ওসমান হাদির মৃত্যুতে মানুষের হৃদয়ে বেদনা

         আজকের পৃথিবী যেন হঠাৎ করেই কিছুটা চিহ্নহীন হয়ে গেছে। অকালপ্রয়াত শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির বিদায়ে সমাজ হারিয়েছে এক অকুতোভয় কণ্ঠস্বর, এক আপসহীন যোদ্ধাকে। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি ন্যায়, সাহস ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতির এক দীপ্ত অধ্যায়ের অবসান। এই শোক শুধু পরিবার বা সহযোদ্ধাদের নয় এ শোক ছড়িয়ে পড়েছে জনতার হৃদয়ে, যেখানে জন্ম নিয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। ব্যক্তিগত বেদনার গণ্ডি পেরিয়ে এই ক্ষতি আজ সামাজিক ও নৈতিক সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আকাশ যেন আজ ভারাক্রান্ত, বাতাসে যেন বিরহের সুর। ওসমান হাদির প্রস্থান আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের মৃত্যু নীরবে কাঁদায়, আবার নীরবতা ভেঙে জাগিয়েও তোলে। তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সত্যের পথে চলা সহজ নয়, নিরাপদও নয়—তবু সেটিই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। তাঁর জীবন ও মৃত্যু আমাদের সামনে রেখে গেছে এক কঠিন প্রশ্ন: আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত, নাকি শুধু ইতিহাসের শোকপাঠে সীমাবদ্ধ থাকব?

সংগ্রামের ভিতর বেড়ে ওঠা এক যোদ্ধা:

ঝালকাঠী জেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ওসমান হাদি শৈশব থেকেই পরিচিত ছিলেন বাস্তবতার কঠিন মুখোমুখি জীবনের সঙ্গে। অভাব, বঞ্চনা ও অবহেলার ভেতর দিয়ে বড় হওয়া এই মানুষটি খুব অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন—ন্যায় কোনো স্বতঃসিদ্ধ উপহার নয়, এটি অর্জন করতে হয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন, প্রশাসনিক অবহেলা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বৈষম্য তাঁর চিন্তাকে শাণিত করে তোলে। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে গড়ে তুলেছিল প্রশ্নকর্তা, প্রতিবাদী এবং দায়িত্ববান এক নাগরিক হিসেবে।

ক্ষমতার উত্তরাধিকার বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নয়—ওসমান হাদির মূল শক্তি ছিল জনতার বিশ্বাস। তিনি কথা বলতেন স্পষ্ট ভাষায়, চোখে ছিল আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি এবং সিদ্ধান্তে ছিল আপসহীন দৃঢ়তা। ব্যক্তিগত লাভ বা সুবিধার আশায় কখনো আদর্শ বিসর্জন দেননি। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান সবসময় ছিল স্পষ্ট—ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো ধূসরতা নেই। এই স্পষ্টতা তাঁকে একদিকে জনপ্রিয় করেছে, অন্যদিকে পরিণত করেছে ঝুঁকিপূর্ণ এক কণ্ঠে।

২৪ জুলাই ওসমান হাদির জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তিনি কেবল একজন অংশগ্রহণকারীই নন, বরং এক দৃশ্যমান সংগ্রামী চরিত্রে রূপ নেন। স্লোগান, মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃঢ় ও নির্ভীক। ভয়ের রাজনীতি কিংবা হুমকির সংস্কৃতি তাঁকে দমাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধা তাঁর কণ্ঠকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে, অবস্থানকে করেছে আরও সুদৃঢ়।

এই সময়েই তিনি প্রমাণ করেন—সংগ্রাম তাঁর কাছে কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং জীবনের নৈতিক দায়। জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে তিনি এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে, জেনে-বুঝেই ঝুঁকি নিয়েছেন। এই অবিচলতা ও আত্মত্যাগই ওসমান হাদিকে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর গণ্ডি ছাড়িয়ে এক আদর্শিক যোদ্ধায় পরিণত করেছে—যাঁর সংগ্রাম আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।

শাহবাগ থেকে ইনকিলাব মঞ্চ: আদর্শের পথচলা

শাহবাগের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে ওসমান হাদির উপস্থিতি ছিল দৃঢ়, সচেতন ও নির্ভীক। তিনি সেখানে কেবল একজন আন্দোলনকারী ছিলেন না; ছিলেন নৈতিক অবস্থানের এক প্রতীক। শুরু থেকেই তিনি একটি বিষয়ে আপসহীন ছিলেন—গণহত্যার বিচার, দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহি ছাড়া নতুন বাংলাদেশ নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। এই স্পষ্ট অবস্থান তাঁকে অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে, একই সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরাগভাজনও বানিয়ে দেয়। তবুও হাদি কখনো পিছু হটেননি, বরং প্রতিটি হুমকি ও প্রতিবন্ধকতাকে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তীব্রতা যেমন কমেছে, তেমনি অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ বাস্তবতার নামে আপসের পথ বেছে নিয়েছেন, কেউ ক্ষমতার সান্নিধ্যে গিয়ে নিজেদের অবস্থান বদলেছেন। কিন্তু ওসমান হাদি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি একা হয়েছেন, দলছুট হয়েছেন, এমনকি ভুল বোঝাবুঝি ও বিচ্ছিন্নতার শিকারও হয়েছেন—তবু আদর্শচ্যুত হননি। তাঁর কাছে বিপ্লব কোনো মৌসুমি আবেগ বা রাজনৈতিক সুবিধার সিঁড়ি ছিল না; এটি ছিল এক গভীর নৈতিক দায়িত্ব, যার দায় তিনি আজীবন বহন করেছেন।

এই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ। এটি কোনো প্রচলিত দলীয় কাঠামো নয়; বরং অন্যায়, দুঃশাসন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক স্বাধীন মঞ্চ। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংযোগ ঘটান—যেখানে গান, কবিতা, বক্তব্য ও আন্দোলন একত্র হয়ে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। এই মঞ্চ দ্রুতই তরুণদের, সচেতন নাগরিকদের এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাওয়া মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। হাদি সেখানে কেবল মুখপাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই আন্দোলনের প্রাণ, নৈতিক কম্পাস ও প্রেরণা।

সাধারণ জীবন, অসাধারণ আদর্শ

ওসমান হাদির জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সাধারণ জীবনযাপন। নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলেও তিনি নিজেকে কখনো এলিট পরিসরে আবদ্ধ করেননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে নির্বাচনী খরচ জোগাড় করতে তিনি লজ্জাবোধ করেননি। বরং এই পথকেই তিনি সম্মানের বলে মনে করতেন। মুড়ি-বাতাসা হাতে নিয়ে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের কথা শোনা এবং তাঁদের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব রূপ।

তাঁর কথায়, লেখায় ও বিশ্বাসে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের আয়ু কিংবা মৃত্যুর মুহূর্ত কোনো পার্থিব শক্তির হাতে নয়। মৃত্যুর আগেও তাঁর উচ্চারণ—

“মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে নয়, আসমানে হয়”—

এই বিশ্বাসই তাঁকে অন্যায়ের সামনে অবিচল রেখেছিল। ভয় নয়, বরং বিশ্বাসের শক্তিতেই তিনি সত্যের পথে অটল ছিলেন।

এই সাধারণতা, নিষ্ঠা ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তাই ওসমান হাদিকে কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকা এক আদর্শিক প্রতীকে পরিণত করেছে।

সাধারণ জীবন, অসাধারণ আদর্শ:

ওসমান হাদির জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাপন। রাজনীতিকে তিনি কখনো ক্ষমতা অর্জনের শর্টকাট বা ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সময় তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন—দলীয় প্রতীকের নিরাপত্তার আড়ালে নয়, বরং জনতার সরাসরি বিশ্বাসের ওপর ভর করে। মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে নির্বাচনী খরচ জোগাড় করাকে তিনি অসম্মানের কিছু মনে করেননি; বরং এটিকেই তিনি গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বলে বিশ্বাস করতেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর হাতে থাকত না বিলাসবহুল গাড়ি বা ব্যয়বহুল ব্যানার। অনেক সময় মুড়ি-বাতাসা হাতে নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন দরিদ্র মানুষের ঘরে, বসেছেন মাটিতে, শুনেছেন তাঁদের জীবনের কথা। এই সরল আচরণ ছিল লোক দেখানো নয়—এটাই ছিল তাঁর স্বাভাবিক জীবনদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যাঁদের জন্য রাজনীতি, তাঁদের কাছেই রাজনীতিকের স্থান হওয়া উচিত। এই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে কেবল গ্রহণযোগ্যই করেনি, বরং হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী করে তুলেছে।

তাঁর কথায়, লেখায় ও চিন্তায় ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবন ও মৃত্যুর ফয়সালা কোনো পার্থিব শক্তির হাতে নয়। মৃত্যুর আগেও তাঁর উচ্চারণ—

“মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে নয়, আসমানে হয়”—

এই বিশ্বাস তাঁর ব্যক্তিত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করত। ভয়, হুমকি বা অনিশ্চয়তা তাঁকে সত্যের পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই তাঁকে অন্যায়ের সামনে নির্ভীক ও অবিচল রেখেছিল।

এই সাধারণতা, আত্মত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তাই ওসমান হাদিকে কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী নয়, বরং এক জীবন্ত আদর্শে পরিণত করেছে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—বড় হতে হলে বিলাসী হতে হয় না; মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস থাকলেই একজন মানুষ ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারেন।

একটি মৃত্যু, বহু প্রশ্ন:

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু আমাদের সামনে রেখে গেছে কিছু কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন—যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা কি সত্যিই এমন সাহসী ও আপসহীন কণ্ঠকে রক্ষা করতে পেরেছি? নাকি ভয়ের সংস্কৃতি, সুবিধাবাদ আর নীরবতার আড়ালে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে তাকে একা করে ফেলেছি? তাঁর মৃত্যু কেবল শোকের উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার আয়নায় নিজের মুখ দেখার মুহূর্ত।

এই মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষেরা প্রায়ই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, আর সমাজ তখন নিরব দর্শকের ভূমিকায় নেমে আসে। ওসমান হাদি সেই নিঃসঙ্গতার মাঝেও আপস করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন—সবাই একদিন মারা যায়, কিন্তু শহীদ হতে পারে কেবল তারাই, যারা সত্যের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করে না। এই বিশ্বাস তাঁকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল রেখেছে।

হাদি শেষ হয়ে যাননি। তিনি আছেন মানুষের কণ্ঠে, অসমাপ্ত বিচারের দাবিতে, প্রতিটি প্রতিবাদী উচ্চারণে। তিনি একটি নামমাত্র নন—তিনি একটি অবস্থান, একটি নৈতিক প্রশ্ন, একটি অস্বস্তিকর সত্য। তাঁর স্মৃতি আমাদের বারবার প্রশ্ন করবে আমরা কোন পক্ষে দাঁড়াব? নীরবতার, না ন্যায়ের?

উপসংহার:

ওসমান হাদির মৃত্যুতে মানুষের হৃদয়ে যে বেদনা জন্ম নিয়েছে, তা শুধু শোকের নয়—তা গভীর কৃতজ্ঞতারও। কৃতজ্ঞতা এমন একজন মানুষের জন্য, যিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন সাহস, নিষ্ঠা ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রকৃত অর্থ। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, আদর্শের পথে চলা সহজ নয়, কিন্তু সেটিই মানুষকে ইতিহাসে অমর করে তোলে। নতুন বাংলাদেশ যখন নিজেকে খুঁজবে, যখন ন্যায়ের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারিত হবে, তখন শহীদ ওসমান হাদির নাম বারবার ফিরে আসবে—সাহসের মানদণ্ড হিসেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার প্রতীক হিসেবে। তাঁর জীবন ও মৃত্যু আমাদের জন্য রেখে গেছে এক অমোচনীয় উত্তরাধিকার।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter