বদলে যাচ্ছে বিশ্বের পরিচিত মানচিত্র? ‘ইকুয়াল আর্থ’ নিয়ে নতুন বৈশ্বিক বিতর্ক

স্কুলের ভূগোল বইয়ে দেখা সেই পরিচিত বিশ্বমানচিত্র—যেখানে ইউরোপ, রাশিয়া, কানাডা কিংবা গ্রিনল্যান্ডকে বিশাল আকারে এবং আফ্রিকা, ভারত ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোকে তুলনামূলক ছোট আকারে দেখানো হয়—সেটি কি শিগগিরই ইতিহাস হয়ে যাবে?

সম্প্রতি জাতিসংঘে বিশ্বমানচিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বহু ভূগোলবিদ, কার্টোগ্রাফার এবং উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের মতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত প্রচলিত মানচিত্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে তাদের প্রকৃত আকারে উপস্থাপন করে না। ফলে বিশ্বের ভৌগোলিক বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে একধরনের ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে “ইকুয়াল আর্থ” (Equal Earth) নামে একটি নতুন মানচিত্র প্রক্ষেপণ পদ্ধতি, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তনকে তুলনামূলকভাবে বেশি সঠিকভাবে তুলে ধরার দাবি করে।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রচলিত বিশ্বমানচিত্র?

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ স্কুল, অ্যাটলাস এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত মানচিত্রের ভিত্তি হলো মারকেটর প্রজেকশন (Mercator Projection)। এটি ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর তৈরি করেছিলেন।

মূলত নৌযাত্রার সুবিধার জন্য নির্মিত এই পদ্ধতিতে দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা সহজ ছিল। কিন্তু এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে রূপান্তর করার সময় মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলের আকার অস্বাভাবিকভাবে বড় দেখায়।

এর ফলে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান দেখালেও বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। একইভাবে কানাডা, রাশিয়া ও উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রকৃত আকারের তুলনায় অনেক বড় এবং আফ্রিকা, ভারত ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে তুলনামূলক ছোট দেখানো হয়।

অনেক গবেষকের মতে, এই ভিজ্যুয়াল বিকৃতি শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং মানুষের মানসিক ধারণাকেও প্রভাবিত করেছে।

উপনিবেশবাদ ও মানচিত্রের রাজনীতি

সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রচলিত মানচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিশ্বের বৃহৎ অংশ শাসন করছিল, তখন তাদের ভূখণ্ডকে মানচিত্রে আরও প্রভাবশালী ও বৃহৎ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রকৃত ভৌগোলিক গুরুত্ব দৃশ্যমানভাবে কমে গেছে।

যদিও অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, মারকেটর প্রজেকশনের উদ্দেশ্য ছিল নৌপরিবহন সহজ করা, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়; তবু এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত রয়েছে।

কী এই ‘ইকুয়াল আর্থ’?

২০১৮ সালে কার্টোগ্রাফার বোয়ান সাভরিক, টম প্যাটারসন এবং বার্নার্ড জেনি “ইকুয়াল আর্থ” নামে একটি নতুন মানচিত্র প্রক্ষেপণ পদ্ধতি তৈরি করেন।

এই পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তনকে বাস্তবতার কাছাকাছি রাখা। ফলে আফ্রিকা, ভারত, ব্রাজিল এবং অন্যান্য নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রকৃত ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুযায়ী বড় দেখায়।

অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও রাশিয়ার মতো উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো আর অতিরঞ্জিতভাবে বিশাল দেখায় না।

ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে বক্ররেখাভিত্তিক দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ ব্যবহার করা হয়, যাতে আয়তনের বিকৃতি কমে আসে এবং মানচিত্র একই সঙ্গে পরিচিত ও ব্যবহারযোগ্য থাকে।

সম্ভাব্য পরিবর্তন

যদি বিশ্বব্যাপী এই ধরনের মানচিত্র আরও ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই, অ্যাটলাস, শিক্ষামূলক উপকরণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে নতুন প্রজন্ম পৃথিবীর দেশগুলোর প্রকৃত আকার ও ভৌগোলিক গুরুত্ব সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা পাবে।

এছাড়া জিআইএস (GIS), আর্কজিআইএস (ArcGIS), কিউজিআইএস (QGIS) এবং অন্যান্য পেশাদার মানচিত্র প্রযুক্তিতেও সমতাভিত্তিক প্রক্ষেপণের ব্যবহার বাড়তে পারে।

মানচিত্র বদলাবে, সীমান্ত নয়

ভূগোলবিদরা মনে করিয়ে দেন যে কোনো নতুন মানচিত্র প্রক্ষেপণ গ্রহণ করা মানে পৃথিবীর বাস্তব ভূগোল পরিবর্তন হয়ে যাওয়া নয়।

দেশগুলোর সীমানা, সার্বভৌমত্ব, অবস্থান কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অপরিবর্তিত থাকবে। পরিবর্তন হবে কেবল পৃথিবীকে আমরা কীভাবে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করি এবং বুঝি।

অনেকের কাছে এটি একটি প্রযুক্তিগত বিষয়। আবার অন্যদের মতে, এটি বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন—যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলকে তার প্রকৃত আকার ও গুরুত্ব অনুযায়ী দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশ্বমানচিত্রের এই নতুন বিতর্ক তাই শুধু ভূগোলের নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, শিক্ষা এবং বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter