রমজানের শেষ দশের এতেকাফ : করণীয়-বর্জনীয় মাসআলা-মাসায়েল

নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে শরয়ী মসজিদে পুরুষের এবং ঘরে নামাজের নির্ধারিত স্থানে নারীদের অবস্থান করাকে শরীয়তের পরিভাষায় এতেকাফ বলা হয়। রোজা রাখার সাপেক্ষে রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। যেটি হলো ফরযে কিফায়া (فرض كفاية) সুতরাং এই আমলটি পুরো এলাকা বাসীর উপর ফরজ, তবে যদি সেই এলাকা থেকে কেউ একজন এই আমলটি পূর্ণ করে তখন সেই ফরজের ভার সবার কাঁধ থেকে সরে যায়। যেহেতু এই আমল বা ইবাদতটি হলো আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেটি আল্লাহ পাকের প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সাললাল্লাহু আলাহী অসাল্লাম পালন করতেন। অতএব এতেকাফের রয়েছে কিছু শর্ত ও স্তম্ভসমুহ। এতেকাফকে সুন্দর ও ফলপ্রসূ করার জন্য রয়েছে কিছু করণীয় ও বর্জনীয়। নিচে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এতেকাফের শর্ত

এতেকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত যা এতেকাফকারীর মাঝে এবং এতেকাফের স্থানের মাঝে পাওয়া যাওয়া অপরিহার্য।

১। এতেকাফকারী মুসলমান হওয়া।

২। প্রাপ্ত বয়স্ক বা বুঝমান নাবালেগ হওয়া।

৩। সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া।

৪। এতেকাফের নিয়ত করা।

৫। হায়েয, নেফাস ও জানাবাত থেকে পবিত্র হওয়া ।

৬। পুরুষের এতেকাফের জন্য শরয়ী এমন মসজিদ হওয়া যেখানে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়।

৭। নারীদের ঘরে নামাজের নির্ধারিত স্থানে এতেকাফ করা। পূর্বেই নির্ধারিত কোনো স্থান না থাকলে এতেকাফের জন্য নির্ধারণ করে নেয়া।

৮। এতেকাফ শব্দের অর্থই হচ্ছে অবস্থান করা, আটকে রাখা, আঁকড়ে থাকা। তাই এতেকাফের রোকন হলো- একান্ত বৈধ প্রয়োজন ছাড়া সর্বসময় মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থান করা। কারণ ছাড়া সামান্য সময়ের জন্যও যদি অবস্থানে ছেদ ঘটে তাহলে এতেকাফ ভেঙে যাবে।

এতেকাফের হুকুম

এতেকাফ মূলত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নত আমল। বছরের যেকোনো সময়ে এতেকাফ করা যায়। তবে রমজান মাসের শেষ দশকে মহল্লার মসজিদে এতেকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদাহ আল কিফায়া। অর্থাৎ মহল্লার দু'একজন লোক এতেকাফ করলেই সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর যদি একজন লোকও এতেকাফ না করে, তবে সকলেই সুন্নাত ছাড়ার কারণে গুনাহগার হবে। এতেকাফ ওয়াজিব হয় দুইভাবে। মান্নতের মাধ্যমে অথবা সুন্নত এতেকাফ শুরুর করার মাধ্যমে। সুন্নত ও ওয়াজিব এতেকাফ ছাড়াও রয়েছে নফল বা স্বল্পকালীন এতেকাফ।

এতেকাফের মেয়াদকাল

সুন্নত ও মান্নতের এতেকাফের সর্বনিম্ন মেয়াদ একদিন-একরাত। যার শুরু হবে আগের দিন সূর্যাস্তের পূর্ব মূহূর্ত থেকে পরেরদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। রমজানের শেষ দশকের এতেকাফের মেয়াদকাল ২০ রমজানের সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে শাওয়ালের চাঁদ ওঠার পূর্ব পর্যন্ত। এই দুই ধরনের এতেকাফের জন্য রোজা শর্ত। নফল এতেকাফ এক মূহুর্তের জন্যও হতে পারে।

এতেকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

এতেকাফ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর রমজানের শেষ দশকে সর্বদাই এতেকাফ করেছেন। রাসূলের ইন্তেকালের পর তাঁর সম্মানিত স্ত্রীগণও এতেকাফ করেছেন। লায়লাতুল কদরের ফজিলত প্রাপ্তিতে এতেকাফের ভূমিকা অসামান্য।

হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম প্রতি বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার কুরআন শোনাতেন। কিন্তু যে বছর তাঁর ওফাত হয় সে বছর দুই বার শোনান। নবীজী প্রতি বছর ১০ দিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু ইন্তেকালের বছর তিনি ২০ দিন এতেকাফ করেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯৯৮, ২০৪৪]

ইমাম যুহরি রহ: বলেন, মানুষের আচরণ দেখে অবাক লাগে, তারা কী করে এতেকাফ ছেড়ে দেয়! অথচ ফরজ ও ওয়াজিবের বাইরের আমলের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল, তিনি তা কখনো ছাড়তেন আবার কখনো করতেন। কিন্তু মদীনায় গমনের পর থেকে মৃত্যু অবধি কখনো এতেকাফ ছাড়েননি। [বাদায়িউস সানায়ে]

হজরত আতা আল খোরাসানি রহ: বলেন, এতেকাফকারী কেমন যেন আল্লাহর সামনে এই দাবিতে অবস্থান গ্রহণ করেছে যে, তিনি আমাকে ক্ষমা না করলে আমি আমার অবস্থান প্রত্যাহার করবো না। [বাদায়িউস সনায়ে]

এতেকাফ ভঙ্গের কারণ

১। সহবাস করা।

২। জাগ্রতাবস্থায় ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত করা।

৩। বিনা ওযরে মসজিদ থেকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও বের হয়ে যাওয়া।

৪। নারীদের হায়েয-নেফাস শুরু হয়ে যাওয়া।

 ইতিকাফে যেসব বিষয় করণীয়

১। এতেকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ নির্বাচন করা। সম্ভব হলে মসজিদে হারামে অথবা মসজিদে নববীতে অথবা মসজিদে আকসায় অথবা বড় কোনো জামে মসজিদে এতেকাফ করা।

২। নিজ এলাকা বা বাসস্থান থেকে দূরের কোনো মসজিদে এতেকাফ করা। যেন পরিচিত মানুষের দর্শনে/সাক্ষাতে একাগ্রতায় বিঘ্ন না ঘটে।

৩। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সাথে নিয়ে যাওয়া। যেন এগুলোর জন্য পরে বেতিব্যস্ত হতে না হয়।

৪। উত্তম কথা ও উত্তম কাজের মাধ্যমে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করা। অহেতুক কথা ও কর্ম থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকা।

৫। সময়ের আগেই প্রস্তুতি নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ার অপেক্ষায় থাকা। তাকবীরে উলার সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাজ আদায় করা।

৬। এ ১০ দিন রাত জেগে বেশি বেশি নামাজ ও অন্যান্য এবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকা পৃথক আরেকটি সুন্নত। আম্মাজান আয়েশা রা: বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে জাগতেন, পরিবার-পরিজনদেরকেও জাগাতেন। কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং (শরীরে শক্তি সঞ্চারের জন্য) কোমরে লুঙ্গি বেঁধে নিতেন।’ [মুসলিম : ১১৭৪]

৭। মা’ছুর দুআ, দরূদ ও তাসবিহ-তাহলিলের ইহতেমাম করা

কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত দুআ, দরূদ ও ইস্তেগফারগুলো বেশি বেশি পাঠ করা। যেহেতু এই দশকের যেকোনো রাত্রি শবে কদর হতে পারে, তাই রাতগুলো এবাদত, জিকির, তাসবিহ-তাহলিলের মাধ্যমে কাটানোর চেষ্টা করা। আম্মাজান আয়েশা রা: বলেন, ‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি শবে কদর পাই তাহলে কী দুআ করবো? রাসূল বললেন, ‘তুমি বলবে : (اللَّهمَّ إنَّك عفُوٌّ تُحِبُّ العفْوَ، فاعْفُ عنِّي) হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাকারী, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ [তিরমিজি : ৩৫১৩]

৮। বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা, সীরাত ও দীনি বইপুস্তক পাঠ করা, দ্বীনি আলোচনা করা ও শোনা, আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা, নিজের গোনাহের কথা স্মরণ করে অনুতপ্ত হওয়া, এতেকাফ পরবর্তী সময়ে আল্লাহ এবং বান্দার হক যথাযথ আদায় করার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা, গোনাহমুক্ত জীবন লাভের জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করা।

৯। সলাওয়াতে মুয়াক্কাতাহ তথা ওয়াক্তের সাথে নির্দিষ্ট নামাজগুলোর প্রতি বিশেষ ইহতেমাম বাগুরুত্বদেওয়া। ফরজ নামাজের পূর্বের এবং পরের সুন্নত ও নফল নামাজগুলো যথাযথ আদায় করা। তাহাজ্জুদ, ইশরাক, আওয়াবিন, তাহিয়্যাতুল ওজু, তাহিয়্যাতুল মসজিদ ইত্যাদি নামাজগুলো দৈনন্দিন আদায়ের চেষ্টা করা।

১০। ঈদের রাতে এতেকাফ সমাপ্ত না করে তা ঈদের নামাজ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা। একটি এবাদত আরেকটি এবাদতের সাথে মিলিত হলে পূর্বের এবাদতটি কবুল হওয়ার নিশ্চয়তার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। তাছাড়া ঈদের রাতে এবাদতের বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিস শরীফে বিবৃত হয়েছে। আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে সওয়াবের আশায় ইবাদাত বন্দেগী করবে তার অন্তর সেদিন মারা যাবে না যেদিন অন্তরগুলো মরে যাবে। [ইবনে মাজাহ]

ইতিকাফে যেসব বিষয় বর্জনীয়

১। অনর্থক কথা এবং কাজ থেকে বিরত থাকা। আবু হুরায়রা রা. বলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মুসলমানের সৌন্দর্য হলো অহেতুক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা।

২। মোবাইল ও অনলাইন থেকে দূরে থাকা। বিশেষ করে স্মার্টফোন থেকে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে এতেকাফ অবস্থায় অনলাইনে একদমই না আসা। পারলে মোবাইল বাসায় রেখে আসা।

৩। আড্ডা ও গল্প-গুজবে লিপ্ত না হওয়া। কেউ আড্ডা দিতে আসলে তাকে সঙ্গ না দেয়া।

৪। ঝগড়া-বিবাদ ও বাগবিতণ্ডায় না জড়ানো। এগুলো শবে কদর থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। বর্ণিত আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শবে কদরের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারিখটি বলতে যাবেন সেই মূহূর্তে দুই ব্যক্তিকে ঝগড়া করতে দেখেন। তাদের এ ঝগড়ার বেবরকতির কারণে রাসুলকে তারিখটি ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

৫। কারো গীবত বা পরচর্চাতে লিপ্ত না হওয়া।

৬। খাওয়া ও ঘুমকে জরুরতের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা। এগুলোকে আয়েশের পর্যায়ে না নেয়া। তাহলে এবাদতে উদ্যম তৈরি হবে।

৭। কোনো এবাদতে অলসতা না করা। সর্বদা আল্লাহর ধ্যান-খেয়ালে থাকার চেষ্টা করা।

৮। অশ্লীল কথাবার্তা এবং পাপাচারের খেয়াল-কল্পনা থেকে যবান ও মনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা।

৯। রাগ, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধ পরায়ণতা, অহংকার পরিহার করা।

১০। নারী সংস্পর্শ ও নারীদের খেয়াল-কল্পনা থেকে বিরত থাকা।

শুধুমাত্র তিন ধরনের ওযরের কারণে এতেকাফকারী সীমিত সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হতে পারবে-

১। প্রাকৃতিক ওযর : প্রাকৃতিক ওযরের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনুশ শালবী রহ. বলেন, যেসকল প্রয়োজন পূরণ না করার কোনো উপায় নেই আবার সেগুলো মসজিদের ভেতরে থেকে পূরণ করাও সম্ভব নয় সেসব প্রয়োজন পূরণ করা এতেকাফকারীর জন্য প্রাকৃতিক ওযর বলে গণ্য, যেমন: পেশাব-পায়খানা, ফরজ গোসল, খানা পৌঁছে দেয়ার কেউ না থাকলে খানা নিয়ে আসার জন্য বের হওয়া ইত্যাদি।

২। শরয়ী ওজর :

যদি এমন মসজিদে এতেকাফ করে থাকে যেখানে জুমা হয় না, তাহলে জুমার নামাজের জন্য জামে মসজিদে গমন করার উদ্দেশ্যে বের হওয়া।

৩। বাধ্যতামূলক ওযর : এতেকাফকারী যদি এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, যা নিজের জীবনের জন্য বা তাঁর জ্ঞাতসারে অন্য কারো জীবনের জন্য হুমকী স্বরূপ, তাহলে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয আছে। যেমন : মসজিদ ধ্বসে পড়ার অশঙ্কা করলো বা কোনো হিংস্র প্রাণী মসজিদে এসে হানা দিলো কিংবা এতেকাফকারীর সামনে কোনো ব্যক্তি অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে কিংবা পানিতে ডুবে যাচ্ছে তাকে বাঁচানোর জন্য মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। এসকল সূরতে এতেকাফ ভঙ্গ হবে না। তবে শর্ত হলো প্রয়োজন সারা মাত্রই অবিলম্বে মসজিদে ফিরে আসতে হবে।

এতেকাফের কাজা

মান্নতের এতেকাফ আদায় করা ওয়াজিব। নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে না পারলে কাযা করা ওয়াজিব। কাযা করতে না পারলে প্রত্যেক দিনের এতেকাফের পরিবর্তে সদাকাতুল ফিতর পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য বা তার সমমূল্য দিরদ্রদের মাঝে বণ্টন করা ওয়াজিব। রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ শুরু করার পর কেউ যদি এতেকাফ ভেঙে ফেলে বা অনিচ্ছায় যদি ভেঙে যায় তাহলে যেদিন এতেকাফ ভঙ্গ করেছে শুধু সেই দিনের কাযা করা ওয়াজিব। [রদ্দুল মুখতার :৩/৪৩৪]

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter