ভেনিসে ইতিহাস গড়ল ‘নাসা’: গাজা নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারিকে ২৪.৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি

বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব আবারও ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত নতুন ডকুমেন্টারি ‘নাসা’ (Nasa) উৎসবে প্রদর্শনের পর টানা ২৪.৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি পেয়েছে। এর মাধ্যমে ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম স্ট্যান্ডিং ওভেশনের রেকর্ড গড়েছে।

প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের অনেককে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে ছবিটির প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যায়। আবেগঘন পরিবেশে হলজুড়ে করতালির ঢেউ বয়ে যায়, যা গাজা সংকটকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ ও সংহতির আরেকটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’-এর পর নতুন মাইলফলক

গত বছর গাজার পাঁচ বছর বয়সী শিশুকন্যা হিন্দ রাজাবের মর্মান্তিক কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘The Voice of Hind Rajab’ ভেনিসে ২২ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছিল। সেই ছবিটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং যুদ্ধের মানবিক মূল্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছিল।

এবার সেই রেকর্ড অতিক্রম করে আরও দীর্ঘ করতালির সাক্ষী হলো ‘নাসা’। চলচ্চিত্রটি গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং সামরিক অভিযানের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

নির্মাতারা কারা?

‘নাসা’ নির্মাণ করেছেন ইউভাল আব্রাহাম এবং র‍্যাচেল সোর। এই দুই নির্মাতা এর আগে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও অস্কারজয়ী ডকুমেন্টারি ‘No Other Land’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

‘No Other Land’ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রভাব ও স্থানীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ‘নাসা’ আরও গভীরভাবে গাজার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে নজর দিয়েছে।

ভেনিসে ছবির প্রদর্শনী শেষে নির্মাতাদের চোখে অশ্রু দেখা যায়। দর্শকদের অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়ায় তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অস্কারজয়ী পরিচালক জোনাথন গ্লেজার তাঁদের অভিনন্দন জানান এবং মঞ্চে গিয়ে সমর্থন প্রকাশ করেন।

ডকুমেন্টারির বিশেষত্ব

‘নাসা’-র সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর সাক্ষাৎকারভিত্তিক নির্মাণশৈলী।

চলচ্চিত্রটিতে ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ২৪ জন ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁদের মুখ ও কণ্ঠস্বর এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে যাতে পরিচয় শনাক্ত করা না যায়।

নির্মাতাদের দাবি, ডকুমেন্টারির একটি বড় অংশ গোপনে ধারণ করা হয়েছে। তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে এবং গোপন স্থানে সাক্ষাৎকার ও চিত্রগ্রহণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এই সাক্ষাৎকারগুলোর মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গাজায় সংঘটিত ঘটনাবলীর অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

শিল্প, স্মৃতি এবং প্রতিবাদের ভাষা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

‘The Voice of Hind Rajab’ যেমন এক শিশুর শেষ আর্তনাদকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনি ‘নাসা’ যুদ্ধের বৃহত্তর কাঠামো ও এর মানবিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, ভেনিসে ছবিটির প্রতি দর্শকদের দীর্ঘ করতালি কেবল একটি চলচ্চিত্রের শিল্পমানের স্বীকৃতি নয়; এটি গাজায় চলমান মানবিক সংকট নিয়ে বিশ্বজনমতের প্রতিফলনও বটে।

ভেনিস থেকে বিশ্বমঞ্চে

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব বরাবরই রাজনৈতিক ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। ‘নাসা’-র অভূতপূর্ব সাড়া প্রমাণ করে যে গাজার গল্প এখনও বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।

পুরস্কার জিতুক বা না জিতুক, ভেনিসে ২৪.৫ মিনিটের দাঁড়িয়ে করতালি ইতোমধ্যেই ‘নাসা’-কে উৎসবের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত করেছে।

আর সেই করতালির প্রতিধ্বনি যেন একটি বার্তাই বহন করে—যুদ্ধের পরিসংখ্যানের পেছনে থাকা মানুষের গল্প, স্মৃতি ও বেদনা এখনো বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter