মিড-ডে মিল কেলেঙ্কারি এবং ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা সংকট: কর্পোরেট লোভ, খাদ্যে ভেজাল ও সরকারি চরম ব্যর্থতা

বর্তমান সময়ে ভারত এক গভীর খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ দু'বেলা দু'মুঠো খাবারের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে দেশের আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং সচেতন নাগরিকরাও না জেনে প্রতিদিন কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর তৈরি বিষাক্ত ও ভেজাল খাবার গ্রহণ করছে। ভারতের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে খাদ্য নিরাপত্তা আজ কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অধিকার বা 'প্রিভিলেজড ইস্যু' হয়ে দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, খাদ্যে ভেজালের মতো এত বড় একটি সংকট দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা বা নির্বাচনী প্রচারণায় সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। সরকারের চরম নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক কর্পোরেট কোম্পানিগুলো (MNCs) মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে এবং বিপুল মুনাফা লুটছে। ফলস্বরূপ, দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব আজ এসে পড়েছে হাতেগোনা কয়েকজন স্বাধীন অ্যাক্টিভিস্টের কাঁধে, যারা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই খাদ্যের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন। আজকের এই আলোচনায় আমরা একদিকে যেমন প্রাত্যহিক খাবারে কর্পোরেট ভেজালের রূপরেখা তুলে ধরব, ঠিক তেমনিভাবে আলোচনা করব সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও কেলেঙ্কারির দিকটি—দরিদ্র শিশুদের পুষ্টির আধার 'মিড-ডে মিল' প্রকল্প থেকে ডিম বাদ দেওয়ার অমানবিক সিদ্ধান্ত।

কর্পোরেট লোভ: প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় খাবারে ভেজালের মহোৎসব

মুনাফার লোভে অন্ধ হয়ে ভারতের বড় বড় খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনীয় খাবারে ভেজাল মেশাচ্ছে। মধু থেকে শুরু করে দুধ, ঘি, পনির এবং প্রোটিন পাউডার—কোনো কিছুই আজ কর্পোরেট গ্রাসের বাইরে নয়।

মধুর বড় কেলেঙ্কারি (Honey Scam): মধুর নামে আমরা আসলে যা খাচ্ছি, তা মূলত চিনির রস। এই কেলেঙ্কারির মূলে রয়েছে চীন থেকে আমদানি করা C3 এবং C4 নামের বিশেষ এক ধরণের সুগার সিরাপ। এই সিরাপের ভয়াবহতা হলো, এটি দিয়ে যদি মধুতে % পর্যন্ত ভেজাল মেশানো হয়, তবে ভারতের সাধারণ ল্যাব টেস্ট বা স্বাদ দিয়ে তা কোনোভাবেই শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এই ভেজাল শনাক্ত করার জন্য একমাত্র আধুনিক NMR (Nuclear Magnetic Resonance) পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, ডাবর (Dabur) বা এপিস (Apis)-এর মতো ভারতের বড় বড় এবং জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো এই NMR টেস্টে ডাহা ফেল করেছে, অর্থাৎ তাদের মধুতে এই চাইনিজ সুগার সিরাপের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র সাফোলা (Safola)-এর মতো কিছু প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছে।

ঘি এবং দুধে ভেজাল: ঘি এবং দুধের বাজারও এই ভেজালের হাত থেকে মুক্ত নয়। বাজারের নামিদামি ব্র্যান্ডের ঘি ল্যাব টেস্টে পাঠিয়ে চরম হতাশাজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। যেখানে পতঞ্জলি (Patanjali)-এর ঘিতে সরাসরি তেলের ভেজাল পাওয়া গেছে, সেখানে আমুল (Amul), মাদার ডেইরি (Mother Dairy), কান্ট্রি ডিলাইট (Country Delight) এবং আইটিসি আশীর্বাদ (ITC Aashirvaad)-এর মতো স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের ঘিতে কোনো তেলের ভেজাল না থাকলেও, সেগুলোতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পেস্টিসাইড বা কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। দুধের ক্ষেত্রে সমস্যাটি মূলত সাপ্লাই চেইন বা সংরক্ষণের ত্রুটির সাথে জড়িত। সাধারণ প্যাকেটের দুধ বা পাউচ মিল্কের ক্ষেত্রে ভয়াবহ 'টেম্পারেচার অ্যাবিউজ' (Temperature Abuse) দেখা যায়। ভোর টায় বুথে দুধের ট্রাক এসে পৌঁছালেও, মালিকরা অনেক দেরিতে আসেন, যার ফলে দুধের প্যাকেটগুলো বাইরের সাধারণ তাপমাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকে। এই সময়ে দুধের তাপমাত্রা  থেকে  ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেখানে আদর্শ তাপমাত্রা হওয়া উচিত  থেকে  ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলস্বরূপ, দুধে ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষতিকর টক্সিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ ফোটানোর মাধ্যমেও দূর করা সম্ভব হয় না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, পাউচ মিল্কের পরিবর্তে টেট্রা প্যাকের দুধ ব্যবহার করা অনেক বেশি নিরাপদ।

প্রোটিন সাপ্লিমেন্টে ভয়াবহ জালিয়াতি: ফিটনেস সচেতন মানুষেরা যে প্রোটিন পাউডার গ্রহণ করেন, তার বাজারে চলছে চরম প্রতারণা। ট্রাস্টিফাইড (Trustified)-এর মতো স্বাধীন পরীক্ষকরা দেখিয়েছেন যে, অনেক বড় বড় সেলিব্রিটি দ্বারা প্রমোট করা প্রোটিন ব্র্যান্ডগুলো প্যাকেটের গায়ে প্রতি স্কুপে % প্রোটিন থাকার দাবি করলেও, ল্যাব টেস্টে দেখা গেছে সেগুলোতে মাত্র % প্রোটিন রয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধেক প্রোটিনও সেখানে নেই। এর চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার হলো 'অ্যামিনো স্পাইকিং' (Amino Spiking) এবং 'এমএসজি' (MSG) স্ক্যাম। বর্তমানে ভালো মানের ওয়ে প্রোটিনের (Whey Protein) কাঁচামালের দাম  টাকা থেকে বেড়ে - টাকা পর্যন্ত হয়ে গেছে। এই অতিরিক্ত দাম এড়ানোর জন্য অসাধু কোম্পানিগুলো প্রোটিন পাউডারে 'মোনোসোডিয়াম গ্লুটামেট' বা MSG মেশানো শুরু করেছে। এই MSG একদিকে যেমন প্রোটিন পাউডারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে ল্যাব টেস্টে গ্লুটামিক এসিডের মাত্রা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিয়ে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি দেখায়। এটি ভোক্তাদের সাথে এক জঘন্য প্রতারণা। এসব 'ক্রিমিনাল ম্যানুফ্যাকচারাররা' আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন পাওয়ার জন্য ল্যাবে নিজেদের সবচেয়ে ভালো ব্যাচটি পাঠায় এবং পরে বাজারে ভেজাল পণ্য বিক্রি করে।

পনির এবং ডিমের প্রতারণা: রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় যে পনির বিক্রি হয়, তার বেশিরভাগই 'অ্যানালগ পনির' (Analog Paneer)। এই কৃত্রিম পনির মূলত পাম অয়েল বা সস্তা তেল দিয়ে তৈরি হয়, যার মধ্যে আসল পনিরের মতো কোনো ক্যালসিয়াম বা প্রোটিন থাকে না। অন্যদিকে, পোল্ট্রি ফার্মগুলো ডিম নিয়েও প্রতারণা করছে। মানুষের ধারণা কমলা কুসুমের ডিম বেশি পুষ্টিকর। এই ধারণাকে পুঁজি করে কোম্পানিগুলো মুরগির খাবারে সিন্থেটিক পিগমেন্ট বা কৃত্রিম রং মিশিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে মুরগি কমলা কুসুমের ডিম পাড়ছে এবং সেগুলো বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকভাবে সাদা বা কমলা কুসুমের ডিমের পুষ্টিগুণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, এটি শুধুই মার্কেটিং গিমিক।

বিস্কুট, নুডলস এবং জুসের মিথ্যা মার্কেটিং: শিশুদের প্রিয় বোরবন বিস্কুটের  গ্রামে কিটক্যাট চকলেটের চেয়েও বেশি এডেড সুগার বা চিনি থাকে। গুড ডে বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে কাজুতে ভরপুর দাবি করা হলেও, বাস্তবে তাতে মাত্র .% কাজু থাকে এবং বাকিটা ময়দা। একইভাবে, আটা ম্যাগি নিজেদের স্বাস্থ্যকর প্রমাণের জন্য সবুজ রঙের প্যাকেট ব্যবহার করে এবং 'টি রুটির সমান ফাইবার' থাকার দাবি করে, অথচ এর একটি প্যাকেটেই প্রায়  মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। রুহ আফজা এর মতো পানীয় বিজ্ঞাপনে 'নো ফ্যাট' (No Fat) দাবি করে নিজেদের স্বাস্থ্যকর সাজাতে চায়, অথচ এই পানীয়টি সম্পূর্ণ চিনি দিয়ে তৈরি এবং চিনি এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তাতে ফ্যাট থাকে না। এটি নিছকই ভোক্তাদের বোকা বানানোর একটি চতুর কৌশল।

অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর নির্যাতন এবং সরকারি নীরবতা

খাদ্যের এই ভয়াবহ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে যখন ফুড ফার্মার (Food Pharmer) বা ট্রাস্টিফাইড (Trustified)-এর মতো স্বাধীন অ্যাক্টিভিস্টরা আওয়াজ তোলেন, তখন তাদেরকে চরম হয়রানি এবং হুমকির সম্মুখীন হতে হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেদের ভুল স্বীকার করার বদলে এই অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে  কোটি টাকার মানহানির মামলা (Defamation Suit) দায়ের করে,  মাসের জেলের হুমকি দেয় এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করে। 'বিগ বস' -এর একজন প্রতিযোগী তো সরাসরি  লক্ষ টাকার ঘুষ অফার করেছিলেন ভিডিও মুছে ফেলার জন্য, এবং রাজি না হওয়ায় অ্যাক্টিভিস্টের বাড়িতে থার এবং স্করপিও গাড়িতে করে গুন্ডা পাঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ক্রমাগত এই ধরনের হুমকির কারণে অ্যাক্টিভিস্টদের নিজেদের বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত বদলাতে হয়েছে এবং অনলাইনে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পূর্ণ গোপন রাখতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অনেক সময় ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এবং টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তাদের সম্মানহানির চেষ্টা করা হয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো সরকারের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা। যেখানে ইউরোপ বা উন্নত দেশগুলোতে এই ব্র্যান্ডগুলোই সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার রফতানি করছে, সেখানে ভারতের বাজারে তারা নিষিদ্ধ পেস্টিসাইড এবং ভেজাল মেশানো খাবার বিক্রি করছে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট ফুড রেগুলেটরি অথরিটিগুলো এই অপরাধী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং, সাধারণ মানুষদের সচেতন করার জন্য ফুড ফার্মারকে নিজের উদ্যোগে 'লেবেল পড়বে ইন্ডিয়া' (Label Padhega India) বা 'সুগার বোর্ড' (Sugar Board)-এর মতো বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলতে হয়েছে। এটি আজ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনজিউমার অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইনে পরিণত হয়েছে এবং সিবিএসই (CBSE) স্কুলগুলোতে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মিড-ডে মিল প্রকল্প থেকে ডিম বাদ দেওয়া এবং দরিদ্র শিশুদের অধিকার হরণ

মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরা যখন কর্পোরেট ভেজালের শিকার, তখন ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের পুষ্টির অধিকার সরাসরি কেড়ে নিচ্ছে স্বয়ং সরকার। এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সম্প্রতি কলকাতা পৌরসভার অধীন সরকারি স্কুলগুলোর মধ্যাহ্নভোজ বা মিড-ডে মিল (Mid-Day Meal) প্রকল্প থেকে ডিম বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিরামিষ মেনু চালুর সিদ্ধান্ত।

কলকাতা পৌর এলাকার স্কুলগুলোর এই মধ্যাহ্নভোজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ISKCON)-এর হাতে। যেহেতু ISKCON তাদের ধর্মীয় ও আদর্শগত কারণে কঠোর নিরামিষ খাদ্যনীতি অনুসরণ করে, তাই তারা স্কুলের মেনু থেকে ডিম বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে রাজমা, সয়াবিন এবং পনিরের মতো নিরামিষ প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তটি মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এবং নীতিবোধকে (ethos) সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

প্রথমত, সরকারি স্কুলে যেসব শিশুরা পড়তে আসে, তাদের বেশিরভাগই চরম অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তান। এই দরিদ্র শিশুদের জন্য স্কুলের এই এক বেলার খাবারটিই হলো তাদের সারাদিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর এবং গুরুত্বপূর্ণ আহার। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডিম হলো অত্যন্ত কম খরচে পাওয়া একটি উচ্চমানের প্রোটিন, যাতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং অন্যান্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান ভরপুর থাকে। যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ভালো, তাদের সন্তানরা বাড়িতে সহজেই মাছ, মাংস বা ডিম খেতে পারে। কিন্তু নিম্ন আয়ের পরিবারের এই হতদরিদ্র শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলের মিড-ডে মিলে দেওয়া ডিমটিই অনেক সময় তাদের জীবনে প্রাণিজ প্রোটিনের (Animal Protein) একমাত্র সহজলভ্য উৎস। এই ডিমটুকু কেড়ে নেওয়া মানে তাদের শারীরিক বিকাশ এবং পুষ্টির মৌলিক অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা।

দ্বিতীয়ত, এই সিদ্ধান্তটি মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই প্রকল্পটি বহু বছর আগে শুরু করা হয়েছিল মূলত দুটি কারণে: এক, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা; এবং দুই, স্কুলে শিশুদের উপস্থিতি বাড়ানো ও স্কুলছুট (Dropout rates) কমানো। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক খাদ্যাভ্যাস প্রচার করা নয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে যে, তারা শিশুদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার চেয়ে একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর মতাদর্শকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের প্রশ্ন তুলে ধরেছে। পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যার নিজস্ব একটি সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি রয়েছে। এই রাজ্যে মাছ, মাংস এবং ডিম খাওয়া বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি দেবী দুর্গা এবং কালীপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও বহু স্থানে দেবীকে মাছ ও মাংস নিবেদন করার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ভারতের সামাজিক ইতিহাসে নিরামিষভোজনকে অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চবর্ণের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এমন একটি রাজ্যে, যেখানে আমিষ খাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে স্বীকৃত, সেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জোরপূর্বক নিরামিষ মেনু চাপিয়ে দেওয়া এক ধরণের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।

নির্বাচনের সময় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রাজনীতি ভারতে নতুন কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গে কিছুদিন আগেই তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ, মাংস ও ডিম নিষিদ্ধ করতে পারে, যার জবাবে অনেক বিজেপি প্রার্থী হাতে বড় মাছ নিয়ে প্রচারণায় নেমেছিলেন নিজেদের সমর্থন বোঝাতে। অথচ নির্বাচনের পর সেই সরকারি স্কুলগুলোতেই যখন ডিম নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ভোটের জন্যই সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা নির্দিষ্ট আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিতে পিছপা হয় না।

উপসংহার

ভারতের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কর্পোরেট ধনকুবেররা নিজেদের অর্থলিপ্সার জন্য মধু, দুধ, ঘি থেকে শুরু করে শিশুদের প্রোটিন সাপ্লিমেন্টেও বিষ মেশাচ্ছে, অ্যাক্টিভিস্টদের কন্ঠরোধ করার জন্য গুন্ডা লেলিয়ে দিচ্ছে এবং শত শত কোটি টাকার মামলা করছে। আর সরকার এই দুর্নীতি দমনের বদলে নীরব দর্শক হয়ে আছে।

অন্যদিকে, যে দরিদ্র শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মিড-ডে মিলের একটি মাত্র ডিমের ওপর নির্ভর করতে হয়, সরকার তাদের সেই অধিকারটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। শিশুদের খাদ্যনীতি কখনোই কোনো সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়; বরং শিশুদের সর্বোচ্চ পুষ্টিগত উপকারিতা এবং তাদের বাস্তব আর্থসামাজিক অবস্থাকেই এখানে একমাত্র অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যে দেশের সেলিব্রিটিরা কোটি টাকার বিনিময়ে পান মসলা আর জং ফুডের বিজ্ঞাপন দিয়ে যুবসমাজকে ধ্বংস করে, আর যারা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য লড়ে যান তারা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হন, সে দেশের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ঘুম ভাঙা প্রয়োজন। শিশুদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে এবং কর্পোরেটদের হাতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তুলে দিয়ে কোনো দেশ কখনোই প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না। খাদ্যে ভেজাল এবং মিড-ডে মিলের মতো এই চরম কেলেঙ্কারিগুলো বন্ধ করতে হলে আজ সমগ্র দেশকে একজোট হয়ে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য আন্দোলনের ডাক দিতে হবে। তবেই হয়তো আগামী দিনে একটি সুস্থ ও সবল ভারত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter