মূলধারার ইসলামী আন্দোলনের সাথে উগ্রপন্থার দ্বন্দ্ব

১. ইসলামী পুনর্জাগরণ চিন্তার পটভূমি

গত শতাব্দী ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে গভীর পরিবর্তনের যুগ। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯২৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে খেলাফতের আনুষ্ঠানিক অবসান। এর ফলে মুসলিম বিশ্বের একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অবসান ঘটে। একই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্বিন্যাসের ফলে ভাষা, ভূখণ্ড, জাতীয়তা ও আঞ্চলিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন জাতিরাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। নবগঠিত রাষ্ট্রগুলোর কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিক জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রভাবে গড়ে উঠেছিল।

এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় মুসলিম সমাজের বিরাট একটি অংশ গভীর আত্মপরিচয় সংকট ও মানসিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। নতুন এই সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোতে মুসলিম তরুণদের কাছে তাদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আত্মপরিচয় ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। ইসলামকে ব্যক্তিগত ধর্মাচার কিংবা মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকার পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। অথচ সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, শিক্ষা ও রাজনীতির মতো বৃহত্তর ক্ষেত্রগুলোতে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়: ইসলাম কি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়, নাকি মানুষের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থার জন্যও তার নিজস্ব নৈতিক ও সামাজিক নির্দেশনা রয়েছে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ধরনের ইসলামী সাহিত্য ও ইসলামী পুনর্জাগরণ চিন্তার বিকাশ ঘটে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে নয়, বরং সমাজ ও মানুষের সামগ্রিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হিসেবে পুনরায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।

২. দুটি প্রভাবশালী ধারা

ভারতীয় উপমহাদেশে উস্তাদ আবুল আ'লা মওদুদীর চিন্তা এ ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তিনি ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক দিকগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যাখ্যা করে মুসলিমদের মধ্যে ইসলামী জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা তৈরির চেষ্টা করেন। তাঁর চিন্তা পরবর্তীকালে উপমহাদেশের বাইরেও বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে মিশরে ইমাম হাসান আল বান্নার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ইখওয়ানুল মুসলিমিন ইসলামী পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ধারায় পরিণত হয়। মিশর থেকে শুরু হয়ে সংগঠনটির চিন্তা ও প্রভাব পরবর্তীকালে আরববিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সাইয়েদ কুতুব শহীদ ও ইউসুফ আল কারজাভির মতো চিন্তাবিদদের লেখালেখিও এই বৃহত্তর ইসলামী পুনর্জাগরণ চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ইখওয়ানুল মুসলিমিনের হাত ধরেই পরবর্তীতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের জন্ম।

৩. পশ্চিমা কৌশল: উগ্রবাদকে "ইসলামের চেহারা" বানানো

মূলধারার ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনগুলো যখন মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করল, তখন পশ্চিমা রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই প্রবণতাকে নিজেদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে শুরু করে। কারণ এসব আন্দোলন মুসলিমদের মধ্যে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয় সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণকে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও আদর্শিক বিরোধিতার পাশাপাশি পশ্চিমাদের আরেকটি কৌশল সামনে আসে: ইসলামের এমন একটি চিত্রকে সামনে আনা, যেখানে চরমপন্থা, সহিংসতা ও উগ্রবাদকেই ইসলামের প্রকৃত রূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। উগ্রবাদীদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা মুসলিমদের "অমানুষ", "উগ্র", "সাম্প্রদায়িক" ও "জঙ্গি" হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার মাধ্যমে এই কৌশল আনুষ্ঠানিক কার্যকারিতা পায়। এই আক্রমণকে উসিলা করে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা "War on Terror" বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মুসলিমদের পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার জঘন্য মিশনে নামে। আল-কায়েদার ৯/১১ হামলাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা আফগানিস্তানে ভয়াবহ যুদ্ধ চালায়, যাতে লেখকের ভাষ্যমতে অসংখ্য নিরীহ আফগান শহীদ হন।

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উগ্রপন্থীরা ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা নিজেদের "প্রকৃত ইসলামী" বা "প্রকৃত মুসলমান" হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং জামায়াত, ইখওয়ান কিংবা হামাসের মতো মূলধারার ইসলামী আন্দোলনগুলোকে "মডারেট", "লিবারেল" বা "পশ্চিমা গণতন্ত্রের গোলাম" ইত্যাদি ট্যাগ দিচ্ছে।

৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বর্তমানে বাংলাদেশেও এই ধরনের চিন্তার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১–২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশে যখন ডানপন্থার উত্থান হচ্ছিল এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখন সাম্রাজ্যবাদী ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, যখন জেএমবি দেশের ৬৩টি জেলায় প্রায় ৫০০টি সমন্বিত বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সরকারের ব্যাপক দমনাভিযানে জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হয়। তবু লেখকের মতে, এখনো তারা গোপন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

৫. মূল দ্বন্দ্বটি কোথায়

এখানেই ইসলামী আন্দোলন এবং উগ্রপন্থার মধ্যকার দ্বন্দ্বটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মূলধারার আন্দোলনগুলো ব্যক্তি ও সমাজের পরিবর্তন, তাযকিয়া, দাওয়াহ, শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সহিংসতাকে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন ও গ্রহণ করে এবং নিজেদের একমাত্র "খাঁটি ইসলামী" ও "প্রকৃত মুসলমান" হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।

৬. কয়েকটি উদাহরণ

ক. ৯/১১-পরবর্তী ইসলামী আন্দোলনগুলোর প্রতিক্রিয়া

৯/১১ টুইন টাওয়ার হামলার প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ "Islamic Statements against the terrorism of 9/11" নামে একটি যৌথ বিবৃতি দেন। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন:

  • মোস্তফা মাশহুর – মুসলিম ব্রাদারহুডের তৎকালীন মুর্শিদ আম (General Guide)
  • মতিউর রহমান নিজামী – জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের তৎকালীন আমির
  • আহমদ ইয়াসিন – ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের প্রতিষ্ঠাতা
  • কাজী হুসাইন আহমদ – জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের তৎকালীন আমির
  • রাশিদ ঘানুশি – তিউনিসিয়ার ইসলামী আন্দোলন এন্নাহদা মুভমেন্টের প্রেসিডেন্ট

এছাড়া আরও বহু ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও আলেম এতে স্বাক্ষর করেন। বিবৃতিতে তাঁরা ৯/১১-কে নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা হিসেবে "Strongest terms"-এ নিন্দা করেন এবং বলেন, ইসলামী আইন নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা নিষিদ্ধ করেছে। বিবৃতিতে এ-ও বলা হয়েছে, "আল-কায়েদা ও বিন লাদেন ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না।" অথচ এখনো উগ্রপন্থীরা ৯/১১-কে শত্রুদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিজয় হিসেবে দেখে এবং তা উদ্‌যাপন করে!

সালমান আল-আওদার খোলা চিঠি। সৌদি আরবের কারানির্যাতিত মাজলুম আলেম সালমান আল-আওদা (হাফিজাহুল্লাহ) ২০১৭ সাল থেকে, অর্থাৎ প্রায় ৯ বছর ধরে, সৌদি কারাগারে বন্দি আছেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, রমযানের দ্বিতীয় দিনে, তিনি Middle East Broadcasting Center (সৌদি MBC)-এর একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ওসামা বিন লাদেনকে সরাসরি সম্বোধন করে প্রশ্ন করেন: আল-কায়েদার নামে এত নিরপরাধ শিশু, নারী ও বৃদ্ধ নিহত হওয়ার পর বিন লাদেন আল্লাহর সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন? MuslimMatters.org-এর "A Ramadan Letter to Osama bin Laden" শিরোনামের একটি আর্টিকেলে পুরো বক্তব্যের ইংরেজি অনুবাদ আছে এবং সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে যে এটি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে MBC-তে লাইভে বলা হয়েছিল।

খ. ২০০৬: বিন লাদেনের বার্তা হামাসের প্রত্যাখ্যান

২০০৬ সালে ওসামা বিন লাদেন হামাসকে সমর্থন করে একটি অডিও বার্তা দেন। হামাস সেই বার্তা প্রত্যাখ্যান করে। হামাসের তৎকালীন মুখপাত্র সামি আবু জুহরি এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁদের সংগ্রাম দখলদার সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে; বিন লাদেন বা তাঁর আল-কায়েদার মতো উগ্রপন্থীদের সঙ্গে হামাসের কোনো সম্পর্ক নেই এবং আল-কায়েদার আদর্শ ও হামাসের আদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন। (ইংরেজি ভাষ্য: "The ideology of Hamas is totally different from the ideology of Osama bin Laden.")

গ. ২০০৯: রাফাহতে হামাস বনাম সালাফী জিহাদিস্ট আল-কায়েদাপন্থীদের সংঘর্ষ

এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেখা যায় ২০০৯ সালের আগস্টে। ১৪ আগস্ট ফিলিস্তিনের গাজার রাফার ইবনে তাইমিয়া মসজিদে সালাফী জিহাদিস্ট নেতা আব্দুল লতিফ মুসা নিজের অনুসারীদের সামনে গাজায় একটি "ইসলামী আমিরাত" প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হামাস-পরিচালিত সরকারকে শরিয়া যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করার জন্য অভিযুক্ত করেন এবং তাদের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সঙ্গে তুলনা করেন। মুসার নেতৃত্বাধীন জোট "জুন্দ আনসার উল্লাহ" আল-কায়েদার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিল।

পরদিন, ১৫ আগস্ট, হামাসের নিরাপত্তা বাহিনী ও হামাসের সামরিক শাখা ইজ উদ্দিন আল কাসসাম ব্রিগেডের সঙ্গে ওই গোষ্ঠীর সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়। একদিনের মধ্যেই আব্দুল লতিফ মুসা হামাস মুজাহিদদের হাতে নিহত হন। তাঁর দলের আরও কিছু সদস্য নিহত এবং অন্যরা গ্রেপ্তার হন।

এভাবে ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সংঘাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, আল-কায়েদা, আইএস, দায়েশ ইত্যাদি উগ্রপন্থী তাকফিরী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মুজাহিদদের সংঘর্ষ বারবার হয়েছে। এখন পর্যন্ত দুনিয়ার সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে খারিজিরা মুজাহিদদের কাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করে মুজাহিদদের হাতে মার খায়। আফগানিস্তান, কাশ্মীর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

৭. তাত্ত্বিকদের বক্তব্য

এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য ইসলামী আন্দোলনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকের বক্তব্যের দিকে ফিরে তাকানো যেতে পারে।

মতিউর রহমান নিজামী (জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক আমির) তাঁর ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ গ্রন্থে লিখেছেন:

"আধুনিক বিশ্বে সন্ত্রাসের যে চিত্র আমরা দেখি, ইসলামী আদর্শ, শিক্ষা, সংস্কৃতির সঙ্গে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এরপরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান বিশ্বের এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে ইসলামের পক্ষে গণজাগরণের শুভ সূচনা সারা বিশ্বে যখন স্পষ্ট, ঠিক সেই মুহূর্তে মুসলিম নামধারী একশ্রেণীর বিপদগামী, পথভ্রষ্ট ও অর্বাচীন লোকদের পক্ষ থেকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়ে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য সৃষ্ট সম্ভাবনা হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বব্যাপী জড়বাদী বস্তুবাদী সভ্যতার পতনের প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিজয়-সম্ভাবনা দেখে ভীত-শঙ্কিত একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী তাদের কায়েমি স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করছে। তাদেরই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম উম্মাহর ওপর ক্র্যাকডাউনের যে প্রেক্ষাপট দরকার, ইসলামের নামে সন্ত্রাসকারীরা সেই প্রেক্ষাপট তৈরির কাজটাই করে যাচ্ছে।

ইসলামের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংগতিপূর্ণ নয়, এটা যেমন দুনিয়াব্যাপী মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব, দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সুস্পষ্ট, তেমনি মুসলিম উম্মাহর কাছেও।"
— ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ, মতিউর রহমান নিজামী, পৃষ্ঠা ৫

সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী (জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা) ১৯৬৩ সালের জুন মাসে, ১৬ জিলহজ ১৩৮২ হিজরিতে, পবিত্র মক্কায় হজ উপলক্ষে আগত ইসলামী দুনিয়ার নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে আরবি ভাষায় একটি ভাষণ দেন। এর শিরোনাম ছিল "মুসলিম বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনসমূহের জন্য কর্মপন্থা"। এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত অথচ বস্তুনিষ্ঠ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর তিনি দিকনির্দেশনামূলক সাতটি মূল্যবান পরামর্শ দেন।

শেষ পরামর্শের মূল কথা ছিল: ইসলামী আন্দোলনের জন্য কোনো গোপন তৎপরতা এবং সশস্ত্র বিপ্লবের ধ্যানধারণা ও কার্যক্রম অবলম্বন করা যাবে না; বরং কঠোরভাবে এগুলো থেকে আন্দোলন-সংগঠনকে মুক্ত রাখতে হবে। উল্লেখ্য, ষষ্ঠ পরামর্শে মাওলানা সবর ও হিকমা অবলম্বনের কথা বলেছেন এবং আন্দোলনের কোনো পর্যায়ে গোপন তৎপরতা অথবা সশস্ত্র কর্মপন্থা গ্রহণকে তিনি সবরের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ধরনের কর্মপন্থার পরিণতি ইসলামী আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর; একটি সঠিক বিপ্লব সব সময় কেবলমাত্র জনসমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড পরিহারের আহ্বান জানিয়ে সমবেত ইসলামী নেতৃবৃন্দকে তিনি বলেন:

"মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত ব্যাপকভাবে তুলে ধরুন। ব্যাপকভাবে মানুষের চিন্তাধারায়, মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। মানুষকে উন্নত আমল-আখলাকে সজ্জিত করে তাদের হৃদয় জয় করুন। এই প্রচেষ্টায় বাধা-প্রতিবন্ধকতা এলে সাহসের সঙ্গে তার মোকাবেলা করুন। পর্যায়ক্রমিক কর্মকৌশলের ফলে যে বিপ্লব সাধিত হবে তাই হবে স্থায়ী এবং সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যাকে প্রতিপক্ষের গৃহীত হাওয়া-তুফান মিটাতে সক্ষম হবে না। দ্রুত সাফল্যের জন্য তড়িঘড়ি করে গৃহীত কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে কোনো বিপ্লব সংগঠিত যদি হয়েও যায়, তা কখনো স্থায়ী হতে পারে না; বরং সেটা যেভাবে আসবে সেভাবেই বিদায় নেবে।"

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter