জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্র আন্দোলন: ইতিহাস, গণতান্ত্রিক অধিকার ও ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের লড়াই
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের শিক্ষাগত জাগরণ এবং জাতীয় জীবনে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের চিন্তাভাবনা। ১৯২০ সালে যে প্রতিষ্ঠানটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার বিকল্প পথ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদেরই আজ নিজেদের প্রতিনিধিত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার বিষয়টি ২০২৬ সালের অক্টোবরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
পাঁচজন শিক্ষার্থীর অনশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘাতের অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ, সব মিলিয়ে জামিয়ার এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ঘটনাটিকে শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ছাত্র প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নীতি এবং শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
জামিয়ার প্রতিষ্ঠা: শিক্ষা ও আত্মমর্যাদার ঐতিহাসিক যাত্রা
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর, উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনের যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েকজন জাতীয়তাবাদী শিক্ষাবিদ ও নেতা ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান, মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, হাকিম আজমল খান, ড. মুখতার আহমদ আনসারি, আবদুল মজিদ খাজা এবং ড. জাকির হুসাইনের মতো ব্যক্তিত্বের অবদান জামিয়ার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি দিল্লির কারোলবাগে স্থানান্তরিত হয়। পরে দিল্লির জামিয়া নগরে এর বর্তমান ক্যাম্পাস গড়ে ওঠে। ১৯৮৮ সালে সংসদে প্রণীত আইনের মাধ্যমে এটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।
জামিয়ার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে চিন্তা কাজ করেছিল, তা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়। বরং নিজেদের আদর্শ, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয় দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে শিক্ষা বিস্তারের একটি উদ্যোগ ছিল এটি। এই ঐতিহাসিক পরিচয়ের কারণেই জামিয়ার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে একটি প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় ইতিহাস থাকলেই তার বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক অথবা ভুল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বর্তমান ঘটনাগুলি বুঝতে হলে তথ্য, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হলো কেন?
২০২৬ সালের আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ২০০৫ ও ২০০৬ সালের দিকে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালের ৩১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ভেঙে দেয়। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় ক্যাম্পাসে বারবার সংঘর্ষ, শিক্ষকদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং ক্লাসে বিঘ্ন ঘটার মতো ঘটনা ছাত্র সংসদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল। প্রশাসন আরও দাবি করেছিল, ছাত্র সংসদের কার্যক্রমের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভাগভিত্তিক ছাত্র সংগঠন বা সাবজেক্ট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু রাখে। এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং বিভাগের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বক্তব্য তুলে ধরতে পারে।
কিন্তু বিভাগভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এক বিষয় নয়। একটি বিভাগের প্রতিনিধি সাধারণত নিজের বিভাগের সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ বৃহত্তর পরিসরে ছাত্রসমাজের দাবি তুলে ধরতে পারে।
এই পার্থক্যই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।
আদালতে আবেদন, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি
ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের দাবি শুধু ২০২৬ সালেই ওঠেনি। এর আগেও শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আন্দোলন করেছেন এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
২০১২ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভাগভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়েও ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয়েছে। ২০১৭ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফিরিয়ে আনার দাবিতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর দিল্লি হাইকোর্টে সংশ্লিষ্ট মামলার নিষ্পত্তি হয়। তবে আদালত বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেয়নি। এই সিদ্ধান্তের অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভবিষ্যতে নির্বাচন করা আইনত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। বরং নির্বাচন পুনরুদ্ধারের বিষয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য নিয়মের আওতায় অনিষ্পন্ন থেকে যায়।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি: বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কি কেবল বিভাগভিত্তিক সংগঠন যথেষ্ট, নাকি একটি নির্বাচিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদও থাকা উচিত?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু জামিয়ার জন্য নয়, ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থার আলোচনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৯ সালের আন্দোলন: জামিয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
জামিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর একটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (CAA) পাস হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ শুরু হয়। আইনটি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট ছয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অমুসলিম অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করে; মুসলিমরা এই নির্দিষ্ট সুবিধার আওতায় ছিলেন না। আইনটি নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে। প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি (NRC) নিয়ে আশঙ্কাও আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।
১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ জামিয়া ক্যাম্পাস ও তার আশপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ গ্রন্থাগারসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং বহু শিক্ষার্থী আহত হন। গ্রন্থাগারের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়।
পুলিশের বক্তব্য ছিল, আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা পুলিশের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। কী পরিস্থিতিতে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল এবং নির্দিষ্ট ঘটনাগুলিতে কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিচার করতে সমসাময়িক প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং তদন্তসংক্রান্ত নথি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জামিয়ার আন্দোলন অন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শহরের প্রতিবাদের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
তবে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৬ সালের ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে এক করে দেখা উচিত নয়। প্রথমটির কেন্দ্রে ছিল নাগরিকত্ব আইন ও তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আপত্তি; দ্বিতীয়টির তাৎক্ষণিক দাবি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনা। দুই ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে জামিয়ার প্রতিবাদের ইতিহাস ও ক্যাম্পাসের অভিজ্ঞতার দিক থেকে, কিন্তু তাদের প্রত্যক্ষ কারণ আলাদা।
২০২০ থেকে ২০২৫: ছাত্র অধিকার ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক
২০১৯ সালের ঘটনার পরও জামিয়ায় ছাত্র অধিকার, ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের সুযোগ এবং প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক থেমে যায়নি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। একই সময়ে জামিয়ার ছাত্রদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ এবং ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের প্রশ্নও আলোচনায় ছিল।
পরবর্তী বছরগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধি, অনুমতি ছাড়া জমায়েত, পোস্টার ও দেওয়াললিখন এবং প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে আরটিআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জামিয়ায় ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের একাধিক ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে একই সময়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য প্রকাশিত হয়।
এই তথ্যগুলি ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্যায় ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি থাকলেই প্রতিটি পদক্ষেপ ন্যায্য ছিল, এমনটিও ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি প্রকাশের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।
২০২৬ সালের আন্দোলন: কেন অনশনের পথ বেছে নিলেন শিক্ষার্থীরা?
২০২৬ সালের অক্টোবরে ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের দাবি আবারও জোরালো হয়ে ওঠে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় বা এএমইউতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ জামিয়ার শিক্ষার্থীদেরও উৎসাহিত করেছিল বলে সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২ অক্টোবর পাঁচজন শিক্ষার্থী অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা জেএমআইএসইউ (JMISU) পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ছাত্র সংসদ না থাকায় হোস্টেল, পানীয় জল, শৌচাগার, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, লিফট এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিয়ে সমস্যা হলে সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একযোগে দাবি জানানোর কার্যকর মঞ্চ নেই। তাঁরা মনে করেন, একটি নির্বাচিত ছাত্র সংসদ থাকলে প্রশাসনের কাছে সমস্যাগুলি আরও সংগঠিতভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
এখানে লক্ষণীয়, শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে শুধু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন ছিল না। দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন সমস্যাও আন্দোলনের পটভূমিতে উঠে এসেছে। যদিও এই সমস্যাগুলির প্রতিটির প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে আরও তথ্যের প্রয়োজন, তবু শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে বোঝা যায় যে তাঁরা নিজেদের মতামত জানানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চাইছেন।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও আন্দোলনের বিস্তার
আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয় এবং আরও দুজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, অনুমতি ছাড়া অবস্থান কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের কাজে বাধা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের সময় বিঘ্ন ঘটানোর মতো ঘটনা ঘটেছিল। প্রশাসন আগের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীরা দুর্ব্যবহার করেছেন। তাঁরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা তদন্তের দাবিও তোলেন।
এই পর্যায়ে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা একত্রিত হন। ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সব ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের বাধা এবং আন্দোলনস্থলে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার যুক্তি সামনে আনে।
২৫ ও ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের জমায়েত এবং উত্তেজনার কথা উঠে আসে। এসব ঘটনার বিবরণে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই সংঘর্ষের প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে না লিখে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করাই সঠিক।
প্রশাসনের বক্তব্য: নির্বাচন ফিরিয়ে আনার আগে সংবিধান ও নিয়মের প্রশ্ন
ছাত্রদের দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়। পরে ছাত্র সংসদের সংবিধান তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়। এর কাজের মধ্যে ছিল ২০০৬ সালে ছাত্র সংসদ বিলুপ্তির পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট আদালতের সিদ্ধান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান এবং লিংডহ (Lyngdoh) কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করা।
প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাচিত সাবজেক্ট অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাঁদের সমস্যা তুলে ধরতে পারেন। প্রশাসন অতীতের সংঘর্ষের ঘটনাগুলিও উল্লেখ করে জানিয়েছে যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বিবেচনা করা দরকার।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা মনে করেন, কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; নির্বাচন কবে হবে, তার একটি স্পষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। তাঁদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়া আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। প্রশাসন প্রক্রিয়া ও বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে; শিক্ষার্থীরা চাইছেন দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা।
২৬ অক্টোবরের সমঝোতা: আন্দোলনের শেষ, নাকি নতুন প্রক্রিয়ার শুরু?
২৬ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন বিবরণ দেখা যায়। The Indian Express সকালে আন্দোলন চলার খবর প্রকাশ করে। অন্যদিকে Outlook India জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমঝোতার পর আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতার শর্তগুলির মধ্যে ছিল ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন, আন্দোলনের সময় জারি করা সাসপেনশন ও শো-কজ নোটিস প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তারক্ষীদের আচরণ খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন। প্রতিবেদনগুলিতে আরও বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা কিছু মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবেন।
তবে এই সমঝোতার খবরের অর্থ এই নয় যে ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময়সীমা সংবিধান অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সংবিধান প্রণয়ন, অনুমোদন এবং প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ওপর।
এই কারণে আন্দোলনের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু আন্দোলন প্রত্যাহারের খবরের দিকে তাকালে চলবে না। বরং দেখতে হবে, শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের দাবি বাস্তবে কতটা পূরণ হয় এবং ভবিষ্যতে ছাত্র সংসদ কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ পায় কি না।
আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়
জামিয়ার ছাত্র আন্দোলন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব কেবল রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা, একাডেমিক অধিকার এবং প্রশাসনের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগের সঙ্গেও এটি যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। অতীতের সংঘর্ষের অভিযোগকে উপেক্ষা করে কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষার নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ সংকুচিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার।
তৃতীয়ত, প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে আলোচনার কার্যকর পথ থাকা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত দাবি জমতে থাকলে ছোট সমস্যা থেকেও বড় আন্দোলন তৈরি হতে পারে। সময়মতো আলোচনা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং স্পষ্ট নিয়ম এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করে।
চতুর্থত, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে দায়িত্ববোধও জরুরি। ছাত্র সংসদ থাকলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও তার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং অভিযোগের ন্যায্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সবশেষে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয়কে শুধু অতীতের গৌরব হিসেবে দেখলে চলবে না। সেই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করছে, তাদের কথা বলার সুযোগ কতটা রয়েছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তারা কীভাবে অংশ নিতে পারছে, এসব বিষয়ও তার শিক্ষাগত আদর্শের অংশ।
উপসংহার
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন।
তবে আন্দোলনের প্রতিটি অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের দাবিকে কেবল শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, ন্যায্য তদন্ত এবং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন।
২৬ অক্টোবরের সমঝোতার খবর যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংবিধান অনুমোদন, নির্বাচন এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পর্যালোচনা কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।
জামিয়ার এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই: একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু জ্ঞান বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং যুক্তি, দায়িত্ব, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণের চর্চাকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে হয়। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর এবং প্রশাসনের দায়িত্ব, দুটিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না করে পরস্পরের পরিপূরক করে তুলতে পারলেই শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।