রমজান মাসে যাকাত কিভাবে দিতে হবে: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

ভূমিকা:

রমজান মাস হলো আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও করুণার মাস। এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলমানরা সাওম পালন করে এবং ইবাদতে মগ্ন থাকে। যাকাত, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, রমজান মাসে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটি সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই নিবন্ধে আমরা রমজান মাসে যাকাত কীভাবে দিতে হবে এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

যাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত:

যাকাত অর্থাৎ বাধ্যতামূলক দান ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং এটি সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেন:

“তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।“ (সূরা আত-তওবা: ১০৩)

রমজান মাসে যাকাত দেওয়া বিশেষ ফজিলতপূর্ণ, কারণ এই সময়ে সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে সেই রোজাদারের মতোই সওয়াব পাবে।“ (তিরমিজি)

যাকাতের হিসাব কিভাবে করবেন:

যাকাত নির্ধারণের জন্য আপনাকে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে—

ক. সম্পদের ধরন:

সোনা ও রূপা

নগদ অর্থ

ব্যবসায়িক মালামাল

সঞ্চয় ও বিনিয়োগ

খ. নিসাব:

নিসাব হলো সেই নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ যা এক বছর পর্যন্ত আপনার হাতে থাকলে ২.৫% হারে যাকাত ফরজ হয়।

সোনার জন্য নিসাব: ৮৫ গ্রাম

রূপার জন্য নিসাব: ৫৯৫ গ্রাম

গ. হিসাবের নিয়ম:

মোট সম্পদ = সোনা, রূপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক মালামাল + পাওনাদারদের কাছ থেকে পাওনা।

ঋণ এবং প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে ২.৫% হারে যাকাত নির্ধারণ করুন।

রমজান মাসে যাকাত দেওয়ার ফজিলত:

রমজান মাসে যাকাত দিলে সওয়াব অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। কারণ এই মাসে প্রতিটি ইবাদত ও দানের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। তদুপরি, এই মাসে দরিদ্রদের সহায়তা করা তাদের ঈদ উদযাপনকে সুন্দর করে তোলে। আর এ মাসে দান করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায় তাই রমজানে জাকাত ও দানের ওপর মানুষ বেশি গুরুত্ব দেয়। রমজানে বাড়তি দানের ফজিলত ও তাৎপর্য-রমজান মাসে দান করলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

যাকাত ও সাদকাহর পার্থক্য:

যাকাত: বাধ্যতামূলক এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে।

সাদকাহ: স্বেচ্ছায় এবং যে কোনো পরিমাণে।

সাদকাহ দান বিপদ থেকে রক্ষা করে এবং রিজিক বৃদ্ধি করে। নবীজি বলেছেন:

“সাদকাহ বিপদকে দূর করে এবং আয়ু বৃদ্ধি করে।“ (তিরমিজি)

কাকে যাকাত দেওয়া যাবে:

কুরআনে আটটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে, যাদেরকে যাকাত দেওয়া যায়:إنما الصدقات للفقراء والمساكين والعاملين عليها والمؤلفة قلوبهم وفي الرقاب والغارمين وفي سبيل الله وابن السبيل فريضة من الله والله عليم حكيم . – سورة التوبة 9:60

1. দরিদ্র (ফকির)

2. মিসকিন (অতি দরিদ্র)

3. যাকাত সংগ্রহকারী

4. নতুন মুসলিম

5. দাসমুক্তির জন্য

6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি

7. আল্লাহর পথে (ফি সাবিলিল্লাহ)

8. মুসাফির (যারা পথে অসহায়)

যাকাতের উপকারিতা ও উদ্দেশ্য:

1. আত্মশুদ্ধি: যাকাত অর্থের ভালোবাসা দূর করে এবং মনের কলুষতা দূর করে।

2. সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা: দরিদ্রদের সহায়তার মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে।

3. সম্পদের পবিত্রতা: যাকাত সম্পদের অপবিত্রতা দূর করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।

জরুরি অবস্থায় যাকাত:

যদি রমজান মাসের আগে কোনো জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়, যেমন দুর্যোগ বা মহামারী, তাহলে সেই সময়ে যাকাত প্রদান করা উত্তম।

নবীজি বলেছেন:

“কাজের ফল নির্ভর করে নিয়তের উপর।“ (বুখারি, মুসলিম)

সুতরাং, প্রয়োজনে আগেই যাকাত দিলে সওয়াব কমবে না বরং তা আরো বৃদ্ধি পাবে।

যাকাত ও ব্যবসায়িক সম্পদ:

যারা ব্যবসা করেন তাদের ব্যবসায়িক মালামালের উপরও যাকাত ফরজ। ব্যবসায়িক মালের মজুদ হিসাব করে তার উপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।

সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

যাকাত কিভাবে বিতরণ করবেন:

সরাসরি দরিদ্রদের হাতে পৌঁছে দিন।

বিশ্বাসযোগ্য ইসলামী সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করুন।

এমন স্থানে দিন যেখানে প্রকৃত প্রয়োজনে আছে।

যাকাত না দিলে পরিণাম:

যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাদের জন্য কুরআনে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে এবং আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।“ (সূরা আত-তওবা: ৩৪)

হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর হাদিস

কুরআনের বাণী ছাড়াও, আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে তাঁর জাতির জন্য আচরণের ক্ষেত্রেও আদর্শ করে তুলেছেন। এর মধ্যে যাকাতের উদাহরণও রয়েছে। নীচের নবীর হাদিসে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি একজন ব্যক্তি তার সম্পদের জন্য যাকাত না দেয় তবে তাকে কী শাস্তি পেতে হবে।

আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন মহিলা (মা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসেছিলেন। তার মেয়ের হাতে এক জোড়া সোনার বালা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তুমি কি তোমার মেয়ের (পরা) দুটি সোনার বালাতে যাকাত দিয়েছ?’, মা উত্তর দিলেন: ‘না’, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা যদি দুটি আগুনের বালা দিয়ে মুড়িয়ে দেন, তাহলে কি তুমি খুশি হবে?’, মা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার মেয়ের দুটি সোনার বালা খুলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে দিয়ে বললেন: ‘আমি এই দুটি সোনার বালা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে দান করছি ।‘ (আবু দাউদ, আত-তিরমিযী, এবং আল-নাসাঈ।)

উপসংহার:

রমজান মাসে যাকাত দেওয়া শুধু দান নয়, এটি আল্লাহর নির্দেশ পালনের একটি অংশ। যাকাত আমাদের সম্পদকে পবিত্র করে, দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করে এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। তাই, সঠিকভাবে যাকাত নির্ধারণ ও প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের সবার যাকাত কবুল করুন এবং আমাদের সম্পদে বরকত দান করুন। আমিন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter