Patriots & Partisans: ভারতীয় গণতন্ত্র, দেশপ্রেম ও মতাদর্শের এক বহুমাত্রিক পাঠ

ভূমিকা

ভারতকে বোঝার জন্য শুধু তার রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে বুঝতে হয় তার বহুত্ব, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতি এবং নাগরিক সমাজের পরিবর্তন। রামচন্দ্র গুহের Patriots & Partisans: From Gandhi to Modi, From the Shiv Sena to the BJP এই জটিল ভারতকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।

২০১২ সালে প্রকাশিত এই বইটি প্রচলিত অর্থে একটি ধারাবাহিক ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এটি বিভিন্ন সময়ে লেখা পনেরোটি প্রবন্ধের সংকলন, যার প্রথম অংশে ভারতীয় গণতন্ত্র ও রাজনীতি এবং দ্বিতীয় অংশে বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক জগতের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

বইটির বিশেষত্ব হলো গুহ ভারতীয় রাজনীতিকে কেবল নির্বাচনী ফলাফল বা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করেননি। বরং ইতিহাস, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শ এবং নাগরিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের কিছু মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছেন।

বইটির পরিচিতি

Patriots & Partisans প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে Allen Lane, Penguin Books India থেকে। মূল সংস্করণে ৩৩৪ পৃষ্ঠা রয়েছে এবং পরবর্তী Penguin সংস্করণেও বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

বইটির প্রথম অংশের শিরোনাম “Debating Democracy” । এখানে Redeeming the Republic, A Short History of Congress Chamchagiri, Hindutva Hate Mail, The Past and Future of the Indian Left, The Professor and the Protester, Gandhi's Faith and Ours, Verdicts on Nehru, An Asian Clash of Civilizations? এবং The Beauty of Compromise এর মতো প্রবন্ধ রয়েছে। 

দ্বিতীয় অংশ “The Word and the World”-এ bilingual intellectual, ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নেহরুর সঙ্গে বুদ্ধিজীবী সম্পর্ক, Oxford University Press এবং Economic and Political Weekly-এর মতো বিষয় উঠে এসেছে। “Patriots” ও “Partisans” শব্দ দুটির মধ্যেই বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক প্রশ্ন নিহিত। দেশপ্রেম বা patriotism যেখানে বৃহত্তর দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে partisanship বলতে বোঝায় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত পক্ষের প্রতি প্রবল আনুগত্য। গুহের আলোচনায় প্রশ্নটি হলো একজন নাগরিক কীভাবে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস বজায় রেখেও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী পরিসরের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে পারেন?

বইয়ের মূল বক্তব্য

বইটির কেন্দ্রীয় আলোচনার একটি দিক হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের জটিলতা। ভারত একটি বিশাল ও বহুমাত্রিক সমাজ ভাষা, ধর্ম, জাতি, অঞ্চল, শ্রেণি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে যার মধ্যে গভীর বৈচিত্র্য রয়েছে। এই বাস্তবতায় গণতন্ত্র পরিচালনার জন্য মতের পার্থক্যকে স্বীকার করা এবং আপসের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গুহ বিভিন্ন প্রবন্ধে ভারতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ধারাকে সমালোচনামূলকভাবে দেখেছেন। Penguin-এর বই-পরিচিতিতেও বলা হয়েছে, তিনি Hindutva, Communist Left এবং পরিবারকেন্দ্রিক Congress রাজনীতির দিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন। 

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর সমালোচনা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকাশিত একটি সমকালীন পর্যালোচনায় বইটির আলোচনায় Hindu fundamentalism, communist dictatorship এবং ethnic separatism কে ভারতীয় গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। 

গান্ধী, নেহরু ও জাতীয়তাবাদ

গান্ধী ও নেহরুর উপস্থিতি বইটির বিভিন্ন আলোচনাকে ঐতিহাসিক গভীরতা দিয়েছে। Gandhi's Faith and Ours প্রবন্ধে গান্ধীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও তার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে Verdicts on Nehru: The Rise and Fall of a Reputation এ জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক ভাবমূর্তির পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

নেহরুকে নিয়ে আলোচনায় গুহ ব্যক্তিকে শুধু প্রশংসা বা নিন্দার একটি প্রতীকে পরিণত না করে তাঁর সময়কাল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মূল্যায়নের পরিবর্তনকে আলোচনার মধ্যে আনেন। ফলে পাঠক নেহরুর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে দেখতে পারেন।

Hindutva, BJP ও রাজনৈতিক পরিচয়

বইটির রাজনৈতিকভাবে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো Hindutva Hate Mail। এখানে লেখক নিজের লেখা নিয়ে পাওয়া রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও আক্রমণাত্মক চিঠি/ই-মেইলের প্রসঙ্গ ব্যবহার করে মতাদর্শগত মেরুকরণের একটি দিক তুলে ধরেছেন। 

তবে এই প্রবন্ধকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সমালোচনা হিসেবে দেখলে বইটির বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি আংশিকভাবে বোঝা হবে। লেখকের আলোচনার মধ্যে মূল প্রশ্নটি হলো ভারতের মতো বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির সমাজে জাতীয় পরিচয় কীভাবে নির্মিত হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী হতে পারে।

Congress ও রাজনৈতিক আনুগত্য

A Short History of Congress Chamchagiri প্রবন্ধে Congress রাজনীতির মধ্যে আনুগত্য ও তোষণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। Penguin-এর বই-পরিচিতিতেও “dynasty-obsessed Congress party” নিয়ে লেখকের সমালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

এখানে বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—গুহ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে শুধু নীতির ভিত্তিতে নয়, তার অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আচরণের ভিত্তিতেও দেখেছেন।

ভারতীয় Left

The Past and Future of the Indian Left প্রবন্ধে ভারতীয় বাম রাজনীতির ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একটি সমকালীন পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয় যে গুহ Communist ও Leninist রাজনীতির মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি Kerala-র সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কারণের ভূমিকাও আলোচনায় এনেছেন।

এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি কোনো একটি রাজনৈতিক মতাদর্শকে ভারতের সামাজিক পরিবর্তনের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ না করে একাধিক কারণের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে নজর দেয়।

আপসের রাজনীতি ও বহুত্ববাদ

বইটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ The Beauty of Compromise। ভারতীয় গণতন্ত্রে আপসকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক সহাবস্থানের একটি প্রয়োজনীয় পদ্ধতি হিসেবে দেখার সম্ভাবনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভারতের মতো সমাজে সব রাজনৈতিক প্রশ্নের একটি মাত্র উত্তর থাকা কঠিন। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দাবি ও স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করার প্রয়োজন হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় গণতন্ত্রকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে আলোচনার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবতে সাহায্য করে। সমকালীন একটি পর্যালোচনাতেও বইটির একটি বড় শিক্ষা হিসেবে ভারতের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সহাবস্থানের দৃষ্টিতে দেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

বইয়ের দ্বিতীয় অংশ: রাজনীতির বাইরে বুদ্ধিজীবী সমাজ

বইটির দ্বিতীয় অংশটি প্রথম অংশের তুলনায় আলাদা স্বাদের। এখানে সরাসরি রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনের পরিবর্তে লেখক বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক জগতের দিকে তাকিয়েছেন।

The Rise and Fall of the Bilingual Intellectual প্রবন্ধে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী জীবনে ভাষার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। Pluralism in the Indian University–এ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বহুমত ও বহুস্বরের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়েছে। In Nehru's House: A Story of Scholarship and Sycophancy–এ জ্ঞানচর্চা, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের সম্পর্কের প্রশ্ন সামনে আসে।

এই অংশের মাধ্যমে বোঝা যায় যে গণতন্ত্র শুধু সংসদ বা রাজনৈতিক দল দিয়ে তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লেখকের লেখার ধরন

রামচন্দ্র গুহের লেখার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তিনি ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে মিলিয়ে লেখেন। তাঁর ভাষা একদিকে তথ্যনির্ভর, অন্যদিকে প্রবন্ধধর্মী ও পাঠযোগ্য।

Penguin বইটিকে “wide-ranging” এবং “readable collection of essays” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই বইটি কঠোর একাডেমিক ইতিহাসগ্রন্থের মতো ধারাবাহিকভাবে কোনো একটি ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখে যায় না। বরং আলাদা আলাদা প্রবন্ধের মাধ্যমে একটি বৃহত্তর বৌদ্ধিক ছবি তৈরি করে। ফলে পাঠকের কাছে বিষয়গুলো অনেক সময় সংবাদপত্রের কলাম, ইতিহাসের আলোচনা ও ব্যক্তিচিত্র—এই তিনটির সংমিশ্রণের মতো মনে হতে পারে।

বইটির শক্তিশালী দিক

বইটির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি। ভারতীয় গণতন্ত্র, Gandhi, Nehru, Congress, Hindutva, Indian Left, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী এবং প্রকাশনা জগত এত বিভিন্ন বিষয় একই বইয়ের মধ্যে স্থান পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, লেখক রাজনৈতিক ঘটনাকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রাখার চেষ্টা করেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য তার অতীতের দিকে ফিরে তাকানো তাঁর পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তৃতীয়ত, বইটি পাঠককে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করে। কেন ভারতীয় রাজনীতিতে এত মতাদর্শগত বিভাজন? কেন রাজনৈতিক আনুগত্য কখনো ব্যক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে? বহুত্ববাদ ও জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে সম্পর্ক কী? গণতন্ত্রে আপসের প্রয়োজন কতটা?

এই প্রশ্নগুলো বইটিকে শুধু রাজনৈতিক প্রবন্ধের সংকলন না রেখে একটি বৃহত্তর নাগরিক বৌদ্ধিক আলোচনার অংশ করে তোলে।

সমালোচনামূলক আলোচনা

তবে বইটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, এটি প্রবন্ধসংকলন হওয়ায় সব লেখা একই সময়ের জন্য বা একই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। ফলে বইটির মধ্যে বিষয় ও সময়ের বিচিত্রতা রয়েছে।

একজন সমকালীন সমালোচক উল্লেখ করেছিলেন যে বইটির বেশ কিছু প্রবন্ধ আগে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হয়েছিল; ফলে যারা আগে থেকেই Guha-র লেখাগুলো পড়েছেন, তাদের কাছে নতুনত্ব কিছুটা কম মনে হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, এটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ইতিহাস নয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা বা দলের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস বুঝতে হলে অন্য গবেষণাগ্রন্থের সাহায্য প্রয়োজন হবে। বইটির উদ্দেশ্যও মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা নয়; বরং নির্বাচিত রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রশ্নকে প্রবন্ধের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা।

তৃতীয়ত, লেখকের নিজস্ব অবস্থান ও মূল্যায়ন বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট। সেটি বইটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও পাঠকের উচিত তাঁর যুক্তি ও ব্যাখ্যাকে অন্যান্য ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। ফলে বইটিকে কোনো একটি রাজনৈতিক প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে না পড়ে একটি নির্দিষ্ট বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পড়া বেশি ফলপ্রসূ।

আজকের প্রেক্ষাপটে বইটির গুরুত্ব

২০১২ সালের বই হওয়ায় এর সব রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণকে ২০২৬ সালের ভারতীয় রাজনীতির সরাসরি বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। তবে বইটির অনেক প্রশ্ন এখনও ঐতিহাসিক ও বৌদ্ধিকভাবে প্রাসঙ্গিক যেমন জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দলীয় আনুগত্য, ধর্মীয় পরিচয়, বাম ও ডান মতাদর্শ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রে আপসের ভূমিকা।

এই অর্থে বইটি বর্তমানকে সরাসরি ব্যাখ্যা করার চেয়ে বর্তমানকে বোঝার জন্য কিছু ঐতিহাসিক প্রশ্ন তৈরি করতে বেশি সহায়ক। পাঠক বইটির আলোচনাগুলো পড়ার পর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে অতীতের ধারাবাহিকতার মধ্যে রেখে ভাবতে পারেন।

কারা বইটি পড়তে পারেন?

ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বইটি বিশেষভাবে উপযোগী, কারণ এখানে স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেখার সুযোগ রয়েছে।

রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ভারতীয় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ এবং নাগরিক সমাজের সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করার উপাদান পাবেন।

ভারতীয় রাজনীতিতে আগ্রহী সাধারণ পাঠকের জন্য বইটি আধুনিক ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার একটি সহায়ক পাঠ হতে পারে।

আর ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের কাছে দ্বিতীয় অংশটি বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ সেখানে রাজনীতির পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

উপসংহার

Patriots & Partisans এমন একটি বই যা ভারতীয় রাজনীতিকে শুধু দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ পরিসরে দেখার পরিবর্তে ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির বৃহত্তর সম্পর্কের মধ্যে দেখার চেষ্টা করে।

বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর প্রশ্ন করার প্রবণতা। দেশপ্রেম কি রাজনৈতিক পক্ষপাতের সঙ্গে একই জিনিস? বহুত্ববাদী সমাজে জাতীয় ঐক্য কীভাবে তৈরি হয়? রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি আনুগত্যের সীমা কোথায়? গণতন্ত্রে আপস কি দুর্বলতা, নাকি সহাবস্থানের প্রয়োজনীয় পদ্ধতি? বিশ্ববিদ্যালয় ও বুদ্ধিজীবী সমাজের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গুহ সব প্রশ্নের উত্তর একইভাবে গ্রহণ করতে বলেন না; বরং তাঁর প্রবন্ধগুলো পাঠককে ভারতীয় গণতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে ভাবার একটি কাঠামো দেয়। তাঁর সঙ্গে পাঠকের মতের মিল হতে পারে, আবার মতভেদও হতে পারে কিন্তু সেই মতভেদই বইটির আলোচনাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।

তাই Patriots & Partisans–কে শুধু কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের বই হিসেবে না দেখে আধুনিক ভারতের গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের নানা দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা একটি বহুমাত্রিক প্রবন্ধসংকলন হিসেবে পড়া যায়। বইটি ভারতকে একটি একরৈখিক রাজনৈতিক কাহিনি হিসেবে নয়, বরং বহু পরিচয়, বহু মত এবং বহু ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে দেখতে সাহায্য করে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter