যে ইসলামকে দূর থেকে ভুল বুঝেছিলেন: পরম সিংয়ের হিদায়াতের পথে এক নীরব যাত্রা
কোনো মানুষ কখন সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, তা সে নিজেও অনেক সময় বুঝতে পারে না। কখনো একটি প্রশ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, কখনো কোনো বই, কোনো বক্তব্য কিংবা কোনো মানুষের আচরণ তার পুরোনো ধারণার ভিত নড়িয়ে দেয়। শুরুতে বিষয়টি হয়তো নিছক কৌতূহল। কিন্তু সেই কৌতূহল যখন অনুসন্ধানে পরিণত হয়, আর অনুসন্ধান যখন হৃদয়কে স্পর্শ করে, তখন মানুষের জীবনও বদলে যেতে পারে। ভারতীয় ইউটিউবার পরম সিংয়ের ইসলাম গ্রহণের গল্প অনেকটা এমনই।
তিনি ইসলামকে প্রথমে একজন মুসলিমের চোখ দিয়ে দেখেননি। বরং একজন অমুসলিম তরুণ হিসেবে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর নিজের কিছু ধারণা ছিল। পরবর্তীতে ইসলাম নিয়ে ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে তিনি বিষয়টি আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ পান। যে ধর্মকে একসময় দূর থেকে দেখেছিলেন, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁর অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে। আর একসময় সেই অনুসন্ধান তাঁকে এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা তাঁর নিজের পরিচয়ই বদলে দেয়।
২০২৩ সালে তিনি প্রকাশ্যে জানান যে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং শাহাদাত পাঠ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি শুধু ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা নয়; বরং তার আগের দীর্ঘ অনুসন্ধান, কীভাবে একজন মানুষ নিজের পুরোনো ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখে এবং সত্যকে জানার জন্য নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে।
পরম সিং কে?
পরম সিং একজন ভারতীয় ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচিতি পান। ইসলাম নিয়ে তাঁর ভিডিও এবং মুসলিম দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁকে ধীরে ধীরে ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ করে দেয়। ২০২৩ সালে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি এমন একটি সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ থেকে এসেছিলেন, যেখানে ইসলাম তাঁর নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ ছিল না। ফলে ইসলাম গ্রহণ তাঁর জন্য কেবল একটি নতুন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের বিষয় ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিচিত চিন্তা ও বিশ্বাসকে নতুন করে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত।
পরমের ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার কিংবা ইসলাম গ্রহণের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করা ঠিক হবে না। তবে তাঁর নিজের প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো, ইসলাম নিয়ে জানার প্রক্রিয়াটিই তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছিল।
আর এখানেই তাঁর গল্পটি অন্য অনেক ধর্মান্তরিত ব্যক্তির গল্প থেকে আলাদা গুরুত্ব পায়।
কারণ তাঁর ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে সামনে আসেনি। বরং তিনি প্রথমে ইসলাম নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেছেন, তারপর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে শুরু করেছেন, নিজের ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করেছেন এবং ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে।
ইসলাম সম্পর্কে প্রথম ধারণা ছিল অন্যরকম
কোনো ধর্ম সম্পর্কে মানুষের ধারণা অনেক সময় সেই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে তার চারপাশের ঘটনাবলি দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।
পরম সিংয়ের ক্ষেত্রেও ইসলাম সম্পর্কে প্রথম দিকের ধারণা ইতিবাচক ছিল না। পরবর্তীতে তাঁর বক্তব্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে যে একসময় তিনি ইসলামকে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতেন। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে নিজে জানার পর তাঁর সেই ধারণা পরিবর্তিত হয়।
এই পরিবর্তনের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একজন মানুষ যখন কোনো বিষয় সম্পর্কে দূর থেকে ধারণা তৈরি করে, তখন তার কাছে সেই বিষয়ের অনেক দিক অদৃশ্য থেকে যায়। ইসলাম সম্পর্কে কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, কোনো অপরাধী ব্যক্তির আচরণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক দেখে পুরো ইসলামকে বিচার করা যেমন ভুল, তেমনি কোনো মুসলিমের ভালো আচরণ দেখেও ইসলাম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়।
ইসলামকে জানতে হলে ইসলামকেই জানতে হবে।
কোরআন মানুষকে বারবার চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানায়। আল্লাহ বলেন,
“তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না?”, সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২৪
পরম সিংয়ের যাত্রায় এই প্রশ্ন করার মানসিকতাটিই লক্ষণীয়। তিনি নিজের পুরোনো ধারণাকে শেষ কথা হিসেবে ধরে রাখেননি। বরং ইসলাম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেই আরও জানতে চেয়েছেন।
আর কখনো কখনো সত্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথম যে সাহসটি দরকার, সেটি হলো, নিজের ধারণাকেই প্রশ্ন করার সাহস।
কনটেন্টের বিষয় থেকে জীবনের প্রশ্ন
পরম সিংয়ের ইসলাম-পরিচয়ের শুরুতে একটি বাস্তব বিষয় কাজ করেছিল, ইসলাম নিয়ে ভিডিও তৈরি করা।
একজন ইউটিউবারের কাছে কোনো বিষয় প্রথমে কনটেন্ট হতে পারে। দর্শকের আগ্রহ, ভিউ, মন্তব্য কিংবা জনপ্রিয়তা একজন নির্মাতাকে একই বিষয় নিয়ে আরও কাজ করতে উৎসাহিত করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর নিজের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ইসলামিক ভিডিও তৈরির শুরুতে ভিউ ও উপার্জনের বিষয়টিও তাঁর বিবেচনায় ছিল।
কিন্তু এখানেই গল্পটি অন্যদিকে মোড় নেয়।
যে বিষয় নিয়ে তিনি দর্শকদের জন্য ভিডিও বানাচ্ছিলেন, সেই বিষয় সম্পর্কে তাঁকেও জানতে হচ্ছিল। ফলে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর পড়াশোনা ও অনুসন্ধান বাড়তে থাকে। কোরআন, ইসলামের ইতিহাস, মুসলিমদের ধর্মীয় জীবন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় গভীর হতে থাকে।
একসময় ইসলাম তাঁর কাছে শুধু ইউটিউবের একটি বিষয় থাকল না।
এটি হয়ে গেল নিজের জন্য একটি প্রশ্ন।
“ইসলাম আসলে কী?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁর সামনে ইসলাম সম্পর্কে আগে থেকে তৈরি অনেক ধারণা নতুনভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ আসে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সত্যের সন্ধান অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় না। মানুষ হয়তো একটি উদ্দেশ্যে পথ চলতে শুরু করে; কিন্তু পথ তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়।
পরম সিংও হয়তো প্রথমে ভাবেননি যে ইসলাম নিয়ে ভিডিও বানাতে বানাতে একদিন নিজেই ইসলাম গ্রহণ করবেন। কিন্তু জ্ঞান ও অনুসন্ধানের পথ কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যা সে শুরুতে কল্পনাও করেনি।
তাহলে কেন ইসলাম গ্রহণ করলেন?
এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরম সিং কেন ইসলাম গ্রহণ করলেন, এর উত্তরকে এক বাক্যে আটকে দেওয়া ঠিক হবে না। তাঁর নিজের বক্তব্য এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসলাম সম্পর্কে জানার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পুরোনো ধারণা বদলাতে থাকে। ইসলামের শান্তি, মানবিকতা, ন্যায়বোধ, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা তাঁকে প্রভাবিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
তিনি এমন কিছু বিষয় জানতে শুরু করেন, যা তাঁর আগের ধারণার সঙ্গে মিলছিল না। ফলে তাঁর সামনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন দাঁড়ায়, আমি এতদিন ইসলাম সম্পর্কে যা ভেবেছি, তা কি সত্যিই ইসলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁর অনুসন্ধান আরও গভীর হয়।
কোনো মানুষ যখন সত্যের অনুসন্ধান করে, তখন তার সামনে শুধু নতুন তথ্য আসে না; নিজের পুরোনো বিশ্বাসও নতুনভাবে দেখতে হয়। এই পর্যায়টি সহজ নয়। কারণ মানুষ সাধারণত নিজের বহু বছরের ধারণা পরিবর্তন করতে চায় না।
কিন্তু সত্যের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে নিজের ভুল স্বীকার করাও এক ধরনের সাহস।
পরমের গল্পে সেই সাহসের একটি দিক দেখা যায়।
তিনি বুঝতে পারেন, কোনো ধর্মকে তার নামে সংঘটিত অপরাধ দিয়ে বিচার করা যায় না। ইসলাম কী বলে, সেটি জানতে হলে কোরআন ও ইসলামের মূল শিক্ষার কাছে যেতে হবে।
আর যতই তিনি জানলেন, ততই তাঁর মন ইসলামের দিকে ঝুঁকতে শুরু করল।
তাই তাঁর ইসলাম গ্রহণকে শুধু “একজন ইউটিউবার মুসলিম হয়ে গেলেন” হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি আসলে একজন মানুষের নিজের পূর্বধারণার সঙ্গে লড়াই করে সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
শাহাদাত: অনুসন্ধানের প্রকাশ্য পরিণতি
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একসময় সেই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসে।
২০২৩ সালে পরম সিং তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং শাহাদাত পাঠ করেন। তাঁর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
শাহাদাত ইসলামে প্রবেশের মূল ঘোষণা:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসুল।”
এই কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের অর্থ শুধু একটি নতুন পরিচয় গ্রহণ করা নয়। এর অর্থ হলো জীবনের বিশ্বাসের কেন্দ্র পরিবর্তন করা, মানুষ নিজের ইচ্ছা, সমাজের চাপ কিংবা পূর্বপরিচয়ের পরিবর্তে আল্লাহর আনুগত্যকে জীবনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
পরম সিংয়ের জন্যও এটি ছিল তাঁর অনুসন্ধানের প্রকাশ্য ঘোষণা।
তাঁর এই সিদ্ধান্তের পর স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ তাঁকে অভিনন্দন জানান, কেউ বিস্মিত হন, আবার কেউ সমালোচনাও করেন।
কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পছন্দের ওপর নির্ভর করে না।
বিশ্বাসের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত জবাবদিহির বিষয়।
পরিবার ও পরিচয়ের প্রশ্ন
একজন মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করলে তার সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বদলায় না; পরিবার, সামাজিক পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসও সামনে এসে দাঁড়ায়।
পরম সিংয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয় ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে সব তথ্য একই রকম নয়। তাই তাঁর পরিবার সম্পর্কে নাটকীয় কোনো দাবি করা বা নিশ্চিতভাবে এমন কোনো ঘটনা লেখা উচিত নয়, যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বরং তাঁর গল্প থেকে যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে সামনে আসে, তা হলো, নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি অনুসন্ধানের একটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পরও মানুষের জীবনে অনেক কিছু একদিনে বদলে যায় না। নাম, পোশাক, ভাষা, অভ্যাস, এসবের পরিবর্তন সময় নিতে পারে। কিন্তু ঈমানের পরিবর্তন মানুষের ভেতর থেকেই শুরু হয়।
এ কারণেই ইসলাম নতুন মুসলিমকে অতীতের জন্য অপমান করে না। বরং তাকে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “ইসলাম পূর্বের গুনাহ মুছে দেয়।” , সহিহ মুসলিম।
অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ মানে শুধু অতীতকে পিছনে ফেলে আসা নয়; বরং আল্লাহর সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা।
পরম সিংয়ের গল্প মুসলিমদের কী শেখায়?
পরমের ঘটনা শুধু অমুসলিমদের জন্য শিক্ষা নয়; মুসলিমদের জন্যও এতে গভীর বার্তা রয়েছে।
প্রথমত, ইসলামকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে মুসলিমদের নিজেদের চরিত্র সুন্দর করতে হবে।
একজন মানুষ হয়তো কোরআনের অনুবাদ পড়বে না। কিন্তু সে একজন মুসলিমের আচরণ দেখবে। সে দেখবে, একজন মুসলিম সত্য কথা বলে কি না, অন্যের অধিকার রক্ষা করে কি না, দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে।
ইসলামের সৌন্দর্য শুধু বক্তৃতায় নয়; মানুষের চরিত্রেও প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয়ত, ইসলাম নিয়ে ভুল ধারণা থাকলে তা নিয়ে উপহাস না করে জ্ঞান দিয়ে উত্তর দেওয়া দরকার।
পরম সিংয়ের নিজের বক্তব্যে তাঁর প্রাথমিক ভুল ধারণার কথা এসেছে। কিন্তু তিনি যখন জানার সুযোগ পেলেন, তখন তাঁর ধারণা পরিবর্তিত হলো।
এখানে মুসলিমদের জন্যও একটি শিক্ষা আছে, কেউ ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করলে তাকে শুধু “তুমি ইসলাম জানো না” বলে থামিয়ে না দিয়ে তাকে জানার সুযোগ করে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, দাওয়াহ শুধু কথা নয়।
আল্লাহ বলেন,
“তোমার রবের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।”, সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫
আজকের যুগে এই দাওয়াহর একটি বড় ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেখানে একজন মুসলিমের একটি সুন্দর উত্তর, একটি তথ্যভিত্তিক ভিডিও কিংবা একটি মার্জিত আচরণ কারও চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারে।
পরমের গল্প তার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে।
একটি ভিডিও থেকে একটি নতুন জীবন
পরম সিংয়ের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই, মানুষ কখন কোথা থেকে হিদায়াত পাবে, তা কেউ জানে না। একটি ভিডিও থেকে শুরু হতে পারে একটি প্রশ্ন। একটি প্রশ্ন থেকে শুরু হতে পারে অনুসন্ধান। অনুসন্ধান থেকে আসতে পারে জ্ঞান। আর জ্ঞান কখনো কখনো মানুষের হৃদয়কে এমন সত্যের সামনে দাঁড় করায়, যার সামনে তাকে নিজের পুরোনো ধারণা ছেড়ে দিতে হয়। পরম সিংয়ের জীবনেও ইসলাম প্রথমে ছিল জানার বিষয়। পরে তা হয়ে উঠল বোঝার বিষয়। আর শেষ পর্যন্ত তা হয়ে গেল বিশ্বাসের বিষয়।
এই গল্প আমাদেরও একটি প্রশ্ন করে, আমরা কি সত্যকে খুঁজে দেখি, নাকি সত্য সম্পর্কে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখি? আমরা কি কোনো ধর্মকে তার মূল শিক্ষা দিয়ে বিচার করি, নাকি তার অনুসারীদের ভুল দিয়ে? আমরা কি কোনো বিষয়ে মত দেওয়ার আগে সেটিকে সত্যিই জানার চেষ্টা করি?
কোরআন বলে,
“যারা আমার পথে সর্বাত্মক চেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখাব।”, সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৯
হিদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। কিন্তু সত্যের সন্ধানে মানুষের একটি ভূমিকা আছে, সে খুঁজবে, প্রশ্ন করবে, পড়বে, চিন্তা করবে এবং নিজের অহংকারকে সত্যের সামনে নত করবে।
পরম সিংয়ের গল্প তাই কেবল একজন ইউটিউবারের ইসলাম গ্রহণের গল্প নয়। এটি ভুল ধারণা থেকে জ্ঞানের দিকে, দূরত্ব থেকে পরিচয়ের দিকে এবং প্রশ্ন থেকে বিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষের গল্প।
কখনো কখনো আল্লাহ মানুষের সামনে হিদায়াতের দরজা এমনভাবে খুলে দেন, যা সে নিজেও কল্পনা করেনি।
পরম ইসলাম নিয়ে ভিডিও বানাতে গিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত সেই ইসলামই তাঁর নিজের জীবনের গল্প হয়ে গেল।
আর এখানেই তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা,
সত্যকে যদি সত্যিই খোঁজা হয়, তবে কখনো কখনো সত্যই মানুষকে খুঁজে নেয়।
উপসংহার
পরম সিংয়ের ইসলাম গ্রহণের গল্পকে শুধু একজন ইউটিউবারের ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতাটা ধরা পড়বে না। এটি মূলত একজন মানুষের সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়ার গল্প, যে মানুষটি একসময় ইসলামকে কিছু পূর্বধারণার মধ্য দিয়ে দেখেছিলেন, কিন্তু পরে সেই ইসলামকেই জানার চেষ্টা করেছেন তার নিজস্ব উৎস ও শিক্ষার আলোকে। আর সেই জানার পথই ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শেষ পর্যন্ত জীবনকে বদলে দিয়েছে।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো ধর্মকে দূর থেকে দেখে বিচার করা সহজ; কিন্তু সত্যিকারভাবে জানার জন্য প্রয়োজন সাহস, ধৈর্য ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। পরমের যাত্রায় হয়তো সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই, সত্যের সামনে নিজের পুরোনো ধারণাকে সংশোধন করতে পারাও এক ধরনের সাহস।
একজন মানুষের হিদায়াতের পথ কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে খুলে যাবে, তা আমরা জানি না। কখনো একটি আয়াত, কখনো একটি বই, কখনো একটি মানুষের চরিত্র, আবার কখনো একটি সাধারণ ভিডিওও হতে পারে সেই পথের সূচনা। তাই আমাদের কাজ কাউকে হিদায়াত দেওয়ার দাবি করা নয়; বরং সত্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা, নিজের চরিত্রে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করা এবং মানুষের জন্য সত্য জানার দরজা খোলা রাখা।
পরম সিং ইসলাম সম্পর্কে জানতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ইসলামেরই অনুসারী হয়েছেন। তাঁর গল্প তাই শুধু তাঁর নিজের জীবনের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি আমাদের জন্যও একটি প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যকে খুঁজছি, নাকি শুধু নিজের পূর্বধারণাকেই সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছি?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই কারও জীবনে নতুন একটি দরজা খুলে যাবে। আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করতে পারে এমন এক সত্য, যা তার পুরো জীবনকে নতুন অর্থ দিতে পারে।