পরিবার জীবনে ইসলামের সৌন্দর্য: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও আদর্শ পরিবার গঠন
ভূমিকা :
পরিবার হল সমাজের মূল ভিত্তি, আর ইসলাম পরিবারকে একটি পবিত্র ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের রূপ দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার একটি নিদর্শন। কুরআন ও হাদিসে আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা একটি সুন্দর, সুখী ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারে।
এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সৌন্দর্য, দাম্পত্য জীবনের নীতিমালা, পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব এবং কীভাবে একটি আদর্শ ইসলামিক পরিবার গঠন করা যায়।
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গুরুত্ব :
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটি দৃঢ় এবং সুরেলা সম্পর্ক এই পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ এবং পরিপূর্ণ জীবন এবং পরকালে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। কুরআন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গভীর বন্ধনের উপর জোর দেয়, তাদেরকে একে অপরের পোশাক হিসেবে বর্ণনা করে: "তারা তোমাদের জন্য পোশাক, এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক..." (কুরআন ২:১৮৭)। এই রূপকটি বৈবাহিক জীবনে সুরক্ষা, সান্ত্বনা এবং ঘনিষ্ঠতাকে বোঝায়। একটি প্রেমময় এবং করুণাময় সম্পর্ক প্রশান্তি এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে, যা আল্লাহ অন্য একটি আয়াতে তুলে ধরেছেন: "এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকে তোমাদের সঙ্গী তৈরি করেছেন যাতে তোমরা তাদের মধ্যে প্রশান্তি পেতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে স্নেহ ও করুণা স্থাপন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (কুরআন ৩০:২১)। একটি শক্তিশালী বৈবাহিক বন্ধন কেবল সুখ নিশ্চিত করে না বরং একটি ধার্মিক পারিবারিক পরিবেশও লালন করে যেখানে বিশ্বাস এবং ভালো চরিত্র গড়ে ওঠে।
এই পৃথিবীর বাইরে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্প্রীতি পরকালে তাদের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে উত্তম, আর আমি আমার স্ত্রীদের সাথে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী)। এই হাদিসটি তুলে ধরে যে, স্বামী-স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করা ধার্মিকতার একটি পরিমাপ। একটি ধার্মিক এবং সহায়ক সম্পর্ক জান্নাতে চিরস্থায়ী সাহচর্যের দিকে পরিচালিত করে, যেমন কুরআন প্রতিশ্রুতি দেয়: "তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা আনন্দের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করো।" (কুরআন ৪৩:৭০)। যদি কোন দম্পতি বিশ্বাস, ধৈর্য এবং ধার্মিকতার সাথে একে অপরকে সমর্থন করে, তাহলে তারা পরকালে একসাথে পুরস্কৃত হবে। অতএব, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং দয়া কেবল পার্থিব গুণ নয় বরং আল্লাহর দৃষ্টিতে চিরস্থায়ী সুখ অর্জনের একটি উপায়ও। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে শুধু দাম্পত্য বন্ধন হিসেবে নয়, বরং এটি আল্লাহর একটি নিয়ামত ও রহমত হিসেবে দেখিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“আর তাঁর এক নিদর্শন হলো তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।“
(সূরা রূম: ২১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা ও দয়ার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা থাকা আবশ্যক।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব :
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে উভয়ের কিছু নির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে, যা পালন করলে দাম্পত্য জীবন সুখের হয়।
স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:
ইসলামে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক অধিকার এবং দায়িত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বৈবাহিক জীবনে ভারসাম্য এবং সম্প্রীতি নিশ্চিত করে। কুরআনে বলা হয়েছে, "এবং তাদের (স্ত্রীদের) অধিকার রয়েছে (স্বামীদের) মতোই, যেমন সদয়ভাবে তাদের উপর..." (কুরআন ২:২২৮)। এই আয়াতটি প্রতিষ্ঠিত করে যে উভয় স্বামী-স্ত্রীরই সমান কিন্তু পরিপূরক কর্তব্য রয়েছে। স্বামী পরিবারে আর্থিক সহায়তা, সুরক্ষা এবং নেতৃত্ব প্রদানের জন্য দায়ী, যেমনটি "পুরুষরা নারীদের রক্ষক এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী..." (কুরআন ৪:৩৪) এ বলা হয়েছে। এদিকে, স্ত্রীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা এবং স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পরিবর্তে, তিনি পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ, সন্তানদের লালন-পালন এবং তার স্বামীর আধ্যাত্মিক ও পার্থিব কর্তব্যে সহায়তা করার জন্য দায়ী। এই পারস্পরিক সহযোগিতা পারিবারিক ইউনিটকে শক্তিশালী করে এবং বৈবাহিক জীবনে ন্যায়বিচার বজায় রাখে।
বস্তুগত দায়িত্বের বাইরে, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সহায়তাও বিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, "ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মুমিন হলেন তারা যারা চরিত্রের দিক থেকে সেরা, এবং তোমাদের মধ্যে সেরা হলেন তারা যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি সর্বোত্তম।" (তিরমিযী)। এটি তুলে ধরে যে, দয়া, ধৈর্য এবং শ্রদ্ধা বৈবাহিক দায়িত্বের অপরিহার্য দিক। একজন স্ত্রীর উচিত তার স্বামীর জন্য সান্ত্বনা এবং সহায়তার উৎস হওয়া, ঠিক যেমন একজন স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল এবং বোধগম্য হওয়া। উভয়েরই উচিত বিশ্বাসে একে অপরকে উৎসাহিত করা, কঠিন সময়ে সাহায্য করা এবং শান্তি ও ধার্মিকতায় ভরা একটি পরিবার তৈরি করার জন্য একসাথে কাজ করা। আন্তরিকতার সাথে এই অধিকার এবং দায়িত্বগুলি পালন করে, স্বামী-স্ত্রী এই পৃথিবীতে বৈবাহিক সুখ এবং পরকালে চিরন্তন পুরস্কার অর্জন করতে পারে। এছাড়াও কিছু পারস্পরিক দায়িত্বগুলি হলো:
পরিবারের ভরণপোষণ: স্বামীর দায়িত্ব হলো পরিবারের জন্য হালাল জীবিকা উপার্জন করা ও স্ত্রী-সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। কুরআনে বলা হয়েছে: “পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ একের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে।“ (সূরা নিসা: ৩৪)
স্ত্রীর প্রতি ভালো ব্যবহার করা: নবী (সা.) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করে।“ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
স্ত্রীর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া: নবী (সা.) নিজেও অনেক বিষয়ে তার স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। সুতরাং, স্বামীকে স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
স্ত্রীর মানসিক ও আবেগিক চাহিদা পূরণ: শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং আবেগিক ও মানসিকভাবে স্ত্রীর পাশে থাকা স্বামীর অন্যতম দায়িত্ব।
স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:
স্বামীর প্রতি আনুগত্য: স্ত্রীকে অবশ্যই স্বামীর প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, যদি তা ইসলামের বিধানের পরিপন্থী না হয়। নবী (সা.) বলেছেন: “যদি একজন নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।“ (ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১৮৪৪)
পরিবারের শান্তি বজায় রাখা: স্ত্রীকে এমনভাবে আচরণ করতে হবে যাতে পরিবারে শান্তি বজায় থাকে এবং স্বামী-সন্তানরা মানসিক প্রশান্তি পায়।
গোপনীয়তা রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিষয়গুলো গোপন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী (সা.) বলেছেন: “সবচেয়ে খারাপ মানুষ হল সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অন্যদের বলে বেড়ায়।“ (মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৭)
একটি আদর্শ ইসলামিক পরিবার গঠনের উপায় :
একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ ইসলামিক পরিবার গঠনের জন্য কিছু মূলনীতি মেনে চলা প্রয়োজন।
পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা :
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। একে অপরকে ছোট করা, কটূক্তি করা বা অবহেলা করা দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
ধৈর্য ও সহনশীলতা চর্চা করা :
পরিবারে বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যা আসতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। নবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যের শক্তি দান করেন।“ (বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯)
ইসলামের শিক্ষাগুলো পরিবারের প্রতিটি স্তরে প্রয়োগ করা :
কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী শিক্ষা চর্চা করা নামাজ আদায় করা ও সন্তানদের নামাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা করা
সন্তানদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করা :
একটি ইসলামিক পরিবার গঠনের জন্য সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল, এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।“ (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
উপসংহার :
পরিবার হল ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের ভিত্তি গঠন করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ থাকলে পরিবার সুখী ও সমৃদ্ধ হয়। ইসলামের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করলে দাম্পত্য জীবন শুধু শান্তিপূর্ণই হবে না, বরং এটি জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে।
সুতরাং, আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামের আলোকে আমাদের পারিবারিক জীবনকে গড়ে তোলা, যাতে আমরা এই পৃথিবীতেও শান্তি পাই এবং পরকালেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
আল্লাহ আমাদের সকলকে আদর্শ পরিবার গঠনের তৌফিক দান করুন, আমিন।