প্রাচুর্যের যুগে অন্তরের দারিদ্র্য: ভোগবাদ, কৃতজ্ঞতা ও কুরআনিক জীবনদর্শন
একবার নিবিড়ভাবে ভেবে দেখুন তো, আমরা কি মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা সুবিধাজনক ও প্রাচুর্যময় সময়ে বাস করছি না? আজ আঙুলের এক স্পর্শেই ঘরের দরজায় হাজির হয়ে যায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে উৎপাদিত খাদ্য, আধুনিক পোশাক কিংবা নিত্যনতুন প্রযুক্তি। যোগাযোগের অবারিত সুবিধা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, দ্রুততম যানবাহন এবং অগণিত বিনোদনের সুযোগ আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে কল্পনাতীতভাবে আরামদায়ক। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষ হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সুখী ও শান্তিময় জীবন অতিক্রম করছে।
কিন্তু নিদারুণ বাস্তবতার পর্দা সরালেই উন্মোচিত হয় এক করুণ চিত্র। বাহ্যিক জীবনের এই প্রভূত রূপ-রস-চাকচিক্য ও আধুনিক সুবিধার মহাসমুদ্রে সাঁতার কেটেও আধুনিক মানুষের অন্তর এক সুগভীর অতল শূন্যতা ও আত্মিক দারিদ্র্যে হাহাকার করছে। মানুষের শারীরিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যত বেড়েছে, মানসিক অস্থিরতা, হতাশা, ডিপ্রেশন এবং আত্মিক নিঃসঙ্গতা ঠিক ততটাই জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান হার, ঘুমের ওষুধের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং থেরাপিস্টের চেম্বারে মানুষের ভিড় এই সত্যেরই সাক্ষ্য দেয় যে, উপকরণের প্রাচুর্য কখনো অনুভূতির শান্তি এনে দিতে পারে না।
আমরা বস্তুগত সম্পদ অর্জনের পেছনে এত দূর ছুটে এসেছি যে, পথের মাঝে নিজেদের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছি। ভোগবাদের অন্ধ সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে মানুষ আজ ভুলে গেছে তার অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য। আমরা শরীরকে নিত্যনতুন বিলাসী উপাদানে সাজাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আত্মার যে খোদায়ী ক্ষুধা রয়েছে, তাকে রাখছি চরম উপবাসে। আর এই ভারসাম্যহীনতার ফলেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, বাইরে প্রাচুর্যের জাঁকজমক, আর ভেতরে অন্তরের চরম দেউলিয়া রূপ।
মহাগ্রন্থ কুরআন এই বৈপরীত্যময় আত্মিক ব্যাধির মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও তার চিরন্তন সমাধান অত্যন্ত চমৎকারভাবে উন্মোচন করেছে। অন্তরের এই হাহাকার কেবল জাগতিক কোনো বস্তু বা ধনের পাহাড়ে মিটবে না; বরং তার জন্য প্রয়োজন কুরআনিক জীবনদর্শনের দিকে ফিরে আসা। আল্লাহ তাআলা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপ ও শান্তিময় জীবনের পরম ঠিকানা বর্ণনা করে মহাগ্রন্থ কুরআনে ইরশাদ করেছেন: "যাঁরা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর জিকির (স্মরণ)-এর মাধ্যমে যাঁদের অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো! কেবল আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রকৃত শান্তি লাভ করে।"
মানুষের আত্মাকে যখন তার আসল রবের পরিচয় ও জিকির থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, তখন গোটা পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদ ও ভোগসামগ্রী এনে দিলেও সেই অন্তরের চাওয়া আর মেটে না। ঠিক যেমন প্রজ্ঞাময় রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনদর্শনের এক অমোঘ সত্য প্রকাশ করে ইরশাদ করেছেন: "পার্থিব উপকরণের প্রাচুর্য থাকলে কেউ সম্পদশালী হয় না; বরং অন্তরের আত্মতুষ্টি ও ধনী হওয়াই হলো প্রকৃত প্রাচুর্য।" প্রযুক্তি ও বস্তুসামগ্রীর এই মোহাচ্ছন্ন যুগে দাঁড়িয়ে অন্তরের সেই হারানো ধন বা 'গিনাউন নাফস' উদ্ধার করাই আজকের মানুষের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ।
তাকাসুর'-এর দৌড়: আধুনিক ভোগবাদ ও অসীম বাসনার ফাঁদ
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ফাটল হলো 'কনসিউমারিজম' বা অপ্রতিরোধ্য ভোগবাদ। আমাদের চারপাশের সমাজ ও বাজারব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদের মগজধোলাই করছে এই বলে যে, আমার সুখ নির্ভর করছে আমার পরবর্তী কেনাকাটার ওপর। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, একটি নতুন বস্তু পাওয়ার সাময়িক আনন্দ ফিকে হয়ে যেতে না যেতেই অন্তরে আরেকটি নতুন বস্তুর চাহিদা জন্ম নেয়। নতুন মডেলের ফোন, বিলাসবহুল গাড়ি, কিংবা আধুনিক গৃহসজ্জার চটকদার আয়োজনের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ নিজের অজান্তেই এক মানসিক দাসত্বে জড়িয়ে পড়ছে। পাওয়ার এই অন্ধ দৌড় মানুষকে বাহ্যিকভাবে প্রাচুর্যশীল করলেও মানসিকভাবে করে তুলছে চরমভাবে ক্লান্ত, অস্থির ও আত্মিকভাবে নিঃস্ব। নিজের অর্জিত নেয়ামত শান্তিমতো উপভোগ করার আগেই 'আরও চাই', এই চিরন্তন অসন্তোষ অন্তরের প্রশান্তি ও আত্মতুষ্টিকে এক লহমায় কেড়ে নিচ্ছে।
মানুষের হৃদয়ে বাসা বাঁধা এই অপরিসীম লোভ ও বাসনার সীমাহীন মানসিকতাকে বিশ্বজাহানের মালিক মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁত ও সত্য রূপে চিত্রায়িত করেছেন: "প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহচ্ছন্ন করে রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে উপনীত হও।"
এই ঐশী বাণী আমাদের চোখ খুলে দেয় যে, বস্তুবাদী দুনিয়ার এই প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা কেবল বাহ্যিক ধন-সম্পদ জমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মানুষের অন্তরকে রবের স্মরণ ও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে পুরোপুরি গাফিল করে ফেলে। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ অনুধাবনই করতে পারে না যে সে এক কৃত্রিম মোহমায়ার পেছনে নিজের অমূল্য জীবনটা নিঃশেষ করে দিয়েছে।
মানুষের প্রকৃতির এই অতৃপ্ত চাহিদার গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যতা বর্ণনা করে প্রজ্ঞাময় রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবচরিত্রের অমোঘ সত্য প্রকাশ করে ইরশাদ করেছেন: "যদি আদমসন্তানকে ধনে-সম্পদে পরিপূর্ণ দুটি উপত্যকাও দেওয়া হয়, তবুও সে তৃতীয় আরেকটি উপত্যকার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর আদমসন্তানের পেট মাটি (মৃত্যু) ছাড়া আর কিছুই ভরাতে পারে না।"
অতএব, পাওয়ার এই অন্ধ চাহিদাকে যদি আমরা ঈমানি প্রজ্ঞা, কানায়াত (অল্পে তুষ্টি) ও বিবেকের লাগাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করি, তবে আধুনিক ভোগবাদের এই বিষাক্ত চক্র কখনোই থামবে না। অর্জনের পর অর্জন জমা হলেও আমাদের অন্তর সবসময় অপ্রাপ্তির হাহাকারে পুড়তে থাকবে এবং আত্মিক দারিদ্র্যের শিকল থেকে কোনোদিন মুক্ত হতে পারবে না।
বস্তুগত উন্নয়ন বনাম অন্তরের শূন্যতা: কেন শান্তি মিলছে না?
আধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতার প্রভূত বিকাশ মানবজীবনকে অলৌকিক মাত্রায় সহজ ও আরামদায়ক করেছে। আগে যা পাওয়ার জন্য মানুষকে দিনের পর দিন পথ হাঁটতে হতো বা কঠোর পরিশ্রম করতে হতো, আজ তা ঘরের চার দেয়ালের মাঝে বোতামের এক ক্লিকেই সুনির্দিষ্ট রূপ নেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ এবং ভৌত অবকাঠামোর অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষকে বাহ্যিক সুখের চরম শিখরে এনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব বস্তুগত উন্নয়নের মধ্য দিয়েও আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে মনের গভীর বিষাদ ও অস্থিরতা। আপাতদৃষ্টিতে জীবন যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের আত্মিক জীবন ততটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদের শরীরকে আরাম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মাকে দিয়েছে এক নিঃশব্দ হাহাকার। মানুষ কেন এই আধুনিকতার সমুদ্রে ভেসেও ভেতরে ভেতরে এত দেউলিয়া, তার কারণ হলো, আমরা শরীরের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আত্মার আসল উপাদানের খোরাক জোগাতে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছি। শরীর গঠিত মাটি থেকে, তাই মাটির তৈরি বস্তুসমূহ (যেমন: সুস্বাদু খাবার, দামি ঘরবাড়ী, বিলাসী গাড়ি) কেবল শরীরকে তৃপ্ত করতে পারে; কিন্তু আত্মা তো ফুঁকে দেওয়া হয়েছে খোদায়ী রুহ থেকে, যা বস্তু দিয়ে কখনোই শান্ত হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মানুষের অন্তরের সুগভীর অশান্তি, সংকীর্ণতা ও বিভ্রান্তির আসল রহস্য উন্মোচন করে পরম সত্য নীতি হিসেবে অবধারিত ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন: "আর যে আমার স্মারক (কুরআন ও আল্লাহর জিকির) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবনযাপন হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ক্লিষ্টকর; এবং কেয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।" এই ঐশী আয়াত আমাদের অনুধাবন করায় যে, ধন-সম্পদ ও বস্তুগত সুবিধার পাহাড় থাকলেও আল্লাহর সাথে সম্পর্কের বিচ্ছেদ মানুষের জীবনকে অন্তর্দাহ ও মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতায় জর্জরিত করে তোলে। বাহ্যিক চোখ দেখে প্রাসাদ, কিন্তু ভেতরের আত্মা ছটফট করে খাঁচাবন্দি পাখির মতো। আত্মার ক্ষুধা মেটানোর জন্য দরকার আল্লাহর সঙ্গে গভীর ঈমানী যোগসূত্র, মোনাজাত এবং সিজদার নমনীয়তা।
মানুষের মনস্তত্ত্ব ও প্রশান্তির এই পরম সত্য বর্ণনা করে প্রজ্ঞাময় রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবজাতির সার্বিক অন্তরের সুস্থতা ও কল্যাণের চূড়ান্ত চাবিকাঠি স্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন: "জেনে রাখো! মানুষের দেহের ভেতরে একখণ্ড গোশতপিণ্ড রয়েছে; যখন তা সংশোধিত ও সুস্থ হয়ে যায়, তখন গোটা শরীরটাই সুস্থ ও সংশোধন হয়ে যায়। আর যখন তা দূষিত ও নষ্ট হয়ে যায়, তখন গোটা শরীরটাই বিষাক্ত ও ধ্বংস হয়ে যায়। মনে রেখো, সেই গোশতপিণ্ডটিই হলো মানুষের অন্তর (হৃদয়)।"
সুতরাং, শারীরিক আরাম-আয়েশ দিয়ে যে অন্তরের শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব, তা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। প্রযুক্তি কিংবা জাগতিক উন্নতিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে, আত্মাকে আল্লাহর জিকির ও কুরআনিক আলোয় সিক্ত করাই হলো আধুনিক যুগের মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র খাঁটি রাজপথ।
প্রকৃত প্রাচুর্য কী? 'গিনাউন নাফস' বা অন্তরের ধন
সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রাসাদসম অট্টালিকা, মূল্যবান ব্র্যান্ডের গাড়ি কিংবা বিশাল সাম্রাজ্যের মালিকানাকেই সমৃদ্ধি ও সফলতার একমাত্র মাপকাঠি মনে করা হয়। বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষকে ছোটবেলা থেকেই শেখায় যে, যার কাছে সম্পদের পাহাড় যত বড়, সে তত বেশি সুখী ও শক্তিশালী। কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য হলো, প্রাচুর্য বা ধনাঢ্যতা কোনো বাহ্যিক উপাদানের নাম নয়, বরং তা সম্পূর্ণ অন্তরের এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েও যদি প্রতিনিয়ত আরও পাওয়ার লোভে ছটফট করে এবং নিজের বর্তমান অর্জনে পরিতৃপ্ত হতে না পারে, তবে পরিভাষাগত দিক থেকে সে সবচেয়ে বড় নিঃস্ব ও দেউলিয়া। কারণ তার ভেতরের চাহিদার অভাবটি অপরিসীম, যা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও মানসিক প্রশান্তি উপভোগ করতে দেয় না। অন্যদিকে, বাহ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেও যে ব্যক্তি নিজের কাছে যা রয়েছে তাতেই অন্তর থেকে পরিতৃপ্ত ও শান্ত থাকে, আসল সমৃদ্ধি ও ধনশীলতা মূলত তারই অর্জিত হয়েছে। ইসলামি দর্শনে একেই বলা হয় 'ক্যানায়াত' বা অল্পে তুষ্টি এবং 'গিনাউন নাফস' বা অন্তরের প্রকৃত ধন।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বান্দার অভাব দূরীকরণ ও পরম আত্মিক সমৃদ্ধি অর্জনের মনস্তাত্ত্বিক মূল সত্যটি বয়ান করে মানুষকে সতর্ক করে স্পষ্ট ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন যে, "তিনি (আল্লাহ) আপনাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর তিনি আপনাকে অভাবমুক্ত ও সমৃদ্ধশালী করেছেন" (সূরা আদ-দুহা: ৮), যার প্রকৃত অর্থ কেবল বাহ্যিক ধন-সম্পদ দেওয়া নয়, বরং বান্দার হৃদয়ে এমন এক অমূল্য আত্মতুষ্টি প্রদান করা যার পর আর কোনো জাগতিক অভাব মানুষকে তাড়িত করতে পারে না। মানুষের বাহ্যিক চাওয়া-পাওয়ার এই কৃত্রিম হিসেব ভেঙে দিয়ে প্রজ্ঞাময় রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত ধনাঢ্যতার পরম ইসলামি সংজ্ঞা উন্মোচন করে ইরশাদ করেছেন যে, "পার্থিব আসবাবপত্রের প্রাচুর্য থাকলে কেউ সম্পদশালী হয় না; বরং অন্তরের অপ্রার্থিতা ও আত্মতুষ্টিই হলো আসল ধন" যা আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সম্পদের বাহ্যিক পরিমাণ কখনোই মানুষের জীবনের আসল সুখ নির্ধারণ করতে পারে না।
যে মানুষটি নিজের মনের ভেতরের এই অভাববোধকে ঈমান ও তাকওয়ার আলোয় জয় করতে পেরেছে, সে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও স্বাধীন সত্তা। বস্তুবাদী দুনিয়া তাকে কৃত্রিম বিজ্ঞাপন দিয়ে কিংবা অন্যের চটকদার জীবন দেখিয়ে কোনোদিন প্রলুব্ধ বা হীনমন্য করতে পারে না।
'গিনাউন নাফস' বা অন্তরের এই ধনে যে ব্যক্তি ধনী হয়, সে অর্জনের খুশিতে অহংকারী হয়ে ওঠে না, আবার হারিয়ে যাওয়ার কষ্টে ভেঙেও পড়ে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনের হৃদয়ের এই পরম প্রাপ্তি ও আত্মিক তৃপ্তির সুসংবাদ দিয়ে অন্য হাদিসে অত্যন্ত সুন্দরভাবে যোগ করে ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি চূড়ান্ত সফলতা লাভ করেছে, যে ব্যক্তি ইসলাম কবুল করেছে, তাকে জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত রিজিক দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতেই তার অন্তরকে পরিতৃপ্ত (ক্যানায়াত) করে দিয়েছেন"।
শুকর' বা কৃতজ্ঞতা: আত্মিক তৃপ্তি ও বরকতের কুরআনিক চাবিকাঠি
আধুনিক সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় বিষাদ হলো প্রাপ্তির হিসাব না কষে অপ্রাপ্তির জন্য অবিরত অভিযোগ করা। অথচ ইসলামি জীবনদর্শনে 'শুকর' বা কৃতজ্ঞতা হলো অন্তরের অনাবিল শান্তি ও মানসিক স্থায়িত্ব অর্জনের পরম চাবিকাঠি।
মানুষ যখন প্রাপ্ত নেয়ামতগুলোর প্রতি মনোযোগী হয়ে হৃদয় থেকে রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়, তখন তার মনের সব হতাশা ও শূন্যতা দূর হয়ে যায়। মহাগ্রন্থ কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে নিয়ামত বৃদ্ধি ও আত্মিক প্রাচুর্যের সুসংবাদ দিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন যে,"যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর" , যা আমাদের শেখায় যে শুকরগুজারি কেবল আখিরাতের সওয়াব নয়, বরং দুনিয়ার জীবনেও বরকত ও মানসিক তৃপ্তি লাভের সেরা উপায়।
মানুষের মানসিক ভারমুক্তির এই ঐশী সত্যকে আরও সুদৃঢ় করে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনদর্শনের অনন্য সূত্র দিয়ে ইরশাদ করেছেন যে, "মুমিনের জীবন কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর... যদি সে কোনো আনন্দ বা সুখ পায় তবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, আর তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে" । সুতরাং, 'আলহামদুলিল্লাহ'-এর চেতনাকে অন্তরে ধারণ করাই হলো আধুনিক যুগের মানসিক চাপ ও অসন্তোষ থেকে বাঁচার সর্বশ্রেষ্ঠ ওষুধ।
রিযক' ও 'বরকত'-এর পার্থক্য: বস্তুবাদী হিসাবের বাইরে কুরআনিক সত্য
সংখ্যার অঙ্কে অনেক টাকা-পয়সা থাকা মানেই যে জীবনে পরম শান্তি ও মানসিক স্বস্তি থাকবে, এমন ধারণাই আধুনিক বস্তুবাদী সমাজের সবচেয়ে বড় ভুল। কেবল গণিতের পরিমাপ বা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দিয়ে জীবনের প্রকৃত সুখ মাপা যায় না; বরং বস্তুবাদী হিসাব যেখানে ব্যর্থ হয়, ইসলামি জীবনদর্শনে 'বরকত'-এর ঐশ্বরিক সত্যতা ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। 'রিযক' হলো আমরা যা উপার্জন করি, কিন্তু 'বরকত' হলো সেই উপার্জনের ভেতরের অদৃশ্য আত্মিক কল্যাণ, শান্তি ও স্থায়িত্ব। বরকত হলো আল্লাহর দেওয়া এমন এক বিশেষ রহমত, যা অল্প উপার্জনেও মানুষকে পরম তৃপ্তি, পরিবারের মাঝে ভালোবাসা, শারীরিক সুস্থতা ও মানসিকভাবে চিন্তামুক্ত এক সুন্দর জীবন উপহার দেয়। অন্যদিকে, বিপুল অংকের আয় থেকেও যদি অসুস্থতা, অহেতুক অপচয়, মানসিক অশান্তি ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলা না কমে, তবে বুঝতে হবে সেখানে অর্থের প্রাচুর্য থাকলেও আল্লাহর দেওয়া 'বরকত'-এর চরম অভাব রয়েছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বরকত ও সুসংহত জীবনের পরম চিরন্তন সত্য অবধারিত করে মুমিনদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করেছেন যে, "যদি জনপদের অধিবাসীরা সত্য ঈমান আনত এবং তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম"। এই আয়াত আমাদের বার্তা দেয় যে, বরকত কোনো বস্তুগত জাদুর নাম নয়; বরং তা লাভ করতে হলে প্রয়োজন হালাল উপার্জন, অন্তরে তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি সুগভীর ঈমানী বিশ্বাস।
মানুষের জীবনের বাহ্যিক পরিমাপের চেয়ে অন্তরের প্রাপ্তি ও বরকতময় জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে প্রজ্ঞাময় রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনদর্শনের পরম হেদায়াত দিয়ে ইরশাদ করেছেন যে,"সেই ব্যক্তির জন্য শুভসংবাদ, যাকে ইসলামের অফুরন্ত হেদায়াত দেওয়া হয়েছে, যার জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত রিজিক রয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন সে তাতেই মন থেকে পরিতৃপ্ত থাকে" । সুতরাং, আধুনিক যুগের ভোগবাদী মানসিকতা ছেড়ে কেবল আয়ের অংক কিংবা সম্পদের পাহাড় বাড়ানোর পেছনে না ছুটে উপার্জনে 'বরকত' ও আত্মিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টাই হলো কুরআনিক জীবনদর্শনের আসল সফলতার পথ।
উপসংহার: অন্তরের প্রাচুর্যে সত্যিকারের প্রত্যাবর্তন
আধুনিক সভ্যতার এই গতিশীল মহাসড়কে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত জরুরি, আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি কেবল বস্তুর প্রাচুর্যে নিজেদের আত্মাকে নিঃস্ব করে ফেলছি? বাহ্যিক চাকচিক্য, বিজ্ঞাপনের মোহময় আলো এবং প্রদর্শনী সংস্কৃতির অমোঘ আকর্ষণ আমাদের হাতছানি দিয়ে এক অনিশেষ চাহিদার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, জাগতিক উপাদানের পাহাড় কখনো মানুষের মনের ভেতরকার গভীর অতল শূন্যতা ভরাতে পারেনি এবং পারবেও না। বস্তু আমাদের শরীরকে সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু যে আত্মাকে নিখিল জাহানের স্রষ্টা নিজস্ব রুহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন, তার পরম শান্তি লুকিয়ে আছে কেবল কুরআনিক জীবনদর্শন, অন্তরের আত্মতুষ্টি (ক্যানায়াত) এবং রবের প্রতি সুগভীর কৃতজ্ঞতার মাঝে।
দুনিয়ার জীবনকে সুন্দরভাবে যাপন করা অপরাধ নয়, তবে দুনিয়াকে অন্তরের পরম উপাস্য বানিয়ে ফেলাটাই আত্মিক দেউলিয়াত্বের মূল কারণ। আমাদের প্রয়োজন এমন এক জীবনব্যবস্থা, যেখানে হাত থাকবে কর্মমুখর ও প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু হৃদয় থাকবে কেবল রবের প্রেমে দেদীপ্যমান। ভোগবাদের এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে আমরা যখন অল্পে তুষ্ট থাকার শিক্ষা লাভ করব, অর্জিত নেয়ামতের ওপর 'আলহামদুলিল্লাহ'র বীজ বুুনব এবং উপার্জনে বরকতের সন্ধান করব, ঠিক তখনই আমাদের জীবনে নেমে আসবে পরম প্রশান্তির ফলগুধারা। প্রাচুর্যের যুগে অন্তরের এই দারিদ্র্য দূর করাই হোক আমাদের ঈমানী অঙ্গীকার; তবেই আমরা লাভ করব পরম সেই 'গিনাউন নাফস' বা অন্তরের প্রকৃত ধন, যা আমাদের দুনিয়াতে দেবে আত্মিক মুক্তি আর আখিরাতে উপহার দেবে চিরস্থায়ী প্রশান্তির জান্নাত।