মৃত্যুকে ছয় বার ফাঁকি, তানজানিয়ার রহস্যমানব ইসমাইল আজিজির অবিশ্বাস্য জীবন কাহিনি:

মানুষের জীবনের সবচেয়ে অবধারিত সত্য হলো মৃত্যু। কারণ আমরা সবাই অবগত যে- পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু যদি এমন কোনও মানুষ থাকেন যিনি একবার নয়, দু’বার নয়, মোট ছয় বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন বলে দাবি করা হয়? এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি বিজ্ঞানীদের কাছেও তা কৌতূহলের বিষয়। যাকে বাস্তব ধারণায় বিশ্বাস করা খুব কঠিন মনে হয়। তানজানিয়ার যুবক ইসমাইল আজিজির জীবনকে ঘিরে এমনই এক রহস্যের জন্ম হয়েছে, যা আজও বহু মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কেউ তাকে মানুষের তালিকায় না রেখে, জীন বা ফারিস্তাদের সাথে তুলনা করে। তাকে দেখে মানুষ আত্মহারা হয় আবার ভয়ে তার কাছে থেকে দূরে চলে যাই। এমনকী তিনার পরিবার সহ এইসব দুর্ঘটনা দেখে, তাকে একা ছেড়ে দেন। 

ইসমাইল আজিজি বর্তমানে তানজানিয়ার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একাই, একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে বসবাস করেন। তাঁর জীবনকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন, রহস্য, ভয় এবং কুসংস্কার। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, তিনি সাধারণ মানুষ নন। কেউ তাঁকে অভিশপ্ত মনে করেন, কেউ আবার মনে করেন তিনি কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী। অথচ ইসমাইল নিজে দাবি করেন, তিনি একজন সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছুই নন।

প্রথম মৃত্যুর অভিজ্ঞতা:

ইসমাইলের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়ের সূচনা হয় একটি কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা দিয়ে। সেই ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এরপর তাঁর দেহ মর্গে পাঠানো হয়।

কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি। যখন তাঁর শেষকৃত্যের প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই তিনি হঠাৎ জেগে ওঠেন। মর্গের ভেতরের তীব্র ঠান্ডা অনুভব করে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি নিজের পায়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যাঁদের কাছে তিনি মৃত ছিলেন, তাঁদের সামনে জীবন্ত অবস্থায় ফিরে আসা যেন কোনও অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম ছিল না। এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর জীবন আর স্বাভাবিক থাকেনি। সকলেই তাকে অন্য দৃষ্টিতে নজরদারি করা শুরু করেন।

দ্বিতীয়বার মৃত্যুর ঘোষণা:

প্রথম ঘটনার কিছুদিন পর ইসমাইল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। কারণ আফ্রিকার বহু অঞ্চলে ম্যালেরিয়া এখনও একটি প্রাণঘাতী রোগ হয়ে জানা যাই। অসুস্থতার এক পর্যায়ে চিকিৎসকেরা আবারও তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের লোকেরা প্রথম বারের মতো আবার তাঁর দাফনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিন্তু আগের ঘটনার ন্যায় পুনরায় একি ঘটনা ঘটে। কবর দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি আবার চোখ খুলে ফেলেন। আর বাড়ি পথে রওনা দেন।

এবার এই বিষয়টি শুধু বিস্ময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় মানুষজনের মনে ভয় ঢুকতে শুরু করে। অনেকেই ভাবতে থাকেন, কোনও সাধারণ মানুষ কি এভাবে বারবার মৃত্যুর পর ফিরে আসতে পারে? তবে মহান শ্রষ্ঠা যাকে রাখে তাঁকে কেও পৃথিবীর বুক থেকে হঠাতে পারে না।

একের পর এক রহস্যময় প্রত্যাবর্তন:

এরপর আরও কয়েকটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তাঁর জীবনে। একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। চিকিৎসকেরা আবারও তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু আগের মতোই শেষকৃত্যের আগে তিনি নড়াচড়া শুরু করেন।

এরপর একবার বিষাক্ত সাপের কামড়েও তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। আবারও একই ঘটনা। মৃত্যুর ঘোষণা, শোকাহত পরিবার, শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেয় তারপর হঠাৎ জীবনের প্রত্যাবর্তন।

একবার তিনি সেপটিক ট্যাঙ্কে পড়ে যান। দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। তখনও তাঁকে মৃত বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আবারও জীবিত হয়ে ওঠেন।

এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলি মানুষের কল্পনাশক্তিকে নড়িয়ে দেয়। স্থানীয়দের কাছে ইসমাইল ধীরে ধীরে একজন রহস্যমানবে পরিণত হন।

ষষ্ঠ ঘটনা: আগুনের মধ্য থেকেও প্রত্যাবর্তন:

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে ষষ্ঠবার। তখন গ্রামের বহু মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে ইসমাইল কোনও অপশক্তির সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি কালোজাদুর মাধ্যমে মৃত্যুকে পরাজিত করেন।

এই ভয় এবং কুসংস্কার একসময় মানুষের হৃদয়ে ঘৃণায় পরিণত হয়।এই কারণে কিছু প্রতিবেশী তাঁর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন।এবং তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়।

ঘটনার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর দেহ তিন দিন ধরে মর্গে রাখা ছিল। গ্রামবাসীরা নিশ্চিত ছিলেন যে এবার আর তিনি ফিরবেন না।

কিন্তু তিন দিন পর যখন ইসমাইল জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন, তখন আতঙ্ক চরমে পৌঁছে যায়। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তিনি আর মানুষ নন। এই অবস্থা থেকে বুঝা যাই যে, মানুষ তার নির্ধারিত সময় ও আহার ছাড়া কখনো বাস্তব দুনিয়া ছেড়ে যাই না। কারণ মৃত্যু একটি নির্ধারিত সময় আসে। কখন আগেও হবে না আর কিছু সময় পরেও হবে না। এই উক্তি থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাই যে- তিনার এখনো হয়তো রুজি রুটি বাকি আছে বা তিনার এখনো সময় ঘনিয়ে আসেনি।

সমাজচ্যুত জীবন:

একজন মানুষের জীবনে পরিবার ও সমাজের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইসমাইলের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটেছে। ক্রমাগত এসব ঘটনার পর তাঁর পরিবারও তাঁকে ত্যাগ করে। গ্রামের মানুষ তাঁকে একঘরে করে দেয়। তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে চায় না। কেউ তাঁর বাড়িতে যায় না। এমনকি অনেকেই তাঁর ছায়া পর্যন্ত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের এক জীর্ণ ঘরে একা থাকেন। সামান্য চাষাবাদ করেন, নিজের রান্না নিজেই করেন এবং নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। তবে তিনি বলেন- আমি কখনও কারও ক্ষতি করিনি। কিন্তু মানুষ আমাকে এমনভাবে দেখে যেন আমি কোনও দানব। এই বক্তব্যের মধ্যে ফুটে ওঠে একজন নিঃসঙ্গ মানুষের অসহায়তা এবং বেদনা।

বিজ্ঞান কী বলে?

ইসমাইলের ঘটনাগুলো শুনলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে- একজন মানুষ কি সত্যিই ছয়বার মারা গিয়ে ফিরে আসতে পারেন?

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কিছু অবস্থা রয়েছে যেখানে একজন মানুষকে ভুলবশত মৃত বলে মনে হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ- ক্যাটালেপসি (Catalepsy) এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষের শরীর প্রায় সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন এতটাই ধীর হয়ে যেতে পারে যে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়। তাছাড়া গভীর কোমা- কিছু ক্ষেত্রে রোগী এমন অবস্থায় চলে যেতে পারেন যেখানে তিনি মৃত বলে মনে হন।

লাজারাস সিনড্রোম (Lazarus Syndrome) অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা, যেখানে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছু সময় পরে তা আবার নিজে থেকেই ফিরে আসে।

তবে ইসমাইলের ক্ষেত্রে এসব ব্যাখ্যা পুরোপুরি প্রযোজ্য কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত পূর্ণ নথি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশিত হয়নি।

মৃত্যুর পরের অভিজ্ঞতা: বাস্তব না মানসিক অনুভূতি?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই দাবি করেন যে তাঁরা একটি উজ্জ্বল আলো দেখেছেন। কেউ বলেন, তাঁরা নিজেদের শরীরকে বাইরে থেকে দেখতে পেয়েছেন। কেউ আবার মৃত আত্মীয়দের দেখার কথাও বলেছেন।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি, রাসায়নিক পরিবর্তন এবং চরম মানসিক চাপের ফলে এমন অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে।

ইসমাইলও জানিয়েছেন যে প্রতিবার ফিরে আসার পর তাঁর শরীরে অদ্ভুত অনুভূতি হতো। যদিও তিনি বিস্তারিতভাবে কোনও অতিপ্রাকৃত জগতের কথা বলেননি।

 কুসংস্কার বনাম মানবতা:

ইসমাইলের গল্পের সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো মানুষের প্রতিক্রিয়া।

একজন মানুষ বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন- এটিকে বিস্ময়ের বিষয় হিসেবে দেখা যেত। কিন্তু অনেকেই তাঁকে ভয় পেয়েছেন। তাঁকে অভিশপ্ত, অমর কিংবা অপশক্তির বাহক বলে মনে করেছেন।

ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। অজানা ও ব্যাখ্যাতীত বিষয়কে মানুষ প্রায়ই ভয় পায়। সেই ভয় থেকে জন্ম নেয় কুসংস্কার, আর কুসংস্কার থেকে জন্ম নেয় বৈষম্য ও নিষ্ঠুরতা।

ইসমাইলের জীবন আমাদের সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

রহস্যের আড়ালে নিঃসঙ্গ:

আজও ইসমাইল আজিজির জীবন রহস্যে ঘেরা। তিনি কি সত্যিই ছয়বার মৃত্যুকে পরাজিত করেছেন? নাকি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও বিরল ঘটনার শিকার হয়েছেন? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও অজানা।

কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-তিনি একজন মানুষ, যিনি জীবনের চেয়েও বড় এক সামাজিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। মৃত্যু নয়, বরং মানুষের ভয়, সন্দেহ এবং কুসংস্কারই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে।

ইসমাইলের কাহিনি আমাদের শুধু বিস্মিতই করে না, বরং ভাবতেও শেখায়। অজানা কোনও ঘটনার মুখোমুখি হলে আমরা কি যুক্তির আশ্রয় নেব, নাকি ভয় এবং কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ করব?

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরই ইসমাইল আজিজির গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শেষ কোথা:

তানজানিয়ার ইসমাইল আজিজির জীবনকাহিনি আধুনিক বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় মানবগল্প। তিনি সত্যিই ছয়বার মৃত্যুর পর ফিরে এসেছেন কি না, তার চূড়ান্ত প্রমাণ না থাকলেও তাঁর জীবন আমাদের সামনে এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। মানুষ মৃত্যুকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভয় পায় অজানাকে। আর সেই ভয় কখনও কখনও একজন নিরীহ মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

মৃত্যুর রহস্য হয়তো এখনও উন্মোচিত হয়নি। কিন্তু ইসমাইলের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রহস্যের চেয়েও বড় বিষয় হলো মানবতা, সহমর্মিতা এবং সত্যকে জানার অবিরাম চেষ্টা।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter