প্রকৃত মুসলিমের সংজ্ঞা: পরপীড়নমুক্ত সমাজ গঠনে জিহ্বা ও হাতের নিয়ন্ত্রণের ইসলামি রূপরেখা
মহাবিশ্বের পরম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মানবজাতিকে পৃথিবীতে এক শান্তিময় ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য প্রেরণ করেছেন। ইসলামের আভিধানিক অর্থই হলো 'শান্তি' (السلم) এবং 'আত্মসমর্পণ'। ইসলাম কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; বরং এটি মানুষের পারস্পরিক আচরণ, নৈতিকতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার এক নিখুঁত ও কালজয়ী সনদ। একজন মানুষ কেবল নামায, রোযা, হজ ও যাকাত আদায়ের মাধ্যমেই আল্লাহর দরবারে পূর্ণাঙ্গ মুমিন বা মুসলিম হিসেবে গণ্য হতে পারে না, যতক্ষণ না তার দৈনন্দিন আচরণে চারপাশের মানুষ নিরাপদ ও শান্তিতে থাকে। বর্তমান পৃথিবীতে যখন বস্তুবাদের চরম আস্ফালন, ব্যক্তিস্বার্থের হিংস্র প্রতিযোগিতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের করাল গ্রাস মানব সমাজকে জর্জরিত করছে, তখন ইসলামের সামাজিক সুরক্ষানীতি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
মুমিনের প্রতিটি ইবাদত তার চরিত্রকে সুন্দর করার এক একটি শক্তিশালী মাধ্যম। নামায মানুষকে অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে, রোযা শেখায় আত্মসংযম এবং যাকাত দূর করে অর্থনৈতিক বৈষম্য। কিন্তু এই সমস্ত ইবাদত তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন তা মানুষের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাব-এর ৫৮ নম্বর আয়াত্তে অন্যকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহ অপরাধের কথা ঘোষণা করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
“এবং যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা মূলত নিজেদের মাথায় এক বিরাট অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।”
এই ঐশী নির্দেশনার মূল প্রতিপাদ্য হলো, কোনো নিরপরাধ মানুষকে শারীরিক বা মানসিকভাবে পীড়ন করা আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত জঘন্য ও অমার্জনীয় অপরাধ। মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে ইসলাম এত বেশি সুরক্ষাকবচ দিয়েছে যে, অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে প্রকৃত ঈমানের প্রধানতম শর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কালজয়ী সামাজিক মূলনীতি—জিহ্বা ও হাতের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ—এর আধ্যাত্মিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে গভীর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা।
হাদীসের শব্দতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: শ্রেষ্ঠত্বের মানবিক মাপকাঠি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সুদীর্ঘ নবুয়তী জীবনে উম্মাহর সামনে একজন খাঁটি মুসলমানের যে চরিত্রচিত্রণ করেছেন, তা অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী। সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মতো সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস গ্রন্থে সংকলিত একটি বিখ্যাত হাদীসে উম্মাহর সামনে প্রকৃত মুসলিমের এক চিরন্তন ও বুনিয়াদী সংজ্ঞা প্রদান করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ
“প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা এবং হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে; আর প্রকৃত হিজরতকারী (মুহাজির) সে, যে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করে।”
এই হাদীসটির শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আরবী ‘আল-মুসলিম’ (الْمُسْلِمُ) শব্দটির সাথে ‘সালিমা’ (سَلِمَ) ক্রিয়াপদের গভীর ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ নিরাপদ থাকা বা অক্ষত থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে কেবল নামধারী বা বংশীয় মুসলমানের কথা বলেননি, বরং মুসলিম হওয়ার দাবিকে মানুষের পারস্পরিক আচরণের কষ্টিপাথরে যাচাই করেছেন। এখানে ‘আল-মুসলিমন’ (الْمُسْلِمُونَ) বা 'অন্যান্য মুসলমান' শব্দটি ব্যবহার করা হলেও, ইসলামের সামগ্রিক শরীয়া অনুযায়ী এর পরিধি সমগ্র মানবজাতি এবং জীবকুলের উপর বিস্তৃত। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ফাতহুল বারী'-তে লিখেছেন যে, এখানে জিহ্বা এবং হাতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, মানুষ অন্য মানুষের ক্ষতি করার জন্য এই দুটি অঙ্গই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে। জিহ্বার মাধ্যমে ঘটে মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন, আর হাতের মাধ্যমে ঘটে শারীরিক ও বৈষয়িক আক্রমণ।
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি কোনো বংশমর্যাদা, রাজকীয় ক্ষমতা বা বিপুল ধন-সম্পদ নয়; বরং শ্রেষ্ঠত্ব লুকিয়ে আছে মানুষের মানবিক গুণাবলী ও পরোপকারের মাঝে। তাবারানী শরীফে বর্ণিত আরেকটি সহীহ হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “কোন মুসলমানের ইসলাম সবচেয়ে উত্তম?” তখন প্রিয় নবীজি (সা.) উত্তরে একই কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন যে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে। এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শান্তি রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদী স্তম্ভ।
জিহ্বার অপব্যবহার ও সমাজবিধ্বংসী চরিত্র: কুরআনের সতর্কবার্তা
মানুষের শরীরের অন্যতম ক্ষুদ্র কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবশালী অঙ্গ হলো তার জিহ্বা বা মুখ। এই জিহ্বার মাধ্যমে যেমন একজন মানুষ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' উচ্চারণ করে জান্নাতের অধিকারী হতে পারে, তেমনি এই জিহ্বার একটি মাত্র কুৎসিত বা নোংরা বাক্যের মাধ্যমে সে নিজের আমলনামা ধ্বংস করে জাহান্নামের অতল গহ্বরে পতিত হতে পারে। জিহ্বা হলো মানুষের অন্তরের আয়না। অন্তরের ভালো-মন্দ চিন্তাভাবনাগুলো জিহ্বার মাধ্যমেই সমাজে প্রকাশ পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মানুষের প্রতিটি উচ্চারিত শব্দের সংরক্ষণ ও তার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সূরা ক্বাফ-এর ১৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“মানুষ এমন কোনো কথাই উচ্চারণ করে না, যার জন্য একজন সদা প্রস্তুত সতর্ক প্রহরী (লিপিবদ্ধ করার জন্য) নিযুক্ত নেই।”
আমাদের অসচেতন সামাজিক জীবনে আমরা মুখের কথার মাধ্যমে অন্যকে কত সহজে আঘাত করি, তা চিন্তা করলেও গা শিউরে ওঠে। গীবত (পরচর্চা), তোহমত (অপবাদ), ঠাট্টা-বিদ্রূপ, গালিগালাজ এবং মিথ্যাচারের মতো সমাজবিধ্বংসী অপরাধগুলো মূলত এই জিহ্বার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা অন্য মানুষকে উপহাস করা এবং তাদের মর্যাদাহানি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। সূরা আল-হুজুরাত-এর ১১ নম্বর আয়াতে সামাজিক শৃঙ্খলার এই সুবর্ণ নীতি ঘোষণা করে ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
“হে ঈমানদারগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে, হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম; এবং নারীরাও যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে, হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।”
জিহ্বা দিয়ে ছড়ানো বিষের ক্ষত তলোয়ারের ক্ষতের চেয়েও গভীর হয়। তলোয়ারের ক্ষত এক সময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের কটূক্তি ও নির্মম বাক্যের আঘাত মানুষের হৃদয়ে আমৃত্যু রক্তক্ষরণ ঘটায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের এই মৌখিক অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সাহাবী হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.)-কে নসিহত করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, মানুষকে সবচেয়ে বেশি উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে তাদের জিহ্বার ফসল বা কথাবার্তা। অতএব, নিজের মুখের ওপর লাগাম পরানো এবং বাকসংযম করা একজন আদর্শ মুসলিমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
হাতের জুলুম ও শক্তির অপব্যবহার: ইসলামি দণ্ডবিধি ও সামাজিক প্রতিরোধ
জিহ্বার পরেই মানুষের দ্বিতীয় ধ্বংসাত্মক হাতিয়ার হলো তার হাত। হাতের শক্তির অন্যায্য ব্যবহার সমাজকে পঙ্গু করে দেয় এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। শক্তিমান যখন দুর্বলকে প্রহার করে, যখন ধনী দরিদ্রের সম্পদ আত্মসাৎ করে, যখন অত্যাচারী শাসক সাধারণ প্রজাদের অধিকার হরণ করে, কিংবা যখন কেউ অন্যের ওপর জুলুমের উদ্দেশ্যে অস্ত্র তুলে নেয়—তখন তা মূলত হাতের অপব্যবহারের চূড়ান্ত রূপ। ইসলাম শক্তির এই জঘন্য অপব্যবহারকে কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। সমাজ থেকে গায়ের জোরে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার প্রবণতা দূর করতে ইসলাম 'কিসাস' বা সমতার বিধান জারি করেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারা-এর ১৭৯ নম্বর আয়াতে জীবনের নিরাপত্তার এই আইনি প্রাচীর বর্ণনা করে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“এবং হে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়! কিসাস বা প্রতিশোধের এই বিধানের মাঝেই তোমাদের জন্য জীবন (ও নিরাপত্তা) নিহিত রয়েছে, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু ও সতর্ক হতে পারো।”
হাতের জুলুমের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি কেবল শারীরিক মারধর বা হত্যার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা, চুরি, ডাকাতি, ঘুষ আদান-প্রদান, এবং কলমের খোঁচায় লক্ষ মানুষের হক নষ্ট করাও এই হাতের জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। হাদীস শরীফে অন্যায়ভাবে অন্যের সামান্য জমি দখল করার শাস্তি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কারো এক বিঘত জমিও অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।
আল্লাহ তা'আলা মানুষের এই পেশীশক্তি ও সামাজিক প্রতিপত্তির অপব্যবহার রোধ করতে ঈমানদারদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা হাতের শক্তিকে কেবল সৎ কাজে এবং মানুষের সুরক্ষায় ব্যয় করে। হাতের মাধ্যমে অন্যের চোখের পানি মুছে দেওয়া, ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানোই হলো হাতের প্রকৃত তাওহীদী ব্যবহার। যখন সমাজে শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয় এবং প্রতিটি সবল হাত দুর্বলকে রক্ষা করার জন্য প্রসারিত হয়, তখনই একটি শান্তিময় আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
গীবত, তোহমত ও অপবাদের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি
ইসলামি সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খায় যে নীরব ব্যাধি, তা হলো গীবত বা পরনিন্দা। আমাদের প্রাত্যহিক আড্ডা ও চায়ের টেবিলগুলো আজ অন্যের চরিত্রহনন ও কুৎসা রটানোর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলামে গীবত করাকে নিজের মৃত ভাইয়ের পচা মাংস খাওয়ার মতো বীভৎস ও ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হুজুরাত-এর ১২ নম্বর আয়াতে মানুষের মনস্তত্বে নাড়া দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
“এবং তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? অবশ্যই তোমরা তা অপছন্দ করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।”
গীবতের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসার দেয়াল ভেঙে দেয়। যে সমাজে গীবতের আধিক্য থাকে, সেখানে কখনো ঐক্য বা সামাজিক সংহতি গড়ে উঠতে পারে না। গীবতের চেয়েও মারাত্মক অপরাধ হলো 'তোহমত' বা মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা। যখন কোনো নির্দোষ মানুষের চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করা হয়, তখন তার সামাজিক জীবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে পবিত্র ও সচ্চরিত্রা নারীদের ওপর অপবাদ দেওয়ার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। সূরা আন-নূর-এর ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এই অপরাধের তাৎক্ষণিক শাস্তি ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
“এবং যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তোমরা তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং কখনোই তাদের সাক্ষ্য কবুল করো না; আর তারাই হলো পাপাচারী।”
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গীবত ও তোহমত মানুষের আমলনামাকে শূন্য করে দেয়। কিয়ামতের দিন যখন পাওনাদাররা এসে জড়ো হবে, তখন মানুষের নামায, রোযা ও যাকাতের সওয়াবগুলো ঐ সমস্ত মানুষদের দিয়ে দেওয়া হবে যাদের সে দুনিয়াতে গালি দিয়েছিল, অপবাদ দিয়েছিল বা গীবত করেছিল। এক পর্যায়ে যখন তার সমস্ত সওয়াব শেষ হয়ে যাবে, তখন ঐ মজলুম মানুষদের পাপের বোঝা তার মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এই দেউলিয়া অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের জিহ্বাকে অন্যের কুৎসা রটানো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখতে হবে।
ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল যুগে জিহ্বা ও হাতের আধুনিক রূপ
আমরা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীসটি পাঠ করি যে—”যার জিহ্বা এবং হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে”—তখন একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ দশকে এর প্রায়োগিক রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। আজ মানুষ কেবল মুখের কথা দিয়ে বা সরাসরি হাত দিয়ে অন্যের ক্ষতি করে না; বরং তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালায় সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক, টুইটার (এক্স), ইউটিউব এবং বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। আধুনিক ডিজিটাল যুগে মানুষের 'জিহ্বা' রূপান্তরিত হয়েছে তার 'কীবোর্ড' বা 'টাইপিং স্ক্রিনে' এবং তার 'হাত' রূপান্তরিত হয়েছে তার 'মাউস' বা 'শেয়ার ও কমেন্ট বাটনে'।
সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি মিথ্যা তথ্য শেয়ার করা, কারো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা, কমেন্ট বক্সে অশালীন গালিগালাজ করা, সাইবার বুলিং (Cyberbullying) এবং ট্রোলিং (Trolling)-এর মাধ্যমে কোনো মানুষকে মানসিক আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া—আজকের যুগের হাতের জুলুমের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। মানুষ মনে করে সে পর্দার ওপাশে বসে বেনামে আইডি খুলে যা ইচ্ছা লিখছে, কেউ তাকে দেখছে না; কিন্তু মহান আল্লাহ তা'আলার দরবারে তার প্রতিটি ক্লিকের হিসাব অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মানুষের এই আধুনিক অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে সূরা আন-নূর-এর ১৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ও মন্দ খবরের প্রচার কামনা করে (বা ছড়িয়ে দেয়), তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না।”
ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা প্রতিদিন না বুঝেই হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে অপবাদ ও গীবতের পাপ কামাই করছি। কোনো সংবাদ যাচাই না করেই একটি 'শেয়ার' ক্লিক করার মাধ্যমে আমরা মস্ত বড় মিথ্যা ছড়ানোর অপরাধী হয়ে যাচ্ছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই (যাচাই ছাড়া) মানুষের মাঝে ছড়াতে শুরু করে। অতএব, ডিজিটাল যুগে একজন খাঁটি মুসলিমের পরিচয় হলো সে তার কীবোর্ড ব্যবহারে অত্যন্ত সংযত হবে, কারো সম্মানহানি করবে না, এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ফিতনা ছড়ানোর হাতিয়ার না বানিয়ে কেবল দ্বীনের দাওয়াত ও সমাজসেবার জন্য ব্যবহার করবে।
পারস্পরিক অধিকার (হক্বুল ইবাদ) ও জান্নাত লাভের শর্তাবলী
ইসলামে ইবাদতকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—একটি হলো আল্লাহর অধিকার (হক্বুল্লাহ) এবং অন্যটি হলো সৃষ্টির অধিকার (হক্বুল ইবাদ)। আল্লাহর অধিকার যেমন নামায, রোযা বা হজের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি হলে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অসীম দয়ায় এবং আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে সরাসরি ক্ষমা করে দিতে পারেন; কিন্তু সৃষ্টির অধিকার বা মানুষের প্রতি কৃত অন্যায় আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না স্বয়ং সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটি বুক চিরে ক্ষমা করে দেয়। এটি ইসলামের এক পরম ও কঠোর ইনসাফের মূলনীতি।
আমরা অনেক সময় ভাবি যে বিপুল ইবাদত করলেই জান্নাত নিশ্চিত, কিন্তু মানুষের মনে আঘাত দিয়ে বা তাদের ওপর জুলুম করে জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একটি অত্যন্ত কাঁপানো হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমরা কি জানো নিঃস্ব বা দেউলিয়া কে?” সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, যার টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই। তখন নবীজি (সা.) তাঁর চিরন্তন আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন:
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا...
“নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত নিঃস্ব সে, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে এই অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেছিল, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, কারো রক্তপাত করেছিল এবং কাউকে প্রহার করেছিল...”
এই হাদীসটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মানুষের অধিকার বা 'হক্বুল ইবাদ' হরণ করা কতটা মারাত্মক। আমাদের সমাজে অনেকে আছেন যারা নামায-কালামে অত্যন্ত পাকা কিন্তু জিহ্বা দিয়ে প্রতিবেশীকে উত্যক্ত করেন, হাতের ক্ষমতাবলে অধীনস্থ কর্মচারীদের বেতন আটকে রাখেন বা তাদের ওপর অমানুষিক খাটুনি চাপিয়ে দেন। তাদের এই সমস্ত নামায ও তাসবীহ কিয়ামতের দিন কোনো কাজে আসবে না। ইসলাম আমাদের এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের শিক্ষা দেয়, যেখানে আল্লাহর মহব্বতের পাশাপাশি বান্দার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্ব পায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবীগণের জীবনাদর্শ: ক্ষমার অনন্য পরাকাষ্ঠা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল মুখের বাণীতেই মানুষকে জিহ্বা ও হাত নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেননি, বরং তাঁর সুদীর্ঘ তেষট্টি বছরের গোটা জীবনটাই ছিল ক্ষমার এক মহিমান্বিত ও অনুপম মহাকাব্য। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে আজীবন চরম শত্রুতা, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন, কিন্তু একবারের জন্যও প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে নিজের হাত উঁচিয়ে ধরেননি বা জিহ্বা দিয়ে কোনো অভিশাপ উচ্চারণ করেননি।
মক্কার কাফেররা যখন ওহুদ যুদ্ধে তাঁর পবিত্র দন্ত মুবারক শহীদ করেছিল, তাঁর রক্তাক্ত মুখমণ্ডল দেখে সাহাবীগণ যখন ব্যাকুল হয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে ধ্বংসের প্রার্থনা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তখন দয়ার সাগর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই চরম মুহূর্তেও হাত তুলে অভিশাপ না দিয়ে বলেছিলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
“হে আল্লাহ! আপনি আমার কওমকে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা সত্য সম্পর্কে অবগত নয়।”
ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন যখন মক্কার আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশ নেতারা—যারা দীর্ঘ বিশ বছর ধরে মুসলিমদের হত্যা করেছে, মক্কা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, এবং প্রিয় নবীজির চাদর ধরে নির্মমভাবে টেনেছে—ভয়ে কাঁপছিল যে আজ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মানবতার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে ইউসুফ (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক বাক্য উচ্চারণ করে বলেছিলেন:
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, আর তিনি পরম দয়ালুদের চেয়েও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
সাহাবীগণের জীবনও ছিল এই সুন্নাহর রঙে রাঙানো। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কন্যা আয়েশা (রা.)-এর সতীত্ব নিয়ে তোহমতের মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো মিস্তাহ নামক এক দরিদ্র সাহাবীকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করার সংকল্প করেছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে মুমিনদের ক্ষমার নির্দেশ দিলেন। সেই ঐশী বাণী শুনে হযরত আবু বকর (রা.) তৎক্ষণাৎ কেঁদে ফেললেন এবং পুনরায় তাঁর সাহায্য দ্বিগুণ করে দিলেন। সাহাবীগণের এই মহান চরিত্র আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে বিজয় লাভ করতে হলে নিজের রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহাকে দমন করে জিহ্বা ও হাতকে কেবল পরম ক্ষমার কল্যাণে নিয়োজিত করতে হয়।
৯. একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে জিহ্বা ও হাত নিয়ন্ত্রণের কর্মপরিকল্পনা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই মহান হাদীসটিকে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা আজ সময়ের দাবি। আমাদের সমাজ থেকে পরপীড়ন, হিংসা ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:
কথা বলার পূর্বে চিন্তা করা (The Think Rule): যেকোনো কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার পূর্বে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কীবোর্ডে টাইপ করার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করতে হবে—এটি কি সত্য? এটি কি কল্যাণকর? এবং এটি কি কারো অপ্রয়োজনীয় দুঃখের কারণ হবে? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তবে নীরবতা অবলম্বন করাই হলো খাঁটি সুন্নাত।
- ক্রোধের মুহূর্তে নীরবতা ও স্থান পরিবর্তন: রাগ হলো শয়তানের পক্ষ থেকে এক ধরণের জ্বলন্ত কয়লা। ক্ষোভের মুহূর্তে মানুষ সবচেয়ে বেশি জিহ্বা ও হাতের অপব্যবহার করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, রাগের মাথায় কেউ যদি দাঁড়িয়ে থাকে তবে সে যেন বসে পড়ে, আর বসে থাকলে যেন শুয়ে পড়ে এবং তপ্ত রাগ প্রশমিত করতে ওজু করে নেয়।
- প্রতিবেশীর অধিকার ও সুরক্ষার অঙ্গীকার: প্রতিবেশীর সাথে প্রাত্যহিক আচরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাদের যাতায়াতের পথে আবর্জনা না ফেলা, উচ্চশব্দে গান বা হট্টগোল করে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটানো এবং তাদের পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করা আমাদের সামাজিক ঈমানি দায়িত্ব।
- অধীনস্থদের প্রতি সদয় আচরণ: গৃহকর্মী, কারখানার শ্রমিক বা অফিসের জুনিয়র কর্মচারীদের সাথে কখনো দুর্ব্যবহার বা গালিগালাজ না করা। তাদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে না দেওয়া।
- ডিজিটাল নৈতিকতা চর্চা: সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো তথ্য শেয়ার করার পূর্বে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করা। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্ক্যান্ডাল বা দুর্বলতা খুঁজে বেড়ানো বন্ধ করা এবং অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুড়ির পোস্ট থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা।
আত্মশুদ্ধি ও খাঁটি মুসলিম হওয়ার আকুল আহ্বান
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠার চেয়ে সুন্দর ও মহৎ গুণ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। “প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা এবং হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে”—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই কালজয়ী বাণীটি কেবল একটি তাত্ত্বিক নীতি নয়, বরং এটি একটি সুসভ্য, নিরাপদ ও আলোকিত মানবিক সমাজ বিনির্মাণের রাজকীয় রাজপথ। আমরা যখন আমাদের জিহ্বা ও হাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিখব, তখনই আমাদের সমাজ থেকে হিংসা, অপরাধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।
আসুন, আমরা আজ এই উরস ও মহররমের বরকতময় আবহে দাঁড়িয়ে আমাদের মনের সমস্ত অহংকার, লালসা ও প্রতিশোধস্পৃহাকে কোরবানি দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি। আমাদের যুবসমাজকে কেবল বৈষয়িক সচ্ছলতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না করে, তাদের একজন সংবেদনশীল, ক্ষমাশীল ও পরোপকারী প্রকৃত মুমিন হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সকলকে আমাদের জিহ্বা ও হাতকে গুনাহ এবং মানুষের অধিকার হরণ করা থেকে রক্ষা করার তাওফিক দান করুন, আমাদের পরিবার ও সমাজকে অনাবিল শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক জান্নাতি টুকরোয় পরিণত করুন এবং কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আমাদের পরম রবের দরবারে 'খাঁটি ও সফল' মুসলিম হিসেবে কবুল হওয়ার পরম গৌরব দান করুন। (আমীন)