শাবান মাসের রোজার বরকত ও ফজিলত: একটি আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক মহাকাব্য

আধ্যাত্মিক বসন্তের পদধ্বনি ও হৃদয়ের জাগরণ

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসই তার নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর, কিন্তু শাবানুল মোয়াজ্জামের অবস্থান এক অনন্য আধ্যাত্মিক সন্ধিক্ষণে। এটি কেবল রমজানের পূর্ববর্তী একটি মাস নয়, বরং এটি মুমিনের হৃদয়ে এক মহাজাগতিক কম্পন সৃষ্টির মাস। এই মাসটি হলো সেই সেতুবন্ধন, যা রজবের তওবা ও সংকল্পকে রমজানের পূর্ণতা ও মাগফিরাতের সাথে যুক্ত করে। আধ্যাত্মিক সাধকগণ শাবানকে 'আধ্যাত্মিক বসন্তের পদধ্বনি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেভাবে বসন্ত আসার আগে প্রকৃতিতে এক ধরণের প্রস্তুতি ও প্রাণের সঞ্চার ঘটে, শাবান মাসও তেমনি মুমিনের রুহ বা আত্মাকে এক ঐশ্বরিক প্রেমের পরশে সঞ্জীবিত করে তোলে।

আরবি 'শাবান' (شعبان) শব্দটি 'শা’ব' (شعب) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো শাখা-প্রশাখা বা বিস্তৃতি। ইমামগণ বলেন, এই মাসকে শাবান বলার কারণ হলো, এতে মুমিনদের জন্য মহান আল্লাহর রহমত ও বরকতের অগণিত শাখা বিস্তৃত হয়। এটি এমন একটি সময় যখন আসমানের রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং বান্দার প্রতিটি নেক আমলকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে মহান রবের দরবারে উপস্থাপন করা হয়। যারা আধ্যাত্মিক জগতের পথিক, তাদের জন্য শাবান হলো সেই উর্বর ভূমি, যেখানে ইবাদতের বীজ বপন করলে রমজানে তার সুমিষ্ট ও চিরস্থায়ী ফলন পাওয়া সম্ভব হয়। এই প্রবন্ধে আমরা শাবান মাসের রোজা, ফজিলত এবং এর গভীর তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে এক বিস্তারিত আলোচনায় অবতীর্ণ হবো।

নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহ ও শাবানের রোজার তাত্ত্বিক ভিত্তি

শাবান মাসের রোজার সবচেয়ে বড় দলিল এবং আধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত আমল। হাদিস ও সীরাতের কিতাবসমূহ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসেই নবীজি (সা.) এত অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন না। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে রোজা রাখতে দেখিনি।" এমনকি কিছু বর্ণনায় এসেছে, তিনি শাবান মাসের প্রায় পুরোটা সময় রোজায় অতিবাহিত করতেন।

নবীজির এই আমল একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় সত্যকে নির্দেশ করে। যেকোনো বড় কাজের আগে একটি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। অলিম্পিকের দৌড়বিদ যেমন মূল প্রতিযোগিতার আগে মাসের পর মাস প্রস্তুতি নেন, মুমিনকেও তেমনি রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার আগে নিজের শরীর ও মনকে প্রশিক্ষিত করতে হয়। সুফি গবেষকগণ মনে করেন, রমজানের ফরজ রোজার আগে শাবানের নফল রোজা হলো আত্মার 'অজু' স্বরূপ। যেভাবে নামাজের আগে অজু করা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পবিত্র করে এবং একাগ্রতা সৃষ্টি করে, শাবানের রোজা তেমনি আত্মাকে গুনাহের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে রমজানের নূরের জন্য প্রস্তুত করে। এটি শরীরকে দীর্ঘ উপবাসে অভ্যস্ত করে তোলে, ফলে রমজান শুরু হলে মুমিন ক্ষুধার তাড়নায় বিচলিত না হয়ে ইবাদতে পূর্ণ মনঃসংযোগ করতে পারে।

অবহেলার মাস ও নির্জন ইবাদতের গূঢ় রহস্য

রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসকে এমন একটি মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যাকে মানুষ সাধারণত অবহেলা করে। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) যখন নবীজিকে এই মাসে অধিক রোজার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি বলেন— "এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস, যে সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে।" এই কথাটির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামি দর্শনে 'গাফেল' বা অবহেলার সময়ে ইবাদত করার ফজিলত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

যখন সমাজের অধিকাংশ মানুষ পার্থিব মোহে বা উৎসবের আনন্দে মগ্ন থাকে, তখন নির্জনে একাকী আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকাই হলো প্রকৃত তাকওয়া। রাতের নির্জনতায় ইবাদত করা যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি বছরের যে সময়ে মানুষ ইবাদত থেকে উদাসীন থাকে, সেই সময়ে রোজা রাখা ও সেজদায় লুটিয়ে পড়া আল্লাহর কাছে বিশেষ মূল্যে মূল্যায়িত হয়। এই মাসটি তাই মুমিনের নিষ্ঠা বা ইখলাস পরীক্ষার এক বড় মানদণ্ড। এটি আমাদের শেখায় যে, ইবাদত কেবল লোক দেখানো বা সামাজিক কোনো আচার নয়, বরং এটি খালিক ও মাখলুকের (স্রষ্টা ও সৃষ্টি) মধ্যকার এক গোপন ও নিবিড় সম্পর্কের নাম। শাবানের ইবাদত সেই মুমিনদের পৃথক করে দেয়, যারা ভিড়ের মধ্যে নয় বরং হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহকে ভালোবাসে।

বার্ষিক আমলনামা পেশ ও রবের দরবারে হাজিরা

শাবান মাসের একটি বিশেষ তাত্ত্বিক দিক হলো বার্ষিক আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাসেই বান্দার সারাবছরের যাবতীয় আমল জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়। নবীজি (সা.)-এর আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, যখন তাঁর আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে, তখন যেন তিনি রোজা অবস্থায় থাকেন।

এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ও ভয় জাগানিয়া। কল্পনা করুন, একজন কর্মচারী যখন তার পুরো বছরের কাজের রিপোর্ট মালিকের কাছে জমা দেয়, তখন সে কতটা উৎকণ্ঠায় থাকে! বিচারকের সামনে যখন কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, তখন আসামি যদি বিনীত ও সুশৃঙ্খল অবস্থায় থাকে, তবে তার প্রতি দয়া প্রদর্শনের সুযোগ বেশি থাকে। ঠিক তেমনি, আমলনামা পেশের সময় রোজা থাকা আল্লাহর কাছে বান্দার পক্ষ থেকে বিনয়, অনুশোচনা ও দাসত্বের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। এটি মূলত একটি সুযোগ যেখানে বান্দা তার সারাবছরের ভুলত্রুটিগুলোকে রোজার মাধ্যমে ঢেকে দিয়ে মহান রবের করুণা ভিক্ষা করতে পারে। শাবানের এই হাজিরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত লিপিবদ্ধ হচ্ছে এবং তার হিসাব দেওয়া অবধারিত।

আধ্যাত্মিক কৃষিতত্ত্ব: বীজ, সেচ ও ফসল আহরণ

বিখ্যাত মনীষী ও আধ্যাত্মিক সাধক ইমাম আবু বকর বলখি (রহ.) ইবাদতের মাসগুলোকে একটি নিরবচ্ছিন্ন কৃষিচক্রের সাথে তুলনা করে এক অনন্য দর্শনের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে:

  • রজব মাস হলো হৃদয়ের জমিতে সংকল্প ও তওবার বীজ বপনের মাস।
  • শাবান মাস হলো সেই রোপিত বীজে ইবাদত, জিকির ও অনুতাপের অশ্রুর পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার মাস।
  • রমজান মাস হলো চূড়ান্ত ফসল কাটার মাস।

এই রূপকটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো কৃষক যদি বীজ বপনের পর তাতে সঠিক সময়ে পানি না দেয়, তবে সেই বীজ অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগেই মাটির তলায় পচে যাবে। ঠিক তেমনি, যে ব্যক্তি শাবানে ইবাদতের শ্রমের মাধ্যমে তার আত্মার জমিকে সিক্ত করবে না, সে রমজানে ইবাদতের স্বাদ পাবে না এবং মাগফিরাতের মিষ্ট ফল ভোগ করতে পারবে না। শাবানের রোজা তাই মুমিনের অন্তরে তাকওয়ার ভিত গড়ে দেয়। এটি অলসতাকে দূর করে এবং আত্মাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায় যেখান থেকে রমজানের আকাশছোঁয়া ফজিলত অর্জন করা সহজ হয়। সুতরাং, শাবান হলো সেই কঠোর পরিশ্রমের কাল যা রমজানের সাফল্য নিশ্চিত করে।

লাইলাতুল বরাত: মুক্তির রজনী ও তাকদীরের ফয়সালা

শাবান মাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর মধ্যবর্তী রজনী বা 'লাইলাতুল বরাত' (শবে বরাত)। হাদিস শরিফে এই রাতটিকে 'মুক্তির রাত' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যদিও এর আমল নিয়ে আলেমদের মধ্যে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে, কিন্তু এর ফজিলত অনস্বীকার্য। বর্ণিত আছে যে, এই রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ঘোষণা করেন— "আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দেব।"

এই রজনীর একটি তাত্ত্বিক দিক হলো তাকদীরের ফয়সালা। অনেক তাফসিরবিদের মতে, আগামী এক বছরে কার মৃত্যু হবে, কার জন্ম হবে এবং কার ভাগ্যে কী ঘটবে—তার একটি প্রাথমিক ফয়সালা এই রাতে ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত, কিন্তু এই রাতে ইবাদত করা ও পরবর্তী দিনে রোজা রাখা মুমিনের জন্য তার ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করার এক সুবর্ণ সুযোগ। রোজা রাখার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে এই অঙ্গীকার করে যে, সে তার কুপ্রবৃত্তি বা নফসকে দমন করে আগামী বছরগুলোতে রবের সন্তুষ্টি অর্জনে বদ্ধপরিকর হবে। এটি মূলত রমজানের মূল ইবাদতে প্রবেশ করার আগে একটি চূড়ান্ত সাধারণ ক্ষমার আবেদন পত্রের মতো।

নবীর প্রতি ভালোবাসা ও 'শহরুন নবী' (নবীর মাস)

শাবান মাসের আরেকটি অনন্য নাম হলো 'শহরুন নবী' বা নবীর মাস। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলেছেন, "রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।" এই নামকরণের পেছনে একটি গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য লুকিয়ে আছে। তাফসিরবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, পবিত্র কোরআনের সূরা আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতটি (যাতে আল্লাহ ও ফেরেশতাদের নবীজির ওপর দরুদ পাঠের কথা বলা হয়েছে) শাবান মাসেই নাজিল হয়েছিল।

তাই এই মাসে অধিক হারে দরুদ শরিফ পাঠ করা এবং নবীজির সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রাখা হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রমাণ। আধ্যাত্মিক সাধকগণ বলেন, শাবানের রোজা মুমিনের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পবিত্র করে তোলে। রোজা রাখা অবস্থায় একজন মুমিনের জবান অপবিত্র কথা থেকে মুক্ত থাকে এবং সেই অবস্থায় যখন দরুদ পাঠ করা হয়, তখন তার আধ্যাত্মিক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরাই হলো আল্লাহর ভালোবাসায় পৌঁছানোর একমাত্র পথ। শাবান মাস মুমিনকে সেই পথের দিশা দেয়।

নফস বা কুপ্রবৃত্তির সাথে লড়াই (জিহাদে আকবর)

শাবান মাসের রোজাকে সুফি দর্শনে 'নফসের সাথে জিহাদ' হিসেবে দেখা হয়। রমজানে শয়তানকে শিকলবন্দী করা হয়, কিন্তু শাবানে শয়তান মুক্ত থাকে। তাই শাবান মাসে রোজা রাখা রমজানের চেয়েও কঠিন হতে পারে, কারণ এখানে আপনাকে নিজের নফস এবং শয়তান—উভয়ের সাথে লড়াই করতে হয়।

এই মাসে রোজা রাখা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যখন কোনো মানুষ আল্লাহর জন্য প্রিয় খাবার ও পানীয় ত্যাগ করে, তখন তার আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং নফসের ক্ষমতা হ্রাস পায়। শাবানের প্রতিটি রোজা মুমিনের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে। যারা শাবান মাসে নিয়মিত রোজা রাখে, রমজান এলে তাদের জন্য রোজা রাখা আর কষ্টের বিষয় থাকে না, বরং তা পরম আনন্দের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এটি মূলত আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের এমন এক কোর্স, যা একজন মানুষকে কেবল ধার্মিক নয় বরং একজন প্রকৃত 'মুত্তাকী' হিসেবে গড়ে তোলে।

ভারসাম্য রক্ষা ও শরয়ি হিকমত: কখন রোজা বন্ধ করতে হবে?

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। শাবান মাসের রোজার ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্যের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন শাবান মাস অর্ধেক হয়ে যায় (১৫ তারিখের পর), তখন যারা শারীরিকভাবে দুর্বল বা যারা রমজানের আগে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন, তারা যেন নতুন করে রোজা রাখা বন্ধ করেন।

এই নির্দেশটির পেছনে এক গভীর হিকমত বা প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে। ইসলাম চায় না যে বান্দা নফল ইবাদত করতে গিয়ে ফরজ ইবাদতে (রমজানের রোজা) অলসতা বা অসুস্থতার শিকার হোক। তবে যারা নিয়মিত রোজা রেখে অভ্যস্ত (যেমন সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা) অথবা যারা শক্তিশালী, তাদের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা নেই। এটি আমাদের শেখায় যে, ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, নিজের শরীরকে অহেতুক বিপন্ন করা নয়। শাবানের এই বিধান আমাদের পরিকল্পনা করতে শেখায়—কীভাবে নিজের শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত রমজানের জন্য সঞ্চয় করে রাখা যায়।

শাবানে তওবা ও ইস্তিগফারের অপরিহার্যতা

রমজান হলো পাওয়ার মাস, আর শাবান হলো ধোয়ার মাস। কোনো অপরিষ্কার পাত্রে যেমন দামি পারফিউম বা দুধ রাখা যায় না, তেমনি গুনাহে পরিপূর্ণ হৃদয়ে রমজানের নূর ও রহমত স্থায়ী হয় না। তাই শাবান মাসের প্রধান কাজগুলোর একটি হলো তওবা ও ইস্তিগফার।

শাবানের রোজা থাকা অবস্থায় তওবা করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ রোজা হলো বিনয়ের প্রতীক। একজন রোজাদার যখন অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন মহান রব তাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন না। এই মাসে মুমিনের উচিত তার বিগত দিনের প্রতিটি গুনাহের জন্য লজ্জিত হওয়া এবং রমজান শুরুর আগেই নিজের হৃদয়কে আয়নার মতো পরিষ্কার করে নেওয়া। আধ্যাত্মিক মনীষীগণ বলেন, "যে ব্যক্তি শাবান মাসে নিজের চোখের পানি দিয়ে হৃদয় ধুয়ে ফেলে না, রমজানের উজ্জ্বল আলো তার হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে না।"

সমাজসেবা ও দান-সদকার গুরুত্ব

শাবান মাস কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও মাস। আমাদের পূর্বসূরিরা শাবান মাস এলে যাকাত ও সদকা প্রদান করতেন যাতে দরিদ্র মানুষগুলো রমজানে খাবারের চিন্তামুক্ত হয়ে ইবাদত করতে পারে। শাবানের রোজার সাথে সাথে দান-সদকা করা সওয়াবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা এবং অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো হলো নবীজির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্নাহ। শাবান মাসে যারা রোজা রাখে, তারা ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করতে পারে এবং সেই অনুভূতি তাদের অন্যের দুঃখ বোঝার ক্ষমতা দান করে। এটি একটি সামগ্রিক আধ্যাত্মিক উন্নয়ন যা ব্যক্তিকে সামাজিক মানুষ হিসেবে উন্নত করে। রমজানের প্রস্তুতির একটি বড় অংশ হলো অন্যের মুখে হাসি ফোটানো।

কোরআন তেলাওয়াত ও শাবান: 'শহরুল কুররা' (কোরআন পাঠকদের মাস)

প্রাচীন আলেম ও তাবিঈগণ শাবান মাসকে 'শহরুল কুররা' বা কোরআন পাঠকদের মাস বলতেন। রমজান যেহেতু কোরআন নাজিলের মাস, তাই তার মাসখানেক আগে থেকেই মুমিনরা কোরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতেন।

শাবান মাসে রোজা রাখা অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত করলে সেই তেলাওয়াত সরাসরি হৃদয়ে প্রভাব ফেলে। কারণ রোজার ফলে মানুষের পাশবিক সত্তা অবদমিত থাকে এবং রুহানি সত্তা সক্রিয় হয়। এই মাসে অন্তত একবার কোরআন খতম করার চেষ্টা করা উচিত, যাতে রমজানে এর গভীর অর্থ ও তাফসীর নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পাওয়া যায়। কোরআনের নূর এবং শাবানের রোজার বরকত মিলিত হয়ে মুমিনের জীবনকে জান্নাতি শান্তিতে ভরে দেয়।

দোয়া ও মোনাজাত: রমজানের প্রত্যাশা

শাবান মাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো রমজানকে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাস থেকেই দোয়া করতেন— "আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবানা, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান" (হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দিন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন)।

একজন প্রেমিকের কাছে যেমন তার প্রিয়তমার আগমনী সংবাদ সবচেয়ে আনন্দের, মুমিনের কাছে তেমনি রমজানের অপেক্ষা সবচেয়ে মধুর। শাবানের প্রতিটি দিন ও রাত মুমিন এই দোয়ায় মশগুল থাকে। এই প্রতীক্ষা ইবাদতের চেয়েও বড় সওয়াবের কাজ। কারণ নিয়ত বা সংকল্প ইবাদতের প্রাণ। যারা শাবান মাসে রমজানের নিয়ত করে রোজা রাখা শুরু করে, তারা যদি কোনো কারণে রমজান নাও পায়, তবুও আল্লাহ তাদের রমজানের সওয়াব দান করবেন।

উপসংহার: শাবানের আলোকচ্ছটায় আগামীর পথ চলা

পরিশেষে বলা যায়, শাবান মাসের রোজা ও ইবাদত হলো আল্লাহর রহমতের এক অনন্য সোপান। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার মাস নয়, বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি ও মহাজাগতিক এক ঐশ্বরিক সফরের নাম। যে ব্যক্তি শাবানকে গুরুত্ব দিল না, সে মূলত রমজানের রহমত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করল। শাবানের প্রতিটি রোজা আমাদের শেখায় ধৈর্য, প্রতিটি সেজদা শেখায় বিনয় এবং প্রতিটি মোনাজাত শেখায় মহান রবের প্রতি অদম্য নির্ভরতা।

আসুন, আমরা এই পবিত্র মাসে নবীজির সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা পালন করি, বেশি বেশি দরুদ ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকি এবং আমাদের আমলনামাকে সুন্দর করে আল্লাহর দরবারে পেশ করি। শাবানের এই আধ্যাত্মিক বসন্তে নিজেদের ধুয়ে-মুছে এমনভাবে তৈরি করি, যেন রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে সাথেই আমরা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শাবান মাসের যথাযথ মর্যাদা রক্ষার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের রমজানের নূর দিয়ে ধন্য করুন। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter