (সূরা ইউনুস: ৫)।
গ্রেগরিয়ান মাস মানুষের তৈরি কৃত্রিম গণিত—কেন জানুয়ারি ৩১ দিনে আর ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনে, তাহার কোনো প্রাকৃতিক যুক্তি নাই; ইহা কেবল রোমান অহমিকা ও প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনা। কিন্তু ইসলামি মাস চাঁদের প্রত্যক্ষ দর্শনের (Empirical Sighting) ওপর নির্ভরশীল। ইহা মানুষকে যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিমতা হইতে মুক্তি দিয়া প্রকৃতির বিশালতার সহিত একাত্ম করে। চান্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষ অপেক্ষা ১১ দিন কম হওয়ায় রমজান ও হজ বিভিন্ন ঋতুতে আবর্তিত হয়। ইহা আল্লাহর ন্যায়বিচারের (আল-আদল) এক অনুপম নিদর্শন—যাহাতে পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ সকল ঋতুতে ইবাদতের স্বাদ গ্রহণ করিতে পারে।
৪.২ হিজরত: কর্মচঞ্চল সূচনা
হজরত ওমর (রা.) যখন পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন, তখন তিনি নবীজির জন্ম বা ওহি নাজিলের দিনকে বাছিয়া লন নাই; তিনি বাছিয়া লইয়াছিলেন "হিজরত"-কে। হিজরত কেবল স্থান ত্যাগ নহে, ইহা বিশ্বাস ও ন্যায়ের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের প্রতীক।
অন্যান্য ক্যালেন্ডার যেখানে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা রাজ্যাভিষেকের স্মৃতি বহন করে, সেখানে ইসলামি ক্যালেন্ডার একটি "কমিউনিটি অ্যাকশন" বা সামষ্টিক কর্মের স্মৃতি বহন করে। ১৪৪৬ হিজরি সন আমাদেরকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে, মুমিন সর্বদা এক আধ্যাত্মিক যাত্রায় (Migration) রত—পাপ হইতে পুন্যের দিকে, স্থবিরতা হইতে সংগ্রামের দিকে।
৪.৩ হিজরি নববর্ষের পুনর্জাগরণ
যদিও ইসলামে হিজরি নববর্ষ বা ১লা মহররম ধুমধাম করিয়া পালনের বিধান নাই, তথাপি এই দিনটিকে স্মরণ করা এবং সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া "সময়ের বি-উপনিবেশায়ন" (Decolonizing Time)-এর জন্য জরুরি। মেহেদী হাসান যেমন বলেন, আত্মীকরণ (Assimilation) মানে মিশিয়া যাওয়া নহে, বরং ইন্টিগ্রেশন (Integration) মানে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখিয়া সমাজে অবদান রাখা। হিজরি সনকে ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করি যে, "মুসলিম বিশ্ব" কোনো কল্পকথা নহে, বরং ইহা এক অভিন্ন সময়ের সুতায় গাঁথা এক জীবন্ত বাস্তবতা।
৫. আত্মীকরণের সমাজতত্ত্ব: ডিজিটাল সংমিশ্রণ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট
তাত্ত্বিক যুক্তিগুলি স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কেন আজ মুসলিম তরুণ সমাজ এই উৎসবে মত্ত? ইহার উত্তর নিহিত আছে আধুনিক সমাজতত্ত্ব এবং ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাবে সৃষ্ট "মৃদু আত্মীকরণ" (Soft Assimilation)-এর মধ্যে।
৫.১ 'পিজা এফেক্ট' ও ফোমো (FOMO)
সমাজবিজ্ঞানীরা ইহাকে "পিজা এফেক্ট" বা সংস্কৃতির বিপরীত আত্তীকরণ বলিয়া থাকেন। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে নববর্ষের যে জৌলুস প্রদর্শিত হয়, তাহা তরুণ মনে এক ভীতি সঞ্চার করে—যাহাকে বলা হয় FOMO (Fear Of Missing Out) বা বাদ পড়িবার ভয়। তরুণ মুসলিম ভাবে, সে যদি এই উদযাপনে শরিক না হয়, তবে সে "অদৃশ্য" হইয়া পড়িবে। সে সামাজিক স্বীকৃতির কাঙাল হইয়া পৌত্তলিকতার আধুনিক সংস্করণে গা ভাসায়।
৫.২ ইনফ্লুয়েন্সার ও 'সফট ইসলাম'
মুসলিম সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা অনেক সময় এই আত্মীকরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তাহারা যখন "হালাল নববর্ষ পার্টি" বা অনুরূপ কনটেন্ট প্রচার করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি (শুবুহ) সৃষ্টি হয়। তাহারা এই বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ধর্মের মোড়কে বৈধতা দিবার চেষ্টা করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছিলেন, "নকলের মোহ বড়ই সাংঘাতিক"—এই নকল সংস্কৃতি আমাদের মূল চেতনাকে গ্রাস করিয়া ফেলে।
৫.৩ হীনম্মন্যতার মনস্তত্ত্ব
গবেষণায় দেখা গিয়াছে, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যখন প্রবল সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করে, তখন তাহাদের আত্মমর্যাদাবোধ (Self-esteem) হ্রাস পায়। যখন একজন মুসলিম নববর্ষ পালন করে, তখন সে এমন এক খেলায় অংশ লয় যাহার নিয়মকানুন অন্যের তৈরি। সে সেখানে কেবলই একজন "খেলোয়াড়", কিন্তু মালিক নহে। পক্ষান্তরে, "আপোষহীন" দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শিখায় যে, নিজের ইতিহাসের নায়ক হওয়াই প্রকৃত সম্মানের। হিজরি সনকে আঁকড়াইয়া ধরার মাধ্যমে আমরা সেই মনস্তাত্ত্বিক গোলামি হইতে মুক্তি পাইতে পারি।
৬. উপসংহার: মহাকালের স্রোতে সত্যের ধ্রুবতারা
পরিশেষে, এই সুদীর্ঘ আলোচনার সারসংক্ষেপ টানিতে গিয়া রবীন্দ্রনাথের সেই শাশ্বত দর্শনের আশ্রয় লইতে হয়—"সত্য যেথা গভীর, আনন্দ সেথা ধ্রুব"। গ্রেগরিয়ান নববর্ষের এই যে ক্ষণস্থায়ী কোলাহল, মদ্যপান, আতশবাজির ঝলকানি আর যান্ত্রিক শুভেচ্ছা বিনিময়—ইহা কি সত্য আনন্দ? নাকি ইহা কেবল এক যান্ত্রিক সভ্যতার ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি, এক গভীর শূন্যতাকে ঢাকিবার ব্যর্থ প্রয়াস?
আমাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, গ্রেগরিয়ান নববর্ষ উদযাপন বর্জন করা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন মানিবার বিষয় নহে, বরং ইহা এক গভীর দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রশ্ন।
১. ঐতিহাসিক কারণে: জানুস ও স্যাটার্নালিয়ার মতো পৌত্তলিক ও বিশৃঙ্খল উৎস হইতে উদ্ভূত বলিয়া ইহা বর্জনীয়।
২. ধর্মতাত্ত্বিক কারণে: তাশাব্বুহ বা বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও স্বকীয়তা ধ্বংস করে।
৩. সমাজতাত্ত্বিক কারণে: পরানুকরণ হীনম্মন্যতা ও আত্মবিস্মৃতির লক্ষণ, যাহা এক গর্বিত জাতির জন্য শোভন নহে।
অতএব, হে আধুনিক মুসলিম! তোমার কিসের এত হীনম্মন্যতা? কেন তোমাকে অন্যের আনন্দ-যজ্ঞে উচ্ছিষ্টভোজী হইতে হইবে? রবীন্দ্রনাথ যেমন প্রার্থনা করিয়াছিলেন, "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির"—তেমনি তোমাকে শির উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে হইবে। আমাদের এই প্রত্যাখ্যান কোনো সংকীর্ণতা বা গোঁড়ামি নহে; বরং ইহা এক মহৎ "আত্মজাগরণ" (Renaissance of the Self)।
আমরা যখন ১লা জানুয়ারিকে উপেক্ষা করিয়া হিজরি সনকে বরণ করি, তখন আমরা মূলত ঘোষণা করি—আমাদের সময় রোমান দেবতার আজ্ঞাবহ নহে, আমাদের সময় মদিনার হিজরতের চেতনায় উদ্ভাসিত। আসুন, আমরা পরানুকরণের এই "নকলের মোহ" ত্যাগ করি। মহাকালের দরবারে আমরা যেন ভিক্ষুক না হইয়া, সত্যের পতাকাবাহী এক মর্যাদাবান উম্মাহ হিসেবে দণ্ডায়মান হইতে পারি। আমাদের উৎসব আসুক ঈদের চাঁদের স্নিগ্ধতায়, রাত্রির নিভৃত ইবাদতে, এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতার অশ্রুজলে। ইহাই হউক আধুনিক অথচ আপোষহীন মুসলিমের একমাত্র সংকল্প।
"সত্যের বন্যায় সব মিথ্যা ভেসে যাক, জেগে উঠুক চিরন্তন সুন্দর।"