তাকদীরে ঈমান: কুরআন, সুন্নাহ ও আহলুস সুন্নাহর আকীদার আলোকে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ
ভূমিকা
‘তাকদীর’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে, তা কি আগে থেকেই লিখে রাখা হয়েছে? যদি আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্বনির্ধারণ করে থাকেন, তাহলে আমাদের পরিশ্রম, দোয়া ও চেষ্টা-সাধনার অর্থ কী? মানুষ কি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে, নাকি সে সবকিছুতে বাধ্য? এ ধরনের প্রশ্ন আজও বহু মানুষের মনে ঘুরপাক খায়।
আসলে তাকদীরের বিষয়টি ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম আকীদাগত বিষয়গুলোর একটি। তাই এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কেউ যদি তাকদীরকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে, তবে তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভরসা আরও দৃঢ় হয়। বিপদের সময় সে ধৈর্য ধারণ করে, নিয়ামত লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সর্বাবস্থায় নিজের রবের হিকমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে।
দুঃখজনকভাবে আজ তাকদীর সম্পর্কে সমাজে নানা ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ নিজের প্রতিটি ভুল ও গুনাহের দায় তাকদীরের ওপর চাপিয়ে দেয়। আবার কেউ মনে করে, “যা হওয়ার তা তো হয়েই যাবে”, তাই চেষ্টা-পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে অনেক মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ জানার জন্য জ্যোতিষী, হাত দেখে ভাগ্য গণনাকারী কিংবা ভবিষ্যদ্বক্তাদের দ্বারস্থ হয়। অথচ ইসলাম এসব বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।
ইসলাম কখনোই মানুষকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে এবং প্রতিটি বিষয়কে তাকদীরের অজুহাতে ছেড়ে দিতে শেখায় না। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয়—মানুষ যেন আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করে, বৈধ উপায় অবলম্বন করে, আল্লাহর কাছে দোয়া করে এবং এরপর ফলাফলের বিষয়টি তাঁর ওপর ছেড়ে দেয়। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল—আল্লাহর ওপর নির্ভরতা।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন—
﴿إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ﴾
“নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেকটি জিনিস নির্ধারিত পরিমাপ ও তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।”
(সুরা আল-কামার, ৫৪:৪৯)
এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয় যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুই আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমতের বাইরে নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। আল্লাহ তাকে বিবেক দিয়েছেন, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সামর্থ্যও দিয়েছেন। এ কারণেই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে।
এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানার চেষ্টা করব—তাকদীর কী, এর ওপর ঈমান রাখা কেন অপরিহার্য, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্বের প্রকৃত অবস্থান কী, দোয়া ও পরিশ্রমের সঙ্গে তাকদীরের সম্পর্ক কী, এবং এ বিষয়কে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর সঠিক জবাব কী। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য উপস্থাপন করা নয়; বরং তাকদীর সম্পর্কে এমন একটি সঠিক উপলব্ধি গড়ে তোলা, যা আমাদের ঈমানকে আরও মজবুত করবে এবং আল্লাহর ওপর প্রকৃত ভরসা করতে শেখাবে।
তাকদীর কী? — এর সঠিক অর্থ
‘তাকদীর’ শব্দটি আরবি «القَدَر» (আল-কদর) থেকে এসেছে। আরবি ভাষায় এর অর্থ হলো—কোনো কিছুর পরিমাণ নির্ধারণ করা, তার সঠিক পরিমাপ স্থির করা এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে নির্ধারিত করে দেওয়া। আর শরিয়তের পরিভাষায় তাকদীর বলতে বোঝায়, আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন জ্ঞান, পরিপূর্ণ হিকমত এবং ইচ্ছা অনুযায়ী সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বিষয় পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
এ কারণেই তাকদীরের ওপর ঈমান রাখা ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের একটি। এর প্রমাণ হলো প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরীল।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, একদিন হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম) মানুষের আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হন এবং ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। যখন তিনি ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন নবী ﷺ ইরশাদ করেন—
«أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
অর্থাৎ, একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো—সে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, আখিরাতের দিন এবং ভালো-মন্দ সব ধরনের তাকদীরের ওপর ঈমান রাখবে।
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, তাকদীরের ওপর ঈমান কোনো অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক আকীদা নয়; বরং এটি ঈমানের মৌলিক ভিত্তির একটি অপরিহার্য অংশ। তাই যে ব্যক্তি তাকদীরকে অস্বীকার করে অথবা এ সম্পর্কে ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করে, সে ঈমানের একটি মৌলিক রুকনকে অস্বীকার করে। এ কারণেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আলেমগণ তাকদীরের ওপর ঈমানকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য বলে গণ্য করেছেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)
ক্বাযা ও কদরের মধ্যে পার্থক্য কী?
তাকদীরের আলোচনা করতে গেলে দুটি শব্দ বারবার সামনে আসে—ক্বাযা (القضاء) এবং কদর (القدر)। সাধারণভাবে অনেকেই এ দুটি শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করেন। তবে আকীদা বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে আলেমগণ এ দুটির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ «شفاء العليل في مسائل القضاء والقدر والحكمة والتعليل»-এ এবং ইবন আবিল ইয আল-হানাফি «شرح العقيدة الطحاوية»-এ এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
আহলুস সুন্নাহর অধিকাংশ আলেমের মতে, কদর বলতে আল্লাহ তাআলার সেই চিরন্তন ও পূর্বনির্ধারিত ফয়সালাকে বোঝায়, যা তিনি তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও হিকমতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছেন। আর ক্বাযা হলো সেই ফয়সালার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হওয়া এবং কার্যকর হয়ে যাওয়া। তবে কিছু আলেম এ দুই শব্দের ব্যাখ্যা উল্টো ক্রমেও করেছেন। তাই এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তবে এই মতভেদ সত্ত্বেও সব আলেম একটি বিষয়ে একমত—ক্বাযা ও কদর উভয়ই আল্লাহর জ্ঞান, তাঁর ইচ্ছা (মাশিয়াত) এবং তাঁর ফয়সালার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ শব্দদ্বয়ের পরিভাষাগত বিতর্কে জড়িয়ে পড়া নয়; বরং আল্লাহর তাকদীরের ওপর পূর্ণ ঈমান রাখা, তাঁর ফয়সালার ওপর আস্থা রাখা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেক আমল ও সঠিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
তাকদীরের চারটি স্তর
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে তাকদীরের চারটি মৌলিক স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবন আবিল ইয আল-হানাফি তাঁর «شرح العقيدة الطحاوية» গ্রন্থে এগুলোকে العلم، الكتابة، المشيئة، الخلق নামে বর্ণনা করেছেন।
১. ইলম (العلم)
তাকদীরের প্রথম স্তর হলো ইলম। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন। অতীতে যা ঘটেছে, বর্তমানে যা ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে—সবই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর কাছ থেকে কোনো বিষয়ই গোপন নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন—
﴿وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”
(সুরা আত-তালাক, ৬৫:১২)
২. কিতাবত (الكتابة)
তাকদীরের দ্বিতীয় স্তর হলো কিতাবত। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টির তাকদীর পূর্বেই লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ»
অর্থাৎ, আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সমগ্র সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছিলেন।
(সহিহ মুসলিম)
৩. মাশিয়াত (المشيئة)
তাকদীরের তৃতীয় স্তর হলো মাশিয়াত বা আল্লাহর ইচ্ছা। এর অর্থ হলো, এই বিশ্বজগতে আল্লাহ যা চান, তাই ঘটে। তাঁর ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ﴾
“তোমরা কিছুই ইচ্ছা করতে পারো না, যতক্ষণ না আল্লাহ ইচ্ছা করেন।”
(সুরা আল-ইনসান, ৭৬:৩০)
৪. খালক (الخلق)
তাকদীরের চতুর্থ ও শেষ স্তর হলো খালক বা সৃষ্টি। অর্থাৎ, আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা। মানুষ, তার শক্তি, তার সামর্থ্য, তার উপায়-উপকরণ এবং সমগ্র সৃষ্টিজগত—সবই আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন—
﴿وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ﴾
“আল্লাহ তোমাদেরও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কর্মেরও স্রষ্টা তিনিই।”
(সুরা আস-সাফফাত, ৩৭:৯৬)
তাকদীরের এই চারটি স্তরের ওপর ঈমান একজন মুমিনের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। সে উপলব্ধি করে যে, তার রব সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত এবং সমগ্র বিশ্বজগতের একমাত্র মালিক ও পরিচালনাকারী। তাই সে তাকদীরের অজুহাতে অলস হয়ে বসে থাকে না; বরং আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে, আল্লাহর কাছে দোয়া করে এবং শেষ পর্যন্ত যে ফলাফল আসে, তা তাঁর হিকমতের ফয়সালা হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। এটাই তাকদীরের ওপর ঈমানের ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।
যদি সবকিছু আগেই লিখে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে কি মানুষ বাধ্য?
তাকদীর সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করা হয়, তা হলো—যদি আল্লাহ তাআলা সবকিছু আগেই নির্ধারণ করে রেখে থাকেন, তাহলে মানুষের কি কোনো ইখতিয়ার (নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা) আছে? মানুষ কি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নেয়, নাকি সবকিছু আগেই নির্ধারিত? আর যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিতই হয়, তাহলে ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব কেন নেওয়া হবে?
এ প্রশ্ন নতুন নয়। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর যুগেও এ প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে করা হয়েছিল। হযরত আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ ইরশাদ করেন যে, প্রত্যেক মানুষের জান্নাত বা জাহান্নামের স্থান পূর্ব থেকেই নির্ধারিত রয়েছে। তখন একজন সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে কি আমরা আমল করা ছেড়ে দেব এবং যা লেখা আছে, তার ওপরই ভরসা করব?” নবী ﷺ সঙ্গে সঙ্গে ইরশাদ করলেন—
«اعْمَلُوا، فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ»
অর্থাৎ, “তোমরা আমল করতে থাকো। কেননা প্রত্যেক মানুষকে সেই কাজেরই তাওফিক দেওয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুল কদর; সহিহ মুসলিম, কিতাবুল কদর)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাকদীরের ওপর ঈমান রাখার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। মানুষ যদি সম্পূর্ণ বাধ্যই হতো, তাহলে নবী ﷺ কখনোই আমল করার নির্দেশ দিতেন না। বরং তিনি মানুষকে চেষ্টা করতে, নেক আমল করতে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে শিক্ষা দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনও একই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ﴾
অর্থাৎ, মানুষের ইচ্ছাও শেষ পর্যন্ত আল্লাহর মাশিয়াতের অধীন। (সুরা আত-তাকভীর, ৮১:২৯)
আবার অন্য জায়গায় তিনি বলেন—
﴿فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ﴾
অর্থাৎ, “এখন যে ইচ্ছা ঈমান আনুক, আর যে ইচ্ছা অস্বীকার করুক।” (সুরা আল-কাহফ, ১৮:২৯)
এই দুই আয়াত একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা মানুষকে চিন্তা করার, ভালো-মন্দ বুঝার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। এ কারণেই মানুষ তার কর্মের জন্য জবাবদিহিতার অধীন। এই ক্ষমতা আল্লাহর দেওয়া হলেও সিদ্ধান্ত মানুষ নিজেই গ্রহণ করে। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—মানুষ না সম্পূর্ণ বাধ্য, আর না সম্পূর্ণ স্বাধীন; বরং আল্লাহ প্রদত্ত সীমিত স্বাধীনতার অধিকারী। এই স্বাধীনতার ভিত্তিতেই কিয়ামতের দিন তার হিসাব নেওয়া হবে।
এ কারণেই তাকদীরকে কখনো গুনাহের অজুহাত বানানো যায় না। কেউ যদি অন্যায় কাজ করে বলে, “এটাই আমার তাকদীরে লেখা ছিল”, তাহলে তা ইসলামের সঠিক শিক্ষা নয়। আল্লাহ মানুষকে সত্য ও অসত্য—উভয় পথই দেখিয়েছেন এবং সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সামর্থ্যও দিয়েছেন। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আন্তরিকতার সঙ্গে নেক আমল করা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা, সব বৈধ উপায় অবলম্বন করা এবং শেষ পর্যন্ত যে ফল আসে, তাকে নিজের রবের হিকমতপূর্ণ ফয়সালা হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া। এটাই তাকদীরের ওপর ঈমানের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।
দোয়া কি তাকদীর পরিবর্তন করতে পারে?
তাকদীর সম্পর্কে মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো—যদি আল্লাহ তাআলা সবকিছু আগেই নির্ধারণ করে রাখেন, তাহলে দোয়া করার কী উপকার? আমাদের দোয়ার মাধ্যমে কি তাকদীর পরিবর্তন হতে পারে? প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নটি কঠিন মনে হলেও, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর উত্তর একেবারেই স্পষ্ট।
প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার যে, দোয়াও একটি ইবাদত এবং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরেরই একটি অংশ। যেমন আল্লাহ তাআলা মানুষের রিজিক, সুস্থতা ও আয়ু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তেমনি তিনিই পূর্ব থেকেই জানেন এবং লিখে রেখেছেন—কে তাঁর কাছে দোয়া করবে, কখন করবে এবং কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে। তাই দোয়া ও তাকদীর একে অপরের বিরোধী নয়; বরং একই ইলাহী ব্যবস্থার দুটি অংশ।
এ কারণেই কুরআনে বারবার মানুষকে দোয়া করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ﴾
অর্থাৎ, “তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব।”
(সুরা গাফির, ৪০:৬০)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করে বলেন—
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ﴾
অর্থাৎ, “আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন বলে দাও—আমি তো খুবই নিকটবর্তী। কেউ যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”
(সুরা আল-বাকারা, ২:১৮৬)
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দোয়া শুধু অন্তরের সান্ত্বনার মাধ্যম নয়; বরং এটি এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ নিজেই তাঁর বান্দাদের জন্য পছন্দ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসেও রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا الْبِرُّ»
অর্থাৎ, “দোয়া ছাড়া আর কিছুই ক্বাযাকে প্রতিহত করতে পারে না এবং নেক আমল ছাড়া আর কিছুই আয়ুতে বরকত বৃদ্ধি করে না।” এই হাদিসটি জামে তিরমিযি, সুনানে ইবন মাজাহ ও মুসনাদে আহমাদ-এ বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ এর সনদ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। অনেক আলেম একে হাসান বলেছেন, আবার কেউ কেউ এর কিছু সনদকে দুর্বল বলেছেন। তবে এর মূল বক্তব্য কুরআনের নীতিমালা এবং অন্যান্য সহিহ হাদিস দ্বারাও সমর্থিত।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি দোয়ার কারণে আল্লাহর ফয়সালা বদলে যায়? এর উত্তর হলো—না। আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞান কখনো পরিবর্তিত হয় না। তিনি পূর্ব থেকেই জানেন কে দোয়া করবে, কে করবে না এবং কার দোয়ার মাধ্যমে কোন বিপদ দূর হবে। তাই যখন বলা হয়, “দোয়া তাকদীর পরিবর্তন করে”, তখন এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন ঘটে। বরং দোয়াও সেই তাকদীরেরই অংশ, যা আল্লাহ পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ «شفاء العليل في مسائل القضاء والقدر والحكمة والتعليل»-এ অত্যন্ত সুন্দরভাবে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, দোয়া ও বিপদের সম্পর্ক অনেকটা ওষুধ ও রোগের সম্পর্কের মতো। যেমন রোগও আল্লাহর তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত এবং ওষুধও তাঁরই নির্ধারিত একটি উপায়, তেমনি বিপদও তাঁর মাশিয়াত অনুযায়ী আসে এবং দোয়াও তাঁরই দেওয়া একটি মাধ্যম। কখনো দোয়া কোনো বিপদ আসার আগেই তা দূর করে দেয়, কখনো বিপদের তীব্রতা কমিয়ে দেয়, আবার কখনো সেই বিপদের ওপর ধৈর্য ধারণ করার শক্তি দান করে। এসবই আল্লাহর হিকমত ও মাশিয়াত অনুযায়ী ঘটে।
এ কারণেই একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো বলে না, “যা লেখা আছে তাই হবে, তাই দোয়া করার দরকার নেই।” বরং সে জানে, দোয়া করাও আল্লাহর নির্দেশ পালন করারই একটি অংশ। তাই অসুস্থ হলে সে চিকিৎসাও গ্রহণ করে, আবার আল্লাহর কাছে দোয়াও করে। রিজিকের জন্য পরিশ্রমও করে, আবার নিজের রবের কাছেই সাহায্যও চায়। এটাই কুরআন ও সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা। দোয়া করা তাকদীরের বিরোধিতা নয়; বরং তাকদীরের ওপর সত্যিকার ঈমানের অন্যতম সুন্দর প্রকাশ।
তাকদীর কি দুই প্রকার? — ক্বাযায়ে মুবরাম ও ক্বাযায়ে মু‘আল্লাক
পূর্ববর্তী অংশে আমরা দেখেছি, দোয়া করা তাকদীরের বিরোধী নয়; বরং তাকদীরেরই একটি অংশ। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—যদি দোয়ার কারণে কোনো বিপদ দূর হয়ে যায়, তাহলে কি এর অর্থ এই যে আল্লাহর লিখিত ফয়সালা পরিবর্তিত হয়ে গেল?
এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার জন্য কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের দিকে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿يَمْحُو اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَهُ أُمُّ الْكِتَابِ﴾
অর্থাৎ, “আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন। আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (উম্মুল কিতাব)।”
(সুরা আর-রা‘দ, ১৩:৩৯)
এই আয়াতের তাফসিরে বহু মুফাসসির উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তবে ফেরেশতাদের নিকট অর্পিত কিছু বিষয় আল্লাহ তাঁর হিকমত অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারেন। এই বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর জন্য পরবর্তী যুগের কিছু আলেম ‘ক্বাযায়ে মুবরাম’ এবং ‘ক্বাযায়ে মু‘আল্লাক’—এই দুটি পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।
তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্বাযায়ে মুবরাম হলো সেই ফয়সালা, যা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে সর্বদা নির্ধারিত রয়েছে। এতে কোনো পরিবর্তন হয় না; কারণ আল্লাহর জ্ঞান কখনো পরিবর্তিত হয় না। আর ক্বাযায়ে মু‘আল্লাক হলো এমন ফয়সালা, যা কোনো শর্ত বা কারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ, ফেরেশতাদের নথিতে লেখা থাকতে পারে যে, যদি কোনো বান্দা দোয়া করে, তবে তার বিপদ দূর হবে; আর যদি দোয়া না করে, তবে সেই বিপদ তার ওপর নেমে আসবে। কিন্তু এই উভয় অবস্থাই আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে পূর্ব থেকেই নির্ধারিত রয়েছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ «شفاء العليل في مسائل القضاء والقدر والحكمة والتعليل»-এ উল্লেখ করেছেন যে, দোয়া, তাওবা, সদকা এবং নেক আমল—এসবও আল্লাহ নির্ধারিত উপায় (আসবাব)-এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন ক্ষুধা লাগলে খাবার খাওয়া এবং অসুস্থ হলে ওষুধ গ্রহণ করা আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার অংশ, তেমনি বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দোয়া করাও তাঁর নির্ধারিত ব্যবস্থারই অংশ। তাই দোয়া ও তাকদীরের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ‘ক্বাযায়ে মুবরাম’ এবং ‘ক্বাযায়ে মু‘আল্লাক’—এই পরিভাষাগুলো কুরআন বা কোনো সহিহ হাদিসে ঠিক এভাবেই উল্লেখিত হয়নি। এগুলো পরবর্তী যুগের আলেমদের ব্যাখ্যামূলক পরিভাষা। তাই এগুলোকে আকীদার স্বতন্ত্র কোনো মূলনীতি হিসেবে নয়; বরং তাকদীরের বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর একটি ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত।
এই আলোচনার সারকথা হলো, আল্লাহর জ্ঞান কখনো পরিবর্তিত হয় না। তিনি পূর্ব থেকেই জানেন কে দোয়া করবে, কে ধৈর্য ধারণ করবে এবং কে গাফিল থাকবে। তাই কারও দোয়ার মাধ্যমে যদি কোনো বিপদ দূর হয়, সেটিও আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদীরেরই অংশ। এ কারণেই একজন মুমিন কখনো দোয়াকে নিরর্থক মনে করেন না; বরং এটিকেই তিনি নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এটাই কুরআন, সুন্নাহ এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
তাকদীর সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
তাকদীরের ওপর ঈমান রাখা ইসলামের মৌলিক আকীদাগুলোর একটি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই আকীদাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা ভুল ধারণাও ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ তাকদীরের অজুহাতে চেষ্টা-পরিশ্রম ছেড়ে দেয়, কেউ নিজের গুনাহের দায় তাকদীরের ওপর চাপিয়ে দেয়, আবার কেউ ভবিষ্যৎ জানার আশায় জ্যোতিষী, গণক বা ভাগ্য গণনাকারীদের দ্বারস্থ হয়। অথচ কুরআন ও সুন্নাহ এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
প্রথম ভুল ধারণা হলো—“যখন সবকিছু আগেই লেখা হয়ে গেছে, তখন পরিশ্রম করে কী লাভ?” এই চিন্তা ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, লিখিত তাকদীরের ওপর ভরসা করে আমল ছেড়ে দেওয়া উচিত কি না, তখন তিনি স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেন—
«اعْمَلُوا، فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ»
অর্থাৎ, “তোমরা আমল করতে থাকো। কেননা প্রত্যেক মানুষকে সেই কাজেরই তাওফিক দেওয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাকদীরের ওপর ঈমান মানুষকে অলস নয়; বরং কর্মঠ ও দায়িত্বশীল করে তোলে।
দ্বিতীয় ভুল ধারণা হলো—“আমি যে গুনাহ করেছি, তা তো আমার তাকদীরেই লেখা ছিল।” এই ধারণাও ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কর্মের জন্য নিজেই দায়ী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ﴾
অর্থাৎ, “মানুষ যে সৎকর্ম অর্জন করবে, তার সুফল সে-ই পাবে; আর যে অসৎকর্ম করবে, তার দায়ও তারই ওপর বর্তাবে।” (সুরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)
তাই তাকদীরকে গুনাহের অজুহাত বানানো কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী। একজন মুমিন ভুল করে ফেললে অজুহাত খোঁজে না; বরং আল্লাহর কাছে তাওবা করে এবং নিজের সংশোধনের চেষ্টা করে।
তৃতীয় ভুল ধারণা হলো—জ্যোতিষ, রাশিফল, হাতের রেখা বা ভবিষ্যৎবক্তারা মানুষের তাকদীর জানাতে পারে। ইসলাম এ বিশ্বাসও গ্রহণ করে না। কুরআন স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। এমনকি রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً»
অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে গায়েবের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল হয় না।” (সহিহ মুসলিম)
তাই একজন মুসলমানের ভরসা নক্ষত্র, রাশিফল বা গণকের কথার ওপর নয়; বরং একমাত্র তার রবের ওপর।
আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—“আমার দোয়া কবুল হলো না, তাহলে দোয়া করে লাভ কী?” অথচ বাস্তবতা হলো, কোনো আন্তরিক দোয়াই বিফল যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو اللَّهَ بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ...»
অর্থাৎ, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে এমন কোনো দোয়া করে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, তখন আল্লাহ তা তিনটি উপায়ের একটিতে অবশ্যই কবুল করেন—হয় তিনি চাওয়া জিনিসটি দান করেন, অথবা তার পরিবর্তে কোনো বিপদ দূর করে দেন, কিংবা সেই দোয়ার সওয়াব আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন। (মুসনাদে আহমাদ)
এসব আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাকদীরের ওপর সঠিক ঈমান মানুষকে দুর্বল বা দায়িত্বহীন করে তোলে না। বরং এটি তাকে পরিশ্রমী হতে, গুনাহ থেকে দূরে থাকতে, সব অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করতে এবং একমাত্র তাঁরই ওপর ভরসা করতে শেখায়। এটাই কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সঠিক শিক্ষা।
উপসংহার
তাকদিরে ঈমান আনার অর্থ কি হাত গুটিয়ে বসে থাকা? কুরআন ও সুন্নাহর উত্তর স্পষ্ট—কখনোই নয়। বরং তাকদিরের প্রতি সঠিক ঈমান একজন মানুষকে অলস নয়, দায়িত্বশীল করে তোলে। এটি শিক্ষা দেয়—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করতে হবে, তারপর যে ফলাফল আসবে, তাকে আল্লাহর হিকমতপূর্ণ ফয়সালা হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে।
এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করেছি যে, তাকদিরে ঈমান ইসলামি আকিদার একটি মৌলিক ভিত্তি। কদা ও কদরের প্রকৃত অর্থ কী, তাকদিরের চারটি স্তর কী, মানুষের ইখতিয়ার বা সীমিত স্বাধীনতার বাস্তবতা কী, দোয়া ও তাকদিরের সম্পর্ক কেমন, এবং এ বিষয়ে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণার সঠিক ইসলামি ব্যাখ্যা কী—এসব বিষয় কুরআন, সহিহ হাদিস এবং আহলুস সুন্নাহর আলিমদের ব্যাখ্যার আলোকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এসব আলোচনার সারকথা একটিই—আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং নেক আমল একে অপরের পরিপূরক; এ দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। একজন প্রকৃত মুমিন নিজের ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করে না; বরং বর্তমানকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, দোয়াকে আঁকড়ে ধরে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। এটাই তাকদিরে ঈমানের প্রকৃত শিক্ষা এবং কুরআন-সুন্নাহ প্রদর্শিত ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাকদির সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান, এর ওপর অটল ঈমান এবং সেই অনুযায়ী নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।