রমজান মাসে তাকওয়া অর্জন ও তা বজায় রাখার উপায়
তাকওয়ার পরিভাষা
‘তাকওয়া’ অর্থ আল্লাহতায়ালার ভয়ে ভালো-মন্দ, হক-বাতিল, সত্য-মিথ্যা এর মধ্যে পৃথকিকরণ এবং উত্তম বিকল্প নির্বাচন। মোট কথা আল্লাহর পথ ও তাগুতের পথ বাছাই করে চলা। পবিত্র কুরআন সেই পার্থক্যের পথ দেখাবে। সুতরাং তাকওয়ার বাস্তব প্রয়োগের জন্য আল কুরআনের প্রাত্যহিক অধ্যয়ন ও অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে। পবিত্র কুদাআন অনুযায়ী নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে এটিই হবে তাকওয়ার পরিচর্যা, এটিই হবে তাকওয়ার বাস্তব প্রতিফলন।
তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ স্বরূপ একমাসের ট্রেনিং কোর্সে বিশ্বের মুসলিম প্রশিক্ষণ প্রার্থীরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রূপান্তরিত হয়। ক্রমাগত একটি মাস তাকওয়ার অনুশীলনে প্রতিটি প্রাণ উজ্জীবিত হয়। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে পৃথিবী এখন তাকওয়ার বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিফলন দেখবে। রমযান মুসলিমদের এমন খাঁটি মুত্তাকী তৈরি করেছে যে, তারা তাকওয়ার পথে পথ চলবে। এটিই ইসলামের প্রত্যাশা, এটিই রমযানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বাস্তব প্রতিফলন বা তাকওয়ার পথে চলতে হলে তো ভালো-মন্দের পার্থক্য জানা চাই। প্রশিক্ষণার্থী ভাই-বোনদের মনে থাকার কথা, এই প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে আমাদেরকে তাকওয়ার পথে চলার জন্য একটি গাইড বুক দেওয়া হয়েছিল, সেটির নাম হল আল-কুরআন। আল্লাহতায়ালা এই সম্পর্কে ইরশাদ করেন: ‘রমযান তো সেই মাস যাতে এই কুরআন নাযিল করা হয়েছে। আর এই কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথের দিশা। মানুষের জন্য (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী। (সুরা বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫)
তাকওয়া বজায় রাখার দায়িত্ব
তাকওয়ার পরিচর্যা অব্যাহত রাখা একজন প্রকৃত তাকওয়াবান বা মুত্তাকীর অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, রমযানের পর যদি তাকওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত না থাকে, তবে বুঝতে হবে তার রমযানের সারাদিনের ক্ষুধা, কিয়ামুল লাইল, রাত্রি জাগরণ, ইবাদাত-বন্দেগী কবুল হয়নি। অর্থাৎ তার প্রশিক্ষণ ভেস্তে গিয়েছে। একটি মৌলিক কথা হল, যে-কোনও কাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পূর্বের কাজের সঠিকতার উপর পরবর্তী কাজটি নির্ভর করে। আল্লাহর ইবাদাতের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ভালো কাজ কবুল হওয়ার লক্ষণ হল, ভালো কাজের পর আরেকটি ভালো কাজ করা। একটি ভালো কাজ করার পর আবার ভালো কাজ করা মানে প্রথমটি কবুল হওয়ার আলামত। আর ইবাদাত-বন্দেগীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আল্লাহর কাছে অতিপ্রিয় সহীহ বোখারীর একটি হাদীস থেকে তাই জানা যায়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে কাজ কেউ সর্বদা (নিয়মিত) করে, সেটিই আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রিয়তম। (সহীহ বোখারী হাদীস-৪৩)-এ হাদিসের ব্যাখ্যায় একজন ইসলামি স্কলার বলেছেন, মুমিনের সমস্ত কাজই একটি নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীন হওয়া উচিত। আল্লাহর দ্বীনের সমস্ত কাজ বেশ সাজানো-গুছানো। আল্লাহর নিজের সমস্ত কাজের মধ্যেও
পরিপূর্ণ নিয়ম-শৃঙ্খলা বিরাজমান। দ্বীনের কাজ কখনও খুব বেশি করা, কখনও খুব কম করা অথবা না করা আল্লাহ পছন্দ করেন না। অল্প হলেও সব কাজ সাজিয়ে-গুছিয়ে রুটিন অনুযায়ী নিয়মিতভাবে করা আল্লাহ পছন্দ করেন। এতে তিনি বরকত দেন। আর এভাবে বাস্তব জীবন সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত হয়। আল্লাহ বলেন: ‘অবধারিত মৃত্যু আসা পর্যন্ত নিজের রবের বন্দেগী করে যেতে থাকো।(সূরা হিজর, আয়াত: ৯৯) কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, রমযান আসে, রমযান যায়, আমরা যেখানটাই ছিলাম সেখানটায় থেকে যাই। কোনও প্রতিফলন তো আমাদের চোখে পড়ে না। এর কারণ কি? এটি কি প্রশিক্ষণের ত্রুটি, নাকি প্রশিক্ষণার্থীর ত্রুটি? প্রকৃত কারণ হল না বুঝে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করা।
প্রশিক্ষণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা রয়েছে। সেই বিষয়গুলি হল রমযান, তাকওয়া ও আল কুরআন। আর সেই ভুলটি হল, রমযানের সিয়াম সাধনা থেকে আমরা কুরআন ও তাকওয়াকে আলাদা করে চিন্তা করি। যিনি অন্ধ তার কাছে লাইটের আলোর কোনও মূল্য নেই এবং এই আলো তাকে পথ দেখাতে পারে না। এমনিভাবে আমরা যারা রমযানের রোযা তথা সিয়াম সাধনাকে আল কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছি এবং আল কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝতে ও মানতে এবং তদঅনুযায়ী জীবন গঠন করতে চাই না- তাদেরকে রোযা ও আল কুরআন যৌথভাবে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করতে পারছে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ইবাদত এবং আল কুরআনের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে ভুলে গিয়ে আমরা সস্তা সওয়াবের ডিজিট গণনায় মত্ত হয়ে আছি।
আল্লাহর ভয় ছাড়া রমজানের রোজা রাখা অসার
রমযান এলেই আল্লাহর রহমতের বারিধারা মুষলধারে বর্ষিত হতে থাকে। কোথাও মুষলধারে বৃষ্টি হলে যেমন মাঠ, ঘাট, নদী-নালা ও খাল-বিল প্রত্যেকটির ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী পানি ধরে রাখে, আর যার গভীরতা যত বেশি, তার ধারণ ক্ষমতাও তত বেশি। কিন্তু সমতলভূমিতে পানি তেমন একটা আটকায় না। বৃষ্টি পড়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে পানি শূন্য হয়ে যায়। কারণ সেখানে পানি ধারণ করার মতো কোনও গভীরতাই নেই। গভীরতা না থাকার কারণ কি? কারণ হল, ১১টি মাস গভীরতা সৃষ্টি জন্য চেষ্টা সাধনা করা হয়নি। ফলে যতটুকু গভীরতা ছিল তাও ভরাট হয়ে গিয়েছে। রমযানে মানুষের যতটুকু গভীরতা হয় তা ক্রমাগত ড্রেজিং তথা তাকওয়ার পথে না চলার কারণে পরবর্তী রমযানে সেখানে তাকওয়া নামক আল্লাহর রহমত আটকায় না। অর্থাৎ তাকওয়া তার মধ্যে কোনও প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। রমযানের রহমত, বরকত ও মাগফিরাত কোনওটিই তার ভাগ্যে জোটে না। যদি জুটতো তাহলে পরবর্তী ১১টি মাসেও সে অবশ্যই আল্লাহর রহমত দ্বারা সিক্ত হ’ত। সবুজ-সমারোহে তার প্রতিটি কার্যক্ষেত্র ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে যেত। সমতল ভূমির ন্যায় সিয়াম শুধু ক্ষুধা এবং কিয়ামুল লাইল শুধু রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কোনও ফায়দা দিতে পারেনি।
রাসূল পাক সা. বলেছেন: ‘অনেক রোযাদার এমন রয়েছে, কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া তাদের ভাগ্যে অন্য কিছুই জোটে না। তেমনি রাত্রিতে ইবাদাতকারী অনেক মানুষও এমন রয়েছে, যারা রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারে না। অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারল না, তার শুধু খানাপিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনও প্রয়োজন নেই। রমযানের তাকওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য যে কাজটি করতে হবে তা হল, নিজের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা। এটাই তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। কিন্তু মানুষের যদি এই জ্ঞানই না থাকে কিসে তার ক্ষতি, কিসে তার ভালো। তবে সে কীভাবে সেই পার্থক্য নিরূপণ করবে? তাই ভালো-মন্দ যাচাই করার জন্য দরকার একটি কষ্টিপাথর। আর পবিত্র কুরআনই হল সেই কষ্টিপাথর যার মাধ্যমেই একমাত্র হক ও বাতিল, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া গুণ সৃষ্টি করা, কুরআনের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন: ‘আলিফ-লাম-মিম (এই নাও) সেই কিতাব (আল-কুরআন) তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এটি মুত্তাকী লোকদের পথ দেখাবে। (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১-২)
পবিত্র কুরআন বলবে কোনটি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ, আর – কোনটি তাগুতের পথ। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ হল তার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর জমিনে তাঁরই অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করা। এটিই রমযান, তাকওয়া ও কুরআনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল কুরআন হল রমযানের মধ্যমণি। রমযান ফরয করা হয়েছে আল কুরআনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করার ট্রেনিং তথা প্রশিক্ষণ হিসেবে। আর শুধুমাত্র রমযান নয়, এমনিভাবে আমরা যতগুলি ইবাদাত পালন করে থাকি, যেমন নামায, যাকাত ও হজ প্রতিটি ইবাদাতের লক্ষ্য হল সেই একটিই, আর তা হল আল কুরআন অনুশীলনের সংগ্রামে নিজেকে একজন আদর্শ সৈনিকে পরিণত করা।
উপসংহার
রমযান, কুরআন ও তাকওয়া এই তিনটি পরিভাষা একই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চক্রাকারে আমাদের মাঝে আবর্তিত হয়। আর সেই লক্ষ্য হল ইসলামি সমাজ উপযোগী সৎ নাগরিক তৈরি করা। সুতরাং রমযান চলে গেলে এই পবিত্র মাসে আমাদের মধ্যে তাকওয়ার যে শক্তি অর্জিত হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে যে তাকওয়া আমাদেরকে আল্লাহর দেওয়া জীবন-বিধান এবং কুরআনের মিশনকে পূর্ণ করার যোগ্য করে তুলতে পারে। সেজন্য কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এই পবিত্র মাসের রোযাসহ সব কিছুই কুরআনের সঙ্গে কেন্দ্রীভূত করে দেওয়া হয়েছে। অতএব অধিকাংশ সময় আমাদেরকে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য তা বুঝে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়ত কুরআনের প্রতি এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কুরআনই একমাত্র পারে ব্যক্তি, সমাজ ও যুগকে পালটে দিয়ে একটি কল্যাণমুখী ও সোনালি সূর্যের সন্ধান দিকে। এছাড়া অন্য কোনও মত বা পথে দুনিয়ার কল্যাণ ও আখেরাত মুক্তির কোনও সম্ভাবনা নেই। আল কুরআন ছাড়া মানুষের মুক্তির চিন্তা করা ইহজীবনে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমান এ বিপর্যস্ত পৃথিবীটাই এর প্রধান সাক্ষী। সারা পৃথিবীজুড়ে মানব রচিত আইন কানুন দিয়ে শান্তি আনয়নের বৃথা চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু শান্তি তো দূরের কথা বরং মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অতএব আসুন তাকওয়ার অনুশীলনের জন্য কুরআনকে নিত্যসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করি। একটি তাকওয়াসম্পন্ন জাতির উন্নয়নের লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিনের দ্বার খুলে দেন। এটি আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ বলেন: ‘লোকালয়ে মানুষগুলি যদি ঈমান আনত ও তাকওয়া বা ভয় করত তাহলে আমি তাদের উপর আসমান ও জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম। (সূরা আরাফ, আয়াত: ৯৬)