প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান: তৃণমূল কংগ্রেসের নেপথ্য কথা ও পশ্চিমবঙ্গের রূপান্তর
ভূমিকা: এক ঐতিহাসিক পালাবদলের সূচনা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১১ সাল একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের, যা একসময় অপরাজেয় বলে মনে করা হতো, পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। এই পালাবদল কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর এক বিশাল রূপান্তর। ১৯৯৮ সালে একটি নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা থেকে শুরু করে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক শক্তিশালী শাসকদলের পতন ঘটানো—এই যাত্রাপথ মোটেই সহজ ছিল না। 'মা-মাটি-মানুষ' স্লোগানকে সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেসের এই উত্থান এবং শাসনে আসার পর গত এক দশকের বেশি সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রূপান্তর এক কৌতূহলোদ্দীপক রাজনৈতিক আখ্যান।
প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠা: কংগ্রেস ত্যাগ এবং এক নতুন লড়াইয়ের সূচনা
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের নেপথ্যে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি তাঁর তীব্র মোহভঙ্গ। নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল ছিল জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বামফ্রন্টের সাথে আপোস করে চলছে এবং বাংলায় সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই রাজনৈতিক মতবিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে এক আপসহীন ও প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ডাক দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় 'তৃণমূল কংগ্রেস'। দলের প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় 'জোড়া ঘাসফুল', যা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের তৃণমূল স্তরের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি ৭টি আসন লাভ করে প্রমাণ করে দেয় যে, বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উদয় হয়েছে।
রাজনৈতিক সংগ্রাম: সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম (২০০৬-২০০৮)
তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যে শিল্পায়নের ডাক দেন। হুগলির সিঙ্গুরে টাটা মোটরস-এর 'ন্যানো' গাড়ি কারখানা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তৈরির জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। সিঙ্গুরে তাঁর ২৬ দিনের অনশন ধর্মঘট গোটা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদরত গ্রামবাসীদের ওপর পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যু রাজ্য রাজনীতিতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনগুলো প্রমাণ করে যে, বামফ্রন্ট সরকার তাদের প্রধান ভোটব্যাংক অর্থাৎ কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমিকদের সমর্থন হারাচ্ছে। বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই তৃণমূলের এই জমি রক্ষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। এই সময়টিতেই তৃণমূলের 'মা-মাটি-মানুষ' স্লোগান বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। আর আজ, যখন তৃণমূল বিজেপির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত, তখন সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে বাংলার এই সর্বব্যাপী দারিদ্র্যের কারণ হলো মমতার সেই পুরোনো ভুল, যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বহু বহুজাতিক সংস্থার ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবে রাজি হননি।
ঐতিহাসিক পালাবদল: ২০১১ সালের নির্বাচন ও বামফ্রন্টের পতন
সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রভাব সরাসরি পড়ে ব্যালট বাক্সে। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। অবশেষে আসে ২০১১ সালের ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচন। "পরিবর্তন" স্লোগানকে সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেস ও জাতীয় কংগ্রেসের জোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসে দীর্ঘতম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটে।
শাসনে পশ্চিমবঙ্গ: জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও সামাজিক রূপান্তর
ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং সামাজিক সুরক্ষার বলয় তৈরি করা। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে সরকার এমন কিছু জনকল্যাণমুখী প্রকল্প (Welfare Schemes) চালু করেছে, যা রাজ্যের আর্থ-সামাজিক চিত্রে ব্যাপক রূপান্তর এনেছে:
- নারী ক্ষমতায়ন ও কন্যাশ্রী প্রকল্প: মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহ রোধ করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া 'কন্যাশ্রী' প্রকল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে (২০১৭ সালে জাতিসংঘ পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড)। এটি রাজ্যের লাখ লাখ ছাত্রীর জীবন বদলে দিয়েছে।
- লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদানের লক্ষ্যে চালু হওয়া এই প্রকল্পের অধীনে রাজ্যের মহিলাদের প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিরাট প্রভাব ফেলেছে।
- স্বাস্থ্য ও খাদ্য সুরক্ষা: 'স্বাস্থ্যসাথী' কার্ডের মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি 'খাদ্যসাথী' প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় বিনামূল্যে রেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
- সবুজ সাথী ও স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড: স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য সাইকেল প্রদান (সবুজ সাথী) এবং উচ্চশিক্ষার জন্য সহজে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পরিকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌত পরিকাঠামোর (Infrastructure) উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সরবরাহ এবং ১০০ শতাংশ বিদ্যুতায়নের কাজ রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। প্রশাসনিক স্তরে জনসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য 'দুয়ারে সরকার' নামক এক অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকারি আধিকারিকরা সরাসরি পাড়ায় পাড়ায় ক্যাম্প করে মানুষের অভাব-অভিযোগ ও প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেন। এছাড়া নতুন কয়েকটি জেলা গঠন করে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পথেও হেঁটেছে এই সরকার।
শিল্প, অর্থনীতি এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ
তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এলেও, ভারী শিল্পের (Heavy Industry) ক্ষেত্রে রাজ্যকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। সিঙ্গুর থেকে টাটা মোটরস-এর বিদায় রাজ্যের শিল্পায়নের ভাবমূর্তিতে যে ধাক্কা দিয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) খাতে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ স্থান দখল করেছে। নিউ টাউন বা রাজারহাট অঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের সম্প্রসারণ ঘটলেও, বৃহৎ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের অভাব এবং বেকারত্ব এখনও একটি চিন্তার বিষয়।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দলটিকে নানা বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সারদা ও রোজভ্যালির মতো চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এবং সাম্প্রতিককালে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) বা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি দলের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক হিংসা এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল শাসকদলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একুশের নির্বাচন এবং বর্তমান প্রেক্ষিত
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক বিশাল পরীক্ষা ছিল। বিজেপির মতো প্রবল শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় শাসকদলের সর্বাত্মক প্রচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় "খেলা হবে" এবং "বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়"—এই স্লোগানগুলোকে হাতিয়ার করে লড়াইয়ের ময়দানে নামেন। সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণকে ভুল প্রমাণ করে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন পেয়ে টানা তৃতীয়বারের জন্য বিশাল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই জয় তৃণমূলকে কেবল রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, বরং জাতীয় স্তরেও একটি প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহার
১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা একটি দল আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সমার্থক হয়ে উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাস কেবল একটি দলের ক্ষমতায় যাওয়ার গল্প নয়, এটি এক প্রবল রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং তৃণমূল স্তরের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের গল্প। সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় অংশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করেছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভারী শিল্পায়নের অভাব রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা এই প্রশাসনিক দুর্নীতিগুলোকে কতটা কঠোর হাতে দমন করতে পারে এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের কতটা সুযোগ তৈরি করতে পারে তার ওপর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোয় যে রূপান্তর এনেছে, তা রাজ্যের ইতিহাসে একটি স্থায়ী অধ্যায় হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে।