আন্তরিকতার পথ: বাম্বুরাম থাঙ্গালের বা-'আলাউই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং মম্বুরাম উরসের জীবন্ত উত্তরাধিকার
ভূমিকা: মালাবার উপকূলে তারিমের সুবাস
কাডালুন্ডি নদীর শান্ত জলধারা যেখানে আরব সাগরের নীল জলরাশির সাথে আলিঙ্গন করে, ঠিক সেখানেই কেরালার মালাপ্পুরাম জেলার তিরুরঙ্গাদি তালুকের বুকে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মম্বুরাম মাকাম। প্রতি বছর যখন ইসলামি বর্ষপঞ্জির পবিত্র মহররম মাসের বিশেষ তিথি ঘনিয়ে আসে, তখন এই নদীর তীরবর্তী প্রান্তর এক অভূতপূর্ব ঐশ্বরিক স্পন্দনে স্পন্দিত হয়ে ওঠে। বাতাসে সুবাসিত ধূপ, উদ এবং লুবানের সুঘ্রাণ মম্বুরামের আকাশ-বাতাসকে এক অপার্থিব পবিত্রতায় ভরিয়ে দেয়। চতুর্দিক থেকে লাখো শুভ্র পোশাকধারী মুমিন ও আশেকানের ঢল নামতে শুরু করে এই পুণ্যভূমিতে। তাঁদের সমবেত কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে জিকিরের গম্ভীর সুর, মাওলিদের সুললিত বন্দনা এবং সালাত-সালামের পবিত্র গুঞ্জন। এই ভাবগম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক উৎসবটিই হলো দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক সমাবেশ’ “মম্বুরাম উরস মুবারক” বা “মম্বুরাম নের্চা”।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই বিশাল বার্ষিক আয়োজনকে সাধারণ কোনো সামাজিক বা ঐতিহাসিক মেলা মনে হতে পারে, কিন্তু সূক্ষ্ম ও গভীর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি কেবল একটি পার্থিব প্রথা নয়। এটি আসলে সুদূর ইয়েমেনের ‘তারিম’ (Tarim) উপত্যকা থেকে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ পাড়ি দিয়ে মালাবার উপকূলে এসে প্রস্ফুটিত হওয়া এক অনন্য আধ্যাত্মিক সিলসিলার জীবন্ত ফসল, যার নাম “বা-‘আলাউই ত্বরিকা” (Ba ‘Alawi Tariqah)। এই সমাবেশ প্রমাণ করে যে, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ইখলাস বা নিখাদ আন্তরিকতার ডানায় ভর করে এক অঞ্চলের মানুষের আত্মাকে অন্য অঞ্চলের সাথে যুক্ত করে। মম্বুরাম উরস হলো ইয়েমেনের আধ্যাত্মিক সুবাস এবং কেরালার স্থানীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার সতেজতা ও বারাকাহ অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
বা-‘আলাউই আধ্যাত্মিক পথ কী?
ইসলামি তাসাউউফের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বা-‘আলাউই ত্বরিকা এক অনন্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সাধনা ধারা হিসেবে স্বীকৃত। এই ধারার মূল প্রবক্তা ও অনুসারী হলেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বংশধর বা সাদাত (Saadaat) সমাজ, যাঁরা মূলত ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলের ঐতিহাসিক তারিম শহরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। হিজরি সপ্তম শতকে (১২৩২ খ্রিষ্টাব্দে) এই ত্বরিকার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন আল-ফকিহ আল-মুকাদ্দাম সৈয়দ মুহাম্মদ বিন আলী বা-‘আলাউই। তৎকালীন সময়ে হাদরামাউতের গোত্রীয় সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহের পটভূমিতে তিনি এক বৈপ্লবিক আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর বংশধর ও অনুসারীদের তরবারি তথা সামরিক অস্ত্র ত্যাগ করার নির্দেশ দেন এবং তার পরিবর্তে আত্মশুদ্ধি, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং শান্তিপূর্ণ দাওয়াহর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ দেখান। এই ধারাটি তাত্ত্বিকভাবে ইমাম গাজ্জালীর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ এবং কাদেরিয়া ও শাজিলিয়া ত্বরিকার ভাবধারার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
বা-‘আলাউই আধ্যাত্মিক পথের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি শরিয়তের (Shariah) কঠোর অনুশাসনের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই ত্বরিকার সাধকগণ মনে করেন, শরিয়তের বাহ্যিক বিধানকে বাদ দিয়ে মারেফাত বা হাকিকতের দাবি করা এক ধরনের বিভ্রান্তি মাত্র। এই পথের মূল কাঠামো পাঁচটি অপরিহার্য স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
ইলম (ঐশী জ্ঞান): বিশেষত আল-কুরআন, সুন্নাহ এবং ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম নববীর গ্রন্থসমূহের গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করা।
আমল (ঐকান্তিক অনুশীলন): অর্জিত জ্ঞানকে দৈনন্দিন জীবনে ইবাদত ও নৈতিকতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা।
ওরা’ (সতর্কতা ও পরহেজগারি): সন্দেহজনক ও হারাম বিষয় থেকে নিজের অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে কঠোরভাবে বাঁচিয়ে রাখা।
খওফ (আল্লাহভীতি): অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্বের ভয় লালন করা এবং সর্বদা জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত রাখা।
ইখলাস (নিখাদ আন্তরিকতা): প্রতিটি কাজ কেবল এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পন্ন করা, যেখানে লোকদেখানো বা সামাজিক প্রতিপত্তির কোনো স্থান থাকবে না।
এই ত্বরিকার আরেকটি অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ‘খুমুল’ (Khumul) বা নিভৃতচারিতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা। বা-‘আলাউই সাধকগণ সুখ্যাতি, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং আত্মজাহির করার প্রবণতাকে অন্তরের মারাত্মক রোগ মনে করেন এবং তা থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকেন। তবে এই নিভৃতচারিতার অর্থ সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে বৈরাগ্যসাধন করা নয়। বরং সমাজে থেকে, মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়িয়ে, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও বিনয় প্রদর্শন করার মাধ্যমে তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই বা-‘আলাউই পথের মূল শিক্ষা।
সৈয়দ আলাভি থাঙ্গাল: কেরালায় তারিমের জীবন্ত প্রতিফলন
১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ অক্টোবর (২৩ জিলহজ ১১৬৬ হিজরি) ইয়েমেনের হাদরামাউতের তারিম শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও পবিত্র সাদাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ আলাভি থাঙ্গাল। তাঁর পিতা সৈয়দ মুহাম্মদ বিন সাহল আল-মাওলাদাবিলা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম এবং মা সৈয়দা ফাতিমা ছিলেন বিখ্যাত সুফি সাধক শেখ হাসান জিফরির বোন। শৈশবেই পিতামাতাকে হারিয়ে তিনি তাঁর খালার সান্নিধ্যে প্রতিপালিত হন। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং তারিমের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শাফেয়ী ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তৎকালীন সময়ে তাঁর মামা শেখ হাসান জিফরি এবং শেখ আল-জিফরি দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে কেরালার মালাবার উপকূলে গমন করেছিলেন এবং সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। মামাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তরুণ সৈয়দ আলাভি ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দর থেকে জাহাজে চড়ে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৯ রমজান হিজরি ১১৮৩) মালাবারের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছান এবং পরবর্তীতে মম্বুরাম নামক স্থানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।
মম্বুরাম থাঙ্গাল কেরালায় এসে কেবল এক সাধারণ ধর্মীয় গুরু হিসেবে জীবনযাপন করেননি, বরং তিনি বা-‘আলাউই ত্বরিকার সেই ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও পরহেজগারির আলোয় সমগ্র মালাবার অঞ্চলকে আলোকিত করেছিলেন। তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনন্য যোগ্যতার কারণে সমসাময়িক সুন্নি সমাজ ও উলামায়ে কেরাম তাঁকে “কুতুবুজ্জামান” (Qutb al-Zaman) বা যুগের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে বা-‘আলাউই ত্বরিকার মূল আদর্শ অনুযায়ী, তাঁর এই আধ্যাত্মিকতা কেবল জায়নামাজ বা হুজরাখানার চার দেয়ালে অবরুদ্ধ ছিল না। তিনি আধ্যাত্মিক সাধনাকে সামাজিক সক্রিয়তায় (Spiritual Activism) রূপান্তর করেছিলেন। রাতের গভীরে যখন তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন, দিনের আলোয় তিনিই আবার হয়ে উঠতেন নিপীড়িত ও মজলুম মানুষের মুক্তির দূত। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির অন্যায় কর ব্যবস্থা এবং তাদের মদদপুষ্ট স্থানীয় জমিদারদের (জন্মি) চরম শোষণের বিরুদ্ধে তিনি মজলুম কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি “চেরুর যুদ্ধ” (Cherur Pada)-এর মতো ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আন্দোলনে যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইকে ঈমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
থঙ্গালের এই বিপ্লবী চরিত্র ছিল মূলত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহান আখলাকেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর উদারতা ও নৈতিক দৃঢ়তা কেবল মুসলমানদেরই নয়, বরং অমুসলিমদেরও বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তৎকালীন হিন্দু社会的 তথাকথিত নিম্নবর্ণের দলিত সম্প্রদায়, যারা জমিদারদের দ্বারা অস্পৃশ্য ও চরম লাঞ্ছিত ছিল, তারা মম্বুরাম থাঙ্গালের দরবারে এসে মানুষের মর্যাদা ফিরে পেত। তাঁর বিশ্বস্ত হিন্দু দেওয়ান ও সহযোগী ‘কোনথু নায়ার’-এর সাথে তাঁর সুগভীর সম্পর্ক কেরালার ইতিহাসে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনুপম উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
তিনি তাঁর জীবনে একাধিক বিবাহ করেন এবং তাঁর বংশধারা ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার কেরালায় ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন হাসান আল-জিফরির কন্যা ফাতিমা, যার গর্ভে সৈয়দা আলাভিয়্যা ও সৈয়দা শরিফা নামে দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম স্ত্রীর ওফাতের পর তিনি কোইল্যান্ডির সৈয়দ আবু বকর আল-মাদানির কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেন, যাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র ও উত্তরসূরি সৈয়দ ফজল (ফজল পূকোয়া থাঙ্গাল), যিনি পরবর্তীতে পিতার মতোই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি তানুরের আয়েশা এবং ইন্দোনেশিয়ার স্বালিহাকে বিয়ে করেন। মম্বুরাম থাঙ্গাল তাঁর আধ্যাত্মিক দূরদর্শিতার কারণে কিছু ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎবাণীও করেছিলেন। তিনি তাঁর শিষ্য আবুকোয়াসহ অনুসারীদের কেরালায় সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের আগমন এবং ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ভারতের মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক দারিদ্র্যের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
উরস শব্দের আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব: মৃত্যুর মাধ্যমে পরম মিলন
ইসলামি তাসাউউফের পরিভাষায় ‘উরস’ (Urs) শব্দটি এক সুগভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে। সাধারণ ব্যাকরণগত অর্থে ‘উরস’ মানে বিয়ে বা বাসর মিলন। কিন্তু আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্বে একজন কামিল অলি বা আল্লাহর প্রিয় বান্দার ইহলোক ত্যাগ করার ঘটনাকে ‘মৃত্যু’ বা ‘বিলীন হয়ে যাওয়া’ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে পরম প্রিয় সৃষ্টিকর্তার সাথে রুহের চিরন্তন মিলন বা ‘বিসাল’ (Wisal) বলে অভিহিত করা হয়।
দুনিয়ার জীবন হলো মুমিনের জন্য এক প্রকার বন্দিশালা। এখানে আত্মা তার মূল উৎস তথা মহান আল্লাহর প্রেম থেকে সাময়িকভাবে পার্থিব দেহের খাঁচায় অবরুদ্ধ থাকে। যখন কোনো অলির ওফাত ঘটে, তখন তাঁর আত্মা এই নশ্বর দেহের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চিরন্তন আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করে এবং তাঁর পরম প্রিয় মাবুদের সান্নিধ্যে মিলিত হয়। এই মিলনটি আধ্যাত্মিক কনের বরের সাথে মিলনের মতোই আনন্দময় ও পবিত্র, তাই সুফি পরিভাষায় এই দিনটিকে ‘উরস’ বা বাসর মিলনের উৎসব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দের (১২৬০ হিজরির ৭ মহররম, রবিবার) মম্বুরাম থাঙ্গাল ৮৫ বছর বয়সে পা অবশ হয়ে যাওয়ার অসুস্থতায় ভুগে ইহলোক ত্যাগ করেন এবং মম্বুরামের পবিত্র মাটিতে সমাহিত হন।
সুন্নি আক্বীদা ও তাসাউউফের তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, আল্লাহর নেককার বান্দাগণ মৃত্যুর পরও বরজখের (Barzakh) জীবনে জীবিত থাকেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও সক্রিয়তা বজায় রাখেন। অলিদের কবরে বা মাকামে গিয়ে জিয়ারত (Ziyarat) করার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের অন্তরের কলুষতা দূর করা, মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ বারাকাহ (Barakah) অর্জন করা। মম্বুরাম মাকাম আজ সেই আধ্যাত্মিক বারাকাহ ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের এক অবিকল্প মহাতীর্থে পরিণত হয়েছে, যেখানে জিয়ারতের মাধ্যমে মানুষের রুহানি শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ঈমানি চেতনা শাণিত হয়।
মম্বুরাম উরস আজ: বা-‘আলাউই ঐতিহ্যের জীবন্ত রূপ
১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ আলাভি থাঙ্গালের ওফাতের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর মাকামকে কেন্দ্র করে মম্বুরাম উরস মুবারক অত্যন্ত গুরুত্ব ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে। বর্তমান সময়েও এই উৎসবের প্রতিটি রীতিনীতি ও আমলের মাঝে বা-‘আলাউই ত্বরিকার সেই প্রাচীন ইয়েমেনি ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিফলন স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়।
আধুনিক মম্বুরাম উরসের প্রধান আমলগুলোর সাথে বা-‘আলাউই রীতির গভীর সংযোগ রয়েছে:
রাতিব আল-হাদ্দাদ ও মাওলিদ শরীফ পাঠ: উরসের দিনগুলোতে সমবেত হাজার হাজার আশেকান অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বা-‘আলাউই সিলসিলার মহান ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আলাভী আল-হাদ্দাদ রচিত বিশ্বখ্যাত আওরাদ ‘রাতিব আল-হাদ্দাদ’ (Haddad Ratib) পাঠ করেন। এই রাতিবের নিয়মিত চর্চা মানুষের মন থেকে দুনিয়ার ভয় দূর করে এবং অন্তরে আল্লাহর জিকিরের গভীর অনুভূতি জাগ্রত করে। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসাগীতি ও মাওলিদ শরীফের সুরময় পাঠ এই উৎসবের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
‘আন্নামুত্তু’ বা ক্ষুধা নিবারণের মহান ঐতিহ্য: তারিমের বা-‘আলাউই সুফিদের অন্যতম প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো ‘ইত্বআমুত ত্বাআম’ (It’am al-Ta’am) বা অকাতরে অন্নদান করা। মম্বুরাম উরসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘আন্নামুত্তু’ (Annamootu), যা হলো একটি বিশাল গণ-খাবার বিতরণ কর্মসূচি। উরসের দিনগুলোতে ধনী-দরিদ্র, চেনা-অচেনা নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষকে পরম আদরে নিখরচায় আহার করানো হয়। এটি মূলত বা-‘আলাউই ঐতিহ্যের সেই শিক্ষারই বাস্তব রূপ, যেখানে মানবসেবাকে স্রষ্টার ইবাদতের সমকক্ষ মনে করা হয়।
সামাজিক সমতার জীবন্ত ক্যানভাস: তৎকালীন কেরালায় যখন উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারদের বাড়িতে নিম্নবর্ণের মানুষের প্রবেশাধিকার পর্যন্ত ছিল না, তখন সৈয়দ আলাভি থাঙ্গাল তাঁর দরবারে বর্ণপ্রথার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। আজও মম্বুরাম উরসের খাবার দস্তরখানে কোনো সামাজিক ভেদাভেদ থাকে না। সমাজের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং সবচেয়ে দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষ একই কাতারে বসে আহার গ্রহণ করেন। এই দৃশ্যটি প্রমাণ করে যে, থাঙ্গাল যে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা আজ দুই শতাব্দী পরও কতটা জীবন্ত এবং প্রাসঙ্গিক।
উপসংহার: আল্লাহর জন্য যা করা হয়, তা অমর
সৈয়দ আলাভি থাঙ্গালের ইন্তেকালের প্রায় দুই শতাব্দী অতিবাহিত হতে চলেছে। সময়ের আবর্তনে কত সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, কত কীর্তিমান মানুষের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে, কিন্তু মম্বুরামের পবিত্র মাটিতে মানুষের সেই বাঁধভাঙা জোয়ার আজও বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। প্রতিদিন এবং বিশেষ করে উরসের দিনগুলোতে হাজার হাজার মানুষের এই আকুল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মম্বুরামের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আজও কেরালা তথা দক্ষিণ ভারতের মানুষের অন্তরে এক অনিঃশেষ বাতিঘর হিসেবে প্রজ্জ্বলিত রয়েছে।
এই চিরন্তন আকর্ষণের রহস্য লুকিয়ে আছে তাসাউউফের একটি পরম সত্যের মাঝে: “যা কিছু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং ইখলাসের সাথে করা হয়, তা কখনোই ধ্বংস হয় না”। সৈয়দ আলাভি থাঙ্গাল তাঁর বংশমর্যাদা, তাঁর গভীর ইলম, তাঁর তীব্র আধ্যাত্মিক সাধনা এবং তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন কেবল আল্লাহর দ্বীনের সত্য প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণে। তিনি খ্যাতির মোহে বা দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্যে কাজ করেননি। বা-‘আলাউই ত্বরিকার সেই নিখাদ ইখলাস, তাজকিয়াতুন নাফস এবং ইহসানের আলোই তাঁর মাকামকে আজও বারাকাহর এক ফলপ্রসূ উৎসে পরিণত করে রেখেছে।
মম্বুরাম উরস আজ কেবল একটি বার্ষিক প্রথা বা সমাবেশ নয়; এটি হলো যুগের পর যুগ ধরে মানুষের অন্তরে আধ্যাত্মিক নবজাগরণ ঘটানোর এক জীবন্ত মাধ্যম। এটি মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত সুফি সাধনা হলো একদিকে নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে আল্লাহর সাথে মারেফাতের সম্পর্ক স্থাপন করা, আর অন্যদিকে সমাজ থেকে অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবতার কল্যাণে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত দুনিয়াতে ইখলাস এবং আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসার অস্তিত্ব থাকবে, ততক্ষণ মম্বুরামের এই আধ্যাত্মিক নদীর সুবাস মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে থাকবে।