প্রজ্ঞার প্রদীপ নিভে গেলেও আলো রয়ে যায়: আল্লামা মুহাম্মদ হাসান হিতুর স্মরণে

মুসলিম বিশ্ব আজ গভীর শোকাভিভূত। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, শাফেয়ি মাযহাবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও শাস্ত্রবিদ, আল্লামা ডক্টর শায়খ হাসান হিতুর (১৩৬২–১৪৪৭ হি./১৯৪৩–২০২৬ খ্রি.) আমাদের মাঝে আর নেই। তাঁর ইন্তেকাল শুধু একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং এক সুদীর্ঘ জ্ঞানসাধনার যুগের অবসান। মহানবী ﷺ হাদিসে ইঙ্গিত দিয়েছেন—আল্লাহ তাআলা জ্ঞানকে মানুষের হৃদয় থেকে একবারে উঠিয়ে নেন না; বরং আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে জ্ঞানকে প্রত্যাহার করেন। এই সত্য আজ আবার আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শায়খ হিতুর প্রস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একজন প্রকৃত আলেম কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি চিন্তাধারা এবং একটি ঐতিহ্যের ধারক। তাঁর জীবন ও কর্ম মুসলিম সমাজে জ্ঞানের মর্যাদা ও দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বংশপরিচয় ও শৈশব

১৯৪৩ সালের ১০ অক্টোবর সিরিয়ার দামেস্ক নগরীতে তিনার জন্ম। পারিবারিকভাবে তিনি ছিলেন ধর্মীয় ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক বংশের সন্তান। তাঁর বংশপরম্পরা প্রসারিত হয়েছে প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক (রহ.)-এর দিকে, যাঁর বংশধারা হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-এর মাধ্যমে মহানবী ﷺ-এর পরিবার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই ঐতিহ্য তাঁর ব্যক্তিত্বে আত্মমর্যাদা, শালীনতা ও নৈতিক দৃঢ়তার ভিত্তি স্থাপন করে।

তাঁর পরিবারে দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ ছিল সুদৃঢ়। পিতামহ ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, যা পরিবারে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার এক ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় অনুশাসন, অধ্যবসায় ও নৈতিকতার চর্চায় অভ্যস্ত হন। এই মূল্যবোধই পরবর্তীকালে তাঁর জ্ঞানসাধনার পথে প্রধান প্রেরণা হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্র থেকে শরিয়াহর পথিক

কৈশোরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও বিজ্ঞানমনস্ক। উচ্চমাধ্যমিকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি জার্মানিতে গিয়ে রকেট ও মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে অধ্যয়নের স্বপ্ন দেখতেন। গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা।

কিন্তু অন্তরের গভীরে এক নতুন আহ্বান ধ্বনিত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, মানবকল্যাণের প্রকৃত ভিত্তি নিহিত আছে আল্লাহর বিধান ও শরিয়াহর জ্ঞানে। এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। তিনি সংকল্প করেন, মিসরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ-এ গিয়ে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করবেন।

পরিবার প্রথমে এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানায়। আর্থিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় তাঁর পিতা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু তরুণ হিতুর সংকল্প ছিল অবিচল। নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ১৯৬৪ সালে তিনি কায়রো পৌঁছান। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রথমে প্রবেশের অনুমতি না পেলেও তাঁর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্য অবশেষে তাঁকে সাফল্য এনে দেয়। এই অধ্যায় তাঁর আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আল-আজহারে জ্ঞানসাধনা ও ত্যাগের অধ্যায়

আল-আজহারে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর সংগ্রাম আরও গভীর হয়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আসায় তাঁকে অতিরিক্ত পরীক্ষা দিতে হয়। পরিবার আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিলে তিনি কঠিন দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। সীমিত আহার, অনিশ্চিত আবাস এবং আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি অধ্যয়ন চালিয়ে যান।

এই কঠিন সময়ে তাঁর ধৈর্য ও আল্লাহভীতি ছিল তাঁর প্রধান শক্তি। ধীরে ধীরে তিনি বৃত্তি অর্জন করেন এবং পূর্ণ মনোযোগে পড়াশোনায় নিমগ্ন হন। উসূলুল ফিকহে তাঁর গভীর গবেষণা তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি এনে দেয়। তাঁর গবেষণাকর্ম ইমাম শিরাজির জীবন ও উসূলি চিন্তাধারা নিয়ে রচিত, যা তাঁকে সমকালীন উসূলবিদদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আল-আজহারের প্রখ্যাত শিক্ষকদের সান্নিধ্যে তিনি ফিকহ, উসূল, তাফসির, হাদিস ও আরবি ভাষাশাস্ত্রে অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর জ্ঞানসাধনা ছিল আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

শিক্ষকতা, দাওয়াহ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর তিনি কুয়েতে অধ্যাপনা শুরু করেন। তাঁর পাঠদান ছিল যুক্তিনির্ভর, বিশ্লেষণসমৃদ্ধ এবং গভীরতাপূর্ণ। তিনি ছাত্রদের কেবল পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং গবেষণামনস্কতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ায় ইমাম শাফেয়ি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শাফেয়ি ফিকহের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বক্তৃতা ও রচনায় ছিল ভারসাম্য, সংযম ও প্রজ্ঞার সমন্বয়। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন—যথাযথ জ্ঞান ছাড়া ফতোয়া প্রদান সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাঁর “আল-মুতাফাইহিকুন” গ্রন্থে এই বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

শায়খ হিতুর রচনাসম্ভার ইসলামী জ্ঞানভান্ডারে এক মূল্যবান সংযোজন। ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, আকিদাহ, হাদিস ও দর্শন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে।

  • المعجزة القرآنية – الإعجاز القرآني العلمي والغيبي
    (আল-মু‘জিযাতুল কুরআনিয়্যাহ – বৈজ্ঞানিক ও গায়েবী কুরআনিক মুজিযা)
  • الحديث المرسل: حجيته وأثره في الفقه الإسلامي
    (আল-হাদীসুল মুরসাল: এর প্রামাণিকতা ও ইসলামী ফিকহে এর প্রভাব)
  • منظومة في تاريخ مصطلح الحديث
    (হাদীস পরিভাষার ইতিহাস বিষয়ক মানযূমা)
  • منظومة في رواة الموطأ
    (মুওয়াত্তা গ্রন্থের বর্ণনাকারীদের বিষয়ে মানযূমা)
  • الوجيز في أصول التشريع
    (উসূলুত তাশরী‘ বা শরীয়তের মূলনীতির সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ)
  • الخلاصة في أصول الفقه
    (উসূলুল ফিকহের সারসংক্ষেপ)
  • التبصرة في أصول الفقه
    (উসূলুল ফিকহে অন্তর্দৃষ্টি / তাবসিরাহ)
  • التمهيد في تخريج الفروع على الأصول
    (উসূলের ভিত্তিতে শাখা-মাসআলা নির্গমনের ভূমিকা)
  • القواطع في أصول الفقه
    (উসূলুল ফিকহে নির্ণায়ক দলিলসমূহ)
  • الأصول والضوابط
    (মূলনীতি ও নীতিমালা)
  • الاجتهاد وأنواع المجتهدين
    (ইজতিহাদ ও মুজতাহিদদের প্রকারভেদ)
  • طبقات مجتهدي الشافعية
    (শাফেয়ী মাযহাবের মুজতাহিদদের স্তরবিন্যাস)
  • الإمام أبو إسحاق الشيرازي (حياته وأصوله)
    (ইমাম আবু ইসহাক আশ-শিরাযী: জীবন ও উসূল)
  • المتفيهقون
    (আত্মপ্রদর্শনকারী ফকীহগণ)
  • العقل والغيب
    (বুদ্ধি ও অদৃশ্য জগত)
  • كشف الستر عن سنية القنوت في صلاة الفجر
    (ফজরের সালাতে কুনূতের সুন্নিয়্যাত উন্মোচন)
  • فقه الصيام
    (রোজার ফিকহ)
  • الإمتاع في أحكام الرضاع
    (রদা‘আহ বা দুধ-সম্পর্কীয় বিধানের আলোচনা)
  • الحشرات نجاستها وأكلها
    (পোকামাকড়ের নাপাকী ও ভক্ষণবিধি)
  • الدين والعلم
    (ধর্ম ও বিজ্ঞান)
  • ديوان: شموع الذكريات وأنين الدموع
    (কাব্যগ্রন্থ: স্মৃতির প্রদীপ ও অশ্রুর আর্তনাদ)
  • ديوان: في موكب الدعوة آلام وآمال
    (কাব্যগ্রন্থ: দাওয়াতের কাফেলায় বেদনা ও আশা)
  • عاشق وعذول
    (প্রেমিক ও নিন্দুক)
  • الحضارة الإسلامية والحضارة المادية المعاصرة
    (ইসলামী সভ্যতা ও সমকালীন বস্তুবাদী সভ্যতা)

—প্রতিটি গ্রন্থ তাঁর গভীর জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে।

তাঁর বৃহৎ প্রকল্প “মাউসু‘আতুল ফিকহ আশ-শাফেয়ি ওয়াল-মুকারান” موسوعة الفقه الشافعي والمقارن —ষাটেরও অধিক খণ্ডে সম্পন্ন—সমকালীন ফিকহ গবেষণায় এক ঐতিহাসিক অবদান। এছাড়া তিনি ইমাম গাজ্জালীর “আল-মনখুল” (المنخول (للإمام الغزالي ও ইসনাবীর “আত-তামহিদ” (التمهيد (للإسنوي গ্রন্থের সমালোচনামূলক সম্পাদনা করেন, যা গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। সাহিত্যিক প্রতিভায়ও তিনি অনন্য; তাঁর কবিতায় স্মৃতি, বেদনা ও দাওয়াহর আশা-আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ইন্তেকাল ও চিরন্তন উত্তরাধিকার

১৪৪৭ হিজরির ৬ রমজান, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কুয়েতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫  বছর। তিনি ওসিয়ত করেছিলেন, যেন তাঁকে তাঁর আজহারি জুব্বা পরিয়ে কাফন দেওয়া হয়, যা তাঁর প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর অনুরাগের প্রতীক।

তাঁর ইন্তেকাল আল-আজহার, শাম দেশ, মিসর এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গ্রন্থসম্ভার, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য ছাত্র তাঁর উত্তরাধিকারকে অমর করে রাখবে।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন এবং তাঁর জ্ঞানকে কিয়ামত পর্যন্ত সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন—এই প্রার্থনাই আমাদের অন্তরের আরজি। আমীন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter