হালিমা ইয়াকুব: সংগ্রাম থেকে জনসেবার পথে একজন মুসলিম নারীর যাত্রা
হালিমা ইয়াকুবের জীবন শিক্ষা, অধ্যবসায়, জনসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি উল্লেখযোগ্য যাত্রা। ১৯৫৪ সালে সিঙ্গাপুরে জন্ম নেওয়া হালিমা ছোটবেলা থেকেই আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন। তিনি যখন শিশু, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর তাঁর মা সন্তানদের লালন-পালন ও পরিবারের খরচ চালানোর দায়িত্ব নেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও হালিমা পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে আইনজীবী, শ্রমিক নেতা, সংসদ সদস্য, সংসদের স্পিকার এবং ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের অষ্টম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করা যায়। কারণ ইসলাম কোনো মানুষকে শুধু তার পদ, সম্পদ বা খ্যাতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে না। কুরআন ন্যায়বিচার, আমানত, দায়িত্ব, পরামর্শ এবং মানুষের সেবার ওপর গুরুত্ব দেয়। নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে এসব নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। তাই হালিমা ইয়াকুবের জীবনকে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের পরিবর্তে একটি জীবন-অভিজ্ঞতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কেস স্টাডি হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর জীবনের মাধ্যমে শিক্ষা, অধ্যবসায়, জনসেবা এবং সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব।
কঠিন শৈশব থেকে উচ্চশিক্ষার পথে:
হালিমা ইয়াকুব ২৩ আগস্ট ১৯৫৪ সালে সিঙ্গাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং মা ছিলেন মালয়। তিনি যখন মাত্র আট বছরের শিশু, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর তাঁর মা পাঁচ সন্তানকে বড় করেন। পরিবারটি আর্থিক সমস্যার মধ্যে ছিল। হালিমা পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর মাকে নাসি পাদাং বিক্রি করতেও সাহায্য করতেন।
তিনি সিঙ্গাপুর চাইনিজ গার্লস স্কুল এবং তানজং কাটোং গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং ২০০১ সালে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- কঠিন পরিস্থিতি মানুষের ভবিষ্যৎকে সবসময় নির্ধারণ করে না। শিক্ষা একজন মানুষকে নিজের জীবন পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের জন্য কাজ করার সুযোগও দিতে পারে।
মুসলিম সমাজের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হওয়া উচিত নয়। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, চরিত্র, দায়িত্ববোধ এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সক্ষমতা তৈরি করা উচিত। কুরআনের প্রথম ওহির মধ্যেই জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে: পড়ো তোমার সেই প্রতিপালকেরনামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সূরা আল-আলাক, ৯৬:১ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসেও জ্ঞান ও শিক্ষাকে মানব উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।
আইন থেকে শ্রমিকদের সেবায়:
আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর হালিমা ১৯৭৮ সালে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (NTUC)-এ কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইন বিভাগ, নারী উন্নয়ন এবং শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
এই জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- নেতৃত্ব সবসময় বড় কোনো রাজনৈতিক পদ থেকে শুরু হয় না। কখনো কখনো সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়েই নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। শ্রমিক, পরিবার, নারী এবং সমাজের দুর্বল মানুষের সমস্যা বুঝতে হলে তাদের কাছাকাছি যেতে হয়। তাদের কথা শুনতে হয় এবং ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে হয়।
ইসলামও দায়িত্ব ও আমানতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ বলেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।- সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮ এখানে আমানত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। জনসেবা বা নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত মর্যাদা অর্জনের সুযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও আমানত হিসেবে দেখা উচিত।
জনজীবনে প্রবেশ:
২০০১ সালে হালিমা ইয়াকুব সিঙ্গাপুরের সংসদ সদস্য হিসেবে জনজীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের সংসদের স্পিকার হন। তিনি ছিলেন দেশটির সংসদের প্রথম নারী স্পিকার। ২০১৭ সালে তিনি সংসদের স্পিকার ও সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তিনি সিঙ্গাপুরের অষ্টম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য বিতর্কের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রতিনিধিত্ব এবং যোগ্যতার প্রশ্ন নিয়ে সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও মতবিরোধ ছিল। তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস আলোচনা করা মানেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা নয়। বরং এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে- ক্ষমতা ও দায়িত্ব পাওয়ার পর কর্তব্য কী?
নেতৃত্ব একটি আমানত, ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব শুধু সম্মান বা ক্ষমতার বিষয় নয়; এটি জবাবদিহিতার বিষয়ও। কুরআন নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির দিকে নির্দেশ করে প্রথম- যোগ্যতার দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া উচিত, যিনি তা যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম। দ্বিতীয় ন্যায়বিচার ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে ন্যায় ও ভারসাম্যের সঙ্গে, এই নীতিগুলো শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নয়; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংগঠন, ব্যবসা, পরিবার এবং সামাজিক সংগঠন- সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই প্রশ্ন শুধু- কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- তিনি কীভাবে সেই দায়িত্ব পালন করছেন?
নারী ও সমাজে অবদান
হালিমা ইয়াকুবের জনজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী, শ্রমিক ও সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বিষয় নিয়ে তাঁর কাজ। তিনি বিভিন্ন সময়ে নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং কর্মজীবী নারীদের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। ইসলামের ইতিহাসেও আমরা দেখতে পাই যে নারীরা জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, ব্যবসা, সমাজসেবা এবং হাদিস সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
অতএব মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- নারী বা পুরুষ কে- এটি নয় বরং কীভাবে মানুষের দক্ষতা, জ্ঞান ও প্রতিভাকে নৈতিকভাবে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। একটি সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ের জ্ঞান ও সক্ষমতার বিকাশের সুযোগ থাকা দরকার। একই সঙ্গে পরিবার, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক মর্যাদার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
COVID-19 সংকটের সময় নেতৃত্ব
হালিমা ইয়াকুবের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট ছিল COVID-19 মহামারি। সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের রিজার্ভ সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে ভূমিকা রাখা। মহামারির সময় সরকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অতীতের রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল এবং হালিমা সেই অনুরোধে সম্মতি দেন। এই অর্থ শ্রমিক, চাকরি ও ব্যবসা রক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই ঘটনা নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেখায়। অনেক সময় একজন নেতাকে একাধিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়। একদিকে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা- দুটিই বিবেচনা করতে হয়।
ইসলামি নৈতিকতার আলোকে এমন বিষয় আমানত, মাসলাহাহ (জনকল্যাণ), ন্যায়বিচার এবং ক্ষতি প্রতিরোধের নীতির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তবে কোনো সরকারি সিদ্ধান্তকে শুধু এই কারণে ইসলামি শাসন বলা যায় না। বরং ইসলামি নীতিগুলো আমাদের একটি নৈতিক প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়।
উপসংহার
হালিমা ইয়াকুবের জীবন শুধু একজন নারীর উচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছানোর গল্প নয়। এটি কঠিন শৈশব থেকে শিক্ষা, আইন, শ্রমিকসেবা এবং জনদায়িত্বের মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার একটি দীর্ঘ যাত্রা। তাঁর জীবন আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে, নেতৃত্ব বলতে আমরা কী বুঝি? শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? নারী ও পুরুষ কীভাবে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে? ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা উচিত? বহুত্ববাদী সমাজে একজন মুসলিম কীভাবে নিজের মূল্যবোধ বজায় রেখে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে? হালিমা ইয়াকুবের জীবনকে এই নীতিগুলোর আলোকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে দেখা যেতে পারে। উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়, আবার তাঁর জীবনের বিতর্কগুলো উপেক্ষা করাও নয়। বরং তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা, জনসেবা, দায়িত্ব ও নৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করা। আজকের মুসলিম তরুণদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে, শিক্ষা যেন শুধু আমাদের সমাজে উপরে উঠতে সাহায্য না করে; শিক্ষা যেন আমাদের সমাজের সেবা করার জন্য প্রস্তুত করে।