পশুত্বের সীমানা ছাড়িয়ে: ঐশী রুহ ও মানবতার আসল আত্মানুসন্ধান
ভূমিকা
আধুনিক সভ্যতার চোখধাঁধানো চাকচিক্য, বস্তুবাদী উন্নয়ন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চরম উৎকর্ষের যুগে মানুষ আজ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি আমাদের বাহ্যিক জীবনকে অবিশ্বাস্য রকমের সহজ, গতিশীল এবং বিলাসবহুল করে তুলেছে সত্য; কিন্তু একই সাথে মানুষের ভেতরের আত্মিক শূন্যতা, হাহাকার এবং নৈতিক অবক্ষয়কে এক চরম সীমায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের মেধা, সামাজিক স্ট্যাটাস, পেশাগত সাফল্য, ব্যাংক ব্যালেন্স আর বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে মানুষের যোগ্যতা পরিমাপ করতে ব্যস্ত। কিন্তু আসলেই কি মানুষের আসল পরিচয় শুধু এই দৃশ্যমান জাগতিক সমীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? পবিত্র আল-কোরআনের একটি অনন্য ও কালজয়ী বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল মানুষকে তৈরি করা কোনো নিয়মের ফরমান ধরিয়ে দেয় না, বরং মানুষকে তার নিজের সত্তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য ক্রমাগত মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কখনো সরাসরি প্রজ্ঞাপূর্ণ আয়াতের মাধ্যমে, আবার কখনো ইতিহাসের শিক্ষণীয় কাহিনীর অন্তরালে। তেমনই একটি মৌলিক ও চিরন্তন প্রশ্ন হলো: ‘মানুষের আসল পরিচয় ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?’ সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই আধ্যাত্মিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা বারবার দৃশ্যমান জগতকে অগ্রাধিকার দিয়েছি, আর হারিয়ে ফেলেছি আমাদের মূল শিকড়। অথচ মহান আল্লাহ যখন প্রথম মানব সৃষ্টির মহাসিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন, তখনই তিনি মানুষের অস্তিত্বের আসল রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। আজকের ভোগবাদী দুনিয়ায় যেখানে পাশবিক ইচ্ছা ও লাগামহীন জৈবিক চাহিদার দাসত্বকে 'ব্যক্তি স্বাধীনতা' বা 'আধুনিকতা' বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এই মহাসত্যটি পুনরায় অনুধাবন করা অপরিহার্য। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আধুনিক জীবনের অন্ধ ইঁদুর দৌড় আমাদের ভেতরের স্বর্গীয় সত্তাকে ক্রমান্বয়ে হত্যা করছে এবং কোরআনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে কীভাবে একজন মানুষ তার ভেতরের তীব্র মানসিক ও আত্মিক লড়াই জয় করে প্রকৃত মানুষের স্তরে উন্নীত হতে পারে।
মাটি ও রুহের মেলবন্ধন: পশুর চেয়েও উত্তম কিছু
মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে মানুষের আগমন কোনো আকস্মিক বিবর্তন বা দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল এক মহিমান্বিত ঐশী পরিকল্পনা। সৃষ্টির পূর্বে মহান আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের ডেকে বললেন যে তিনি পৃথিবীতে মানুষের মতো একটি প্রজাতি পাঠাতে যাচ্ছেন, তখন ফেরেশতারা মানুষের কেবল বাহ্যিক ও জৈবিক রূপ অর্থাৎ রক্ত-মাংস আর কাদা মাটির সীমাবদ্ধতাই দেখতে পেয়েছিলেন। তারা মানুষের ইতিহাসকে তাদের দূরদৃষ্টি দিয়ে অনুমান করে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই সৃষ্টি পৃথিবীতে কেবল ফাসাদ, বিপর্যয় ও রক্তপাত ঘটাবে। মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস আর বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ-বিগ্রহ, নির্মমতা ও হানাহানি দেখলে ফেরেশতাদের সেই আশঙ্কাকে কোনোভাবেই অমূলক বলা যায় না। কিন্তু পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সেদিন ফেরেশতাদের সেই প্রশ্নের জবাবে যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা মানুষের চিরন্তন আশার আলো:
{إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ}
“নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৩০)
আল্লাহ মানুষের ভেতরে কেবল মাটির উপাদান রাখেননি, বরং তার সাথে যুক্ত করেছেন তাঁর নিজস্ব আদেশ থেকে আসা এক পবিত্র ‘রুহ’ বা আত্মা। মানুষের শরীর মাটির তৈরি হওয়ায় তার প্রাকৃতিক টান সবসময় নিচের দিকে, অর্থাৎ স্থূল আনন্দ, আলসেমি এবং বস্তুগত চাহিদার দিকে। অন্যদিকে, রুহ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসায় তার চিরন্তন তৃষ্ণা ও আকর্ষণ ঊর্ধ্বমুখী যা পবিত্রতা, পরম স্রষ্টার জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি খোঁজে। আজকের আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্ব আমাদের দিনরাত কেবল শরীরের যত্ন নিতে শেখায় জিম, ডায়েট, স্কিন কেয়ার, ফ্যাশন আর ক্যারিয়ারের জৌলুস। কিন্তু আমাদের ভেতরের অনন্ত তৃষ্ণার্ত আত্মাকে অবহেলা করে কেবল শরীরের চাকচিক্য বাড়ানোটা ঠিক তেমনই, যেমন কোনো ভেঙে পড়া জরাজীর্ণ ঘরের বাইরের দেয়ালে দামি রঙের প্রলেপ দেওয়া। যারা আত্মাকে মৃত রেখে কেবল শরীরের জৈবিক চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকে, তাদের জীবনের পরিণতি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। এই নির্মম সত্যটি কোরআনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে:
{أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ}
“তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তাদের চেয়েও পথভ্রষ্ট। তারাই হলো গাফেল বা উদাসীন।” (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৯)
একটি পশুও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তার আহার খোঁজে, নিজের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করে, বংশবৃদ্ধি করে এবং দিনশেষে ঘুমিয়ে পড়ে। আমরাও যদি ঘুম থেকে উঠে কেবল ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটি, উদরপূর্তি করি, সম্পদ জমানোর প্রতিযোগিতায় মাতি আর রাতে ঘুমিয়ে যাই তবে পশুর সাথে আমাদের গুণগত তফাতটা কোথায় রইল? বস্তুত, অনেক দিক থেকে পশুরা আমাদের চেয়েও নিখুঁতভাবে তাদের প্রবৃত্তি ও দায়িত্ব পালন করে। মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান দিয়েছেন কেবল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য নয়, বরং এই জন্য যে মানুষ তার সমস্ত প্রাকৃতিক আকাঙ্ক্ষা ও পাশবিক প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায়, ভালোবেসে মহান স্রষ্টার আনুগত্য করতে পারে।
অন্তরের চিরন্তন যুদ্ধ: নফস আম্মারাহ বনাম নফস লাউওয়ামাহ
মানুষের জীবন আসলে কোনো শান্ত নদী নয়, এটি হলো এক অবিরাম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র। আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং কঠিন যুদ্ধটি বাইরের কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের নিজেদের বুকের ভেতরে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক অবস্থাকে পবিত্র কোরআন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছে। এই আত্মিক লড়াইয়ের প্রথম প্রধান প্রতিপক্ষ হলো ‘নফসে আম্মারাহ’ (মন্দ কাজের নির্দেশক আত্মা)। এটি মানুষের অবচেতন মনের সেই আদিম ও পাশবিক অংশ, যা সবসময় তাৎক্ষণিক আরাম, সাময়িক আনন্দ, অহংকার ও নিষিদ্ধ লালসার দিকে মানুষকে তীব্রভাবে টানে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই নফসের ফিসফিসানি বা প্ররোচনাগুলো কখনোই সরাসরি অশুভ বা ভয়ঙ্কর শোনায় না; বরং এগুলোকে অত্যন্ত যৌক্তিক, আধুনিক এবং আকর্ষণীয় মনে হয়। এটি মানুষের কানে ফিসফিস করে বলে “তুমি তো অনেক কষ্ট করো, এই সামান্য আনন্দটুকু তোমার প্রাপ্য,” “আর মাত্র একবারই তো করবে, পরে তওবা করে নিলেই হবে,” “যুগের সাথে তাল মেলাতে হলে এটা করতেই হবে,” কিংবা “আরে, কেউ তো দেখছে না!”
যদি আমাদের স্বভাবের মধ্যে কেবল এই অন্ধকার দিকটিই থাকত, তবে হয়তো ফেরেশতাদের আশঙ্কাই চিরন্তন সত্যে পরিণত হতো এবং মানুষ পৃথিবীতে কেবলই এক ধ্বংসাত্মক পশুতে পরিণত হতো। কিন্তু পরম দয়াময় আল্লাহ মানুষকে এই অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচাতে তার অন্তরের গভীরে এক অনন্য আধ্যাত্মিক অ্যালার্ম বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন, যাকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘নফসে লাউওয়ামাহ’ (অনুশোচনাকারী আত্মা)। স্বয়ং আল্লাহ এই অনন্য আত্মার শপথ নিয়ে বলেছেন:
{وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ}
“আর আমি কসম খাচ্ছি সেই সত্তার, যা নিজেকে তিরস্কার করে (অনুশোচনাকারী আত্মা) ।” (সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ২)
কোনো অন্যায় কাজ করার পর, কারো সাথে রুক্ষ আচরণ করার পর, কিংবা অলসতায় সময় নষ্ট করার পর মনের ভেতরে যে একটা চাপা অস্বস্তি, তীব্র অপরাধবোধ বা যন্ত্রণাদায়ক অনুশোচনা তৈরি হয় তা কোনো মানসিক দুর্বলতা বা ডিপ্রেশন নয়। এটি আসলে আপনার ভেতরে সজাগ থাকা ‘নফসে লাউওয়ামাহ’। এটি আল্লাহর দেওয়া এক পরম রহমত, যা নির্দেশ করে যে আপনার ভেতরের ঈমান ও মানবতার আলোটি এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। একটি মৃত হৃদয় বা অবশ শরীর যেমন কোনো আঘাতের ব্যথা অনুভব করতে পারে না, তেমনই একটি আধ্যাত্মিকভাবে মৃত আত্মা কখনো পাপের পর অনুতপ্ত হয় না। তাই মনের ভেতরের এই অপরাধবোধ বা কান্নাকে এড়িয়ে না গিয়ে, এটিকে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এক মৃদু ঐশী আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আরোহণ বনাম পতন: আধ্যাত্মিক মধ্যাকর্ষণ ও ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের শক্তি
ইসলামের আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর দিক হলো ভাষার ব্যবহার। পবিত্র কোরআনে জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে সবসময় ‘দারাজাত’ (উচ্চ স্তর বা সিঁড়ি) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে ওপরে ওঠার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, জাহান্নামের গভীরতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘দারাকাত’ (নিচে নেমে যাওয়ার স্তর বা অতল গহ্বর) শব্দটি। এই ভাষাগত পার্থক্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের আত্মার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা। বাস্তব জীবনে আমরা সবাই জানি যে, পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হলে কিংবা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হলে প্রচুর শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়, প্রতিটি কদম অত্যন্ত সচেতনভাবে ও ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলতে হয়। ওপরে ওঠার যাত্রায় সামান্য আলসেমি বা মনোযোগের অভাব ঘটলে থমকে যেতে হয়, কষ্ট সহ্য করতে হয়। কিন্তু পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার জন্য কোনো শক্তির প্রয়োজন হয় না, কোনো আলাদা প্রচেষ্টার দরকার পড়ে না। আপনি যদি কেবল নিজেকে ছেড়ে দেন বা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা না করেন, তবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে আপনি এমনিতেই অতল গহ্বরে পতিত হবেন।
আমাদের আত্মিক জীবনটাও ঠিক এই নিয়মে চলে। এখানে স্থির বা নিউট্রাল থাকার কোনো সুযোগ নেই। আপনি যদি সচেতনভাবে আল্লাহর দিকে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করেন, তবে দুনিয়ার মোহের আধ্যাত্মিক মাধ্যাকর্ষণ আপনাকে প্রতিনিয়ত টেনে নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে যাবে।
- ভোরবেলা তীব্র ঘুম আর আরামের বিছানা ত্যাগ করে নামাজের জন্য দাঁড়ানো হলো ওপরে ওঠার একটি কষ্টকর ধাপ।
- তীব্র রাগের মাথায় প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নরম সুরে কথা বলা হলো আরেকটি আরোহণ।
- সবাই যেখানে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করছে, সেখানে নিজের সততা ধরে রাখা হলো ওপরে ওঠার সফল লড়াই।
- প্রতিটি ছোটখাটো ভুলের পর চোখের জল ফেলে ক্ষমা চাওয়া হলো ওপরে ওঠার সিঁড়ি।
বিপরীতপক্ষে, অহংকার, পরনিন্দা, হিংসা, লোভ এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করার জন্য কোনো কষ্ট করতে হয় না। এগুলো অত্যন্ত সহজ এবং প্রাকৃতিকভাবেই মানুষকে নিচের দিকে টেনে নেয়। তাই ধার্মিক হওয়া বা একজন ভালো মানুষ হওয়াটা সবসময়ই একটু কঠিন মনে হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার কষ্টটাই চূড়ার সৌন্দর্য দেখার আনন্দ এনে দেয়। কেউ কখনো দুর্ঘটনাবশত পাহাড়ে চূড়ায় পৌঁছাতে পারে না, ঠিক তেমনি কেউ কখনো অবহেলা ও অলসতার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে না। আমাদের প্রতিদিনের অতি সাধারণ ও ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করে দিচ্ছে আমরা ওপরে উঠছি নাকি নিচে তলিয়ে যাচ্ছি।
বৈপরীত্যের রহস্য এবং ইবলিসের অদৃশ্য ফাঁদ
মানুষের পতনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিপজ্জনক চোরাবালি হলো অহংকার ও আত্মতুষ্টি। মানব ইতিহাসের প্রথম যে পাপটি আসমানে সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল ইবলিসের অহংকার। যখন পরম স্রষ্টা ইবলিসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদমকে সেজদা করার জন্য, তখন ইবলিস তার যুক্তির ফাঁদে পড়ে বাহ্যিক উপাদানকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সে অহংকার করে বলেছিল, “আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কারণ আপনি আমাকে আগুন দিয়ে তৈরি করেছেন আর তাকে কাদা মাটি দিয়ে।” ইবলিস তার সংকীর্ণ ও দৃশ্যমান যুক্তি দিয়ে ভেবেছিল আগুন সবসময় ঊর্ধ্বমুখী ও তেজস্বী, আর মাটি নিচু ও মলিন। কিন্তু সে এটা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল যে, মহান আল্লাহ অনেক সময় অত্যন্ত সরল ও সাধারণ জিনিসের ভেতরেই তাঁর সর্বোচ্চ সম্মান ও বরকত লুকিয়ে রাখেন।
মাটি আপাতদৃষ্টিতে মলিন ও মূল্যহীন মনে হলেও, এই মাটি থেকেই জন্ম নিয়েছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, নবী, রাসুল, শহিদ এবং সত্যবাদী সাধকেরা। অন্যদিকে, তেজস্বী আগুন ইবলিসকে কেবল অহংকারের দহনে পুড়িয়ে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত করেছে। এই মহাজাগতিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক চাকচিক্য বা আভিজাত্যই মানুষের আসল মাপকাঠি নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই আত্মিক ব্যাধির ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন:
{لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ}
“যার অন্তরে অনুপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহীহ মুসলিম)
অনেক সময় শয়তানের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ফাঁদটি পাতা থাকে ইবাদতের জায়গায়। শয়তান যখন দেখে যে একজন মুমিন বান্দাকে নামাজ, রোজা বা দান-সদকা থেকে কোনোভাবেই বিরত রাখা যাচ্ছে না, তখন সে তার ইবাদত নষ্ট করার জন্য এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে। সে অতি গোপনে ওই বান্দার মনে আত্মতুষ্টির জন্ম দেয়“দেখো, তুমি কত সুন্দর করে নামাজ পড়ছ, বাকিরা তো হেলায় সময় নষ্ট করছে! তুমি কত ধার্মিক!” এই সূক্ষ্ম আত্মতুষ্টি ইবাদতের বাহ্যিক কাঠামো ঠিক রাখলেও তার ভেতরের আন্তরিকতা ও বিনয়কে এক নিমেষে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ইসলামের ইতিহাসের মহান সাধকেরা তাই নিজেদের ইবাদতকে কখনো নিজস্ব অর্জন মনে করতেন না; বরং তারা ভাবতেন যে ভালো কাজটি করার সুযোগ পাওয়াটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর এক বিরাট অনুগ্রহ। এই গভীর বিনয় ও নম্রতা মানুষকে সবসময় শয়তানের অদৃশ্য অহংকারের ফাঁদ থেকে রক্ষা করে এবং মানুষের আত্মাকে আসল পবিত্রতা দান করে।
উপসংহার
সামগ্রিক পর্যালোচনায় এ কথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ কেবল হরমোনের তাড়না, ডিএনএ-এর কোডিং বা স্রেফ মাটি ও রক্তের কোনো যান্ত্রিক পুতুল নয়; বরং সে হলো আল্লাহর এক রাজকীয় সৃষ্টি যার ভেতর বয়ে চলেছে এক স্বর্গীয় রুহ। আধুনিক বস্তুবাদী ও ভোগবাদী জীবনদর্শনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এটি আমাদের বাহ্যিক জীবনকে সুসজ্জিত করতে গিয়ে আমাদের ভেতরের আসল মানুষকে ক্রমশ এক যান্ত্রিক পশুতে রূপান্তর করছে। পশুর মতো কেবল নিজের আহার, আরাম এবং জৈবিক চাহিদা মেটানো কখনোই সৃষ্টির সেরা জীব ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। আমাদের আসল মর্যাদা লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ইচ্ছাশক্তির পরিচ্ছন্নতায়, প্রবৃত্তির দাসত্ব শিকল ছিঁড়ে স্রষ্টার নিঃশর্ত ভালোবাসায় নিজেকে সমর্পণ করার মাঝে। জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী রঙ্গমঞ্চে প্রতিনিয়ত আমাদের ভেতরের নফসের সাথে যে অদৃশ্য লড়াই চলছে, সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াই মানুষের একমাত্র সার্থকতা। যেখানে পতন অত্যন্ত সহজ, সেখানে জান্নাতের সেই চিরন্তন আলোর ঠিকানায় পৌঁছাতে হলে আমাদের প্রতিদিনের প্রতিটি সাধারণ কাজে ও সিদ্ধান্তে পরম স্রষ্টার সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আসুন, আমরা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে নিজেদের আত্মার দিকে তাকাই, মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অহংকার ও ভন্ডামির মুখোশগুলো চূর্ণ করি এবং বিনীত অনুশোচনার অশ্রুজল দিয়ে আমাদের কলুষিত হৃদয়কে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবীর জীবন কেবলই একটি পরীক্ষার হল, আর আমাদের আসল বাড়ি পরকালে। মহান আল্লাহ আমাদের পশুত্বের এই অদৃশ্য শিকল ও অন্ধ মোহ থেকে মুক্ত করুন, আমাদের আত্মাকে বিশুদ্ধ করার তৌফিক দিন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে একজন খাঁটি ও সফল মানুষ হিসেবে কবুল করুন। আমীন।