নুসাইবা বিনতে কা’ব আল-মাযনিয়া (উম্মে আম্মারা) (রা.): ইসলামের সাহসী নারী যোদ্ধা ও আত্মত্যাগের আদর্শ
বিস্মৃত নয়, গর্বের নাম তাঁরা : পর্ব ২
ভূমিকা
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ইসলামি সভ্যতার বিকাশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অমর ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, সাহসিকতা ও জ্ঞানের আলোয় গড়ে উঠেছে ইসলামের সুবিশাল ঐতিহ্য। সেইসব অনন্য নারীদের মধ্যে অন্যতম হলেন নুসাইবা বিনতে কা’ব আল-মাযনিয়া (উম্মে আম্মারা) (রা.) — যিনি ছিলেন নবী করিম ﷺ–এর সাহাবিয়া, যোদ্ধা, সেবিকা ও সত্যনিষ্ঠ দাঈ। নুসাইবা (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় যে, নারীও আল্লাহর পথে লড়াই, ত্যাগ ও নেতৃত্বে পুরুষের সমান মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারেন। তাঁর জীবন একদিকে সাহসের প্রতীক, অন্যদিকে দীন-নিষ্ঠা ও সেবার আদর্শ।
প্রারম্ভিক জীবন
নুসাইবা (রা.) মদীনার খাজরাজ গোত্রের মাযনিয়া বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন মর্যাদাবান ও শিক্ষিত নারী। তাঁর স্বামী ছিলেন জাইদ ইবন আসিম (রা.), তাঁদের দুই সন্তান— হাবীব ইবন যায়েদ (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবন যায়েদ (রা.) — উভয়েই ইসলামের জন্য অবদান রেখেছেন। তিনি প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবী করিম ﷺ–এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
আকাবার প্রতিশ্রুতি (বাইআতুল আকাবা)
দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের সময় (হিজরতের পূর্বে), যখন মদীনার ৭৩ জন পুরুষ নবী করিম ﷺ–এর হাতে ঈমানের অঙ্গীকার করেন, তখন তাঁদের সঙ্গে মাত্র দুইজন নারী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের একজন ছিলেন নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.)। সেই রাতে তিনি নবী করিম ﷺ–এর কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে—
“আমরা আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস রাখব, রাসূল ﷺ–এর আদেশ পালন করব, এবং প্রয়োজনে আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গ করব।” এটি ছিল নারীর ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের এক ঐতিহাসিক সূচনা।
উহুদের যুদ্ধ : এক নারী যোদ্ধার দৃষ্টান্ত
নুসাইবা (রা.)-এর সাহসিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায় উহুদের যুদ্ধের ময়দানে।
যুদ্ধের শুরুতে তিনি ও অন্যান্য নারীরা আহতদের পানি পান করানো ও চিকিৎসায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু যখন মুসলিম বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে শুরু করে, এবং নবী করিম ﷺ শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন, তখন নুসাইবা (রা.) কোনো দ্বিধা না করে নিজের পানি-পাত্র ফেলে দেন, এবং হাতে তুলে নেন তরবারি ও ঢাল।
নবী ﷺ–এর প্রশংসা
রাসূলুল্লাহ ﷺ পরে সাহাবিদের বলেন—
مَا الْتَفَتُّ يَوْمَ أُحُدٍ يَمِينًا وَلَا شِمَالًا إِلَّا وَأَنَا أَرَاهَا تُقَاتِلُ دُونِي (সিরাত ইবন হিশাম, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯১)
অনুবাদ: “উহুদের দিনে আমি যখনই ডানে বা বাঁয়ে তাকিয়েছি, দেখেছি উম্মে আম্মারা (নুসাইবা) আমার সামনে লড়ছেন ও আমাকে রক্ষা করছেন।”
তিনি নবী ﷺ–এর দেহরক্ষার ভূমিকা পালন করেন, নিজে বারোটি আঘাত পান, তবুও পিছিয়ে যাননি।
এক আঘাত এত গভীর ছিল যে মাসের পর মাস তাঁর চিকিৎসা চলে। নবী ﷺ স্বয়ং তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর প্রতি দোয়া করেন—
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُمْ رُفَقَاءِي فِي الْجَنَّةِ (ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮)
অনুবাদ: “হে আল্লাহ! উম্মে আম্মারা ও তাঁর পরিবারকে জান্নাতে আমার সঙ্গী করে দিও।”
তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ
নুসাইবার সন্তান হাবীব ইবন যায়েদ (রা.) ছিলেন সাহসী তরুণ সাহাবি। মিথ্যা নবী মুসাইলামা কায্যাব যখন নবুওয়াতের দাবি করে, তখন হাবীব (রা.) তার কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছাতে যান। মুসাইলামা তাঁকে জিজ্ঞেস করে:
“তুমি কি স্বীকার কর যে আমি আল্লাহর রাসূল?” তিনি জবাব দেন: “আমি মুহাম্মদ ﷺ–কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করি।” এরপর তাঁকে টুকরো টুকরো করে শহীদ করা হয়। পুত্রের শাহাদতের পরও নুসাইবা (রা.) ধৈর্য ধরে আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং পরবর্তী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ইয়ামামার যুদ্ধ
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর আমলে যখন ইয়ামামার যুদ্ধে মুসাইলামার বিরুদ্ধে লড়াই হয়, তখন নুসাইবা (রা.) তাতে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর একটি হাত সেখানে কেটে যায়, শরীরে একাধিক আঘাত লাগে; কিন্তু তিনি বলেন— “আমি আল্লাহর প্রশংসা করি যে মিথ্যা নবী মুসাইলামা নিহত হয়েছে।”
তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য
- অটল ঈমান ও আনুগত্য — আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।
- ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ — সন্তান ও স্বামীর জীবন উৎসর্গ করেও দ্বীনের কাজে অবিচল থাকা।
- সাহস ও বীরত্ব — যুদ্ধক্ষেত্রে নারী হয়েও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া।
- সেবা ও মানবতা — আহতদের সেবা, সঙ্গিন সময়েও মানবিক দায়িত্ব পালন।
- ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা — জীবনের কঠিনতম পরীক্ষায়ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায়।
নবী ﷺ–এর হাদীস দ্বারা নারীর মর্যাদা
নুসাইবা (রা.)-এর জীবন নবী ﷺ–এর এই হাদীসের প্রতিফলন—
إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ (আবু দাউদ, হাদীস নং ২৩৬)
অনুবাদ: “নারীরা হলো পুরুষদের অর্ধাঙ্গ, তারা একে অপরের সম্পূরক।”
নুসাইবা (রা.) দেখিয়েছেন যে, নারীরাও ঈমান, কর্ম ও ত্যাগে পুরুষের সমান মর্যাদাপ্রাপ্ত হতে পারেন।
বর্তমান যুগে নুসাইবা (রা.)-এর অনুপ্রেরণা — আধুনিক বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
আজকের পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা — সবক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মধ্যেও নৈতিক শূন্যতা, আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি, ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নারীর প্রকৃত মর্যাদাকে অনেক সময় বিকৃত করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.)-এর জীবন এক বাস্তব পথনির্দেশক ও নৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১. ঈমান ও আত্মপরিচয়ের দৃঢ়তা
আধুনিক যুগে নারী স্বাধীনতা প্রায়ই ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে “ইচ্ছার স্বাধীনতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
কিন্তু নুসাইবা (রা.) আমাদের শেখান — প্রকৃত স্বাধীনতা হলো “আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যেই আত্মমর্যাদা খুঁজে পাওয়া।”
তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন স্বাধীন, সাহসী ও আত্মনির্ভর; কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল না ব্যক্তিগত খ্যাতি, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আজকের মুসলিম নারীর জন্য এ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ —ইসলাম নারীর স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে না, বরং সেটিকে সঠিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত করে।
২. সেবা ও নেতৃত্বের ইসলামী মডেল
পশ্চিমা সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন প্রায়শই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু নুসাইবা (রা.) দেখিয়েছেন— নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতা নয়; বরং ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও মানবসেবার মাধ্যমে সমাজকে উন্নত করা। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নবী ﷺ–এর পাশে দাঁড়িয়েছেন, আহতদের সেবা করেছেন, আবার প্রয়োজনে তলোয়ার হাতে লড়েছেন। অর্থাৎ, ইসলামী দৃষ্টিকোণে নারীর নেতৃত্ব এক নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্ব — যা আধুনিক “power-centered feminism”-এর চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
৩. নৈতিক শক্তি বনাম বাহ্যিক স্বাধীনতা
পশ্চিমা সমাজের নারীবাদ অনেক সময় নারীর “বাহ্যিক স্বাধীনতা”-কে (physical autonomy, dress, lifestyle) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। কিন্তু নুসাইবা (রা.) দেখিয়েছেন— নারীর আসল শক্তি তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগে। তিনি পর্দা রক্ষা করে, সমাজের নিয়ম মেনে, তবুও যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিয়েছেন — যা প্রমাণ করে ইসলাম নারীর কর্মক্ষেত্র সংকুচিত করে না, বরং মূল্যবোধের সীমায় রেখে মর্যাদা রক্ষা করে।
৪. ইসলামী নারীবাদ বনাম পশ্চিমা নারীবাদ
আজকের পশ্চিমা Feminism নারীর মুক্তিকে ধর্ম ও পরিবারের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু ইসলামী নারীবাদ (Islamic feminism) বলে নারীর মুক্তি পরিবার, ধর্ম ও সমাজের ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই আসতে পারে। নুসাইবা (রা.)-এর জীবন এই ইসলামী নারীবাদের বাস্তব রূপ: তিনি একজন মা, স্ত্রী, যোদ্ধা ও সমাজসেবিকা — চার ভূমিকাতেই সম্মানিত ও সফল। অর্থাৎ, ইসলাম নারীর মর্যাদা দেয় বহুমাত্রিক ভূমিকার মধ্যে সাদৃশ্য সৃষ্টি করে, সংঘাত নয়।
৫. দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের পাঠ
আজকের সমাজে ব্যক্তিস্বার্থ, প্রতিযোগিতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষের মৌলিক মূল্যবোধকে ক্ষয় করছে।
কিন্তু নুসাইবা (রা.) শেখান— প্রকৃত সাফল্য আসে ত্যাগের মাধ্যমে, সেবার মাধ্যমে, ঈমানের মাধ্যমে।
তিনি নিজের শরীরে বারোটি আঘাত নিয়েও বলেছিলেন: “আমি নবী ﷺ–কে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম; আল্লাহ আমাকে সে সুযোগ দিয়েছেন।” এই আত্মত্যাগের মানসিকতা আজকের চিকিৎসক, সমাজকর্মী, শিক্ষিকা, কিংবা যে কোনো মুসলিম পেশাজীবীর জন্য অনুপ্রেরণা।
৬. আধুনিক ইসলামী সমাজে নারীর ভূমিকা পুনর্গঠন
আজ মুসলিম নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন ও সমাজসেবায় এগিয়ে আসছে। নুসাইবা (রা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী, এই অংশগ্রহণ কেবল পেশাগত নয়, বরং ইবাদতের অংশ হতে পারে — যদি তার লক্ষ্য হয় মানবতার সেবা ও ইসলামের মূল্যবোধ রক্ষা। তাঁর আদর্শ আমাদের শেখায়— নারী নেতৃত্ব হতে পারে ধর্মভিত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্ব। পেশাগত উন্নতির সঙ্গে থাকতে হবে আল্লাহভীতি ও নৈতিক সচেতনতা।
৭. পশ্চিমা সমালোচনার জবাব
পশ্চিমা সমালোচকরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, ইসলাম নারীর স্বাধীনতা সীমিত করেছে। কিন্তু নুসাইবা (রা.)-এর ইতিহাস এই ধারণার সরাসরি প্রতিবাদ। তিনি প্রমাণ করেছেন—ইসলাম নারীর সম্মান ও স্বাধীনতাকে কেবল রক্ষা করে না, বরং তাকে দায়িত্ব, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মহান মর্যাদায় উন্নীত করে। অতএব, ইসলামী ইতিহাস নারীর যে প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করে, তা পশ্চিমা “materialistic freedom”-এর তুলনায় অধিক মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও আধ্যাত্মিকভাবে মুক্ত।
৮. সমকালীন বার্তা
নুসাইবা (রা.) আমাদের শেখান—নারীর প্রকৃত শক্তি শুধু কণ্ঠে নয়, কর্মে, ত্যাগে ও সত্যে প্রতিষ্ঠিত। মুসলিম নারী যদি তাঁর মতো আত্মিক দৃঢ়তা অর্জন করে, তবে সে সমাজে পরিবর্তনের এজেন্ট হতে পারে। আল্লাহর পথে কাজ করাই সর্বোচ্চ স্বাধীনতা — কারণ তাতে রয়েছে আত্মার মুক্তি ও সম্মান।
সারসংক্ষেপ
নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) আধুনিক যুগের জন্য এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত — তিনি দেখিয়েছেন, নারী হতে পারে জ্ঞানী, যোদ্ধা, নেতা ও সেবিকা — সবই একসাথে, এবং তা সম্ভব আল্লাহর আনুগত্য, নৈতিকতা ও আত্মত্যাগের ভিত্তিতে। যেখানে পশ্চিমা নারীবাদ নারীর মর্যাদাকে ধর্ম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে চায়, সেখানে নুসাইবা (রা.) শেখান — “ঈমান, জ্ঞান ও সেবার মধ্য দিয়েই নারী প্রকৃত মর্যাদা লাভ করে।”