ফেমোন্যাশনালিজম: ইউরোপে নারীবাদ, জাতীয়তাবাদ ও নিওলিবারেল রাজনীতির যৌথ এক নতুন উপনিবেশবাদ

এখানে একটি খুব সাধারণ ও একপেশে ধারণা আছে: পুরুষ মুসলিম অভিবাসীকে দেখানো হয় অত্যাচারী ও বর্বর হিসেবে—যেন তাদের সমাজের সব দোষ, সব ব্যর্থতার কারণ সে-ই। কিন্তু নারী মুসলিম অভিবাসীকে কখনও কখনও “উদ্ধারযোগ্য” বলা হয়। তাকে এক সুন্দর ব্যতিক্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়, কারণ তাকে ব্যবহার করে নৈতিকতার বড়াই করা যায় এবং লাভও আদায় করা যায়। এটি খুব সহজ একটি গল্প। সত্যিও হতে পারে, নাও হতে পারে, কিন্তু আসল ব্যাপার হলো—এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ নেদারল্যান্ডস, ইটালি এবং ফ্রান্স—এই তিন দেশের উদাহরণের মাধ্যমে ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী সারা ফারিস দেখিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদ, বাজারকেন্দ্রিক নীতি (নিওলিবারেলিজম) এবং নারীবাদ একসাথে মিলে নারী মুসলিম অভিবাসীকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে। তিনি এই প্রবণতাকে বলেছেন “ফেমোন্যাশনালিজম।”

ফারিস প্রথমে ফেমোন্যাশনালিজমকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে: জাতীয়তাবাদ, নারীবাদ এবং নিওলিবারেল নীতির একটি রাজনৈতিক জোট, যারা “নারী মুক্তি”র কথা বলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদেশি-বিদ্বেষী ও বর্ণবাদী কর্মকাণ্ডকে ন্যায্য দেখাতে চায়। এটি মূলত ইউরোপীয় রাজনীতির একটি চিন্তার সমালোচনা। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতা, এমনকি কিছু নারীবাদীও ‘অত্যাচারিত মুসলিম নারী’র ছবিকে ব্যবহার করে—

  • কখনো তাকে বাঁচানোর প্রয়োজন আছে এমন শিকার হিসেবে দেখিয়ে,
  • কখনো তাকে শুধু অর্থনৈতিক কাজে লাগানোর শ্রমিক হিসেবে দেখিয়ে।

অর্থাৎ “নারীর মুক্তি”র ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে নিজেদের জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য পূরণ করতে এবং বাজারের স্বার্থ রক্ষা করতে। ২০০০ সালের পর থেকে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো হঠাৎ নারীর অধিকার নিয়ে খুব চিন্তিত বলে দাবি করতে শুরু করেছে—যদিও তাদের অতীত ইতিহাস নারী-বিরোধী নীতি ও বক্তব্যে ভরা। ফারিস স্বীকার করেন যে বামপন্থীরাও এই ধরনের ভণ্ডামির বাইরে নয়, কিন্তু তার মূল আলোচনা ডানপন্থী দলগুলোকে নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে, নেদারল্যান্ডসে ২০০০ সালের শুরুর দিকে “লিঙ্গ সমতা” এবং “সমকামী অধিকার”কে আধুনিক ডাচ সমাজের মূল মূল্যবোধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই কারণে মুসলিমদের দ্রুতই এই মূল্যবোধের হুমকি হিসেবে দেখানো শুরু হয়। ফারিস উল্লেখ করেন গির্ট উইল্ডারসের কথা—যিনি ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল পার্টি ফর ফ্রিডম -এর নেতা। তিনি ফিতনা নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন, যেখানে ইসলামকে নারীদের এবং সমকামীদের ওপর নিষ্ঠুর ও সহিংস বলে দেখানো হয়েছে। ২০১৬ সালে উইল্ডারস বলেন: “আমাদের পশ্চিমা সভ্যতার স্বার্থে, এমনকি মুসলিমদের নিজের স্বার্থেও, যত বেশি সম্ভব মুসলিমকে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান, নাস্তিক বা অন্য কিছু হতে উৎসাহিত করা উচিত। যত বেশি মুসলিম ইসলাম এবং মুহাম্মদের ‘শৃঙ্খল’ থেকে মুক্ত হবে, ততই ভালো।”

উইল্ডার্স কাজ করেছিলেন আয়ান হিরসি আলির সাথেও যিনি মুসলিম থেকে নাস্তিক নারীবাদী হওয়ার উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমে খুব জনপ্রিয় (যদিও ২০২৩ সালে তিনি নিজেই খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছেন)। নারীর অধিকারকে এখানে আগেই ধরে নেওয়া হয় যে তা ইসলামী আইন-এর সাথে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী—যদিও তিনি তার অতীত সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন, এবং ইউরোপে মুসলিম নারীদের “উদ্ধার” করার নামে ইসলামবিরোধী ভয়ের আগুন আরও জ্বালিয়েছেন। মজার বিষয় হল—তিনি নিজেও একজন অভিবাসী। ফারিস ফ্রান্সেও একই ধরণ খুঁজে পেয়েছেন, বিশেষ করে মেরিন লো পেন-এর মধ্যে। লো পেন বলেছেন যে তিনি নারীর অধিকার সমর্থন করেন “যতটা পর্যন্ত ইসলামের হুমকি থেকে নারীদের রক্ষা করা যায়।” কিন্তু এর বাইরে তিনি নারীর সমস্যাগুলো নিয়ে খুব কম কিছু করেন। 

যেমন ফরাসি সমাজে যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণ নিয়ে তার কোনো বাস্তব নীতি নেই। তার দলের পরিবারনীতি অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা শুধু সেই পরিবারগুলো পায় যাদের অন্তত একজন “ফরাসি” পিতা-মাতা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে “হোয়াটঅ্যাবাউটারি”র ভক্ত নই। মুসলিম সমাজেও অনেক বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা আছে—এবং আমরা সেই বিষয়গুলো খোলাখুলিই আলোচনা করি। কিন্তু লো পেন-এর আচরণ—ইসলামের নাম এলে খুব জোরে চিৎকার করা, কিন্তু ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় নীরব থাকা পরিষ্কার করে দেয় যে “নারীর অধিকার” তার কাছে সত্যিকার রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং একটি স্লোগান।

ইতালিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মরক্কো-জন্ম ইটালীয় ডানপন্থী রাজনীতিবিদ সুয়াদ সাবাই বুরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। তিনি বলেছেন “পশ্চিমা বহু-সংস্কৃতিবাদ অভিবাসী ও মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।” 

ইতালির পুরুষ-নারী সমতার মন্ত্রণালয়ও এমন একটি ধারণাকে সমর্থন করে যে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নাকি মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত—বাম ও ডান উভয় দলই এতে যুক্ত ছিল যদিও একই সময়ে ইতালীয় পুরুষদের দ্বারা নারীনিধনের হার (ফেমিসাইড) বাড়ছিল। (এখানেও আগের মতো এটি তুলনা করার জন্য বলা নয়, বরং পক্ষপাত দেখাতে বলা হচ্ছে।)

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ফারিস দেখান যে মুসলিম নারীদের নিয়ে বর্ণবাদী এবং প্রাচ্যবাদী ধারণা প্রচলিত থাকলেও, তাদের এমনভাবে দেখানো হয় যেন তারা স্বাধীনভাবে নিজেরা “সমাজে মিশে যেতে পারে” এবং “পুরুষদের অত্যাচার থেকে পালাতে পারে।” তিনি খতিয়ে দেখেন রাষ্ট্র যখন অভিবাসী নারীদের জন্য “ইন্টিগ্রেশন” বা সমাজে মিশে যাওয়ার প্রোগ্রাম তৈরি করে, তখন কীভাবে নারীর ভূমিকা বাজারকেন্দ্রিক (নিওলিবারেল) রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন: “অভিবাসী নারীদের পুরুষদের মতো আচরণ করা হয় না। পুরুষদের বলা হয়—তারা নাকি চাকরি কেড়ে নেবে, সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ ঘটাবে, কিংবা কল্যাণব্যবস্থার ওপর বোঝা হবে। কিন্তু নারীরা? তাদের দেখা হয় এমন পরিচারিকা হিসেবে যারা পশ্চিম ইউরোপের পরিবার ও ব্যক্তিদের স্বস্তি বজায় রাখে। তারা চাকরি দেয়, সেবা দেয় যারা ঘরের কাজ করে পশ্চিমা নারীদের ‘মুক্ত’ করে, যাতে তারা বাইরে উৎপাদনশীল কাজে যোগ দিতে পারে। তারা শিশুদের দেখে, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের যত্ন করে যা রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছে, সেই সব কাজ এই অভিবাসী নারীরা করছে।”

অভিবাসী নারীদের “প্রজননমূলক কাজ” অর্থাৎ বাসা-ঘর, যত্ন, শিশু-বৃদ্ধ দেখাশোনা ইত্যাদি কাজে উৎসাহিত করা—যে কাজগুলোকে এই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নারীদের জীবন থেকে আলাদা করতে চায় সেটাই আসলে “স্থানীয় নারীদের” ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করে। এই জায়গাতেই নারীবাদ ও নিওলিবারেলিজম এক হয়ে যায়। নারীর সমতা ও মুক্তির প্রয়োজনীয়তা সত্য হলেও, নারীবাদ সবসময় রাষ্ট্রের কঠোর নীতি বা সহিংস প্রকল্প থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেনি। বরং অনেক সময় রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার “সহকারী” হিসেবে কাজ করেছে।

ইউরোকেন্দ্রিক নারীবাদ যা নারীর সমস্যাকে শুধুই বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে গ্লোবাল সাউথের নারীদের মুক্ত করার কথা বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এমন অবস্থানে নিয়ে আসে যেখানে তারা বাজারের জন্য সস্তা শ্রমিক হয়ে যায়, এবং উন্নত দেশের নারীদের সুবিধার জন্য কাজ করে। এই প্রবণতা একদিকে নিওলিবারেল স্বার্থকে সমর্থন করে, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদীদের তৈরি করা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকেও মান্যতা দেয়, যেখানে মুসলিম পুরুষ অভিবাসীকে সবার নিচে রাখা হয়। অনেক পাঠকের কাছে বইটি কঠিন বা একঘেয়ে লাগতে পারে যেমন অনেক একাডেমিক কাজেই দেখা যায় বিশেষ করে শ্রমের ধরন বা ভাষাগত আলোচনার অংশগুলো। কিন্তু বইটি মূলত একাডেমিকদের সাথে একাডেমিক ভাষায় কথোপকথন। সাধারণ পাঠকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো হলো—

  • ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ইতালিতে ফেমোন্যাশনালিজমের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (অধ্যায় ৩)
  • “অর্থনৈতিক” একীভূতকরণের (ইন্টিগ্রেশন) চাপ (অধ্যায় ৪) 
  • মুসলিম পুরুষ অভিবাসীদের “নিক্ষেপযোগ্য” এবং মুসলিম নারী অভিবাসীদের “সস্তা শ্রম” হিসেবে ব্যবহার করার দ্বিমুখী মানদণ্ড (অধ্যায় ৫)

বইটির এমন একটি দিক আছে যা বোঝা কঠিন জাতীয়তাবাদকে খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করা। লেখক জাতীয়তাবাদকে স্বভাবগতভাবে বাদমুখী এবং নারীবাদের বিপরীত হিসেবে ধরেছেন, এবং তাই নারীবাদ ও জাতীয়তাবাদের যেকোনো মিলকে নারীবাদী নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ নারী অধিকারকে এগিয়েও দিয়েছে যদিও তা অনেক সময় স্বার্থসিদ্ধির জন্য (যেমন জায়োনিস্ট নারীবাদ)। নারীবাদ ও জাতীয়তাবাদ কখনো কখনো একে অপরকে শক্তিশালীও করেছে সবসময় বিরোধী নয়। এছাড়া নারীবাদের নিজস্ব একটি বর্জনমূলক ইতিহাসও আছে—শ্রমজীবী নারী, আফ্রিকান-আমেরিকান নারী, ইত্যাদি গোষ্ঠীকে অনেক সময়ই উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব সমস্যাকে “এটা আসল নারীবাদ নয়” বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এবং কেবল জাতীয়তাবাদকে দোষারোপ করলে নারীবাদের অভ্যন্তরীণ বৈষম্যগুলো অদেখা থেকে যায়। লিবারেলিজম ও নিওলিবারেলিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফারিস নারীবাদ, নিওলিবারেলিজম ও জাতীয়তাবাদের জোট ব্যাখ্যা করার একটি কার্যকর কাঠামো দিয়েছেন। তার বই থেকে আমরা নতুন শব্দভান্ডার পেয়ে কৃতজ্ঞ হতে পারি। পশ্চিমা পাঠকেরা আয়ান হিরসি আলির মতো নারীবাদী ও শ্বেত-উগ্রপন্থীদের জোট বোঝার জন্য এই ভাষা কাজে লাগাতে পারবেন, অথবা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অমানবিক বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রেও।

দক্ষিণ এশিয়ার পাঠকেরা ভারতের বিজেপি বা উচ্চবিত্ত শিক্ষিত বৃত্তে একই ধরণের ফেমোন্যাশনালিজম দেখতে পারবেন যেখানে “নারীর ক্ষমতায়ন” বলা হলেও একই সঙ্গে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ধর্ষণ চলতে থাকে। রাজনীতি সবসময়ই ছিল জটিল ও ধূর্ত খেলা, এখনো তাই। আমাদের সত্যিই নতুন ধরনের “ধারণাগত চশমা” দরকার।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter