রক্তাক্ত যন্তর মন্তর: সংবিধানের কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক নগ্ন উল্লাস এবং আমাদের বিপন্ন গণতন্ত্র
দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত 'যন্তর মন্তর' কেবল একটি ঐতিহাসিক মানমন্দির বা পর্যটনকেন্দ্র নয়; স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এটি প্রতিবাদের এক পবিত্র তীর্থস্থান, গণতান্ত্রিক চেতনার এক জীবন্ত স্পন্দন। বহু দশক ধরে এই চত্বর সাক্ষী থেকেছে অসংখ্য গণ-আন্দোলনের, কৃষকের ঘামের, শ্রমিকের গর্জনের এবং নাগরিক সমাজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই মাসের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোতে দাঁড়িয়ে এই যন্তর মন্তর যে বিভীষিকাময় দৃশ্যের সাক্ষী হলো, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য, যেকোনো বিবেকবান মানুষের জন্য এক চরম লজ্জার এবং বেদনার বিষয়। আমাদের দেশের ছাত্রসমাজের তাজা রক্তে, তাদের কান্নায় এবং আর্তনাদে ভিজেছে যন্তর মন্তরের পিচঢালা পথ। তাদের অপরাধ কী ছিল? তারা তো কোনো অবৈধ বা অসাংবিধানিক দাবি নিয়ে রাজপথে নামেনি; তারা সশস্ত্র কোনো বিদ্রোহ করেনি, তারা রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি করতে চায়নি। তারা কেবল সেই অধিকারটুকু চেয়েছিল, যা ভারতের পবিত্র সংবিধান তাদের গ্যারান্টি দিয়েছে—দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা, স্বচ্ছ পরীক্ষা, মেধার মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতার অধিকার। অথচ, ক্ষমতাদর্পী শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের আজ্ঞাবহ, মেরুদণ্ডহীন পুলিশ বাহিনী এই ন্যায্য দাবিকে প্রতিহত করেছে নির্মম লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, জলকামান এবং পাশবিক রক্তপাতের মাধ্যমে।
একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আজ গভীর ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও ধিক্কারের সঙ্গে আমাকে এই প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে—আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে বাস করছি, নাকি এক নব্য-স্বৈরতন্ত্রের নিশ্ছিদ্র চাদরে নিজেদের ঢেকে রেখেছি, যেখানে গণতন্ত্র কেবল একটি ফাঁকা বুলি, একটি আলংকারিক শব্দমাত্র? ইসলামঅনওয়েব বাংলার পাঠকদের কাছে আজ এই বাস্তবতাকে তুলে ধরা শুধু প্রয়োজন নয়, এটি সময়ের দাবি। কারণ, যখন জুলুম বা নিপীড়ন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন তার বিরুদ্ধে সত্য বলা বা 'হক' কথা বলা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব।
সাংবিধানিক প্রতারণা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের উলঙ্গ আস্ফালন
আমাদের সংবিধান প্রণেতারা, বিশেষ করে ড. বি. আর. আম্বেদকরের মতো দূরদর্শী মানুষেরা, যখন ভারতের সংবিধান রচনা করেছিলেন, তখন তাঁরা নাগরিকদের কিছু মৌলিক অধিকার প্রদান করেছিলেন। সংবিধানের ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদ আমাদের নিরস্ত্রীভূত ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে। ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ দিয়েছে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু আজকের এই নব্য-ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এই অধিকারগুলো যেন কেবল সংবিধানের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। শাসকগোষ্ঠী যখনই কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, যখনই তাদের দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখনই তারা সংবিধানের পাতা ছিঁড়ে সেখানে ঔপনিবেশিক আমলের মতো দমন-পীড়নের আইন চাপিয়ে দেয়।
'চলো সংসদ' ডাক দিয়ে যখন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শিক্ষাব্যবস্থার নগ্ন দুর্নীতি, বিশেষ করে নিট (NEET) কেলেঙ্কারি, ক্রমাগত প্রশ্নফাঁস এবং সরকারের চরম ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল, তখন রাষ্ট্র তাদের হাতে তুলে দিয়েছে আঘাত আর ক্ষত। এই শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিল। এদের অনেকেই দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যাদের কাছে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জন নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র হাতিয়ার। নিট-এর মতো একটি সর্বভারতীয় পরীক্ষায় যখন নজিরবিহীন দুর্নীতি হয়, যখন টাকার বিনিময়ে মেধা বিক্রি হয়, তখন তা কেবল একটি পরীক্ষার ব্যর্থতা থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় একটি প্রজন্মের স্বপ্নহত্যার সমতুল্য। এই স্বপ্নহত্যার প্রতিবাদ করতেই তারা যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের এই আর্তি শোনেনি। উলটে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৬৩ ধারার মতো নিষেধাজ্ঞার খড়গ চাপিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, তারা এখন আর জনগণের সেবক নেই, বরং তারা একটি করপোরেট ও রাজনৈতিক মাফিয়ার পাহারাদার হিসেবে কাজ করছে।
পুলিশি বর্বরতা: ঔপনিবেশিক প্রভুদের যোগ্য উত্তরসূরি
পুলিশের নির্মমতার যে চিত্রগুলো সামনে এসেছে, তা যেকোনো পাষাণ হৃদয়কেও কাঁপিয়ে দেবে। এটি কোনো সাধারণ জনতা ছত্রভঙ্গ করার পুলিশি পদক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং পৈশাচিক আক্রমণ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন রিপোর্টে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগণিত ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছে শিহরণ জাগানো তথ্য। দেখা গেছে, পুলিশের লাঠিতে পেরেক আর স্ক্রু লাগানো ছিল! ভাবা যায়? স্বাধীন দেশের পুলিশ তার নিজের দেশের নিরস্ত্রীভূত ছাত্রদের ওপর পেরেক লাগানো লাঠি দিয়ে হামলা করছে! এটি কি কোনো সভ্য দেশের লক্ষণ হতে পারে? ব্রিটিশ আমলে রাওলাট আইন বা জালিয়ানওয়ালাবাগের যে ভয়াবহ ইতিহাস আমরা পড়েছি, আজকের এই স্বাধীন ভারতের শাসকরা কি সেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রভুদেরই প্রেতাত্মা হয়ে ফিরে আসেনি?
শুধু উর্দিধারী পুলিশই নয়, সাধারণ পোশাকে থাকা গুণ্ডাবাহিনীও পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে ছাত্রদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে। এই গুণ্ডারা কারা? এদের কে পাঠিয়েছে? রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় লালিত এই প্রাইভেট মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করার এই কৌশল যেকোনো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি পরিচিত ব্লু-প্রিন্ট। আহেলী, হার্দিক কিংবা নাভেদের মতো ২০-২২ বছরের তরুণদের বুক, পিঠ ও মাথায় যে কালশিটে দাগ আর রক্তের ধারা আমরা দেখেছি, তা কেবল ব্যক্তিগত শারীরিক ক্ষত নয়; তা হলো ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর রাষ্ট্রের কষা নির্মম চাবুকের দাগ।
সবচেয়ে ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক অধ্যায়টি রচিত হয়েছে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়ে। র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) এবং দিল্লি পুলিশের পুরুষ জওয়ানরা যখন নারী শিক্ষার্থীদের চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়, তাদের বুট দিয়ে মাড়িয়ে দেয় কিংবা 'হিসাবে থাকার' অকথ্য ভাষায় হুমকি দেয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই রাষ্ট্রযন্ত্র তার মানবিকতা, সভ্যতা এবং নৈতিকতার শেষ বিন্দুটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। যে দেশে 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও'-এর মতো চটকদার স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা হয়, সেই দেশেই যখন ন্যায়ের দাবিতে পথে নামা মেয়েদের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে, তখন সেই স্লোগানের অন্তঃসারশূন্য ভণ্ডামি নগ্ন হয়ে পড়ে।
মেধা ও মননের প্রতি রাষ্ট্রের আক্রোশ: কেন এই ভয়?
শাসকগোষ্ঠী কেন ছাত্রদের ওপর এত ক্ষুব্ধ? একজন সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবেত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এর উত্তর খুব স্পষ্ট। যেকোনো ফ্যাসিবাদী, কর্তৃত্ববাদী বা ধর্মান্ধ রাষ্ট্রকাঠামো সবচেয়ে বেশি ভয় পায় স্বাধীন চিন্তাকে। তারা ভয় পায় মেধার স্ফুরণকে, তারা ভয় পায় যৌবনের স্পর্ধাকে। ছাত্ররা প্রশ্ন করতে জানে, তারা শাসকের চোখের দিকে চোখ রেখে সত্য বলতে ভয় পায় না। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ স্তাবক নয়, তারা কোনো কর্পোরেট বেনিয়ার কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া দাস নয়।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার যে চরম বাণিজ্যিকীকরণ চলছে, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো শিক্ষাকে মুষ্টিমেয় কিছু ধনকুবেরের কুক্ষিগত করা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তহবিলের অভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে লাখ লাখ টাকা ফি নেওয়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। নিট (NEET), জেইই (JEE) বা ইউপিএসসি (UPSC)-এর মতো পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এই শাসকগোষ্ঠী মূলত দরিদ্র, দলিত, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু ঘরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার এক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্তে লিপ্ত। তারা চায় একটি মেরুদণ্ডহীন, প্রশ্ন না করতে পারা, আজ্ঞাবহ প্রজন্ম তৈরি করতে, যারা কেবল সস্তায় শ্রম দেবে এবং হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির মিথ্যে বয়ান গিলবে।
আর ঠিক যখন সেই প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে ছাত্ররা গর্জে ওঠে, তখন রাষ্ট্র প্রমাদ গোণে। রাষ্ট্র তখন তার পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করে, পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার দিয়ে নজরদারি চালায়, এবং ইউএপিএ (UAPA)-এর মতো কালাকানুন ব্যবহার করে তাদের জেলে পোরে। তারা চায় ছাত্ররা যেন বাধ্য প্রজার মতো বিনা প্রশ্নে সবকিছু মেনে নেয়। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, ভারতের ইতিহাস মাথা নত করার ইতিহাস নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলন—সব জায়গাতেই দেশের ছাত্রসমাজই স্বৈরাচারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছে।
নীরবতার সংস্কৃতি ও মিডিয়ার দালালবৃত্তি
এই পুলিশি হামলার বীভৎসতার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় যা সমানভাবে পীড়াদায়ক, তা হলো মূলধারার গণমাধ্যমের একটি বড় অংশের নির্লজ্জ দালালি এবং নাগরিক সমাজের একাংশের বধির নীরবতা। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত মিডিয়া আজ রূপান্তরিত হয়েছে শাসক দলের জনসংযোগ এজেন্সিতে। যখন যন্তর মন্তরে ছাত্রদের রক্ত ঝরছে, তখন ন্যাশনাল টেলিভিশনের প্রাইম টাইম ডিবেটে অ্যাঙ্কররা সেই ছাত্রদেরই 'দেশদ্রোহী', 'আরবান নক্সাল' বা 'বহিরাগত ইন্ধনপুষ্ট' বলে দেগে দিতে ব্যস্ত। এই 'গোদী মিডিয়া' (Godi Media) আসল সত্যকে আড়াল করে রাষ্ট্রের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেভাবে নির্লজ্জের মতো কাজ করে যাচ্ছে, তা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
একইসাথে, তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের নীরবতাও আমাদের ভাবায়। যতক্ষণ না আগুন নিজেদের ঘরে লাগছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অন্যকে পুড়তে দেখেও না দেখার ভান করি। কিন্তু এই আত্মকেন্দ্রিকতা একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী। আজ যে পুলিশ অন্যের সন্তানের মাথা ফাটাচ্ছে, কাল সেই একই পুলিশ আপনার সন্তানের ওপর লাঠি তুলবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ না খোলা মানে পরোক্ষভাবে সেই অন্যায়কে সমর্থন করা। ইসলামি দর্শনেও স্পষ্ট বলা আছে, জুলুম দেখে নীরব থাকা মজলুমের প্রতি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা।
আইনের শাসন বনাম শাসকের আইন
দেশের ৬৫০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা এই পুলিশি বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে—এই পুলিশি বর্বরতা মুক্তমত, মানবিক মর্যাদা এবং ভিন্নমতের অধিকারের ওপর এক নগ্ন আক্রমণ। সংসদ কোনো হাতির দাঁতের মিনার নয়, বা কোনো মহারাজার দুর্গ নয় যে তা সাধারণ নাগরিকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে। সংসদ হলো জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা জনগণেরই প্রতিষ্ঠান। সেখানে গিয়ে নিজেদের দাবি জানানো কোনো অপরাধ হতে পারে না।
কিন্তু আজকের ভারত এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে 'আইনের শাসন' (Rule of Law) পরিণত হয়েছে 'শাসকের আইনে' (Rule by Law)। পুলিশ এখন আর আইন রক্ষাকারী সংস্থা নয়, তারা শাসক দলের সশস্ত্র শাখায় পরিণত হয়েছে। যে পুলিশ দুর্নীতিবাজ নেতা বা প্রশ্নফাঁস চক্রের হোতাদের ধরতে ব্যর্থ হয়, সেই পুলিশই কীভাবে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর এমন বীরত্ব ফলায়, তা এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। এই দ্বৈতনীতি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি পচে গেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে যারা ভারতকে 'গণতন্ত্রের জননী' (Mother of Democracy) বা 'বিশ্বগুরু' বলে বড়াই করেন, তাদের এই কপটতা বিশ্ববাসীর সামনে আজ উন্মোচিত।
ছাত্রসমাজের অদম্য স্পিরিট: ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থান
কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এই নির্মম দমন-পীড়ন, এই রক্তস্নান কি ছাত্রদের দমাতে পেরেছে? তাদের কণ্ঠ কি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে? এর উত্তর হলো—দৃপ্ত ও সোচ্চার 'না'। যন্তর মন্তরের বাতাস আজ হয়তো বারুদে পরিণত হয়েছে, সেখানকার মাটি হয়তো রক্তে ভিজেছে, কিন্তু তা থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন সংকল্পের বীজ। ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথা, ফোলা পিঠ, প্লাস্টার করা ভাঙা পা আর চোখে অদম্য আগুন নিয়েও হার্দিক, আহেলী, নাভেদ, সোনমদের মতো হাজারো তরুণ-তরুণী আবার ফিরে এসেছে প্রতিবাদের ময়দানে।
তাদের এই ফিরে আসা কেবল একটি জেদ নয়, এটি হলো এক গভীর দার্শনিক ও রাজনৈতিক বার্তা। তারা রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, শারীরিক আঘাত দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে একটি জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু চেতনার যে আগুন একবার জ্বলে ওঠে, তাকে জলকামান দিয়ে নেভানো যায় না। পরিবারের কাছে নিজেদের আহত হওয়ার খবর লুকিয়ে, নিজেদের কষ্ট চেপে রেখে তারা যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা প্রমাণ করে যে, এই লড়াই তাদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার বাঁচানোর লড়াই নয়; এই লড়াই হলো দেশের আত্মাকে বাঁচানোর লড়াই, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ রেখে যাওয়ার লড়াই।
পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে পারে, তাদের প্রতিবাদের মঞ্চ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তাদের গায়ে মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তাদের ভেতরের যে নৈতিক জোর রয়েছে, তার কাছে এই বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্র নেহাতই বামন। যখন একজন নিরস্ত্র ছাত্র পুলিশের লাঠির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই মুহূর্তে পুলিশের হাতে থাকা লাঠিটি আর ক্ষমতার প্রতীক থাকে না, বরং তা হয়ে যায় রাষ্ট্রের দুর্বলতা, ভয় এবং পরাজয়ের প্রতীক।
উপসংহার: অন্ধকারের শেষ কোথায়?
যন্তর মন্তরে সংঘটিত এই বর্বরোচিত পুলিশি হামলার পর একজন ভারতীয় হিসেবে আমি এই রাষ্ট্রীয় স্পর্ধাকে তীব্র, তীক্ষ্ণ ও সর্বাত্মক ধিক্কার জানাই। যে রাষ্ট্র তার ছাত্রদের সম্মান করতে জানে না, যারা শিক্ষার পবিত্রতাকে কলুষিত করে, মেধার অবমূল্যায়ন করে এবং ন্যায়ের দাবিকে লাঠি, বন্দুক ও টিয়ার গ্যাস দিয়ে স্তব্ধ করতে চায়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের পতন অনিবার্য। ইতিহাস সাক্ষী আছে, কোনো স্বৈরাচারই চিরস্থায়ী নয়। ফারাও থেকে শুরু করে হিটলার, মুসোলিনি কিংবা নিকট অতীতের অনেক স্বৈরশাসক—অহংকার এবং ক্ষমতার দম্ভ কাউকেই রক্ষা করতে পারেনি।
আজকের এই কালশিটে দাগগুলো, যন্তর মন্তরের রাস্তায় ঝরে পড়া এই তাজা রক্তবিন্দুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা অস্থায়ী ঘটনা নয়; এগুলো আগামী দিনের বৃহত্তর গণজাগরণের মানচিত্র আঁকছে। প্রতিটি লাঠির ঘা, প্রতিটি রক্তবিন্দু দেশের যুবসমাজের মনে যে ক্ষোভের দাবানল তৈরি করছে, তা একদিন এই দুর্নীতিগ্রস্ত, ফ্যাসিবাদী ও অহংকারী শাসকগোষ্ঠীর মসনদ পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
সংবিধানকে হয়তো সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করা যায়, হয়তো বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখিয়ে বা কিনে নিয়ে ন্যায়ের পথ রুদ্ধ করা যায়, মিডিয়াকে দলিত দাসে পরিণত করা যায়, কিন্তু স্বাধীন মানুষের মুক্তিকামী চেতনাকে, ন্যায়ের প্রতি মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। যন্তর মন্তরের এই রক্তাক্ত অধ্যায় ভারতের বুকে এক নতুন প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিবাদ কেবল একটি পরীক্ষার দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়, এই প্রতিবাদ হলো একটি পচে যাওয়া সিস্টেমের বিরুদ্ধে। ইসলামঅনওয়েব বাংলার পাঠকদের কাছে আমার আহ্বান, এই লড়াইকে কেবল ছাত্রদের লড়াই ভাববেন না। এটি ভারতের প্রতিটি নাগরিকের লড়াই। কারণ আজ যদি আমরা এই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তাহলে আগামী কাল এমন এক ভারত আমরা দেখতে পাব, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যও আমাদের শাসকের অনুমতি নিতে হবে। জয় হিন্দ। সত্যের জয় হোক, মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। যন্তর মন্তরের এই রক্ত যেন বৃথা না যায়।