রমজানের প্রকৃত মর্মার্থ: নফসের দাসত্ব হতে আত্মার মুক্তির এক ক্রন্দন
আজ পবিত্র জুমুআর নামাজে মিম্বরের সামনে বসে যখন খতিব সাহেবের খুতবা শুনছিলাম, আমার বুকের ভেতরটা যেন এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল। জুমুআর সেই পুণ্যময় ক্ষণে, মসজিদের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন আমার তন্দ্রাচ্ছন্ন রুহকে সজোরে নাড়া দিচ্ছিল। খতিব সাহেব অত্যন্ত দরদমাখা কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দিলেন, আমরা অনেকেই ‘রোজা’ রাখছি ঠিকই, কিন্তু ‘সিয়াম’ পালন করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। ফার্সি শব্দ ‘রোজা’র সাধারণ অর্থ হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। কিন্তু কোরআনের ভাষায় যাকে ‘সিয়াম’ বলা হয়েছে, তার মর্মার্থ আরও গভীর, আরও ব্যাপক। সিয়াম হলো আত্মশুদ্ধির এক নিবিড় সাধনা, নফসের (প্রবৃত্তির) লাগাম টেনে ধরে খোদায়ী প্রেমের দরবারে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
অথচ কী নিদারুণ পরিহাস! আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, যারা রমজান এলেই নিত্যনতুন খোঁড়া যুক্তির অবতারণা করে। শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত মানবাত্মা আজ কতই না ঠুনকো অজুহাতের আশ্রয় নেয়। একটুখানি শিরঃপীড়া, সামান্য বক্ষব্যথা কিংবা নামেমাত্র অসুস্থতার দোহাই দিয়ে তারা স্রষ্টার এক মহান ফরজ বিধানকে অবলীলায় পদদলিত করে। অথচ কী আশ্চর্য, শাওয়ালের একফালি বাঁকা চাঁদ আকাশে উঁকি দিলেই তাদের সেই চিরস্থায়ী ব্যাধিগুলো জাদুর মতো কর্পূরের ন্যায় উবে যায়! এই ভণ্ডামি, এই মুনাফিকি কি মহাশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে ধোঁকাবাজি নয়? খতিব সাহেবের এই কথাগুলো যখন শুনছিলাম, তখন আমার কল্পনার পাতায় ভেসে উঠল এক ভয়াবহ হাদিসের দৃশ্যপট, যেখানে স্বয়ং রহমতের নবী, মানবতার মুক্তির দিশারী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এক দুর্ভাগা সম্প্রদায়ের জন্য বদদোয়া করেছেন এবং জিবরাঈল (আ.) তাতে ‘আমিন’ বলেছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَقِيَ الْمِنْبَرَ فَقَالَ: «آمِينَ، آمِينَ، آمِينَ»... وَمَنْ أَدْرَكَ شَهْرَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ فَدَخَلَ النَّارَ فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ، قُلْ: آمِينَ، فَقُلْتُ: آمِينَ.
"আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বরে আরোহণ করার সময় বললেন, 'আমিন, আমিন, আমিন।'... জিবরাঈল (আ.) বললেন, 'ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক, যে রমজান মাস পেল অথচ তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না, অতঃপর সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে নিজ রহমত থেকে দূর করে দিন। আপনি বলুন, আমিন।' তখন আমি বললাম, 'আমিন'।" (ইবনে হিব্বান, সহিহ আল-জামি)
কী ভয়ংকর এই হুংকার! যে মাসে আসমানের রহমতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, সেই মাসেও যে হতভাগ্য নিজ আত্মাকে কলুষমুক্ত করতে পারল না, তার চেয়ে বড় ব্যর্থ, বড় জালিম আর কে হতে পারে?
আপনজনের মজলিস ও গীবতের বিষাক্ত ছোবল
মসজিদ থেকে ফিরে আমি যখন আমার চারপাশের পরিবেশ, এমনকি আমার একান্ত আপনজন ও আত্মীয়স্বজনের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন এক তীব্র হতাশায় আমার হৃদয় মুষড়ে পড়ে। আমি নিজের চোখেই দেখেছি, ইফতারের অপেক্ষায় বসে থাকা রোজাদার আত্মীয়রা কীভাবে অবলীলায় অন্যের গীবত বা পরনিন্দায় মেতে ওঠে। যাদের তারা অপছন্দ করে বা যাদের প্রতি তাদের অন্তরে বিদ্বেষের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে, তাদের সমালোচনা করতে করতে তারা যেন পৈশাচিক আনন্দ লাভ করে।
মুখে তারা রোজাদার, পেটে তাদের ক্ষুধার তীব্রতা, অথচ জিহ্বা দিয়ে তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করে চলেছে! এই কি সিয়ামের শিক্ষা? রমজান কি কেবল পাকস্থলীকে উপবাস রাখার নাম? সামান্য কিছু না-পাওয়ার ক্ষোভে বা তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থে আমরা কথায় ও আচরণে আমাদের আপনজন, প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছি। আমাদের রূঢ় বাক্যবাণ, আমাদের শ্লেষাত্মক মন্তব্য অন্যের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করে, তা কি আমাদের সারাদিনের উপবাসকে এক নিমিষেই ভস্মীভূত করে দেয় না?
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
"যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ করা বর্জন করল না, তার এই পানাহার ত্যাগ করায় (উপবাস থাকায়) আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই।" (সহিহ বুখারি: ১৯০৩)
এই হাদিসটি যেন আমাদের সমাজের এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। আমরা হালাল খাবার থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি ঠিকই, কিন্তু হারাম কথা, মিথ্যাচার, চোগলখুরি আর অন্যের চরিত্রে কালিমা লেপন করার মতো মারাত্মক হারাম কাজগুলো থেকে আমাদের জিহ্বাকে সংযত করতে পারিনি। তাই তো আমাদের এই রোজা কেবলই উপবাসের ক্লান্তি, এর মাঝে নেই কোনো ইবাদতের মিষ্টতা, নেই কোনো তাকওয়ার সুবাস।
অন্তর্জালের মায়াজাল: দৃষ্টির ব্যভিচার ও আত্মার অবক্ষয়
বর্তমান যুগের এক সর্বনাশা ব্যাধি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে আমরা হয়তো পানশালায় যাই না, প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত হই না, কিন্তু আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটিই যেন আজ এক আধুনিক মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। রোজার দীর্ঘ সময় কাটানোর অজুহাতে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ আটকে রাখছি। আর এই অন্তর্জালের রঙিন মায়াজালে ভেসে আসছে অসংখ্য হারাম দৃশ্য, অশ্লীল ছবি ও ভিডিও, যা আমাদের চোখ দিয়ে সরাসরি আমাদের রুহ বা আত্মাকে বিষাক্ত করে তুলছে।
আমরা ভুলে যাই যে, কেবল পেট নয়, রোজার দিনে আমাদের চোখেরও রোজা থাকে, কানেরও রোজা থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি, অশ্লীল বিনোদন উপভোগ করা কিংবা হারাম কনটেন্টে মগ্ন থাকা—এসবই দৃষ্টির ব্যভিচার।
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
"মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এতেই তাদের জন্য রয়েছে পবিত্রতা। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেখানে দৃষ্টি সংযত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে আমরা রোজার মতো এক পবিত্রতম ইবাদতরত অবস্থায় সেই দৃষ্টিকে শয়তানের চর হিসেবে ব্যবহার করছি। এই দ্বিমুখী আচরণ আমাদের ঈমানের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। আমরা এক হাতে তসবিহ ঘুরাচ্ছি, আর অন্য হাতে স্ক্রল করে চলেছি অন্তহীন পাপাচারের এক বিষাক্ত দুনিয়া। এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে আমাদের কবে মুক্তি মিলবে?
কৈশোরের অবাধ্যতা ও প্রাপ্তবয়স্কদের উদাসীনতা: একটি পারিবারিক আখ্যান
রমজানের এই অবমাননা ও উদাসীনতা কেবল বয়স্কদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, তা আমাদের তরুণ প্রজন্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক ভয়াবহ ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আমার নিজের ঘরেরই এক মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা আজ আমাকে এই কথাগুলো লিখতে বাধ্য করছে। আমার ১৪ বছর বয়সী সৎভাই, বয়সের দিক থেকে যে এখন শরীয়তের বিধান পালনে বাধ্য (মুকাল্লাফ), তার আচরণ আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে।
প্রতি রাতেই সে অত্যন্ত উৎসাহের সাথে পরিবারের সবার সাথে সাহরি খেতে ওঠে। সাহরির আয়োজনে তার কোনো কমতি থাকে না। কিন্তু বেলা গড়াতেই আমি লক্ষ্য করি, সে অবলীলায় তার রোজা ভেঙে ফেলছে, লুকিয়ে কিংবা কখনও প্রকাশ্যে খাবার খাচ্ছে। আমি যখন তাকে এই বিষয়ে ভৎসনা করলাম, জানতে চাইলাম কেন সে সাহরি খেয়েও রোজা রাখছে না, তখন সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল— "বড়রাই তো অনেকেই রোজা রাখে না, তাহলে আমি কেন রাখব?"
তার এই একটি কথা যেন আমার কানে সিসা ঢেলে দিল! কী ভয়ংকর এই স্পর্ধা, কী নিদারুণ এই অজ্ঞতা! আমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না। তাকে কাছে বসিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় অথচ আবেগময় কণ্ঠে বললাম, "শোন হে তরুণ, আজ তুমি যাদের উদাহরণ দিয়ে নিজের পাপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছ, সেই বড়রাও কিন্তু একসময় তোমারই মতো কিশোর ছিল। তারা রমজানের মহানুভবতা বোঝেনি, স্রষ্টার এই অসীম রহমতের সুযোগকে তারা পায়ে ঠেলেছিল। তারা ভেবেছিল, যৌবনের এই উদ্দীপ্ত সময়ে রোজার মতো কঠোর সংযম তাদের জন্য নয়। সেই কৈশোরের অবাধ্যতাই আজ তাদের পরিণত বয়সের অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। তাদের অন্তর আজ মোহরাঙ্কিত হয়ে গেছে, তাদের কলবে আজ জং ধরেছে। তুমিও কি চাও তাদের মতো তোমার আত্মাও এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাক?"
রমজান তো কেবল ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করার মাস নয়, এটি হলো ক্ষমার এক সুবর্ণ সুযোগ, খোদায়ী রহমতের এক অবারিত বারিধারা। যে ব্যক্তি এই মাসেও নিজ প্রভুর কাছে দু'ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ফেলে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারল না, তার মতো দুর্ভাগা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর কেউ নেই। আমরা ভুলে যাই যে, আমাদের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগামী রমজান আমাদের নসিবে জুটবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা কি আমাদের কাছে আছে?
পরিশেষে, আমার এই আর্তনাদ কেবল আমার নিজের বা আমার সেই কিশোর ভাইয়ের প্রতি নয়, বরং সেই সমস্ত দাম্ভিক ও উদাসীন মানুষের প্রতি, যারা রমজানের পবিত্রতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। আসুন, আমরা আত্মবিশ্লেষণ করি। গীবত, পরনিন্দা, অন্তর্জালের হারাম আসক্তি এবং ঠুনকো অজুহাতে রোজা তরক করার মতো গাফেলতি থেকে নিজেদের মুক্ত করি। নফসের এই গোলামির শৃঙ্খল ভেঙে আমরা যেন প্রকৃত সিয়ামের মাধ্যমে আমাদের আত্মাকে খোদায়ী নূরে আলোকিত করতে পারি। অন্যথায়, রোজ হাশরের ময়দানে এই রমজানই আমাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে এবং জিবরাঈল (আ.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ভয়াবহ বদদোয়া আমাদের চিরস্থায়ী ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রকৃত সিয়াম পালনের তৌফিক দান করুন এবং আত্মশুদ্ধির এই মহামূল্যবান মাসকে কাজে লাগিয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করুন। আমিন।