সমস্ত কেরালা জামিয়াতুল উলামা: প্রতিষ্ঠা থেকে শতবর্ষী যাত্রার ইতিহাস

​কেরালার ইসলামী নবজাগরণ ও সমস্ত

​কেরালা, যাকে 'প্রভুর নিজের দেশ' বলা হয়, ভারতের ইসলামী ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। মালিক বিন দীনার (রা.)-এর সময় থেকেই এখানে ইসলামের প্রচার শুরু হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন বিশ্বজুড়ে এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নানা নতুন মতাদর্শ ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ লাগে, তখন কেরালার ঐতিহ্যবাহী সুন্নি ইসলাম এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সেই সন্ধিক্ষণে ঐতিহ্যবাহী উলামায়ে কেরাম এবং পূর্বসূরীদের আদর্শ রক্ষায় যে সংগঠনটি ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়, তা-ই হলো 'সমস্ত কেরালা জামিয়াতুল উলামা'। ১৯২৬ সাল থেকে ২০২৬—এই একশ বছরের পথচলায় 'সমস্ত' কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং কেরালার কোটি কোটি মুসলমানের আকিদা ও আমল রক্ষার এক শক্তিশালী দুর্গে পরিণত হয়েছে।

​সংগঠনের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা

​বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কেরালায় কিছু নতুন চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে, যারা 'মুজাহিদ আন্দোলন' বা সংস্কারবাদী নামে পরিচিত ছিল। তারা শত বছরের লালিত সুন্নি রীতিনীতি, যেমন—ইমামদের অনুসরণ (তাকলিদ), আউলিয়ায়ে কেরামের ওছিলা গ্রহণ এবং ঐতিহ্যবাহী মাওলুদ-সলাতকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ যখন বিভ্রান্ত হচ্ছিল, তখন কেরালার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমগণ অনুধাবন করেন যে, একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া এই 'ফিতনা' মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ১৯২৫ সালে কোঝিকোড়ে এক সভায় প্রাথমিক আলোচনা হলেও, ১৯২৬ সালের ২৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে 'সমস্ত' গঠিত হয়।

​প্রতিষ্ঠাতা পথিকৃৎ ও প্রথম দিককার নেতৃত্ব

​সমস্ত-এর জন্মলগ্ন থেকে এর নেতৃত্বে ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাপসগণ। সংগঠনের প্রথম সভাপতি ছিলেন ভারাক্কাল মুল্লাকোয়া থাঙ্গাল। তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক এবং উলামাদের ঐক্যের প্রতীক। তার সাথে ছিলেন পঙ্গিল জয়নুদ্দীন মুসলিয়ার, যিনি তার পাণ্ডিত্য ও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল বারী মুসলিয়ারের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বগণ এই আন্দোলনের হাল ধরেন। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাকে অবিকৃত রাখা।

​ সাংগঠনিক কাঠামো ও আদর্শিক ভিত্তি

​সমস্ত কেরালা জামিয়াতুল উলামা 'তাকলিদ' বা চার ইমামের যেকোনো একজনের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক মনে করে (কেরালার প্রেক্ষাপটে মূলত শাফিয়ী মাযহাব)। তাদের মূলনীতি হলো—কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াসের আলোকে ইসলামকে বোঝা এবং পূর্ববর্তী সলফে সালেহীনদের পথ অনুসরণ করা। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেবল ইলম ও আমলদার আলেমরাই এর নীতিনির্ধারক হতে পারেন। এই কঠোর মানদণ্ডই সংগঠনটিকে আজ অবধি বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করেছে।

​শিক্ষা বিপ্লব: মাদ্রাসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

​সমস্ত-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তাদের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। ১৯৫১ সালে তারা 'সমস্ত কেরালা ইসলাম মত শিক্ষা বোর্ড' (SKIMVB) গঠন করে।

​কেন্দ্রীভূত সিলেবাস: কেরালার গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার মাদ্রাসা রয়েছে যেগুলোর সিলেবাস, পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট সব একই কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।

​সমন্বিত শিক্ষা: তারা কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং নৈতিক শিক্ষার সাথে জাগতিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে।

​দশ হাজারের বেশি মাদ্রাসা: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে) তাদের অধীনে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

​উপ-সংগঠনসমূহ: সমাজের প্রতিটি স্তরে পদচারণা

​একটি বিশাল জনসংখ্যাকে সুশৃঙ্খল রাখতে সমস্ত বিভিন্ন শাখা সংগঠন তৈরি করেছে:

​সমস্থ কেরালা সুন্নি যুবজন সঙ্ঘ (SYS): তরুণদের আদর্শিক ও সামাজিক কাজে নিয়োজিত করে।

​সুন্নি স্টুডেন্টস ফেডারেশন (SSF) / এসকেএসএসএফ (SKSSF): ছাত্রদের মাঝে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করে। সাইবার জগতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে SKSSF-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

​জমিয়তুল মুয়াল্লিমিন: ১০ লক্ষ শিক্ষার্থীর পাঠদানকারী উলামাদের অধিকার ও মানোন্নয়নে কাজ করে।

​মুসলিম লেবার কনফেডারেশন: শ্রমিক শ্রেণির অধিকার রক্ষায় সুন্নি আদর্শের ভিত্তিতে কাজ করে।

​জামিয়া নূরিয়া এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান

​১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত 'জামিয়া নূরিয়া আরাবিয়া' (পট্টিক্কাদ) সমস্ত-এর উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। এখান থেকে পাস করা আলেমদের 'ফয়েজী' উপাধি দেওয়া হয়, যারা আজ সারা বিশ্বে সুন্নি ইসলামের প্রচার করছেন। এছাড়াও দারুল হুদা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি এবং মার্কাজু সাকাফাতি সুন্নিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্ত-এর ভাবধারা থেকেই বিকশিত হয়েছে (যদিও পরবর্তীতে সাংগঠনিক বিভাজন ঘটেছে, কিন্তু মূল আদর্শ এক)।

​রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক ভারসাম্য

​সমস্ত সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু কেরালার রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অপরিসীম। বিশেষ করে 'ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ' (IUML)-এর সাথে সমস্ত-এর একটি ঐতিহ্যগত সুসম্পর্ক রয়েছে। কেরালায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ে সমস্ত সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। তারা চরমপন্থা এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকেছে।

​প্রকাশনা ও প্রচার মাধ্যম

​মতাদর্শ প্রচারের জন্য সমস্ত নিজস্ব পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তুলেছে। 'সুন্নি আফকার', 'আল-মুয়াল্লিম' এবং 'সুন্নী ভয়েস'—এর মতো সাময়িকীগুলো কেরালার মুসলিম ঘরে ঘরে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেয়। মালয়ালম ভাষায় তারা অগাধ সাহিত্য সৃষ্টি করেছে, যা সাধারণ মানুষকে দ্বীন বুঝতে সাহায্য করে।

​ শতবর্ষী সফরের চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য

​গত একশ বছরে সমস্ত অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে। ১৯৮৯ সালে সংগঠনের ভেতরে একটি বড় বিভাজন ঘটে (এপি ও ইকে গ্রুপ), যা সুন্নি শক্তিকে কিছুটা বিভক্ত করলেও উভয় পক্ষই সমস্ত-এর মূল চেতনাকে ধারণ করে শিক্ষা ও সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ, যেমন—নাস্তিকতা, উদারপন্থা এবং ডিজিটাল ফিতনা মোকাবিলায় সমস্ত এখন অনেক বেশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

​২০২৬: শতবর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি ও লক্ষ্য

​২০২৬ সালে সমস্ত তার শতবর্ষ পূরণ করবে। এই উপলক্ষে তারা '১০০ বছর ১০০ প্রকল্প' হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল নির্মাণ, দরিদ্রদের জন্য আবাসন, উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন। তাদের মূল স্লোগান হলো—"ঐতিহ্য রক্ষা এবং আধুনিকতার মোকাবিলা।"

​ উপসংহার

​সমস্ত কেরালা জামিয়াতুল উলামা কেবল একটি কেরালার সংগঠন নয়, এটি ভারতের সুন্নি মুসলমানদের জন্য একটি সফল মডেল। কিভাবে ঐতিহ্যকে বিসর্জন না দিয়েও একটি সুশৃঙ্খল আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তা সমস্ত বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। তাদের শতবর্ষী এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, সত্য আকিদা এবং একনিষ্ঠ নেতৃত্ব থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। আগামী শতকেও সমস্ত কেরালা জামিয়াতুল উলামা ইসলামের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখবে—এটাই সাধারণ মুসলমানদের প্রত্যাশা।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter