র্যাচেল কোরি: রাফাহর বুলডোজারের সামনে দাঁড়ানো এক তরুণীর গল্প
কখনও কখনও একটি মানুষের জীবনের শেষ কয়েকটি মিনিট তার পুরো জীবনকে ছাপিয়ে যায়। র্যাচেল কোরির ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল। ২০০৩ সালের ১৬ মার্চ, গাজার রাফাহ শহরে একটি সামরিক বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ২৩ বছরের এক তরুণী পৃথিবীর মানুষের নজরে চলে আসেন। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি মাটিতে পড়ে যান। বুলডোজার এগিয়ে আসে, এবং গুরুতরভাবে আহত র্যাচেল কিছুক্ষণ পর মারা যান।
আজও র্যাচেল কোরির নাম উচ্চারিত হলে প্রথমেই সেই বুলডোজারের কথাই মনে পড়ে। কিন্তু র্যাচেল কোরির জীবনকে শুধু তাঁর মৃত্যুর কয়েকটি মুহূর্ত দিয়ে বিচার করলে তাঁর গল্পের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি কে ছিলেন? কেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি জায়গায় গিয়ে তিনি একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন? কী ঘটেছিল সেই দিন? তাঁর মৃত্যু নিয়ে কেন এত প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল? আর তাঁর মৃত্যুর পর তদন্ত ও আদালতের লড়াই কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে র্যাচেলের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর চিন্তাভাবনা এবং ২০০৩ সালের রাফাহর পরিস্থিতি—তিনটিকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।
র্যাচেল কোরি কে ছিলেন?
র্যাচেল অ্যালিন কোরি জন্মগ্রহণ করেন ১০ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অলিম্পিয়া শহরে। তিনি Evergreen State College-এ পড়াশোনা করছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সামাজিক ন্যায়বিচার, শান্তি এবং মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তিনি একজন সংবেদনশীল, চিন্তাশীল এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় তরুণী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কলেজ জীবনে তাঁর সামাজিক ও শান্তিবিষয়ক আগ্রহ আরও গভীর হয়। তিনি স্থানীয় শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও চিন্তা করতেন। ২০০৩ সালের শুরুতে তিনি International Solidarity Movement বা ISM-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফিলিস্তিনে যান। ISM ছিল একটি আন্তর্জাতিক অহিংস আন্দোলন, যার বিদেশি স্বেচ্ছাসেবীরা ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন এবং সামরিক কর্মকাণ্ড ও বাড়িঘর ধ্বংসের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদে অংশ নিতেন।
র্যাচেল প্রায় এক মাস রাফাহতে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটান এবং তাঁদের জীবনকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেন। তিনি নিয়মিত তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের কাছে ই-মেইল লিখতেন। সেই চিঠিগুলোতে গাজার মানুষের ভয়, কষ্ট, পরিবার, শিশু এবং কঠিন জীবনযাপনের কথা উঠে এসেছে। পরে তাঁর লেখা চিঠিগুলো প্রকাশিত হয় এবং তাঁর চিন্তাভাবনা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে।
র্যাচেল শুধু প্রতিবাদ করতে গাজায় গিয়েছিলেন—এমন ধারণা তাঁর নিজের লেখাগুলো পুরোপুরি প্রকাশ করে না। তাঁর রাফাহ সফরের সঙ্গে অলিম্পিয়া ও রাফাহর মধ্যে একটি মানবিক যোগাযোগ গড়ে তোলার চিন্তাও যুক্ত ছিল। তাঁর পড়াশোনার একটি স্বাধীন গবেষণা-ধর্মী প্রকল্পের সঙ্গে এই ধারণার সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ, তিনি শুধু দূর থেকে একটি রাজনৈতিক ঘটনা দেখার চেষ্টা করেননি; তিনি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হতে চেয়েছিলেন।
এই জায়গাটিই র্যাচেলের গল্পকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে। তাঁর কাছে রাফাহ কেবল সংবাদপত্রের একটি জায়গার নাম ছিল না। সেখানে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের বাড়িতে গিয়েছেন, শিশুদের দেখেছেন এবং তাঁদের ভয় ও অনিশ্চয়তার কথা শুনেছেন। তাঁর চিঠিগুলোতেও এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায়।
রাফাহর সেই সময়ের পরিস্থিতি
র্যাচেল কোরির মৃত্যুর পেছনের পরিস্থিতি বুঝতে হলে ২০০৩ সালের রাফাহকে বুঝতে হবে। রাফাহ গাজার দক্ষিণে, মিশরের সীমান্তের কাছে অবস্থিত। সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরে এলাকাটি ইসরায়েলি-প্যালিস্তিনি সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।
সে সময় ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ এলাকায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা এবং মিশর থেকে অস্ত্র পাচারের জন্য ব্যবহৃত টানেল তাদের জন্য একটি নিরাপত্তা সমস্যা ছিল। সেই কারণে সীমান্তের কিছু এলাকায় জমি পরিষ্কার করা, স্থাপনা সরিয়ে ফেলা এবং বাড়িঘর ধ্বংস করার মতো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল। Human Rights Watch-এর ২০০৪ সালের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই টানেল ও সীমান্ত নিরাপত্তাকে বাড়িঘর ধ্বংসের জন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য ছিল যে এসব সামরিক অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষের বাড়িঘরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। Human Rights Watch তাদের গবেষণায় রাফাহতে ব্যাপক বাড়িঘর ধ্বংসের বিষয়টি নথিবদ্ধ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব ধ্বংসের সামরিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংস্থাটি ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে রাফাহ এলাকায় প্রায় ১৬,০০০ মানুষ বাড়ি হারিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করে। এই সংখ্যাটি Human Rights Watch-এর গবেষণার ফল; এ বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যাখ্যাও ছিল।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই র্যাচেল এবং তাঁর সহকর্মীরা রাফাহতে কাজ করছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, বিদেশি নাগরিকরা যদি ধ্বংসের আশঙ্কায় থাকা বাড়ির সামনে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো সামরিক বাহিনী অভিযান বন্ধ করবে বা অন্তত কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে। তাঁদের প্রতিবাদের পদ্ধতি ছিল অহিংস। তাঁরা উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরতেন, মেগাফোন ব্যবহার করতেন এবং নিজেদের উপস্থিতি সামরিক বাহিনীর কাছে স্পষ্ট করে জানানোর চেষ্টা করতেন।
রাফাহতে তাঁদের এই কাজ সবসময় ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। তাঁরা এমন একটি এলাকায় কাজ করছিলেন যেখানে নিয়মিত সামরিক অভিযান, গোলাগুলি এবং বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা ঘটছিল। তবু র্যাচেল সেখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
১৬ মার্চ ২০০৩: যে দিনটি বদলে দিল একটি জীবন
২০০৩ সালের ১৬ মার্চ ছিল রাফাহতে র্যাচেলের জীবনের শেষ দিন। সেদিন র্যাচেল এবং International Solidarity Movement-এর আরও কয়েকজন বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। ওই এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর ও আশপাশের স্থাপনা সরিয়ে ফেলার কাজ চলছিল। র্যাচেলসহ অন্য স্বেচ্ছাসেবীরা উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাক পরেছিলেন এবং মেগাফোন ব্যবহার করে বুলডোজার চালকদের কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা করছিলেন। Human Rights Watch-এর পরবর্তী নথিতেও এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, র্যাচেল একটি বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বুলডোজারটি এগিয়ে আসতে থাকলে তিনি পেছনে সরে গিয়ে মাটির একটি উঁচু স্তূপের ওপর অবস্থান নেন। কিন্তু বুলডোজার থামেনি। সামনে থাকা মাটি ধাক্কা দিয়ে সরাতে সরাতে সেটি আরও এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে র্যাচেল মাটির সঙ্গে নিচে পড়ে যান এবং বুলডোজার তাঁর ওপর দিয়ে এগিয়ে যায়। ঘটনার পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তখনও সচেতন ছিলেন এবং তাঁর পিঠে গুরুতর আঘাতের কথা জানিয়েছিলেন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। মাত্র ২৩ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় র্যাচেল কোরির জীবন।
দুর্ঘটনা—নাকি আরও কিছু?
র্যাচেলের মৃত্যুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিল—ঠিক কীভাবে এই মৃত্যু ঘটেছিল? ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘটনাটিকে একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে। চালকের বক্তব্য ছিল, তিনি র্যাচেলকে দেখতে পাননি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০০৩ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা মনে করেছিলেন যে বুলডোজারের চালক র্যাচেলের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতেন, কিন্তু চালক দাবি করেছিলেন যে তিনি তাঁকে দেখতে পাননি। ইসরায়েলি সামরিক তদন্তে চালকের বিরুদ্ধে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছিল।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। Human Rights Watch তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে এবং তাঁদের বর্ণনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল খুঁজে পায়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, র্যাচেল উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাক পরে দৃশ্যমান অবস্থায় ছিলেন এবং বুলডোজারটি তাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল। তাঁরা আরও বলেছিলেন, বুলডোজারটি থামার পরিবর্তে মাটি ঠেলে তাঁর অবস্থানের দিকে এগিয়ে যায়।
এখানেই ঘটনাটি নিয়ে বিতর্কের শুরু। একদিকে সামরিক তদন্তের বক্তব্য—চালক র্যাচেলকে দেখতে পাননি এবং এটি একটি দুর্ঘটনা। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য—র্যাচেল দৃশ্যমান ছিলেন এবং বুলডোজার তাঁর দিকে এগিয়ে এসেছিল।
Human Rights Watch ইসরায়েলি তদন্তের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। সংস্থাটি জানায়, প্রাথমিক সামরিক তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে যথেষ্টভাবে যোগাযোগ করা হয়নি এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংগঠনটি র্যাচেলের ময়নাতদন্তের ফলাফল নিয়েও সামরিক ব্যাখ্যার সঙ্গে অসঙ্গতি তুলে ধরে।
তবে এসব প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও র্যাচেলের মৃত্যু ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বরং ঘটনাটির বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী, সামরিক তদন্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই বিরোধই র্যাচেল কোরির মৃত্যুকে এত দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার মধ্যে রেখেছে।
তদন্তের পরও প্রশ্ন রয়ে গেল
র্যাচেলের মৃত্যুর পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তদন্ত করে। মার্কিন সরকারের ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলি বাহিনী দুটি তদন্ত পরিচালনা করেছিল এবং তদন্তে কোনো অবহেলা পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে সামরিক বুলডোজারের কেবিনের দৃষ্টিসীমা বা blind spot-এর মতো বিষয়গুলো নিয়ে কিছু সংশোধনমূলক পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছিল।
কিন্তু Human Rights Watch এই তদন্তকে যথেষ্ট মনে করেনি। তাদের মতে, তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যথাযথ গুরুত্ব পায়নি এবং তদন্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থাটি আরও বলেছিল, র্যাচেলের মৃত্যুর ঘটনাকে বৃহত্তর রাফাহ অভিযান এবং বাড়িঘর ধ্বংসের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
এই জায়গায় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—র্যাচেলের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু একজন বুলডোজার চালককে কেন্দ্র করে পুরো ঘটনা বোঝা যায় না। প্রশ্নটি আরও বড় ছিল: সেই সময় রাফাহতে কেন বাড়িঘর ধ্বংস করা হচ্ছিল, সামরিক বাহিনী কী উদ্দেশ্যে অভিযান চালাচ্ছিল, স্থানীয় মানুষ কীভাবে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছিলেন এবং বিদেশি স্বেচ্ছাসেবীরা কেন সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ করছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে আজও বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা রয়েছে।
আদালতের দরজা পর্যন্ত
র্যাচেলের পরিবার তাঁর মৃত্যুর জন্য আইনি দায় নির্ধারণের চেষ্টা করে। ইসরায়েলের আদালতে করা মামলায় তাঁরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন। ২০১২ সালে হাইফা জেলা আদালত সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আদালত সামরিক তদন্তে গুরুতর ত্রুটি আছে বলে মনে করেনি এবং ঘটনাটিকে সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে রাষ্ট্রের দায় সীমিত বলে ধরে নেয়।
এরপর মামলাটি ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে যায়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। Human Rights Watch এই রায় নিয়ে সমালোচনা প্রকাশ করে এবং অভিযোগ করে যে আদালত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সামরিক কর্মকাণ্ডের বৈধতার প্রশ্নটি যথেষ্টভাবে পরীক্ষা করেনি।
অর্থাৎ, আদালতের প্রক্রিয়ায় র্যাচেলের পরিবার তাঁদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কিন্তু আদালতের রায়ও ঘটনাটি নিয়ে সব বিতর্ক শেষ করে দেয়নি। বরং র্যাচেলের মৃত্যু, সামরিক তদন্ত এবং রাফাহতে বাড়িঘর ধ্বংস—এই তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা আরও দীর্ঘ হয়।
র্যাচেলের নিজের কণ্ঠ
র্যাচেল কোরিকে বুঝতে হলে তাঁর মৃত্যুর ভিডিও বা ছবির দিকে তাকানোর পাশাপাশি তাঁর নিজের লেখা পড়াও গুরুত্বপূর্ণ। রাফাহ থেকে তিনি পরিবার ও বন্ধুদের কাছে যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন, সেখানে যুদ্ধ বা রাজনীতির বড় বড় শব্দের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছবি বেশি দেখা যায়। তিনি শিশুদের কথা লিখেছেন, পরিবারের কথা লিখেছেন, ভয় ও অনিশ্চয়তার কথা লিখেছেন। তাঁর লেখায় একদিকে ছিল গভীর আবেগ, অন্যদিকে নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করার প্রবণতা। এই চিঠিগুলো থেকে বোঝা যায়, র্যাচেল রাফাহতে গিয়ে শুধু প্রতিবাদ করতে চাননি। তিনি সেখানে কী ঘটছে তা নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে দূরের একটি সংঘাত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিল।
সম্ভবত এ কারণেই তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত চিঠিগুলো এত মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ শুধু একজন নিহত আন্দোলনকর্মীর ঘটনা জানেনি; তারা একজন তরুণীর ব্যক্তিগত অনুভূতি, দ্বিধা, ভয় এবং আশার কথাও পড়তে পেরেছে।
একটি তরুণীর সিদ্ধান্ত
র্যাচেলের সিদ্ধান্তকে বোঝার জন্য তাঁর বয়সের কথাও মনে রাখা দরকার। তিনি তখন মাত্র ২৩ বছরের একজন তরুণী। তিনি এমন একটি দেশে জন্মেছিলেন যেখানে যুদ্ধ তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল না। তারপরও তিনি এমন একটি জায়গায় গিয়েছিলেন যেখানে সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক সংঘাত ছিল মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
তিনি জানতেন যে তাঁর কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবু তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বাস করতেন যে বিদেশি নাগরিক হিসেবে তাঁদের উপস্থিতি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে স্থানীয় মানুষের জন্য একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। ১৬ মার্চের ঘটনাটিও সেই বিশ্বাসেরই একটি প্রকাশ ছিল। তিনি একটি বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন কারণ তিনি মনে করেছিলেন, তাঁর শরীরের উপস্থিতি হয়তো একটি বাড়ি ধ্বংস হওয়া ঠেকাতে পারবে। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
একটি মৃত্যুর চেয়েও বড় গল্প
র্যাচেল কোরির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল না। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল—যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানের মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? একজন বিদেশি তরুণী যখন একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি নিজেকে কোনো সেনা বা যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি একজন অহিংস প্রতিবাদকারী হিসেবে সেখানে ছিলেন। তাঁর মৃত্যু তাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
তবে এই ঘটনাকে বোঝার সময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রাফাহতে তাদের কর্মকাণ্ডকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সশস্ত্র হামলা এবং অস্ত্র পাচারের টানেলের মতো বিষয় মোকাবিলার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। অন্যদিকে Human Rights Watch তাদের গবেষণায় বাড়িঘর ধ্বংসের ব্যাপকতা এবং এসব কর্মকাণ্ডের সামরিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার পার্থক্যই ২০০৩ সালের রাফাহকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংঘাতের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, একটি পক্ষের কাছে যে ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অন্য পক্ষের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা। র্যাচেল কোরির মৃত্যু সেই জটিল বাস্তবতার একটি অত্যন্ত মানবিক প্রতিচ্ছবি।
সমাপ্তি
র্যাচেল কোরির জীবনের শেষ ছবি হয়তো একটি বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর ছবি। কিন্তু তাঁর পুরো জীবনকে সেই একটি ছবির মধ্যে আটকে রাখা ঠিক হবে না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষার্থী, একজন কন্যা, একজন বন্ধু, একজন লেখক এবং একজন সামাজিকভাবে সক্রিয় তরুণী। তিনি দূর আমেরিকা থেকে রাফাহতে গিয়েছিলেন এমন কিছু মানুষের জীবনের কাছাকাছি যেতে, যাদের জীবন সম্পর্কে তিনি আগে মূলত দূর থেকেই জানতেন। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, তাঁদের কথা শুনেছেন এবং নিজের পরিবারকে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। ২০০৩ সালের ১৬ মার্চ তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু তাঁর লেখা চিঠি, তাঁর পরিবারকে ঘিরে আইনি লড়াই, তাঁর মৃত্যুর তদন্ত এবং রাফাহর সেই সময়ের ইতিহাস তাঁকে জনস্মৃতিতে বাঁচিয়ে রেখেছে।
র্যাচেল কোরির গল্প তাই শুধু একটি বুলডোজারের গল্প নয়। এটি একজন তরুণ মানুষের বিশ্বাস, অন্য মানুষের কষ্টকে নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং সেই বিশ্বাসের জন্য ঝুঁকি নেওয়ার গল্প। একই সঙ্গে এটি যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সামরিক প্রয়োজনীয়তা, মানবিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির মতো কঠিন প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
র্যাচেল কোরির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মতভেদ আজও আছে। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য এক নয়। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক নেই—২৩ বছরের একজন তরুণী ২০০৩ সালের ১৬ মার্চ রাফাহতে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সময়ের সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু ঘটনা মানুষের মনে থেকে যায়, কারণ সেগুলোর মধ্যে একটি মানুষের মুখ দেখা যায়। র্যাচেল কোরির গল্পও তেমনই—একজন তরুণীর গল্প, যিনি দূরের মানুষের কষ্টকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই নিজের জীবন হারিয়েছিলেন।