খলিফা উমর (রা.)-এর যুগে ইরাক বিজয়: কাদিসিয়া থেকে জালুলা—ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইরাক অভিযানের সূচনা
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩ হিজরি) খলিফা আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তাঁর শাসনকাল (১৩–২৩ হিজরি/৬৩৪–৬৪৪ খ্রি.) শুধু ইসলামী রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সম্প্রসারণের জন্যই নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন, সুসংগঠিত সামরিক কৌশল এবং টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যও ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর সময়েই মুসলিম রাষ্ট্র আরব উপদ্বীপের সীমানা অতিক্রম করে তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়।
এই সময়ে ইরাক ছিল সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীবিধৌত এই অঞ্চল কৃষি, বাণিজ্য, সামরিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক দিক থেকে পারস্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। রাজধানী মাদায়িন (Ctesiphon) ছিল পারস্য সম্রাটের রাজনৈতিক আসন এবং সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক। ফলে ইরাকের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
ইসলামের আবির্ভাবের সময় সাসানীয় সাম্রাজ্য বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও অভ্যন্তরীণভাবে গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল। ৬০২ থেকে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ পারস্যের অর্থনীতি ও সেনাবাহিনীকে ক্লান্ত করে তোলে। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট খসরু দ্বিতীয় (কিসরা পারভেজ) ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একাধিক শাসক সিংহাসনে বসেন। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে, যখন অল্পবয়সী ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় সাসানীয় সম্রাট হন। কিন্তু তখন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং প্রাদেশিক সেনাপতিরা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছিলেন।
অন্যদিকে, আরব উপদ্বীপে ইসলামী রাষ্ট্র দ্রুত সুসংগঠিত হচ্ছিল। রিদ্দাহ যুদ্ধের মাধ্যমে খলিফা আবু বকর (রা.) আরবের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে পুনরায় ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে আনেন। এরপর তিনি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন। ১২ হিজরি (৬৩৩ খ্রি.) সালে ইসলামের কিংবদন্তি সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) ইরাক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। উবুল্লা, হিরা, আইনুত-তামর এবং ফিরাজসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনি সাসানীয় ও তাদের আরব মিত্রদের পরাজিত করেন। এই বিজয়গুলো ইরাকে মুসলিম উপস্থিতির ভিত্তি গড়ে দিলেও পারস্য সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি তখনও ভেঙে পড়েনি।
পরবর্তীতে সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর প্রয়োজন দেখা দিলে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-কে সেখানে পাঠানো হয়। তাঁর প্রস্থানের পর ইরাকে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মুসান্না ইবন হারিসা আশ-শায়বানি (রা.)। তিনি ছিলেন ইরাক সীমান্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং স্থানীয় আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম একজন দক্ষ সেনাপতি। কিন্তু খালিদের অনুপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে সাসানীয়রা পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে। তারা সীমান্তবর্তী বহু এলাকা পুনর্দখলের চেষ্টা শুরু করে এবং মুসলিম বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করে।
এমন পরিস্থিতিতে ১৩ হিজরিতে খলিফা উমর (রা.) ক্ষমতায় এসে ইরাক ফ্রন্টকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সীমান্তে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ যথেষ্ট নয়; বরং সাসানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক সক্ষমতাকে নির্ণায়কভাবে ভেঙে না দিলে ইরাকে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। তবে তাঁর নীতি ছিল যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিজিত অঞ্চলে ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
খলিফা উমর (রা.)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যুদ্ধ পরিচালনায় পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তিনি মদিনায় সাহাবিদের নিয়ে নিয়মিত শূরা বৈঠক করতেন এবং সামরিক অভিযানের আগে বিভিন্ন মতামত গ্রহণ করতেন। প্রথমদিকে তিনি নিজেই ইরাক অভিযানে অংশগ্রহণের কথা বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু উসমান ইবন আফফান (রা.), আলী ইবন আবি তালিব (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-সহ জ্যেষ্ঠ সাহাবিরা পরামর্শ দেন যে, খলিফার রাজধানীতে থেকে সামগ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করাই অধিক কল্যাণকর হবে। তাঁদের এই পরামর্শ গ্রহণ করে উমর (রা.) একজন দক্ষ সেনাপতিকে সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে মুসান্না ইবন হারিসা (রা.) মদিনায় এসে ইরাকের বাস্তব পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, পারস্য বাহিনী নতুন করে বিশাল সেনাবাহিনী সংগঠিত করছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মুসলিমদের অর্জিত সাফল্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর এই প্রতিবেদন উমর (রা.)-কে দ্রুত নতুন অভিযান সংগঠিত করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর এখান থেকেই শুরু হয় এমন এক ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি, যা অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বুয়াইব, কাদিসিয়া, মাদায়িন ও জালুলার মতো ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের ভিত্তি স্থাপন করে।
ইতিহাসবিদদের মতে, ইরাক বিজয়ের এই অধ্যায় ছিল কেবল একের পর এক যুদ্ধজয়ের গল্প নয়; বরং সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব, ধৈর্য, সামরিক শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অসাধারণ উদাহরণ। আর এই অভিযানের প্রথম নির্ণায়ক পরীক্ষা ছিল বুয়াইবের যুদ্ধ, যেখানে মুসলিম বাহিনী প্রমাণ করে যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর প্রস্থানের পরও তারা সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়াই করতে সক্ষম। সেই যুদ্ধই পরবর্তীকালের কাদিসিয়ার মহাবিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।
বুয়াইবের যুদ্ধ: কাদিসিয়ার বিজয়ের ভিত্তি
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) সিরিয়ায় চলে যাওয়ার পর পারস্য সাম্রাজ্য মনে করেছিল যে ইরাকে মুসলিম প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে তারা সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো পুনর্দখলের উদ্যোগ নেয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুসান্না ইবন হারিসা আশ-শায়বানি (রা.), যিনি স্থানীয় আরব গোত্রগুলোর সহযোগিতা নিয়ে প্রতিরক্ষা সুসংহত করেন।
১৩ হিজরি (৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ)-এর শেষ দিকে ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী বুয়াইব অঞ্চলে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। পারস্য বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বাহমান জাযুয়াইহ (Bahman Jadhuyih)। যদিও কিছু প্রাচীন বর্ণনায় তাঁর পরিবর্তে মিহরান ইবন মিহরবন্দাদ-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে পারস্য বাহিনী একজন অভিজ্ঞ সেনাপতির অধীনেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল।
যুদ্ধের শুরুতেই মুসলিম বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করে। তারা নদী পার হয়ে যুদ্ধ করার পরিবর্তে পারস্য সেনাদের নিজেদের অবস্থানে আসতে দেয়। এতে পারস্যের ভারী অশ্বারোহী ও যুদ্ধহাতির সুবিধা অনেকাংশে কমে যায়। দীর্ঘ সংঘর্ষের এক পর্যায়ে মুসান্না (রা.) সরাসরি শত্রুপক্ষের নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানার নির্দেশ দেন। সেনাপতির পতনের পর পারস্য বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং তারা পিছু হটতে শুরু করে।
বুয়াইবের বিজয় মুসলিমদের জন্য কেবল একটি সামরিক সাফল্য ছিল না; এটি ইরাকে মুসলিম উপস্থিতিকে পুনরায় সুসংহত করে এবং খলিফা উমর (রা.)-কে বৃহত্তর অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণে উৎসাহিত করে। ইতিহাসবিদ আল-তাবারী উল্লেখ করেন, এই বিজয়ের পর ইরাকের বহু আরব গোত্র আবার মুসলিম বাহিনীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
কাদিসিয়ার পথে
বুয়াইবের পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় বুঝতে পারেন যে সীমান্তে ছোট ছোট সংঘর্ষে মুসলিমদের থামানো সম্ভব নয়। তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সৈন্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি রুস্তম ফাররুখজাদ-কে সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। রুস্তম ছিলেন সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্যতম দক্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব।
অন্যদিকে খলিফা উমর (রা.) মদিনা থেকে ইরাক অভিযানের জন্য নতুন বাহিনী সংগঠিত করেন। প্রথমে তিনি নিজে অভিযানে যাওয়ার কথা ভাবলেও সাহাবিদের পরামর্শে রাজধানীতে থেকে সামগ্রিক নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবি সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে ইরাকের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন।
সা’দ (রা.) ছিলেন নবী ﷺ-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন এবং ইসলামের প্রথমদিকের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। বদর, উহুদ, খন্দকসহ বহু যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব সুপরিচিত ছিল। উমর (রা.) তাঁকে নির্দেশ দেন—
- যুদ্ধের আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে।
- অকারণে রক্তপাত করা যাবে না।
- নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও উপাসনালয়ে অবস্থানকারী ধর্মীয় ব্যক্তিদের ক্ষতি করা যাবে না।
- বিজিত অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে ন্যায়বিচার করতে হবে।
এই নির্দেশনাগুলো মুসলিম অভিযানের নৈতিক ভিত্তি স্পষ্ট করে।
কাদিসিয়ার আগে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়া অঞ্চলে পৌঁছানোর পরও যুদ্ধ অবিলম্বে শুরু হয়নি। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, সা’দ (রা.) প্রথমে পারস্য সম্রাটের কাছে দূত পাঠান। দূতদের মধ্যে ছিলেন রিব’ই ইবন আমির (রা.), হুযাইফা ইবন মিহসান (রা.) এবং পরে মুগীরা ইবন শু’বা (রা.)।
রিব’ই ইবন আমির (রা.) যখন রুস্তমের দরবারে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর সরল পোশাক ও বিনয়ী আচরণ পারস্য অভিজাতদের বিস্মিত করে। রুস্তম মুসলিমদের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন—
“আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে আল্লাহর দাসত্বে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে ইসলামের প্রশস্ততার দিকে এবং অন্যায় ধর্মব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামের ন্যায়বিচারের দিকে আহ্বান করার জন্য।“
এই বক্তব্য ইসলামী ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত কূটনৈতিক ভাষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় ও রুস্তম যুদ্ধের পথই বেছে নেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি
১৫ হিজরি (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ)-এ কাদিসিয়ার সমতলে দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নেয়। ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। আল-তাবারী, ইবন কাসির ও অন্যান্য প্রাচীন সূত্রে বিভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। অধিকাংশ আধুনিক গবেষক মনে করেন, মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ হাজার, আর পারস্য বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৫০ থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে। তাই অতিরঞ্জিত লক্ষাধিক সৈন্যের বর্ণনাকে আধুনিক ইতিহাসবিদরা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন না।
রুস্তম তাঁর বাহিনীর সম্মুখভাগে যুদ্ধহাতি মোতায়েন করেন, কারণ তিনি জানতেন আরবদের ঘোড়া হাতির সামনে সহজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সা’দ (রা.) অসুস্থ থাকায় একটি দুর্গসদৃশ ভবনের উপর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। তাঁর নির্দেশ মাঠে পৌঁছে দিতেন খালিদ ইবন উরফুতা, হাশিম ইবন উতবা (রা.) এবং অন্যান্য কমান্ডাররা।
উভয় পক্ষের দীর্ঘ প্রস্তুতির পর অবশেষে শুরু হয় এমন এক যুদ্ধ, যা শুধু ইরাকের নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দেয়। টানা চার দিন ধরে চলা কাদিসিয়ার যুদ্ধ সাসানীয় সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করে এবং মুসলিম বিজয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
কাদিসিয়ার যুদ্ধ: সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা
১৫ হিজরি (নভেম্বর ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ)-এ কাদিসিয়ার প্রান্তরে শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম নির্ণায়ক যুদ্ধ। প্রায় চার মাস ধরে দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান করার পর অবশেষে সংঘর্ষ শুরু হয়। ঐতিহাসিক আল-তাবারি, আল-বালাযুরি ও ইবন কাসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধটি টানা চার দিন স্থায়ী হয় এবং প্রতিটি দিনের আলাদা নাম ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রথম দিন: ইয়াওমুল আরমাথ
প্রথম দিনের যুদ্ধ শুরু হয় পারস্য বাহিনীর বিশাল যুদ্ধহাতির আক্রমণের মাধ্যমে। হাতিগুলোর সামনে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে; অনেক ঘোড়া ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ফলে প্রথম দিনের লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনী কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) অসুস্থ থাকলেও একটি উঁচু ভবন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। তিনি প্রতিটি ইউনিটে নির্দেশ পাঠিয়ে সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় রাখেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চললেও কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
দ্বিতীয় দিন: ইয়াওমুল আগওয়াস
দ্বিতীয় দিন যুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। সিরিয়া ফ্রন্ট থেকে কা’কা ইবন আমর আত-তামিমি (রা.)-এর নেতৃত্বে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের একটি দল কাদিসিয়ায় এসে পৌঁছায়। উমর (রা.) ইচ্ছাকৃতভাবে পুরো বাহিনীকে ছোট ছোট দলে পাঠিয়েছিলেন, যাতে প্রতিটি নতুন দল পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি পায়।
কা’কা (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছেই একক দ্বন্দ্বযুদ্ধে পারস্যের কয়েকজন বিশিষ্ট যোদ্ধাকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি যুদ্ধহাতির বিরুদ্ধে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। তাঁর নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা হাতির চোখ ও শুঁড় লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায় এবং হাতির পিঠে থাকা চালকদের হত্যা করে। এতে হাতিগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেদের সৈন্যদের মধ্যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
এই দিনের শেষে যুদ্ধের ভারসাম্য ধীরে ধীরে মুসলিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তৃতীয় দিন: ইয়াওমুল আমাস
তৃতীয় দিন উভয় পক্ষ সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। দিনভর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। পারস্য বাহিনী বারবার মুসলিমদের প্রতিরক্ষা ভাঙার চেষ্টা করলেও তারা সফল হয়নি।
মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে হাশিম ইবন উতবা (রা.), আসিম ইবন আমর (রা.), জারির ইবন আবদুল্লাহ আল-বাজালি (রা.) এবং অন্যান্য কমান্ডাররা অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন।
চতুর্থ রাত: লাইলাতুল হারীর
তৃতীয় দিনের সূর্যাস্তের পর যুদ্ধ থেমে যায়নি। বরং পুরো রাত ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চলতে থাকে। ইতিহাসে এই রাতটি “লাইলাতুল হারীর” বা “গর্জনের রাত” নামে পরিচিত। অস্ত্রের সংঘর্ষ, তাকবির ধ্বনি এবং আহতদের আর্তনাদে যুদ্ধক্ষেত্র প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
রাতের শেষ ভাগে একটি প্রবল ধূলিঝড় পারস্য বাহিনীর দিকে প্রবাহিত হয়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুসলিম বাহিনীর একটি দল সরাসরি রুস্তমের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রুস্তম নিজের শিবিরের কাছে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে হিলাল ইবন উল্লাফা (রা.) তাঁকে হত্যা করেন। সেনাপতির মৃত্যুর খবর দ্রুত পারস্য বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে যায় এবং বিশৃঙ্খল পশ্চাদপসরণ শুরু হয়।
কাদিসিয়ার বিজয়ের তাৎপর্য
কাদিসিয়ার বিজয় ছিল মুসলিম ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মোড়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পারস্য সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় রাজধানী মাদায়িন ত্যাগ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পালিয়ে যান।
খলিফা উমর (রা.) বিজয়ের সংবাদ পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং সেনাপতিদের নির্দেশ দেন, বিজিত জনগণের প্রতি কোনো ধরনের অবিচার করা যাবে না।
মাদায়িন (কতেসিফোন) বিজয়
কাদিসিয়ার কয়েক মাস পর, ১৬ হিজরি (৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ)-এ মুসলিম বাহিনী পারস্যের রাজধানী মাদায়িন-এর দিকে অগ্রসর হয়। শহরটি টাইগ্রিস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ছিল এবং প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত বলে বিবেচিত হতো।
পারস্য বাহিনী নদীর সেতুগুলো ধ্বংস করে দেয়, যাতে মুসলিম সেনারা অগ্রসর হতে না পারে। কিন্তু সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সৈন্যদের আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ঘোড়াসহ টাইগ্রিস নদী অতিক্রম করার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী সফলভাবে নদী পার হয়ে অপর তীরে পৌঁছে যায়—যা সে সময়ের অন্যতম বিস্ময়কর সামরিক অভিযান হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করলে পারস্য সম্রাট ইতোমধ্যে রাজধানী ত্যাগ করেছিলেন। ফলে বড় ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই মাদায়িন মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
মাদায়িনে অবস্থিত বিখ্যাত ইওয়ান-ই কিসরা (Taq Kasra)—সাসানীয় সম্রাটদের প্রাসাদ—মুসলিমদের দখলে আসে। সেখানে বিপুল পরিমাণ রাজকীয় সম্পদ, অস্ত্র ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার পাওয়া যায়। এসব সম্পদ শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বণ্টন করা হয় এবং একটি অংশ মদিনার বায়তুল মালে পাঠানো হয়।
তবে উমর (রা.) সেনাপতিদের স্পষ্ট নির্দেশ দেন যে, সাধারণ জনগণের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করা যাবে না। বিজয়ের পরও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, করব্যবস্থা এবং নাগরিক নিরাপত্তা দ্রুত পুনর্বহাল করা হয়।
মাদায়িনের পতনের মাধ্যমে প্রায় চার শতাব্দী ধরে পশ্চিম এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারকারী সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্র মুসলিমদের হাতে চলে আসে। কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় উত্তর ইরাকে নতুন বাহিনী সংগঠিত করতে শুরু করেন। সেই বাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের পরবর্তী মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে জালুলার যুদ্ধে, যা ইরাক বিজয়কে কার্যত সম্পূর্ণতা দেয়।
জালুলার যুদ্ধ: ইরাকে সাসানীয় প্রতিরোধের শেষ বড় অধ্যায়
১৬ হিজরি (৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ)-এ মাদায়িন পতনের পর সাসানীয় সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় রাজধানী ত্যাগ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সরে যান। তবে তিনি পরাজয় মেনে নেননি। অবশিষ্ট সেনাবাহিনী, আঞ্চলিক অভিজাত এবং সামরিক নেতাদের নিয়ে তিনি ইরাকের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জালুলা (Jalula) নগরকে নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পরিণত করেন। ভৌগোলিকভাবে জালুলা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি মাদায়িন, হুলওয়ান এবং পারস্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সংযোগপথ নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে এই শহর ধরে রাখতে পারলে সাসানীয়রা নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেত।
খলিফা উমর (রা.) পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে হাশিম ইবন উতবা ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে জালুলা অভিযানের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কা’কা ইবন আমর আত-তামিমি (রা.), আসিম ইবন আমর (রা.), আমর ইবন মালিক (রা.)সহ কাদিসিয়ার অভিজ্ঞ বহু যোদ্ধা। অপরদিকে পারস্য বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ সেনাপতি মিহরান আল-রাজি (Mihran al-Razi)।
জালুলার চারপাশে পারস্য বাহিনী গভীর পরিখা (খন্দক) খনন করে এবং প্রবেশপথগুলো শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ দিয়ে সুরক্ষিত করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বাহিনীকে দীর্ঘ অবরোধে আটকে রেখে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, উভয় পক্ষ কয়েক মাস ধরে মুখোমুখি অবস্থান করে এবং একাধিক ছোট সংঘর্ষের পর চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।
হাশিম ইবন উতবা (রা.) সরাসরি দুর্গে আঘাত না করে প্রথমে শত্রুর প্রতিরক্ষা দুর্বল করার কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করেন, যাতে পারস্য বাহিনী তাদের সেনাশক্তি ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়। এরপর মুসলিম বাহিনী সমন্বিত আক্রমণ শুরু করলে তীব্র যুদ্ধ বেঁধে যায়। দীর্ঘ সংঘর্ষের এক পর্যায়ে মিহরান আল-রাজি নিহত হন। সেনাপতির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই পারস্য বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা উত্তর-পূর্ব দিকে পিছু হটতে শুরু করে। মুসলিম বাহিনী পরিখা অতিক্রম করে জালুলা নগর দখল করে।
ইতিহাসবিদ আল-বালাযুরি উল্লেখ করেন, জালুলার বিজয়ের ফলে ইরাকে সাসানীয়দের সুসংগঠিত সামরিক প্রতিরোধ কার্যত শেষ হয়ে যায়। সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় আরও পূর্বে হুলওয়ান অভিমুখে সরে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে সেখান থেকেও তিনি পারস্যের অভ্যন্তরে চলে যান।
তিকরিত ও উত্তর ইরাক বিজয়
জালুলার বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনীর সামনে উত্তর ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো উন্মুক্ত হয়ে যায়। খলিফা উমর (রা.) নতুন অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিলে মুসলিম সেনারা টাইগ্রিস নদীর তীর ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়।
১৬ হিজরি (৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ)-এর শেষদিকে তিকরিত (Tikrit) অবরোধ করা হয়। শহরটি ছিল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে আরব খ্রিস্টান গোত্র ও পারস্যপন্থী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল। কয়েক দিনের অবরোধের পর মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। স্থানীয় কয়েকটি আরব গোত্র মুসলিমদের সঙ্গে সমঝোতায় আসায় বিজয় তুলনামূলকভাবে দ্রুত অর্জিত হয়।
তিকরিত বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মসুল (Mosul) অঞ্চলে পৌঁছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয় এবং অঞ্চলটি ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে আসে। এভাবে সমগ্র উত্তর ইরাক ধীরে ধীরে মুসলিম প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ইরাকের প্রধান শহরগুলো মুসলিম শাসনের অধীনে আসার ফলে খলিফা উমর (রা.) সামরিক অভিযান থেকে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু ভূখণ্ড দখল নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মুসলিম ও অমুসলিম—উভয় সম্প্রদায় নিরাপদে বসবাস করতে পারে।
জালুলা, তিকরিত ও মসুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরাকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের শতাব্দীপ্রাচীন আধিপত্য কার্যত অবসান ঘটে। যদিও সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় পূর্বাঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে নতুন বাহিনী গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যান, তবু ইরাক আর কখনো সাসানীয়দের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যায়নি। বরং এই বিজয়ই পরবর্তী সময়ে হুলওয়ান, খুজিস্তান এবং শেষ পর্যন্ত নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ (২১ হিজরি/৬৪২ খ্রিস্টাব্দ)-এর মাধ্যমে সমগ্র সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের ভিত্তি রচনা করে।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও ইরাকে ইসলামী শাসনের ভিত্তি
ইরাক বিজয়ের পর খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিজিত অঞ্চলকে একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের অধীনে আনা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি যুদ্ধ জয় করা অপেক্ষাকৃত সহজ; কিন্তু সেই বিজয়কে দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়াই প্রকৃত সাফল্য। তাই তিনি এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেন, যা পরবর্তী ইসলামী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।
প্রথমত, তিনি বিজিত কৃষিজমি বিজয়ী সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন না করে রাষ্ট্রের অধীনেই রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যদি সমস্ত জমি সেনাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুসলিমরা এই সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে কৃষকরা আগের মতোই জমিতে চাষাবাদ চালিয়ে যান এবং নির্ধারিত খরাজ প্রদান করেন। এই নীতির মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকে এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।
দ্বিতীয়ত, ইরাকে মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য তিনি কুফা ও বসরা নামে দুটি নতুন গ্যারিসন নগর প্রতিষ্ঠা করেন। এই নগরগুলো কেবল সামরিক ছাউনিই ছিল না; পরবর্তীকালে এগুলো ইসলামী জ্ঞানচর্চা, ফিকহ, হাদিস, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.), আলী ইবন আবি তালিব (রা.) এবং বহু বিশিষ্ট তাবেয়ি কুফাকে জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেন।
উমর (রা.) দিওয়ান ব্যবস্থা চালু করে সৈন্যদের নিয়মিত ভাতা নির্ধারণ করেন এবং রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের একটি সুসংগঠিত রেজিস্টার প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি অমুসলিম অধিবাসীদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। যারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বসবাস করতেন, তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা ছিল ইসলামী প্রশাসনের মৌলিক নীতি।
ইরাক বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইরাক বিজয় ইসলামের সামরিক ইতিহাসে যেমন একটি যুগান্তকারী অধ্যায়, তেমনি বিশ্ব ইতিহাসেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কাদিসিয়া, মাদায়িন ও জালুলার ধারাবাহিক বিজয়ের ফলে চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি সাসানীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় পূর্বাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হন এবং পরবর্তী সময়ে ২১ হিজরি/৬৪২ খ্রিস্টাব্দে নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ সাসানীয় শক্তির চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত করে।
ইরাক মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এটি পূর্বাঞ্চলে ইসলামের বিস্তারের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখান থেকেই পরবর্তীকালে পারস্য, খুরাসান, সিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে মুসলিম অভিযান পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে কুফা ও বসরা ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ এবং কিরাআতের বহু প্রসিদ্ধ ধারার সূচনা এই অঞ্চলেই ঘটে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিজয় কেবল ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ঘটনা ছিল না; বরং ন্যায়ভিত্তিক শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার এক বাস্তব উদাহরণ ছিল। খলিফা উমর (রা.) তাঁর গভর্নরদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে জনগণের ওপর জুলুম করার জন্য নয়, বরং তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্যই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
খলিফা উমর (রা.)-এর যুগে ইরাক বিজয় ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যেখানে ঈমান, দূরদর্শী নেতৃত্ব, সামরিক দক্ষতা এবং সুশাসনের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। বুয়াইবের প্রতিরোধ, কাদিসিয়ার নির্ণায়ক বিজয়, মাদায়িনের পতন এবং জালুলার সাফল্য—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে মুসলিম বাহিনীর শক্তির মূল উৎস ছিল সুসংগঠিত নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা।
তবে এই বিজয়ের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজয়ের পর যে ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ধর্মীয় সহনশীলতার দৃষ্টান্ত খলিফা উমর (রা.) স্থাপন করেছিলেন, সেটিই ইসলামী শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। ইতিহাস তাই তাঁকে শুধু একজন বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই নয়, বরং একজন আদর্শ প্রশাসক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবেও স্মরণ করে। ইরাক বিজয়ের এই অধ্যায় আজও আমাদের শিক্ষা দেয় যে টেকসই বিজয় অস্ত্রের শক্তিতে নয়, বরং ন্যায়, প্রজ্ঞা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়।