সাম্রাজ্য থেকে প্রজাতন্ত্র: মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের রূপান্তর এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ দশক
ভূমিকা
বিশ্ব ইতিহাসে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের নাম এক গৌরবময় অধ্যায়। প্রায় ছয় শতাব্দী (১২৯৯–১৯২৩) ধরে ইসলামি সভ্যতা, শাসন ও সংস্কৃতির ধারক এই সাম্রাজ্য ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে শাসন বিস্তার করেছিল। এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ন্যায়বিচার ও শরিয়াহভিত্তিক শাসনের প্রতীক।
কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জাতীয়তাবাদের উত্থান সাম্রাজ্যটিকে নাড়িয়ে দেয়। পশ্চিমা শক্তির চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ফলে এই সাম্রাজ্য ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।
এই পতনের ধ্বংসাবশেষ থেকে এক নতুন নেতা—মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১–১৯৩৮)—উত্থিত হন, যিনি জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকতার পতাকা তুলে ধরে তুরস্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বেই জন্ম নেয় এক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র, যা একদিকে আধুনিকতার প্রতীক, অন্যদিকে ইসলামী ঐতিহ্য থেকে এক নাটকীয় বিচ্ছেদ।
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ দশকসমূহ
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ যুগ ছিল অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিদেশি ষড়যন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের উত্থানে ভরপুর। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে ইসলামি শাসনের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা এই সাম্রাজ্য উনবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্রমে অবক্ষয়ের পথে এগোতে থাকে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো তখন একে বিদ্রূপের সুরে “ইউরোপের অসুস্থ মানুষ” (Sick Man of Europe) বলে অভিহিত করত। এর কারণ ছিল, সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, এবং প্রাদেশিক জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
বলকান, আরব উপদ্বীপ, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার প্রদেশগুলো একে একে বিদ্রোহে জ্বলে ওঠে। ১৮২১ সালে গ্রিস স্বাধীনতা অর্জন করে, এরপর সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া প্রভৃতি দেশ ধীরে ধীরে ওসমানীয় শাসন থেকে মুক্ত হয়। এই বিচ্ছিন্নতাবাদ সাম্রাজ্যের ঐক্য নষ্ট করে দেয় এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে।
এই সংকট নিরসনে ১৮৩৯ সালে শুরু হয় তানযিমাত সংস্কার (Tanzimat Reforms), যার লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ও সামরিক আধুনিকায়ন। ওসমানীয় শাসকরা ইউরোপীয় মডেল অনুসরণ করে নতুন আইন প্রণয়ন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। যদিও এসব সংস্কার সামরিক দক্ষতা ও প্রশাসনিক কাঠামো উন্নত করে, তবে এটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শরিয়াহ আদালতকে দুর্বল করে দেয়। পশ্চিমা চিন্তাধারা রাষ্ট্রনীতিতে প্রবেশ করে, ফলে ইসলামী ঐক্যের ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
বিশ শতকের শুরুতে ক্ষমতায় আসে “ইয়ং তুর্ক” আন্দোলন (Young Turk Movement), যারা ১৯০৮ সালে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র চালু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল জাতীয় পুনর্জাগরণ ও আধুনিকতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তারা ইসলামী পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে তুর্কি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেয়। এই ধারার মধ্য দিয়েই পরবর্তীকালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে, যা ওসমানীয় খিলাফতের অবসান ঘটিয়ে তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের পতন
১৯১৪ সালে ওসমানীয় সাম্রাজ্য জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়। এই সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন যুব তুর্ক নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের ফল। তারা মনে করেছিল, এই যুদ্ধে জয়লাভ করলে ওসমানীয় সাম্রাজ্য আবারও তার হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এই অংশগ্রহণ সাম্রাজ্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা করে।
যুদ্ধের শুরুতেই রুশ ফ্রন্টে ওসমানীয় বাহিনী বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে, আরব উপদ্বীপে স্থানীয় বিদ্রোহ শুরু হয়, এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনী যখন গালিপোলি উপদ্বীপে (Gallipoli Peninsula) অবতরণ করে, তখন এক তরুণ সেনাপতি মুস্তাফা কামাল পাশা সেখানে নেতৃত্ব দেন এবং শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করে জাতীয় নায়কে পরিণত হন। এই যুদ্ধে তাঁর কৌশলই পরবর্তীতে তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি গঠন করে।
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হলে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে ওসমানীয় সাম্রাজ্যও পরাজিত হয়। মিত্রশক্তি ইস্তাম্বুল দখল করে এবং ১৯২০ সালের সেভর চুক্তি (Treaty of Sèvres) অনুযায়ী সাম্রাজ্যকে কার্যত ভেঙে ফেলা হয়। আরব দেশগুলো ব্রিটিশ ও ফরাসি ম্যান্ডেটে বিভক্ত হয়ে যায়—সিরিয়া ও লেবানন ফরাসি শাসনে, প্যালেস্টাইন ও ইরাক ব্রিটিশ শাসনে চলে যায়। আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরেও গ্রীক ও আর্মেনীয় বাহিনী আক্রমণ শুরু করে।
এই ভয়াবহ পরাজয় ও বিদেশি দখলের মুখে তুর্কি সমাজে এক নতুন চেতনা জেগে ওঠে—জাতীয় মুক্তির আহ্বান। এই সময়ে মুস্তাফা কামাল পাশা, যিনি সামরিক দক্ষতা ও দৃঢ় নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই সুপরিচিত, ১৯১৯ সালে সামসুনে অবতরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধ (1919–1922), যা পরবর্তীতে এক নতুন রাষ্ট্র—তুরস্ক প্রজাতন্ত্র—এর জন্ম দেয় এবং ওসমানীয় খিলাফতের শতাব্দীপ্রাচীন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায়।
মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের উত্থান
মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১–১৯৩৮) আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তাঁর জন্ম থেসালোনিকি শহরে (বর্তমান গ্রিস), তখনকার ওসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী। শৈশব থেকেই তিনি বুদ্ধিমত্তা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমে অনন্য ছিলেন। মনাস্তির সামরিক বিদ্যালয় ও পরে ইস্তাম্বুলের স্টাফ কলেজে অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি সামরিক দক্ষতা অর্জন করেন এবং ১৯০৫ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আতাতুর্ক গালিপোলি যুদ্ধক্ষেত্রে (Battle of Gallipoli, ১৯১৫) অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর কৌশল ও দৃঢ়তা তুর্কি সেনাদের মনোবল বাড়িয়ে তোলে এবং তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। যুদ্ধশেষে সাম্রাজ্যের পতন ও বিদেশি শক্তির দখলের মুখে তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
১৯১৯ সালের ১৯ মে সামসুনে অবতরণের মাধ্যমে তিনি তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেন। তিন বছরের কঠোর সংগ্রামের পর (১৯১৯–১৯২২) তিনি গ্রিক ও আর্মেনীয় বাহিনীকে পরাজিত করে জাতীয় বিজয় অর্জন করেন। ১৯২৩ সালের লুসান চুক্তি (Treaty of Lausanne) অনুযায়ী নবগঠিত তুরস্ক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
এইভাবে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক একাধারে সামরিক নেতা, রাজনৈতিক সংস্কারক ও নতুন রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই পতিত ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক তুরস্কের জন্ম হয়
ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর আধুনিক তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক হন দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ওসমানীয় খিলাফতের ছয় শতাধিক বছরের অধ্যায়ের অবসান ঘটে। আতাতুর্কের লক্ষ্য ছিল একটি আধুনিক, জাতীয়তাবাদী ও পশ্চিমা ধাঁচের তুরস্ক গঠন, যা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বিশ্বাস করতেন, “ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, রাষ্ট্রের নয়।”
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আতাতুর্ক একের পর এক মৌলিক সংস্কার চালু করেন, যা তুর্কি সমাজকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়।
১. খিলাফতের বিলুপ্তি (১৯২৪): ইসলামী বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক খিলাফতকে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করেন। এর মাধ্যমে উম্মাহর কেন্দ্রিক নেতৃত্বের ধারার অবসান ঘটে এবং তুরস্ক নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
২. মাদ্রাসা ও শরিয়ত আদালতের বিলুপ্তি: ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে পাশ্চাত্য ধাঁচের শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। শরিয়াহ আদালতের বদলে দেওয়ানি ও ইউরোপীয় মডেলের আইনব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে ইসলামী ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা সংকুচিত হয়।
৩. লিপি পরিবর্তন ও ভাষা সংস্কার: ১৯২৮ সালে আরবি হরফ বাদ দিয়ে লাতিন বর্ণমালা চালু করা হয়। এটি ভাষার আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, বাস্তবে তুর্কি জনগণকে ইসলামী সাহিত্য ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
৪. নারীর সামাজিক মুক্তি ও পশ্চিমা পোশাক সংস্কার: আতাতুর্ক নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকারের সুযোগ দেন, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। তবে একই সঙ্গে ইসলামী পোশাক ও পর্দাকে ‘অগ্রগতির অন্তরায়’ বলে নিন্দা করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে পশ্চিমা পোশাক ও সংস্কৃতি গ্রহণ উৎসাহিত করা হয়।
৫. ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও ওয়াকফের জাতীয়করণ: মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াকফ সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি সরকারি দপ্তর (Diyanet İşleri Başkanlığı) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ধর্মকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে তোলে।
এইভাবে আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক ইসলামি খিলাফতের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়—যা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
ইসলামী মূল্যবোধ ও আতাতুর্কের নীতি
মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের পরিচালিত সংস্কারসমূহ ইসলামি বিশ্বে গভীর আলোচনার জন্ম দেয়। বহু চিন্তাবিদ ও আলেম তাঁকে “ধর্মবিরোধী আধুনিকতার স্থপতি” বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষত ১৯২৪ সালে খিলাফতের বিলুপ্তি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ভিত্তিকে নাড়া দেয়। খিলাফত ছিল কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উম্মাহর ঐক্য, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। এর বিলুপ্তি মুসলমানদের হৃদয়ে শূন্যতা সৃষ্টি করে, যা আজও ঐতিহাসিক ক্ষতের মতো বিদ্যমান।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩)
এই ঐক্যের আহ্বান আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তায় স্থান পায়নি। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি জাতীয় রাষ্ট্র গঠন, যেখানে ইসলাম রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন—আধুনিকতা ও অগ্রগতি অর্জনের জন্য ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখা অপরিহার্য। ফলে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয় এবং সমাজজীবনে পশ্চিমা ধাঁচের সংস্কৃতি প্রবর্তিত হয়।
তবে, অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আতাতুর্কের সংস্কার তুরস্কে শিক্ষা, নারী অধিকার, প্রশাসন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। তিনি এক ভগ্নপ্রায় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে এক আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর নীতি তুর্কিদের জাতীয় চেতনা ও আত্মসম্মান ফিরিয়ে দেয়।
তবুও এই প্রগতির মাশুল ছিল ইসলামি মূল্যবোধ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতা। আধুনিকতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের এই দ্বন্দ্ব আজও তুরস্কের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রতিফলিত। নেজমেত্তিন এরবাকান ও রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের মতো নেতারা ইসলামী পুনর্জাগরণের মাধ্যমে সেই ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেছেন, যা আতাতুর্কের উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানায়।
উপসংহার
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ছিল কেবল একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান নয়; এটি ইসলামী ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। ছয় শতাধিক বছর ধরে যে সাম্রাজ্য বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে টিকে ছিল, তার বিলুপ্তি মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসে এক গভীর আঘাত হানে। এর ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসেন মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক—একজন সামরিক বীর, সংস্কারক এবং বিতর্কিত রাষ্ট্রনির্মাতা।
আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। তিনি শিক্ষা, নারী অধিকার, প্রশাসন ও প্রযুক্তিতে আমূল সংস্কার আনেন এবং দেশকে ইউরোপীয় মানচিত্রে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক খিলাফতের ঐক্য, শরিয়াহভিত্তিক বিচারব্যবস্থা এবং ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রজীবন থেকে মুছে যায়।এই দ্বৈত উত্তরাধিকারের ফলেই আতাতুর্কের ভূমিকা ইতিহাসে আজও বিতর্কিত। একদিকে তিনি তুর্কি জাতির মুক্তির স্থপতি, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ভাঙার প্রতীক। তুরস্কের ইতিহাস তাই আজও দুটি শক্তির প্রতিফলন—একদিকে ইসলামী ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বেই গঠিত। একদিকে ইসলামি মূল্যবোধ পুনর্জাগরণের প্রবাহ, অন্যদিকে আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি—এই দুইয়ের ভারসাম্যই ভবিষ্যৎ তুরস্কের আত্মপরিচয় ও স্থিতিশীলতার মূল নির্ধারক হবে। অতএব, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও আতাতুর্কের সংস্কার—দুটিই ইতিহাসের অপরিহার্য বাস্তবতা, যা আমাদের শেখায় যে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সংলাপই একটি জাতির সত্যিকারের শক্তি হতে পারে।