বাংলার বুকে দ্বিতীয় 'বাবরি': হুমায়ুন কবীরের ভক্তি নাকি ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক চাল?

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু ঠিক ৩৩ বছর পর, ২০২৫ সালের ৬ই ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগরে যা ঘটল, তা আমাদের অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সাসপেন্ড হওয়া বিধায়ক হুমায়ুন কবীর ঘোষণা করেন, তিনি সেখানে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের আদলে একটি নতুন মসজিদ তৈরি করবেন। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তিনি রেজিনগরে এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— হঠাৎ কেন এই উদ্যোগ? এটা কি শুধুই ধর্মীয় আবেগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? চলুন এই প্রবন্ধটিতে বিষয়টি জানার চেষ্টা করি...

কে এই হুমায়ুন কবীর?

প্রথমেই বোঝা দরকার, এই ঘটনার নায়ক হুমায়ুন কবীর আসলে কে। তিনি মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের বিধায়ক। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দেখলে বোঝা যায়, তিনি বারবার দলবদলি করেছেন। কংগ্রেস থেকে রাজনীতি শুরু করে তিনি তৃণমূলে আসেন, এরপর বিজেপিতে যোগ দেন এবং ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন। সম্প্রতি দলবিরোধী মন্তব্যের জেরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে সাসপেন্ড করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া হুমায়ুন কবীর এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে 'ধর্মীয় কার্ড' খেলছেন। রেজিনগর ও বেলডাঙা এলাকাটি সাম্প্রদায়িক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিছুদিন আগেই বেলডাঙায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক এই জায়গাতেই 'বাবরি মসজিদ' তৈরির ঘোষণা দিয়ে তিনি মুসলিম জনমানসে নিজেকে ত্রাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

কেন এই মসজিদ? 

হুমায়ুন কবীরের দাবি, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে মুসলিমদের মনে যে আঘাত দেওয়া হয়েছিল, তার আবেগগত ক্ষতিপূরণ হিসেবেই তিনি এই মসজিদ তৈরি করছেন। তিনি একে তার সাংবিধানিক অধিকার বলে দাবি করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এই কমপ্লেক্সে শুধু মসজিদ নয়, হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে।

কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।

মিডিয়া রিপোর্ট যেমন (The Federal & The Wire) বিশ্লেষকরা বলছেন, হুমায়ুন কবীরের এই পদক্ষেপ বিজেপির রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। বিজেপি যেমন রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে হিন্দু ভোট জমা করেছে, কবীর তেমনই বাবরি মসজিদের আবেগ ব্যবহার করে মুসলিম ভোট নিজের পকেটে ভরতে চাইছেন।

তারা আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের রায় অনুযায়ী অযোধ্যা বিবাদের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এবং মুসলিমদের জন্য বিকল্প জায়গাও দেওয়া হয়েছে। এখন নতুন করে 'বাবরি' নামে মসজিদ তৈরি করা পুরনো ক্ষতকে জাগিয়ে তোলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাজনৈতিক দিক?

এই পুরো ঘটনায় সবথেকে লাভবান কে হতে পারে?

একদিক থেকে দেখা যাই, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এইটি বিপদ তুল্য। তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই মুসলিম ভোটব্যাংকের ওপর কঠিন নির্ভরশীল। হুমায়ুন কবীর যদি নিজেকে মুসলিমদের আসল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে তৃণমূলের ভোট ভাগ হয়ে যাবে। বেলডাঙা ও মুর্শিদাবাদের মতো এলাকায় তৃণমূলের ভোট কাটলে তার সরাসরি সুবিধা পাবে বিজেপি বা কংগ্রেস। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ ইতিমধ্যেই বলেছেন, “ব্যক্তিগত জমিতে কেউ ধর্মীয় স্থান বানাতেই পারেন, কিন্তু একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা অনুচিত।” দল যে তার এই কাজের দায় নিচ্ছে না, তা স্পষ্ট।

অপরদিকে দেখা যাই এইটি বিজেপির জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। বিজেপি এই ঘটনাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে পাল্টা রাজনৈতিক আখ্যান গড়ে তুলেছে। শুভেন্দু অধিকারী ও দিলীপ ঘোষের মতো বিজেপি নেতারা দাবি করছেন, তৃণমূল সরকার তোষণের রাজনীতি করছে বলেই রাজ্যে এমন ঘটনা ঘটছে। হুমায়ুন কবীরের এই উদ্যোগ হিন্দুদের মধ্যেও দলাদলি ও চরমপন্থী হতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ, মুসলিমরা যদি হুমায়ুনের দিকে ঝোঁকে, তবে হিন্দু ভোট স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির দিকে একজোট হবে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন আছে যে, হুমায়ুন কবীর জেনে বা না জেনে বিজেপির 'বি-টিম' হিসেবে কাজ করছেন।

মুসলিম সমাজের সচেতনতা

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মুসলিম সমাজ কী ভাবছে। বিভিন্ন ভারতীয় নিউজ চ্যানেল, বলাবাহুল্ল্য যে এর মধ্যে অধিকাংশই বিজিপি দলীয়, এই বলে দাবী করছে যে, এই মসজিদ তৈরির উদ্যোগ আসলে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করার একটি চেষ্টা।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি তাহলে বলা যায় যে, ইসলামে তাকওয়া বা খোদাভীতির ওপর ভিত্তি করে মসজিদ তৈরির কথা বলা হয়েছে। কিয়ামতের একটি আলামতের মধ্যে একটি হল শেষ যুগের মানুষ আলিশান সুন্দর মসজিদ বানাবে কিন্তু তাতে মুসল্লি থাকবে না। তাই শুধু মসজিদ তৈরি করে রেখে দেওয়া নয়, সেইগুলোকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে আবাদ রাখতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে বা লোক দেখানোর জন্য তৈরি মসজিদকে ইসলামে মসজিদে দিরার বা ক্ষতিকর মসজিদ বলা হয়, যা সমাজকে বিভক্ত করে।

অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী মনে করেন, এখন প্রয়োজন শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তাই অনেকই বলে গেছেন, সমস্যা বাবরি নয়, সমস্যা হলো বরাবরি বা সাম্য। মুসলিমদের এখন দরকার সেই সাম্য বা অধিকার, লোক দেখানো রাজনৈতিক মসজিদ নয় যা দাঙ্গা লাগাতে পারে।

গোপন এজেন্ডা ? 

এইসব তথ্যের ও আলোচনার ভিত্তিতে বলা বলা যেতে পারে যে, প্রথমত, হুমায়ুন কবীর ২০২৬ সালের নির্বাচনে টিকিট পাওয়ার জন্য বা নির্দল হিসেবে জেতার জন্য নিজের একটি কট্টরপন্থী ইমেজ তৈরি করে নিজের দর বাড়াচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, সরাসরি দাঙ্গা বাঁধানোর ছকের প্রমাণ না পেলেও, বেলডাঙার মতো সংবেদনশীল এলাকায় এমন আবেগী ইস্যুতে উত্তেজনা ছড়াতে পারে। এতে রাজনৈতিক ফাইয়দা লোটার চেষ্টা সব দলেরই থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, পরবর্তীতে প্রশাসন বা আদালত শেষ পর্যন্ত এই নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। কারণ, 'বাবরি' নামটি ব্যবহার করা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। পুলিশ ইতিমধ্যেই কড়া নজরদারি রাখছে।

মূল্যায়নের পর হুমায়ুনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে পারা যাই যে, যদি তিনি সফলভাবে এই সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাতে পারেন, তবে মুর্শিদাবাদে তিনি তৃণমূলের বিকল্প শক্তি হয়ে উঠবেন। আর যদি মুসলিম সমাজ বুঝতে পারে যে এটি একটি রাজনৈতিক চাল, তবে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

এরই প্রভাব হিসেবে, ইস্যুটি আগামী নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলায় বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। বিজেপি এটাকে ব্যবহার করে বলবে, “দেখুন, বাংলায় আবার বাবরি ফিরে আসছে, হিন্দুরা ও মন্দিরগুলি বিপদের মধ্যে আছে। অতএব হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপি কে ভোট দিয়ে নিজের ধর্ম ও বাংলাকে বাঁচান। “ এইভাবে হিন্দু ভোট বাড়াতে সাহায্য করবে।

শেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হুমায়ুন কবীরের এই পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় মনে হলেও, এর শিকড় পুরোটাই রাজনৈতিক স্বার্থে গাঁথা।তাই সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে যে, নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে যেন তারা ব্যবহৃত না হন। মসজিদ বা মন্দিরের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন উচ্চমানের শিক্ষা, হাসপাতাল, এবং কর্মসংস্থান। শুধু স্কুল বানিয়ে লাভ হবেনা, যেমনটা বাংলার অবস্থা হয়ে আছে, উচ্চমানের সুশিক্ষার দিকটাও নিশ্চিত করতে হবে। 

প্রশাসনকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কোনো দাঙ্গা না বাঁধে।  হুমায়ুন কবীর হয়তো একটি ইটের গাঁথনি দিয়েছেন, কিন্তু তিনি আসলে বাংলার রাজনীতিতে বিভেদকরনের এক বিশাল প্রাচীর তোলার চেষ্টা করছেন। এটি যদি সফল হয়, তবে ক্ষতিটা কোনো দলের হবে না, ক্ষতি হবে বাংলার সম্প্রীতির। ইতিহাস সাক্ষী, আবেগের রাজনীতি সাময়িক হাততালি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter