ইসরা ও মি'রাজ: পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-এর মহান মু'জিযা
ভূমিকা
প্রতি বছর ২৭ রজবের রাতে মুসলমানরা শব-এ-মি'রাজ বা ইসরা ও মি'রাজের স্মৃতি পালন করেন। এটি সেই বিশেষ রাত, যখন আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং তারপর সাত আসমান পর্যন্ত সফর করিয়েছিলেন। এ ঘটনা হিজরতের প্রায় এক বছর আগে ঘটেছিল। প্রায় ২৫ জন সাহাবী থেকে এর রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। হজরত জিবরীল আলাইহিস সালাম পয়গম্বর ﷺ-কে বোরাকের উপর সওয়ার করে মসজিদ-এ-হারাম থেকে মসজিদ-এ-আকসা নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে অনেক মহান নবীদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তারপর সর্বোচ্চ আসমানে আল্লাহর হাজিরায় পৌঁছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা লাভ করেন এবং তারপর জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়।
ইসরা মানে রাতের সফর – মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত। মি'রাজ মানে উপরে উঠা – সপ্তম আসমান পর্যন্ত। এটি পয়গম্বর ﷺ-এর জীবনের সবচেয়ে বড় মু'জিযা।
মক্কা থেকে জেরুজালেমের দূরত্ব ও সফরের সময়
মক্কা ও জেরুজালেমের মধ্যে আকাশ পথে দূরত্ব প্রায় ১২৩৯ কিলোমিটার। সে সময় উটের কাফেলায় এ সফর ৩০-৪০ দিন লাগত। কিন্তু পয়গম্বর ﷺ বোরাকে সওয়ার হয়ে এ দূরত্ব এক রাতের খুব অল্প সময়ে পাড়ি দেন। পুরো ঘটনা রাতের মধ্যে ঘটে এবং ভোরের আগেই মক্কায় ফিরে আসেন। বোরাকের গতি এত দ্রুত ছিল যে প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায় পৌঁছাত।
আধুনিক যুগেও এ দূরত্ব অতিক্রম করা কঠিন। এখানে একটি তুলনা দেওয়া হলো:
|
যানবাহনের ধরন |
মাইল/ঘণ্টা |
সময় |
|
মানুষ (পায়ে হেঁটে) |
৫ |
১৩ দিন |
|
দ্রুতগামী ঘোড়া |
৪০ |
৩৯ ঘণ্টা |
|
সবচেয়ে দ্রুত ট্রেন |
১৮৬ |
৮.৩ ঘণ্টা |
|
রেস কার |
২৫০ |
৬.২ ঘণ্টা |
|
জেট বিমান |
৫৩০ |
২.৯ ঘণ্টা |
|
কনকর্ড জেট |
১৫৫০ |
৬০ মিনিট |
|
ফাইটার জেট |
২০০০ |
৪৬ মিনিট |
|
স্পেস শাটল |
১৭৫০০ |
৫.৩ মিনিট |
|
রকেট |
২৫০০০ |
৩.৭ মিনিট |
|
আলোর গতি |
৬৭০ মিলিয়ন |
৮.৩ মিলিসেকেন্ড |
এ সফর শারীরিক ছিল, শুধু রূহানি নয়। পয়গম্বর ﷺ ফিরে এসে কাফেলার বিস্তারিত খবর বলেন, যা কুরাইশ যাচাই করে সত্যতা স্বীকার করে।
কুরআনে ইসরা ও মি'রাজের প্রমাণ
ইসরা ও মি'রাজের ঘটনা কুরআনে দুই জায়গায় স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে।
১. ইসরার প্রমাণ – সূরা আল-ইসরা-এর প্রথম আয়াত:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
(সূরা আল-ইসরা: ১)
“পবিত্র ও মহান তিনি যিনি রাতের এক অংশে তাঁর বান্দাকে মসজিদ-এ-হারাম থেকে মসজিদ-এ-আকসা পর্যন্ত সফর করিয়েছেন – যার চারপাশে আমি বরকত দিয়েছি – যাতে তাকে আমার কিছু বড় নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
এ আয়াত স্পষ্টভাবে ইসরা (মক্কা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত রাতের সফর) এর উল্লেখ করে। আল্লাহ পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-কে “আব্দ” (বান্দা) বলে সম্মান করেছেন এবং এ সফরকে তাঁর কুদরতের নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন।
২. মি'রাজের প্রমাণ – সূরা আন-নাজম, আয়াত ১৩ থেকে ১৮:
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَىٰ عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ
“নিশ্চয় তিনি তাকে দ্বিতীয়বারও দেখেছেন, সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার কাছে জান্নাতুল মা'ওয়া। যখন সিদরাকে ঢেকে রেখেছিল যা ঢেকে রাখে। দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়নি এবং সীমা লঙ্ঘন করেনি। নিশ্চয় তিনি তাঁর রবের মহান নিদর্শনসমূহ দেখেছেন।”
এ আয়াতসমূহ মি'রাজ (আসমানসমূহের সফর এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছানো) এর দিকে ইঙ্গিত করে। পয়গম্বর ﷺ-এর দৃষ্টি কখনো বিভ্রান্ত হয়নি এবং তিনি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিদর্শনসমূহ দেখেছেন।
এভাবে কুরআন ইসরা ও মি'রাজ উভয়কেই আল্লাহর কুদরতের মু'জিযা হিসেবে বর্ণনা করে।
হাদিসে ইসরা ও মি'রাজের বর্ণনা (বিস্তারিত ব্যাখ্যা)
ইসরা ও মি'রাজের ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিস্তারিত রেওয়ায়েত মালিক বিন সা'সা'া রা. থেকে বর্ণিত, যা সহীহ বুখারীর হাদিস নম্বর ৩৮৮৭-এ রয়েছে। এ হাদিস পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-এর নিজের জবানীতে।
১. বক্ষ বিদারণ ও বোরাকের শুরু (সহীহ বুখারী ৩৮৮৭)
بَيْنَمَا أَنَا فِي الْحَطِيمِ مُضْطَجِعٌ إِذْ أَتَانِي آتٍ فَشَقَّ مَا بَيْنَ هَذِهِ إِلَى هَذِهِ – يَعْنِي مِنْ ثُغْرَةِ نَحْرِهِ إِلَى شِعْرَتِهِ – فَاسْتَخْرَجَ قَلْبِي، ثُمَّ أُتِيتُ بِطَسْتٍ مِنْ ذَهَبٍ مَمْلُوءَةٍ إِيمَانًا وَحِكْمَةً فَغُسِلَ قَلْبِي ثُمَّ حُشِيَ ثُمَّ أُعِيدَ، ثُمَّ أُتِيتُ بِدَابَّةٍ بَيْضَاءَ دُونَ الْبَغْلِ وَفَوْقَ الْحِمَارِ يُقَالُ لَهُ الْبُرَاقُ، يَضَعُ خَطْوَهُ عِنْدَ أَقْصَى طَرْفِهِ...
পয়গম্বর ﷺ বলেন: “আমি হাতিমে (কা'বার কাছে একটি অংশ) শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ কেউ (জিবরীল আলাইহিস সালাম) আমার কাছে এলেন। তিনি আমার বুক এখান থেকে এখান পর্যন্ত চিরে দিলেন – অর্থাৎ গলার নিচ থেকে পেটের উপর পর্যন্ত। তারপর আমার হৃদয় বের করে নিলেন। এরপর সোনার একটি তসলা আনা হলো যা ঈমান ও হিকমত (জ্ঞান) দিয়ে ভরা ছিল। আমার হৃদয় তাতে ধোয়া হলো, তারপর ঈমান ও হিকমত দিয়ে ভরে আমার বুকে ফিরিয়ে রাখা হলো।”
এরপর: “তারপর আমার কাছে একটি সাদা জন্তু আনা হলো, যা খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড়। তাকে বোরাক বলা হয়। সে তার প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায় রাখত।”
ব্যাখ্যা:
এ অংশ দেখায় যে ইসরা ও মি'রাজের আগে পয়গম্বর ﷺ-এর হৃদয়কে পবিত্র ও শক্তিশালী করা হয়েছিল, যাতে তিনি আল্লাহর মহান নিদর্শনসমূহ দেখতে পারেন। বোরাক ছিল একটি বিশেষ জন্তু যাকে আল্লাহ এ সফরের জন্য তৈরি করেছিলেন।
২. দুধ নির্বাচনের ঘটনা (সহীহ বুখারীতে উল্লেখিত)
قَالَ جِبْرِيلُ: أَصَبْتَ الْفِطْرَةَ، لَوْ أَخَذْتَ الْخَمْرَ غَوَتْ أُمَّتُكَ
জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন: “তুমি ফিতরত (স্বাভাবিক সঠিক পথ) নির্বাচন করেছ। যদি তুমি শরাব নিতে তাহলে তোমার উম্মত গোমরাহ হয়ে যেত।”
ব্যাখ্যা:
মসজিদ-এ-আকসায় পৌঁছার পর পয়গম্বর ﷺ-এর সামনে তিনটি পেয়ালা পেশ করা হয়: একটিতে দুধ, একটিতে শরাব এবং একটিতে পানি (কিছু রেওয়ায়েতে মধু)। পয়গম্বর ﷺ দুধ নির্বাচন করেন। এ নির্বাচন ফিতরতের (প্রাকৃতিক সঠিক স্বভাবের) প্রতীক। জিবরীল জানান যে দুধ নেওয়ায় উম্মত হিদায়াতের উপর থাকবে, আর শরাব নিলে গোমরাহী হতো। এটি ইসলামে শরাব হারাম হওয়ার দিকেও ইঙ্গিত করে।
পটভূমি (ঘটনার প্রেক্ষাপট)
নবুয়তের দশম বছরে পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-কে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়।
- তাঁর চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিল, যিনি কুরাইশের মধ্যে তাঁর প্রধান সুরক্ষা ছিলেন।
- তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা রা.-এরও ইন্তেকাল হয়।
- কুরাইশের জুলুম ও অত্যাচার চরমে পৌঁছে যায়।
- তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁকে পাথর মারা হয় এবং খালি হাতে ফিরে আসতে হয়।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহ পয়গম্বর ﷺ-কে ইসরা ও মি'রাজের সফর করিয়ে সান্ত্বনা ও সম্মান দান করেন। এ ঘটনা তাঁর নবুয়তের সত্যতা এবং আল্লাহর বিশেষ রহমতের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
ইসরা ও মি'রাজের ঘটনার বিস্তারিত ক্রম
প্রমাণিক হাদিসসমূহের (সহীহ বুখারী ৩৮৮৭, ৭৫১৭ প্রমুখ) ভিত্তিতে পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-এর এ সফর এভাবে ঘটেছিল। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. বক্ষ বিদারণ ও হৃদয়ের শুদ্ধিকরণ
হজরত জিবরীল আলাইহিস সালাম পয়গম্বর ﷺ-এর কাছে এলেন। তিনি বুক গলার নিচ থেকে পেটের নিচ পর্যন্ত চিরে দিলেন, হৃদয় বের করে জমজমের পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে দিলেন। তারপর ঈমান ও হিকমত দিয়ে ভরে ফিরিয়ে রাখলেন।
উদ্দেশ্য: এ মহান সফর ও আল্লাহর হাজিরার জন্য পয়গম্বর ﷺ-কে শারীরিক ও রূহানি উভয়ভাবে পবিত্র করা।
২. বোরাকে মসজিদ-এ-আকসার সফর
একটি চমকপ্রদ সাদা জন্তু “বোরাক” আনা হলো। তার প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায় পৌঁছাত। পয়গম্বর ﷺ তার উপর সওয়ার হয়ে মক্কা থেকে জেরুজালেম (মসজিদ-এ-আকসা) পৌঁছলেন।
পথে তিন জায়গায় থামা হয়:
- মদিনা (যেখানে পরে হিজরত হয়)
- মাউন্ট সিনাই (যেখানে হজরত মূসা আ. তাওরাত পান)
বাইতলাহম (হজরত ঈসা আ.-এর জন্মস্থান)
- এ সফর রাতের অল্প সময়ে সম্পন্ন হয় – আল্লাহর কুদরতের বড় প্রমাণ।
৩. মসজিদ-এ-আকসায় নামাজ
মসজিদ-এ-আকসায় পৌঁছে সকল পূর্ববর্তী নবীদের (আদম থেকে ঈসা আলাইহিমুস সালাম পর্যন্ত) রূহসমূহ উপস্থিত ছিলেন। পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ তাঁদের জামাতের সামনে দু'রাকাত নামাজের ইমামতি করেন। এটি দেখায় যে পয়গম্বর ﷺ সকল নবীর ইমাম ও শেষ নবী। সব নবী তাঁর ইমামতি কবুল করেন।
৪. দুধ ও শরাবের নির্বাচন
নামাজের পর দুই (বা তিন) পেয়ালা পেশ করা হয় – একটিতে দুধ, অন্যটিতে শরাব। পয়গম্বর ﷺ দুধ নির্বাচন করেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন: “আপনি ফিতরত (প্রাকৃতিক সঠিক পথ) নির্বাচন করেছেন। শরাব নিলে আপনার উম্মত গোমরাহ হয়ে যেত।”
৫. সাত আসমানের সফর
তারপর মি'রাজ শুরু হয়। প্রতি আসমানে এক বা দুইজন মহান নবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়:
- প্রথম আসমান: হজরত আদম আলাইহিস সালাম – ডানে জান্নাতী, বামে জাহান্নামী দেখেন।
- দ্বিতীয়: হজরত ঈসা ও হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিমাস সালাম
- তৃতীয়: হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম (সবচেয়ে সুন্দর)
- চতুর্থ: হজরত ইদরীস আলাইহিস সালাম
- পঞ্চম: হজরত হারূন আলাইহিস সালাম
- ষষ্ঠ: হজরত মূসা আলাইহিস সালাম (কাঁদলেন কারণ তাঁর উম্মত দুর্বল)
- সপ্তম: হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম (বাইতুল মা'মূরের কাছে, যা জান্নাতের কা'বা)
প্রতি নবী পয়গম্বর ﷺ-এর স্বাগত জানান এবং দু'আ করেন।
৬. সিদরাতুল মুনতাহা ও জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য
সপ্তম আসমানের পর সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন – একটি বিশাল বরই গাছ। তার ফল বড় ঘড়ার মতো, পাতা হাতির কানের মতো। এখানে ফেরেশতাদের জ্ঞানের সীমা শেষ। আল্লাহর নূরে ঢাকা ছিল, এত সুন্দর যে কেউ বর্ণনা করতে পারে না। এখানে কাউসারের নহর দেখেন। জান্নাতে নেয়ামত (মুক্তার ঘর, কস্তূরীর মাটি) এবং জাহান্নামে শাস্তি (জিনাকারী উল্টো ঝুলানো, সুদখোরের বড় পেট ইত্যাদি) দেখানো হয়। এক হাদিসে পয়গম্বর ﷺ বলেন: “জাহান্নামে বেশি নারী দেখেছি, কারণ তারা নেয়ামতের নাশুকরি করে এবং স্বামীর ভালোকে স্বীকার করে না।”
৭. নামাজের উপহার
সিদরাতুল মুনতাহার পর আল্লাহর বিশেষ হাজিরায় পৌঁছেন। প্রথমে উম্মতের উপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম পরামর্শ দেন যে উম্মতের জন্য বেশি, কম করান। পয়গম্বর ﷺ বারবার আল্লাহর কাছে যান। অবশেষে ৫ ওয়াক্ত নামাজ থাকে, কিন্তু ৫০-এর সওয়াব রাখা হয়। নামাজ উম্মতের সবচেয়ে বড় উপহার – এটিই আমাদের মি'রাজ।
৮. মক্কায় প্রত্যাবর্তন
পুরো ঘটনা একই রাতে ঘটে। ভোরের আগে পয়গম্বর ﷺ মক্কায় ফিরে আসেন। বিছানা এখনো উষ্ণ ছিল।
এ সফর আল্লাহর রহমত ও পয়গম্বর ﷺ-এর মর্যাদার সবচেয়ে বড় মু'জিযা।
ইসরা ও মি'রাজের গুরুত্ব
এ ঘটনা পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুয়ত ও সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আল্লাহ দুনিয়ার কষ্টগুলোর বদলে আসমানসমূহে তাঁকে সম্মান দান করেন। সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপহার। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত ফরজ হয়েছিল, কিন্তু হজরত মূসা আলাইহিস সালামের পরামর্শে বারবার কমিয়ে অবশেষে ৫ ওয়াক্তে নেমে আসে – তবে ৫০-এর সওয়াব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। নামাজই মুসলমানের মি'রাজ, কারণ এটি আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে।
যখন পয়গম্বর ﷺ এ ঘটনা বর্ণনা করেন, কাফিররা মজাক করে। কিন্তু হজরত আবু বকর সিদ্দীক রা. কোনো সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বাস করেন। এজন্যই তাঁকে “সিদ্দীক” (সত্যবাদী) উপাধি দেওয়া হয়। এ সফর আমাদের শেখায় যে কঠিন সময়ে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কখনো একা ছাড়েন না। নামাজের পাবন্দি করুন এবং পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন।
উপসংহার
ইসরা ও মি'রাজের এ মহান ঘটনা আমাদের একটি অপরূপ বার্তা দেয়: যখন দুনিয়ার কষ্টগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, যখন সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোও সাথ ছেড়ে চলে যায়, তবুও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কখনো একা ছাড়েন না। তিনি তাকে নিজের রহমত দিয়ে নেয়ামত দান করেন, আসমানসমূহে সম্মান বখশেন এবং হৃদয়কে শান্তি প্রদান করেন। এ সফর কেবল পয়গম্বর মুহাম্মদ ﷺ-এর নয়, বরং পুরো উম্মতের মি'রাজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আমাদের প্রতিদিন আল্লাহর কাছে নিয়ে যায় – এটিই আমাদের আধ্যাত্মিক যাত্রা।
আসুন আমরা এ নেয়ামতের কদর করি। নামাজকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানাই, পয়গম্বর ﷺ-এর সুন্নাত অনুসরণ করি এবং কঠিন সময়ে ধৈর্য ও পূর্ণ বিশ্বাস ধরে রাখি। আল্লাহ আমাদের নামাজের পাবন্দি, সুন্নাতের অনুসরণ এবং জান্নাতের পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।
তথ্যসূত্র (References)
- সূরা আল-ইসরা (১৭:১) → ইসরার স্পষ্ট উল্লেখ।
- সূরা আন-নাজম (৫৩:১৩-১৮) → মি'রাজ এবং সিদরাতুল মুনতাহার উল্লেখ।
- মূল রেওয়ায়েত: সহীহ বুখারী, হাদিস ৩৮৮৭ (মালিক বিন সা'সাা রা. থেকে) – বক্ষ বিদারণ, বোরাক, আসমানসমূহের সফর, নবীদের সাথে সাক্ষাৎ, নামাজের উপহার ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনা।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৭৫১৭ – নামাজের সংখ্যা কমানোর অংশ।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৭৬ (আবু হুরাইরা রা. থেকে) – দুধ ও শরাবের নির্বাচন (মি'রাজের রাতে জেরুজালেমে)।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩২০৭ – সিদরাতুল মুনতাহার বর্ণনা (ফল হাজরের বড় ঘড়ার মতো, পাতা হাতির কানের মতো)।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২৯ ও ৩০৪ – জাহান্নামে বেশি নারী দেখার উল্লেখ (নাশুকরির কারণে)।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৬১০ – দুধ, মধু ও শরাবের পেয়ালার অতিরিক্ত উল্লেখ।