জাতি ত্যাগ ও নৈতিক বোধের পুনর্গঠন: একটি সাধারণ লতার শিক্ষায় নবীসুলভ নেতৃত্বের রূপান্তর

 ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবীদের জীবনকাহিনী কেবল ইতিহাসের গল্প নয়; বরং এটি মানব চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, নেতৃত্বের সংকট এবং আল্লাহর রহমতের এক অনন্ত পাঠশালা। হযরত ইউনুস (আ.)-এর ঘটনাটি আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এই গল্পের একটি নির্দিষ্ট অংশে এসে থেমে যান তিমি মাছের পেটে অন্ধকার প্রকোষ্ঠ এবং সেই বিখ্যাত দোয়া, যা তাঁকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু উদ্ধারের ঠিক পরের মুহূর্তটিতে কুরআনে এমন একটি বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যা সচরাচর এড়িয়ে যাওয়া হয়।

তিমির পেট থেকে মুক্তির পর, ঘোর অন্ধকারের অবসানের পর, আল্লাহ তাআলা তাঁর দুর্বল এবং অসুস্থ শরীরের ওপর একটি 'লতা জাতীয় গাছ' (ইয়াকতিন) উদগত করলেন। কিন্তু কেন? কুরআনে প্রতিটি শব্দের পেছনে গভীর প্রজ্ঞা বা 'হিকমাহ' লুকিয়ে থাকে। কেন আল্লাহ তাঁকে সরাসরি সুস্থ করে দিলেন না? কেন একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের প্রয়োজন হলো? এই উদ্ভিদটি কি কেবল তাঁর শারীরিক চিকিৎসার জন্য ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল নেতৃত্বের এক বিশাল দর্শন?

হযরত ইউনুস (আ.)-এর এই ঘটনাটি কেবল একজন নবীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই নয়, বরং এটি আজকের দিনের প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তি সে হতে পারে পরিবারের কর্তা, মা-বাবা, কিংবা সমাজের নেতা তাদের জন্য এক উজ্জ্বল দিকনির্দেশনা। এই প্রবন্ধে আমরা সেই 'লতা জাতীয় গাছ' বা লাউ গাছের রূপক ব্যবহার করে নেতৃত্বের দায়িত্ব এবং পলায়নপর মানসিকতা থেকে ফিরে আসার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করব।

মহান আল্লাহর ভাষায় সেই ঘটনা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। সূরা আস-সাফফাতে আল্লাহ বলেন: “আর নিশ্চয়ই ইউনুস ছিলেন রাসূলগণের একজন।” [৩৭:১৩৯]

একজন রাসূল হিসেবে তাঁর মর্যাদা ছিল অনেক উঁচুতে। কিন্তু এরপর এমন কিছু ঘটল যা ছিল অপ্রত্যাশিত। “যখন তিনি পালিয়ে বোঝাই নৌযানের দিকে গেলেন।” [৩৭:১৪০]

এখানে 'পালিয়ে যাওয়া' শব্দটি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত। হযরত ইউনুস (আ.) তাঁর জাতির ওপর বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন দাওয়াত দেওয়ার পরেও তারা যখন তাঁর বার্তা প্রত্যাখ্যান করল, তখন তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন। মানবিক আবেগের বশবর্তী হয়ে, আল্লাহর প্রত্যক্ষ অনুমতি ছাড়াই তিনি তাঁর দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এই অবাধ্য জাতির কাছে থাকার চেয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া শ্রেয়।

কিন্তু আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে এভাবে ছেড়ে দেন না। কুরআনের ভাষায়: “অতঃপর তিনি নির্বাচন করলেন এবং তাতে তিনি অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হলেন। অতঃপর বড় মাছ তাঁকে গিলে ফেলল, আর তিনি ছিলেন নিজেকে ধিক্কার দানকারী।” [৩৭:১৪১-১৪২]

সমুদ্রের তলদেশে, মাছের পেটের গহীন অন্ধকারে তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। সেই অন্ধকারের আর্তনাদ আজও মুমিনদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করে। তিনি নতজানু হয়ে স্বীকার করলেন: “তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই; তুমি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি পাপিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৭]

আল্লাহর রহমত ছাড়া তাঁর পরিণতি কী হতে পারত, তা আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন: “তিনি যদি আল্লাহর তাসবীহ পাঠ না করতেন, তবে তাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো।” [৩৭:১৪৩-১৪৪]

আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করলেন এবং তাঁকে তিমির পেট থেকে মুক্তি দিলেন। কিন্তু তিনি তখন ছিলেন অত্যন্ত রুগ্ন, চামড়া ছিল বিগলিত এবং শরীর ছিল নিস্তেজ। “অতঃপর আমি তাকে এক জনশূন্য প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, আর তিনি ছিলেন অসুস্থ।” [৩৭:১৪৫]

ঠিক এই মুহূর্তেই সেই আয়াতটি আসে, যা এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু: “আর আমি তার ওপর লতা জাতীয় একটি গাছ (ইয়াকতিন) উদগত করলাম।” [৩৭:১৪৬]

লতা জাতীয় গাছটির ভূমিকা ও হিকমাহ

মুফাসসিরগণ বলেন, কুরআনে বর্ণিত 'শাজারাতান মিন ইয়াকতিন' বা লতা জাতীয় গাছটি সম্ভবত লাউ বা কুমড়া গাছ ছিল। আল্লাহর নির্দেশে এই গাছটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বেড়ে ওঠে। কিন্তু কেন এই গাছটিই বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে বৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় কারণই বিদ্যমান।

১. ছায়া ও আব্রু: জনশূন্য প্রান্তরে প্রখর রোদে ইউনুস (আ.)-এর নাজুক শরীরের জন্য প্রয়োজন ছিল স্নিগ্ধ ছায়া। লাউ গাছের পাতাগুলো হয় প্রশস্ত ও বড়, যা তাঁকে সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করেছিল। ২. পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা: মাছের পেটের এসিডে তাঁর গায়ের চামড়া অত্যন্ত পাতলা হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ অবস্থায় মাছি বা পোকামাকড় তাঁকে আক্রমণ করতে পারত, যা হতো অসহনীয় যন্ত্রণার। লাউ গাছের একটি বিশেষ গুণ হলো, এর গন্ধে মাছি বা ক্ষতিকর পোকামাকড় কাছে আসে না। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রাকৃতিক 'ইনসেক্ট রিপেলেন্ট'। ৩. পুষ্টি ও আরোগ্য: এই গাছের ফল ছিল তাঁর জন্য খাদ্য এবং পানীয়ের উৎস। এটি সহজপাচ্য এবং শরীরকে দ্রুত সতেজ করে তোলে। এর প্রতিটি অংশ পাতা, ছাল, শাঁস সবই ছিল উপকারী।

এই গাছটি সেই মুহূর্তে ইউনুস (আ.)-এর জন্য ছিল 'পরিপূর্ণ সমাধান'। কিন্তু এর নিরাময় কেবল দৈহিক ছিল না, এটি ছিল একটি রূপক বা মেটাফোর। আল্লাহ তাআলা এই গাছের মাধ্যমে ইউনুস (আ.)-কে হাতে-কলমে শেখাচ্ছিলেন একজন নেতা বা অভিভাবকের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত।

লতা থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা

ইউনুস (আ.) তাঁর জাতিকে বোঝা মনে করেছিলেন। তিনি তাদের বক্রতা ও অবাধ্যতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে দেখালেন যে, একটি সাধারণ লতা গাছ কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

১. ছায়ার মতো আশ্রয় হওয়া: গাছটি যেমন ইউনুস (আ.) কে ছায়া দিয়ে রোদ থেকে বাঁচিয়েছিল, একজন নেতার কাজ হলো তাঁর অনুসারীদের জীবনের কঠোরতা থেকে রক্ষা করা। ইউনুস (আ.)-এর দায়িত্ব ছিল তাঁর জাতির জন্য আধ্যাত্মিক ছায়া হওয়া, যা তাদের আল্লাহর ক্রোধ এবং দুনিয়ার অনাচার থেকে রক্ষা করবে।

২. অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা প্রদান: গাছটি যেমন পোকামাকড় দূরে রেখেছিল, একজন নবীর দায়িত্ব হলো শয়তানের প্ররোচনা এবং সমাজের 'পোকামাকড়' রূপী পাপ কাজ থেকে মানুষকে আগলে রাখা। মানুষ ভুল করবে, পাপে জড়াবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নেতা তাদের ছেড়ে যাবেন না, বরং বর্মের মতো রক্ষা করবেন।

৩. আত্মিক পুষ্টির জোগান: গাছটি যেমন তাঁকে ফল দিয়ে পুষ্টি দিয়েছিল, একজন নেতার কাজ হলো মানুষের আত্মিক ক্ষুধা মেটানো। জ্ঞানের আলো, হেদায়েতের বাণী এবং ঈমানের পুষ্টি দিয়ে তাদের সজীব রাখা। কুরআনে আল্লাহ বলেন: “হে মানবজাতি! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরের জন্য নিরাময়।” [১০:৫৭]

৪. ভিন্নতাকে মেনে নেওয়া: লাউ গাছের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কাজে লাগে। ইউনুস (আ.)-এর জাতিও ছিল বৈচিত্র্যময়। সবাই একরকম হবে না, সবাই একভাবে কথা শুনবে না। এই ভিন্নতাকে মেনে নিয়ে, তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার করাই হলো প্রকৃত নেতৃত্বের প্রজ্ঞা। গাছটি তাঁকে শেখাল সবাইকে এক পাল্লায় মাপা যাবে না, বরং প্রত্যেকের মধ্যে থাকা সুপ্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

আমূল পরিবর্তন ও জাতির বিশ্বাস স্থাপন

মাছের পেটে যাওয়ার আগে ইউনুস (আ.) তাঁর জাতিকে দেখেছিলেন একটি অসহ্য বোঝা হিসেবে। কিন্তু লতা গাছের নিচে শুয়ে আরোগ্য লাভের পর, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। তিনি বুঝলেন, নেতৃত্ব মানে নিখুঁত মানুষদের পরিচালনা করা নয়; বরং অপূর্ণ মানুষদের প্রয়োজন পূরণ করা—ঠিক যেমনটি ওই গাছটি তাঁর জন্য করেছিল।

আল্লাহ তাআলা এরপরের ঘটনা বর্ণনা করেন: “আর আমি তাকে এক লাখ বা তার চেয়েও বেশি মানুষের নিকট প্রেরণ করলাম। তারা ঈমান আনল, তাই আমি তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম।” [৩৭:১৪৭-১৪৮]

ইতিহাসে এটিই একমাত্র জাতি, যার প্রতিটি সদস্য ঈমান এনেছিল। ভাবুন তো! যে জাতি এত অবাধ্য ছিল যে নবী তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেই জাতিই ইতিহাসের সেরা জাতিতে পরিণত হলো। এর কারণ কী? কারণ ইউনুস (আ.) ফিরে এসেছিলেন নতুন এক সত্তা নিয়ে। তিনি আর অভিযোগকারী ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই 'লতা গাছ' দয়ালু, রক্ষাকারী এবং পুষ্টিকর।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: আমাদের জন্য শিক্ষা

আজকের দিনে আমরা যদি আমাদের সমাজের দিকে তাকাই, বিশেষ করে পারিবারিক কাঠামোর দিকে, আমরা দেখব ইউনুস (আ.)-এর সেই 'পলায়নপর' মানসিকতা আমাদের মধ্যেও প্রবল।

কত বাবা আজ ভাবছেন, "আমার স্ত্রী বড়ই ঝগড়াটে, সন্তানরা কথা শোনে না, আমি আর পারছি না।" কত মা আজ হতাশ হয়ে বলছেন, "এই সংসার, এই সন্তান লালন-পালন আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। আমি আমার মুক্তি চাই।" অনেকেই নিজের পরিবারকে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে বা নিজের দায়িত্বকে 'বো বোঝা' মনে করে দূরে সরে যাচ্ছেন। অফিসের বস তাঁর কর্মীদের ওপর বিরক্ত, নেতা তাঁর কর্মীদের ওপর হতাশ।

কিন্তু ইউনুস (আ.)-এর গল্প আমাদের শেখায় অস্বস্তিকর বলেই দায়িত্ব ছেড়ে পালানো যায় না। আল্লাহ মুমিনদের সতর্ক করেছেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো।” [৬৬:৬]

আপনার পরিবারই আপনার 'উম্মত' বা জাতি। আপনার সন্তানরা আপনার 'কওম'।

  • বাবাদের জন্য শিক্ষা: আপনাকে হতে হবে সেই লতা গাছের মতো 'ছায়া'। সংসারের হাজারো ঝড়-ঝাপটা থেকে স্ত্রী-সন্তানকে আগলে রাখার দায়িত্ব আপনার। আপনি যদি তাদের ছেড়ে মানসিক প্রশান্তির জন্য বাইরে সময় কাটান, তবে আপনি ইউনুস (আ.)-এর প্রথম অবস্থার মতো আচরণ করছেন।
  • মায়েদের জন্য শিক্ষা: আপনি হলেন পুষ্টির উৎস। সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয়। মাতৃত্ব কঠিন, সংসার ক্লান্তিকর কিন্তু এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়।

মনে রাখবেন, ইউনুস (আ.) যখন পালিয়েছিলেন, তিনি শান্তি পাননি। তিনি ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মাছের পেটের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। দায়িত্ব থেকে পালানো কখনোই মুক্তি আনে না, বরং আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।

আশা ও প্রত্যাবর্তনের পথ

এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এটি দোষারোপের গল্প নয়, বরং ফিরে আসার গল্প। হযরত ইউনুস (আ.) ভুল করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে নবীর তালিকা থেকে বাদ দেননি। তিনি ফিরে এসেছিলেন, তওবা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।

আল্লাহ যখন দেখলেন ইউনুস (আ.) তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত, তখন আল্লাহ তাঁকে একা ছেড়ে দেননি। তিনি 'গাছ' পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। এর অর্থ হলো আপনি যখনই আপনার দায়িত্বের দিকে ফিরে আসবেন, আল্লাহ আপনার জন্য গায়েবি সাহায্য পাঠাবেন (Gourd Plant)। তিনি আপনার কাজকে সহজ করে দেবেন, আপনার হৃদয়ে প্রশান্তি দেবেন এবং আপনার পরিবারের (কওমের) হৃদয় পরিবর্তন করে দেবেন।

আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” [২:২২২]

সুতরাং, আপনি যদি অতীতে আপনার দায়িত্ব অবহেলা করে থাকেন, সন্তানদের সময় না দিয়ে থাকেন, স্ত্রীর প্রতি কঠোর হয়ে থাকেন এখনও সময় আছে। ফিরে আসুন। সেই লতা গাছটির মতো হোন যে ছায়া দেয়, যে আগলে রাখে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও আমরা এই শিক্ষার প্রতিফলন দেখি। তিনি লাউ বা কদু খুব পছন্দ করতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তরকারির প্লেটে লাউ খুঁজে খুঁজে খেতেন। যখন তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বলেছিলেন: “এটি আমার ভাই ইউনুসের গাছ।”

প্রতিটি ভোজের সময় এটি ছিল এক বিনীত স্মরণ। সেই নবীর কথা মনে করা, যিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু ফিরে এসে এক ইতিহাস গড়েছিলেন। এটি ছিল রহমতের, প্রত্যাবর্তনের এবং রূপান্তরের এক প্রতীক।

উপসংহার

একটি সাধারণ লতা গাছ, কিন্তু এর শিক্ষা কত গভীর! এটি আমাদের শেখায় দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা এবং কঠিন সময়েও হাল না ছাড়ার মানসিকতা।

নেতৃত্ব বা অভিভাবকত্ব মানে হুকুম দেওয়া নয়। নেতৃত্ব মানে হলো, আপনার অধীনস্থ মানুষগুলো যখন কঠিন আচরণ করবে, যখন তারা অবাধ্য হবে, তখনও তাদের প্রয়োজন মেটানো। আপনি যখন ক্লান্ত, তখনও তাদের জন্য ছায়া হয়ে থাকা। কারণ, এটি কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি 'আমানত' বা ডিভাইন ট্রাস্ট।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন: “আমি আসমানসমূহ, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল।” [৩৩:৭২]

আল্লাহ সেই মানুষদের কখনো ত্যাগ করেন না যারা এই আমানত রক্ষা করার চেষ্টা করে। তিনি তাদের জন্য নিরাময় পাঠান, সাহায্য পাঠান এবং তাদের দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করেন।

আসুন, আমরা ইউনুস (আ.)-এর জীবনের এই শিক্ষা গ্রহণ করি। আমরা যেন আমাদের পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে পলায়নপর না হয়ে, সেই লতা গাছটির মতো আশ্রয়দাতা হতে পারি। আমাদের ছায়ায় যেন আমাদের আপনজনেরা শান্তি পায়, আমাদের উপস্থিতিতে যেন তারা দ্বীনের পথে চলার শক্তি পায়।

হে আল্লাহ! আমাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করার তৌফিক দিন। আমাদের ত্রুটিগুলো ক্ষমা করুন এবং আমাদের পরিবার ও সমাজকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করুন। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter