সোশ্যাল মিডিয়া, ক্যারিয়ার ও আখিরাত: সমকালীন মুসলিম তরুণদের জীবনদর্শনে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়
মানবজীবনে দ্বীন ও দুনিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক একটি বিষয়। কিছু মানুষ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মনে করেন, আবার কেউ কেউ দুনিয়াকে দ্বীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করান। অথচ ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, দ্বীন মানুষকে দুনিয়ায় সঠিক জীবনযাপনের পদ্ধতি প্রদান করে। দ্বীন ও দুনিয়া পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং দ্বীনের অর্থই হলো দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার শিক্ষা।
শরিয়তে বারবার এই সত্যটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দুনিয়ার জীবন হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়া ত্যাগ করে দেওয়া ইসলামের কাম্য নয়; বরং শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাই প্রকৃত সফলতা। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দুনিয়ায় বসবাস করেও সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন; কিন্তু তাঁদের অন্তর আখিরাতের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
বর্তমান যুগে এই ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আধুনিক সভ্যতা দ্বীন ও দুনিয়াকে পৃথক দুটি ক্ষেত্রে বিভক্ত করে দিয়েছে। এর ফলে মানুষ হয় সম্পূর্ণরূপে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে, নয়তো দুনিয়া ত্যাগ করাকেই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি বলে মনে করতে শুরু করেছে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে পারস্পরিক ভারসাম্যই মানুষকে সফল করে তোলে। এই ভারসাম্য ছাড়া যেমন দুনিয়ার জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হতে পারে না, তেমনি দ্বীনও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। সুতরাং মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
“আর তুমি আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো, তবে দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। আর তুমি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।
এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ লিখেছেন, এখানে ‘দুনিয়া থেকে তোমার অংশ’ বলতে দুনিয়ায় অতিবাহিত জীবনকাল এবং এমন সব কাজকে বোঝানো হয়েছে, যা আখিরাতে মানুষের উপকারে আসবে। এর মধ্যে সদকা-খয়রাতসহ অন্যান্য নেক আমলও অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তী ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, এর অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা কিছু দান করেছেন, তা কাজে লাগিয়ে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করো। তবে দুনিয়ার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও ভুলে যেয়ো না। এমন যেন না হয় যে, সবকিছু সদকা-খয়রাত করে তুমি নিঃস্ব হয়ে পড়বে। বরং নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্যও প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু সম্পদ রেখে দাও।
পবিত্র হাদিস থেকেও আমরা এই শিক্ষা লাভ করি যে, একজন মুসলিমের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে জীবনযাপন করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে নবী আকরাম ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“তোমার শরীরের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে, তোমার চোখের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করো।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অন্য এক স্থানে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।” (শুআবুল ঈমান, ইমাম বায়হাকি)
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন:
“তিনজন ব্যক্তি নবী আকরাম ﷺ-এর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তাঁদের একজন বললেন, ‘আমি সর্বদা রোজা রাখব।’ দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আমি সারা রাত নামাজ আদায় করব।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘আমি বিয়ে করব না।’
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘আল্লাহর প্রতি তোমাদের মধ্যে আমিই সর্বাধিক ভয় পোষণ করি। তা সত্ত্বেও আমি রোজা রাখি আবার পানাহারও করি, নামাজ আদায় করি আবার ঘুমাইও এবং বিবাহও করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অন্য একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“কোনো ব্যক্তি যদি তার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করে এবং তার উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তবে সেই ব্যয়ও তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন:
“কোনো ব্যক্তি নিজের উপার্জন থেকে উত্তম খাবার কখনো খায়নি। আর আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের উপার্জন থেকেই আহার করতেন।” (সহিহ বুখারি) এই হাদিসগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কাম্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন যে, প্রত্যেকের অধিকার আদায় করা জরুরি—তা নিজের শরীরের অধিকার হোক, স্ত্রীর অধিকার হোক কিংবা ইবাদতের অধিকার হোক। এই শিক্ষা আমাদের জীবনে মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের পথ দেখায়।
ইসলাম দুনিয়ার জীবনে পরিশ্রম ও প্রচেষ্টাকেও ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে, তবে শর্ত হলো, এর পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকতে হবে। পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের জন্য ব্যয় করাও ইবাদত। নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করা উত্তম এবং এটি নবী-রাসুলদের সুন্নাহ। একইভাবে দুনিয়ার নেয়ামত ও সুখ-সুবিধা ভোগ করাও বৈধ, তবে শর্ত হলো, তা শরিয়তের নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে। দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের শস্যক্ষেত্রে পরিণত করাই ইসলামের লক্ষ্য।
রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বাড়াবাড়ি ও চরমপন্থা থেকে বিরত রেখেছেন এবং জীবনে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নিজের সুন্নাহর মাধ্যমে বাস্তব জীবনে এই ভারসাম্য প্রদর্শন করেছেন—তিনি বিবাহ করেছেন, আহার করেছেন, বিশ্রাম নিয়েছেন এবং ইবাদতও করেছেন।
এটাই হলো প্রকৃত ভারসাম্য। দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো পথভ্রষ্টতা, আর আখিরাতকে ভুলে যাওয়া চরম ক্ষতির কারণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন দোয়াও শিখিয়েছেন, যাতে আমরা দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখিরাতের কল্যাণ—উভয়ই প্রার্থনা করি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়েরই প্রয়োজন রয়েছে; তবে জীবনের মূল ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আখিরাত। দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার জীবন ও কর্ম ছাড়া আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
সেই দুনিয়াই নিন্দনীয়, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে দেয়। এমন দুনিয়া, যেখানে মানুষ কেবল সম্পদ সঞ্চয়ের পেছনে ছুটতে থাকে এবং আখিরাতকে ভুলে যায়। সেই দুনিয়া, যেখানে অহংকার, ঔদ্ধত্য, পাপাচার ও অনাচার বিরাজ করে। এমন দুনিয়া, যেখানে হালাল ও হারামের কোনো পরোয়া করা হয় না।
সেই দুনিয়াও নিন্দনীয়, যার প্রতি মানুষ গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তাকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে নেয়। যে দুনিয়া মানুষকে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এবং দ্বীনের ওপর আমল করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেই দুনিয়াই প্রকৃতপক্ষে নিন্দনীয়।
সেই দুনিয়া নিন্দনীয়, যেখানে মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতা, জুলুম-অত্যাচার ও ফিতনা-ফাসাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমন দুনিয়া, যার প্রতি ভালোবাসা মানুষের অন্তরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে। সেই দুনিয়া, যা মানুষকে কবর ও আখিরাতের কথা স্মরণ করা থেকে উদাসীন করে দেয়। এমন দুনিয়াই নিন্দনীয়, যা মানুষকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝার এবং তা অনুসারে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।