ইসলামি অর্থনীতি: পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের সংকট মোচনে এক শাশ্বত সমাধান

বর্তমান যুগের মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, অর্থ-ব্যবস্থার রঙ্গমঞ্চে দুইটি বিশাল মতবাদ পরস্পরের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছে—একদিকে পুঁজিবাদ, অন্যদিকে সাম্যবাদ। উভয়েই মানুষের প্রকৃতি, সম্পত্তির অধিকার এবং সমাজ-ব্যবস্থা সম্পর্কে নিজস্ব স্বতন্ত্র ধারণা প্রসূত; এবং উভয়েই আপন আপন ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য অর্জন করিলেও, কালক্রমে গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হইয়াছে। এই দুই মতবাদের জঠর হইতে জন্ম নেওয়া সংকটসমূহ আজ মানবজাতিকে এক গভীর সংশয়ের মুখে দাঁড় করাইয়াছে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে, চিরায়ত ইসলামি অর্থ-ব্যবস্থা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান হইয়া একটি তৃতীয় পথের নির্দেশ দিতেছে। এই পথের মূল মন্ত্র এই যে, নিখিল বিশ্বের সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক একমাত্র পরমেশ্বর বা আল্লাহ; মানুষ কেবল সেই সম্পদের অছি বা আমানতদার মাত্র। মানুষের স্বার্থপরতা বা আত্মপ্রীতি থাকিবে, কিন্তু তাহা হইবে সংযত এবং নৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দৃষ্টিকোণ হইতে বিচার করিলে দেখা যায়, ইসলামি আদর্শ কেবল পূর্ববর্তী দুই মতবাদের চরমপন্থাকেই পরিহার করে না, বরং তাহাদের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধিতারও সুন্দর মীমাংসা করিয়া থাকে।

দার্শনিক ভিত্তি: মালিকানা ও দায়িত্ববোধের মিলন

ইসলামি অর্থনীতির হৃদয়ে যে বিশ্বাসটি স্পন্দিত হইতেছে, তাহা হইল—এই ধরণী ও ইহার সমস্ত সম্পদ মানবের নিকট এক পবিত্র আমানতস্বরূপ; ইহা মানুষের নিরঙ্কুশ বা অবাধ অধিকারের বস্তু নহে। ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত, এমনকি উৎসাহিতও বটে, কিন্তু তাহা সর্বদাই নৈতিক ও সামাজিক কর্তব্যপালনের শর্তে আবদ্ধ। সম্পদ এখানে আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার নহে, বরং সেবা ও তত্ত্বাবধানের উপায়। এই একটিমাত্র মূলনীতি পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ—উভয়েরই বুনিয়াদকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।

পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত মালিকানাকে চরম ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। ইহার ফলে এমন এক ব্যবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে, যেখানে জবাবদিহিতা ব্যতিরেকেই সম্পদের পাহাড় গড়া সম্ভব হয় এবং নৈতিকতার বালাই না রাখিয়াই উৎপাদন চলিতে থাকে। অন্যদিকে সাম্যবাদ, পুঁজিবাদের এই অনাচারের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, উৎপাদনের উপায়ের উপর হইতে ব্যক্তিগত মালিকানাকে সমূলে উৎপাটন করিয়া সমস্ত কিছুকে সমষ্টি বা রাষ্ট্রের কুক্ষিগত করিয়াছে। কিন্তু হায়! ইহা করিতে গিয়া তাহারা মানুষের সেই ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ ও উদ্দীপনাকেও নির্বাসিত করিয়াছে, যাহা মালিকানা হইতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মলাভ করে।

ইসলামি ব্যবস্থা ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সামাজিক নজরদারি—উভয়ের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকিবে, কিন্তু তাহা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের অহমিকা হইতে উদ্ভূত নহে, বরং ঐশ্বরিক অনুমতির দান। আবার জনস্বার্থ যেখানে দাবি করে—যেমন প্রাকৃতিক সম্পদ বা বৃহৎ অবকাঠামো—সেখানে রাষ্ট্রীয় বা গণমালিকানাও থাকিবে, কিন্তু তাহা যেন আবার ব্যক্তির উদ্যমকে গ্রাস না করিয়া ফেলে। এই সুষম দৃষ্টিভঙ্গি দুই চরমপন্থার বিষক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করিয়া দেয়; ইহা একাধারে পুঁজিবাদের শোষণকে রোধ করে এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া কারবারের স্থবিরতা ও স্বৈরাচারকেও রুখিয়া দাঁড়ায়।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

প্রতিটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে সাফল্যের মাপকাঠি হইল মুনাফা ও পার্থিব সমৃদ্ধি; সাম্যবাদের নিকট তাহা সাম্য ও সমষ্টিগত নিয়ন্ত্রণ। উভয়েই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জগত বলিয়া মনে করে—উৎপাদন ও বণ্টনের এমন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যাহার সহিত আধ্যাত্মিকতা বা নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নাই। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এই বিচ্ছেদকে অস্বীকার করে। এখানে অর্থনৈতিক জীবন এক বৃহত্তর নৈতিক শৃঙ্খলার অংশ, যেখানে আধ্যাত্মিক কল্যাণ, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সম্প্রীতি অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্য হিসেবে বিরাজমান।

এই উচ্চতর অবস্থান হইতে দেখিলে বুঝা যায়, অর্থনৈতিক নীতি কেবল দক্ষতা বা উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির অন্ধ অন্বেষণ হইতে পারে না। উৎপাদনের মূল্য কেবল তাহার পরিমাণের উপর নির্ভর করে না, বরং তাহা মানবমযার্দা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় কতটুকু সহায়ক, তাহার উপরও নির্ভর করে। ভোগের ক্ষেত্রেও একই কথা—প্রয়োজন মেটানো ও জীবন ধারণের জন্য ভোগ বৈধ, কিন্তু অপচয়, লোভ এবং জাঁকজমক প্রদর্শনকে আমানতের খেয়ানত বলিয়া গণ্য করা হয়। সুতরাং, এই ব্যবস্থা বস্তুগত অগ্রগতিকে নৈতিক উদ্দেশ্যের সহিত একসূত্রে গাঁথিয়া দেয়, যাহাতে সমৃদ্ধি আসিলে সমাজের নৈতিক বুনন ছিঁড়িয়া না যায়।

সম্পদ বণ্টন ও ন্যায়বিচার

পুঁজিবাদের অন্যতম প্রধান স্ববিরোধিতা নিহিত রহিয়াছে ইহার বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে। বাজার ব্যবস্থা শ্রমের চেয়ে পুঁজিকে, প্রয়োজনের চেয়ে মেধাকে এবং ন্যায়পরায়ণতার চেয়ে দখলদারিত্বকে অধিক পুরস্কৃত করে। সময়ের আবর্তে ইহা সমাজে বিশাল বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং দরিদ্রের প্রান্তিকীকরণের জন্ম দেয়। সাম্যবাদ এই ত্রুটি সংশোধনের নামে এক জবরদস্তিমূলক সমতা চাপাইয়া দেয়, যাহা বৈচিত্র্যকে দমন করে, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের স্পৃহাকে হত্যা করে এবং প্রায়শই অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক নিপীড়নের আমদানি করে।

ইসলামি বণ্টন ব্যবস্থা এক ভিন্ন যুক্তির উপর পরিচালিত। ইহা প্রচেষ্টা ও উদ্ভাবনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার পুরস্কারকে স্বীকৃতি দেয় বটে, কিন্তু সম্পদ যাহাতে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত না হইয়া সমাজে প্রবাহিত থাকে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করে। যাকাত (বাধ্যতামূলক দান), সুদ বা রিবার নিষিদ্ধকরণ এবং একচেটিয়া কারবার ও ফাটকাবাজির নিয়ন্ত্রণ—এই সকল হাতিয়ারের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহকে সামাজিকভাবে উৎপাদনমুখী রাখা হয়। এখানে জবরদস্তিমূলক পুনর্বণ্টন বা বাজারের উদাসীনতা—কোনোটিই নাই; তাহার পরিবর্তে রহিয়াছে এক নিরবচ্ছিন্ন নৈতিক ও আইনি সঞ্চালন—সমাজের ধমনীতে সম্পদের এক "ন্যায়সঙ্গত প্রবাহ"। এখানে ন্যায়বিচার মানে কেবল গাণিতিক সমতা নহে, বরং প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান।

রাষ্ট্র ও বাজারের ভূমিকা

পুঁজিবাদ তাহার সমস্ত ভরসা ন্যস্ত করিয়াছে বাজারের উপর; ধরিয়া লইয়াছে যে, ব্যক্তিগত স্বার্থান্বেষণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আপনা-আপনি সমষ্টিগত কল্যাণ বহিয়া আনিবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আমরা বারংবার দেখিয়াছি, নৈতিক ও আইনি বাঁধনহীন বাজার কেবল সংকটই সৃষ্টি করে—বেকারত্ব, ফাটকাবাজির বুদবুদ এবং শোষণ যাহার নিত্যসঙ্গী। সাম্যবাদ ইহার জবাবে উৎপাদন ও বণ্টনের সর্বময় কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতে তুলিয়া দিয়াছে; কিন্তু ইহাও ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হইয়াছে—অর্থনৈতিক অরাজকতার পরিবর্তে আসিয়াছে আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচার।

ইসলামি ব্যবস্থা বাজার ও রাষ্ট্র—উভয়কেই তাহাদের যথাযোগ্য ও সীমিত ভূমিকা প্রদান করিয়াছে। বাজারকে বিনিময় ও উদ্ভাবনের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু তাহা পরিচালিত হইবে এক নৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে, যাহা প্রতারণা, একচেটিয়া আধিপত্য ও অবিচারকে রোধ করিবে। অন্যদিকে রাষ্ট্র জনকল্যাণের অভিভাবক, অর্থনৈতিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রক এবং সমষ্টিগত সম্পদের রক্ষক হিসেবে কাজ করিবে, কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগের কণ্ঠরোধ করিবে না। এই গতিশীল ভারসাম্য অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার অরাজকতা এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার পক্ষাঘাত—উভয় সংকট হইতেই সমাজকে রক্ষা করে।

মানবিক উপাদান: মানুষ কি কেবলই যন্ত্র?

পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ—উভয়ের মূলে রহিয়াছে মানুষের প্রতি এক খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি। পুঁজিবাদের চোখে মানুষ কেবলই স্বার্থান্বেষী এক যুক্তিবাদী প্রাণী, আর সাম্যবাদের চোখে সে সমষ্টিগত উৎপাদনের এক যন্ত্রাংশ মাত্র। ইসলামি ব্যবস্থা অর্থনৈতিক জীবনে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গভীরতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। মানুষ এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন পরমাণু বা মেশিনের চাকা নহে; সে এক নৈতিক সত্তা, যে তাহার উপার্জন, ব্যয় এবং সম্পদ বণ্টনের জন্য পরমেশ্বরের নিকট দায়বদ্ধ।

এই নৈতিক দায়বদ্ধতা মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে আমূল পরিবর্তন করিয়া দেয়। মুনাফা কেবল তখনই বৈধ, যখন তাহা সৎ ও গঠনমূলক উদ্দেশ্যে সাধিত হয়। শ্রম এখানে কেবল পণ্য নহে, বরং ইবাদত ও সাধারণের মঙ্গলে অবদান রাখার এক সম্মানজনক উপায়। দান ও উদারতা এখানে ঐচ্ছিক গুণ মাত্র নহে, বরং অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সংহতি রক্ষার অপরিহার্য নীতি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই নৈতিক অভিপ্রায়ের সঞ্চার করিয়া ইসলামি ব্যবস্থা সেই বিচ্ছিন্নতাবোধকে দূর করে যাহা পুঁজিবাদ সৃষ্টি করে, এবং সেই জবরদস্তিকেও নিরসন করে যাহা সাম্যবাদ চাপাইয়া দেয়।

স্ববিরোধিতার মীমাংসা

পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের সংকট আসিলে ভারসাম্যহীনতা হইতে—প্রথমটি ব্যক্তি-স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্যকে এমন উচ্চে তুলিয়া ধরে যে সামাজিক ন্যায়বিচার ভুলুণ্ঠিত হয়; দ্বিতীয়টি সমতাকে এমন প্রাধান্য দেয় যে তাহা স্বৈরাচারে পর্যবসিত হয়। ইসলামি ব্যবস্থা এই সমস্যার সমাধান করে স্বাধীনতা ও সমতা—উভয়কেই এক উচ্চতর মূল্যের অধীনে আনয়ন করিয়া; আর সেই মূল্যটি হইল 'ন্যায়বিচার' বা 'আদল'—যাহা একটি নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্যে প্রত্যেককে তাহার প্রাপ্য প্রদান করে। এখানে স্বাধীনতা সুরক্ষিত, কিন্তু তাহা স্বেচ্ছাচারিতা নহে; সমতাও কাম্য, কিন্তু তাহা বৈচিত্র্যহীন একাকারত্ব নহে। ঈশ্বরের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার সূত্রে উভয়কেই এক সুষম ছন্দে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে।

ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, এই ভারসাম্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, কারণ ব্যক্তি তাহার কাজের প্রেরণা ও মালিকানা উভয়ই বজায় রাখে। ইহা জনকল্যাণ নিশ্চিত করে, কারণ সমাজ নৈতিক সীমা ও পুনর্বণ্টন কার্যকর করে। এবং সর্বোপরি ইহা স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, কারণ অর্থনৈতিক আচরণ এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোর সহিত একীভূত হইয়া থাকে, যাহা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নহে, বরং স্বতঃস্ফূর্ত মান্যতা দাবি করে।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মধ্যবর্তী কোনো আপস-মীমাংসা বা 'মধ্যপন্থা' মাত্র নহে; বরং ইহা এক স্বতন্ত্র এবং বিকল্প দৃষ্টান্ত। ইহা সম্পদকে আমানত, শ্রমকে সম্মান, মালিকানাকে দায়িত্ব এবং উৎপাদনকে সেবা হিসেবে গণ্য করে। অর্থনৈতিক জীবনকে নৈতিক উদ্দেশ্য ও ঐশ্বরিক জবাবদিহিতার মূলে প্রোথিত করিয়া, ইহা লোভের নিকট আত্মসমর্পণ না করিয়াই মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করে এবং জবরদস্তির আশ্রয় না লইয়াই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে পুঁজিবাদ সমাজকে খণ্ড-বিখণ্ড করে এবং সাম্যবাদ সমাজকে যান্ত্রিক সমতলে নামাইয়া আনে, সেখানে ইসলামি আদর্শ বস্তুগত উন্নতির সহিত নৈতিক শৃঙ্খলার এক অপূর্ব মিলন ঘটাইতে প্রয়াসী হয়—যাহাতে অর্থনীতি মানুষের মর্যাদার বাহন হইতে পারে, নিজেই চরম লক্ষ্য হইয়া না দাঁড়ায়।

ভাবার্থ ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ

যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে মানবসভ্যতা আজি এক বিশাল সংকটের সম্মুখীন। যন্ত্রের চাকা ঘুরুক, ধনের পাহাড় জমুক, কিন্তু মানুষের অন্তরের তৃষ্ণা কি মিটিয়াছে? ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী ধরিয়া আমরা দেখিয়াছি, মানুষের মনন ও কর্মজগৎ দ্বিধাবিভক্ত হইয়া গিয়াছে। একদিকে ধনিকতন্ত্রের জয়জয়কার, যেখানে ব্যক্তির লোভ ও লালসা অবারিত স্রোতে বহিয়া চলিয়াছে, দুর্বলকে পিষিয়া মারিয়া সবল নিজের বিজয়পতাকা উড্ডীন করিতেছে। ইহাকেই আমরা নাম দিয়াছি 'ক্যাপিটালিজম' বা পুঁজিবাদ। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিই সর্বেসর্বা, সমাজ সেখানে গৌণ। ফলে ধনের বিষম বণ্টনে সমাজদেহ জরাজীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে, এক প্রান্তে অতিশয্যের জঞ্জাল, অন্য প্রান্তে অনাহারের হাহাকার।

ইহারই প্রতিবাদে গর্জিয়া উঠিয়াছিল সাম্যবাদ বা 'কমিউনিজম'। তাহারা বলিল, ব্যক্তির কোনো স্বতন্ত্র সত্তা থাকিবে না, রাষ্ট্রই হইবে সব কিছুর নিয়ন্তা। তাহারা মানুষের ক্ষুধা নিবারণের ভার লইল বটে, কিন্তু তাহার চিত্তের স্বাধীনতা কাড়িয়া লইল। মানুষকে তাহারা বানাইল এক বিশাল যন্ত্রের ক্ষুদ্র বলটু। পেট ভরিল, কিন্তু মন মরিল। যে সৃজনী শক্তি মানুষের সহজাত, রাষ্ট্রযন্ত্রের পেষণে তাহা পিষ্ট হইয়া গেল। এক চরম হইতে মানবজাতি ছুটিতে চাইল অন্য এক চরমে, কিন্তু শান্তির দেখা মিলিল না। আগুনের কুণ্ড হইতে পলাইয়া সে পড়িল গিয়া জলের অতল গহ্বরে।

এই দুই মেরু-সংকটের মাঝখানে দাঁড়াইয়া ইসলামি অর্থব্যবস্থা এক স্নিগ্ধ, সুশীতল ছায়াতলে মানুষকে আহ্বান জানাইতেছে। এই প্রবন্ধের মূল সুরটি বড়ই গভীর ও ব্যঞ্জনাময়। লেখকের মতে, ইসলামি অর্থনীতি কোনো জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা নহে, ইহা এক শাশ্বত দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই দর্শনটি কি? তাহা হইল—'মালিক আমি নই, মালিক তুমিও নও, মালিক সেই বিশ্ববিধাতা'।

রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছিলেন, "আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে"—মানুষের চেতনায় জগতের রূপ ধরা দেয় বটে, কিন্তু সেই রূপ ও রসের প্রকৃত উৎস তো সেই অনন্ত অসীম। ইসলামি অর্থনীতি এই সত্যকেই ধ্রুবক মানিয়া লইয়াছে। এখানে সম্পদ আমার 'হাতের মুঠোয় ধরা' কোনো বস্তু নহে, যাহাকে আমি যথেচ্ছ ব্যবহার করিতে পারি। বরং ইহা এক 'আমানত', এক পবিত্র গচ্ছিত ধন। আমি কেবল তাহার রক্ষক বা ট্রাস্টি। এই একটি বোধ যখন মানুষের অন্তরে জাগরূক হয়, তখন সে আর সম্পদকে কুক্ষিগত করিয়া রাখিতে পারে না। সে বুঝে, তাহার ধনে দরিদ্রের হক আছে, সমাজের দাবি আছে।

পুঁজিবাদে দেখি, ধনের অবাধ সঞ্চয়ন। সেখানে 'আমি' এবং 'আমার'—এই দুই শব্দের দাপট। অপরদিকে সাম্যবাদে দেখি, জোর করিয়া কাড়িয়া লওয়ার নীতি। সেখানে ব্যক্তির 'আমি'কে রাষ্ট্রের 'আমরা'র যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলাম মানুষের স্বভাবধর্মকে অস্বীকার করে না। মানুষ নিজের জন্য কিছু চায়, নিজের শ্রমে অর্জিত ফলের স্বাদ সে পাইতে চায়—ইহা তো দোষের নহে। ইসলাম এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে সম্মান জানায়, কিন্তু লাগামহীন হইতে দেয় না। ঘোড়ার মুখে লাগাম পরাইলে যেমন সে আরোহীকে ফেলিয়া দেয় না, বরং গন্তব্যে লইয়া যায়, তেমনি লোভের মুখে ধর্মের ও নীতির লাগাম পরাইলে সম্পদ আর অনর্থের কারণ হয় না।

প্রবন্ধকার অতি নিপুণভাবে দেখাইয়াছেন যে, ইসলামি ব্যবস্থায় 'জাস্টিস' বা ন্যায়বিচার কোনো গালভরা বুলি মাত্র নহে। ইহা রক্তসঞ্চালনের মতো। শরীরে রক্ত যেমন এক জায়গায় জমিয়া থাকিলে পচন ধরে, তেমনি সমাজে ধন এক জায়গায় জমিয়া থাকিলে অশান্তি সৃষ্টি হয়। যাকাত ব্যবস্থা, সুদের উচ্ছেদ—এই সবই তো সেই রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া। সুদ মানুষকে অলস করে, শোষক বানায়; বিনা শ্রমে অন্যের রক্ত চুষিয়া খাওয়ার প্রবৃত্তি জন্মায়। ইসলাম তাই সুদকে হারাম করিয়াছে, যাহাতে মানুষ শ্রমের মর্যাদা বুঝে, একে অপরের দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হয়।

রাষ্ট্র ও বাজারের সম্পর্ক লইয়া যে দ্বন্দ্ব আজ বিশ্বজুড়িয়া, তাহারও এক চমৎকার মীমাংসা এখানে পাওয়া যায়। বাজার থাকিবে, বেচাকেনা চলিবে, প্রতিযোগিতাও থাকিবে—কিন্তু তাহা যেন মৎস্যায় বা জঙ্গলের নীতি না হয়। রাষ্ট্র সেখানে প্রহরীর মতো জাগিয়া থাকিবে। কেউ যেন ওজনে কম না দেয়, কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি না করে। আবার রাষ্ট্র নিজেও যেন বানিয়া না সাজে। রাষ্ট্র থাকিবে সেবকের ভূমিকায়, শোষকের ভূমিকায় নহে।

সবচেয়ে বড় কথা, মানুষকে এখানে কী দৃষ্টিতে দেখা হইয়াছে? আধুনিক অর্থনীতি মানুষকে বানাইয়াছে 'ইকোনমিক ম্যান'—যে কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে। কিন্তু মানুষ তো কেবলই গণিতবিদ নহে, সে যে এক অনন্ত সম্ভাবনাময় আত্মা! তাহার পেটের ক্ষুধা যেমন আছে, মনের ক্ষুধাও আছে; তাহার শরীরের দাবি যেমন আছে, আত্মার দাবিও আছে। ইসলামি অর্থনীতি মানুষের এই পূর্ণাঙ্গ রূপটিকে স্বীকার করে। এখানে রুজি-রোজগারও ইবাদত, যদি তাহা সৎপথে হয়। শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক এখানে প্রভু-দাসের নহে, বরং ভাই-ভাইয়ের।

আজকের এই ভোগবাদী সমাজে, যেখানে মানুষ মানুষকে পণ্য ভাবিতেছে, প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করিতেছে, সেখানে এই প্রবন্ধের বার্তা বড়ই প্রাসঙ্গিক। আমরা ভুলিয়া গিয়াছি যে, পৃথিবীর সম্পদ অসীম নহে, এবং আমাদের ভোগলিপ্সারও কোনো শেষ নাই। ইসলামি অর্থনীতি আমাদের সেই সংযমের শিক্ষা দেয়। "প্রয়োজন মতো নাও, কিন্তু অপচয় করিও না"—এই মন্ত্র যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করিতে পারি, তবেই হয়তো এই ধরণী আবার শস্য-শ্যামলা হইয়া উঠিবে।

পরিশেষে এই কথাই বলিতে হয়, লেখক কুমাইল আল-তামিমি যে দিশা দেখাইয়াছেন, তাহা কেবল কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নহে, বরং সমগ্র মানবজাতির মুক্তির পাথেয়। পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষ আজ মুক্তির পথ খুঁজিতেছে। সেই পথ কোনো চরমপন্থা নহে, সেই পথ ভারসাম্যের পথ, ন্যায়ের পথ, মানবতার পথ। সেই পথ আমাদের শিখায়—ধন বড় নহে, মানুষ বড়; ভোগে সুখ নাই, ত্যাগেই প্রকৃত আনন্দ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলিতে গেলে—

"বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।

অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়

লভিব মুক্তির স্বাদ।"

এই পৃথিবীর অসংখ্য কর্মবন্ধনের মাঝেই আমাদের মুক্তির স্বাদ খুঁজিতে হইবে, আর সেই কর্ম হইতে হইবে ন্যায়ের ভিত্তিতে, প্রেমের ভিত্তিতে, এবং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শন সেই মহানন্দময় মুক্তিরই সন্ধান দেয়, যেখানে অর্থনীতি কেবল পেটের ক্ষুধা মিটায় না, বরং আত্মার খোরাক জোগায়; মানুষকে পশুত্বের স্তর হইতে দেবত্বের স্তরে উন্নীত হইবার সুযোগ করিয়া দেয়। ইহাই তো প্রকৃত সভ্যতার সংকট মোচনের একমাত্র উপায়।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter