রমজান কি শুধু রোজার মাস?

মিকা :

      এগারোটি মাস অতিক্রম করার পর শাবান মাসের পরেই আসে রমজান মাস। এই মাসের উল্লেখ পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বহু জায়গায় রয়েছে। এই মাসে মহান আল্লাহ্ তাআলা হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কোরআন অবতীর্ণ করেন। বিশেষ করে এই মাসটি রোজার জন্য চিহ্নিত। তবে কি এই মাস শুধু রোজার মাস? না, রমজান মাস রোজার সাথে সাথে নামাজে দাঁড়ানোর মাস, কুরআন তিলাওয়াত করার মাস, মুক্তি ও ক্ষমার মাস, দান ও খায়রাতের মাস, যে মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, নেক আমল বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয় এবং ভুলত্রুটি ক্ষমা করা হয়, যে মাসে প্রার্থনা কবুল করা হয়, মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং ক্ষমা লাভ করা হয়। এই মাস হলো চরিত্রহীন থেকে চরিত্রশীল হওয়ার মাস। ধৈর্যহীন থেকে ধৈর্য্যশীল হওয়ার মাস। স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারের মাস। কিয়ামুল লাইল এর জন্য কোমর বাঁধার মাস। এই মাসে মৃত্যু বরণকারীদের হিসাব কিতাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করার মাস।

কুরআন অবতীর্ণের মাস :

আল্লাহ তাআলা ইসালেমর পাক গ্রন্থ কোরআন শরীফ কে এই রমজান মাসের কদরের রাতে অবতীর্ণ করেন। যার প্রমাণ আমরা কোরআন শরীফের মধ্যে পাই।

قال الله تعالى : "شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ" البقرة 185

আল্লাহ তাআলা বলেন: “রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে।” আল-বাকারা- ১৮৫

قال الله تعالى : "إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ" القدر 1

আল্লাহ তাআলা বলেন : "নিশ্চয়ই, আমরা এটি কদরের রাতে নাজিল করেছি।" আল-কাদার- 1

قال الله تعالى : " أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ" الدخان 3

আল্লাহ তাআলা বলেন : "নিশ্চয়ই, আমরা এটি বরকতময় রাতে নাজিল করেছি" আল-দুখান- 3

কিছু মুফাসসিরগন এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে" বরকতময় রাত বলতে কদরের রাত কে বলা হয়েছে।"

ইবাদতের মাস:

এই মাসে মুসলমানরা বেশি করে ইবাদত করে। কারণ এই মাসে এতই ফযীলত যে নফল এর সওয়াব সুন্নতের তুলনায় এবং সুন্নতের সওয়াব ফরয এর তুলনায় আর ফরয এর সওয়াব সত্তর গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মাসে বেশি করে ইবাদত করতেন যেমন নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, তসবিহ পড়া ইত্যাদি।

মুক্তি ও ক্ষমার মাস :

মহান আল্লাহ তাআলা এই মাসে তার বান্দাদের বেশি করে ক্ষমা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যারা এই মাসে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রোজা রাখবে তাদের পূর্ববতী সমস্ত গুনাহ কে মাফ করে দেয়া হবে।

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من صام رمضان إيمانا واحتسابا، غفر له ما تقدم من ذنبه

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।"

জাহান্নামের দরজা বন্ধ ও জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার মাস :

 এই মাসে মহান আল্লাহ্ তাআলা জাহান্নামের সমস্ত দরজা কে বন্ধ করে দেয় এবং জান্নাতের দরজা কে খুলে দেয়। হাদীসে বর্ণিত আছে,

عن النبي ﷺ أنه قال: إذا دخل رمضان فتحت أبواب الجنة، وغلقت أبواب النار، وسلسلت الشيطان [أخرجه مسلم 2549].

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন রমজান আসে, তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয় [মুসলিম ২৫৪৯]।

এই মাসে যারা রোজা রাখে জাহান্নামের থেকে দূরে থাকবে,

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: (الصيام جنة وحصن حصين من النار)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন: "রোজা হলো ঢাল এবং আগুনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী দুর্গ।"

কদরের রাত :

রমজান মাসে একটি রাত রয়েছে যাকে কদরের রাত বলা হয়। এই রাতকে নিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা একটি সূরা অবতীর্ণ করেন । তার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে সেই রাতে কোরআন অবতীর্ণ হয় এবং সেই রাতটি হলো এক হাজার মাসের চেয়েও অতি উত্তম। সেই রাতে সমস্ত ফেরেশতারা আল্লাহর অনুমতি তে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হন সাথে জিবরীল আলাহীসালামও। এবং তারা ফজর পর্যন্ত দেখতে থাকেন কারা এই রাতে ঘুম ছেড়ে আল্লাহর ইবাদত করছে।

হাদীসের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাত গুলির (21,23,25,27,29) মধ্যে একটি রাত হলো কদরের রাত।

উলামারা বলেন বেশি সম্ভব 27 এর রাতে। যেহেতু لَيْلَةِ الْقَدْرِ শব্দে 9 অক্ষর আছে এবং এই শব্দ টি কোরআনে 3 বার উল্লেখিত রয়েছে, সেহেতু 9 কে 3 দিয়ে গুণ করলে 27 হয়। (9*3=27)

এই রাতে যারা ইবাদত করবে তাদের এক হাজার মাস ইবাদত করার সওয়াব দেওয়া হবে।

রোজার মাস :

রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা মোমিনদের ওপর রোজা ফরয করেছেন যেমন পূর্ববর্তি মোমিনদের ওপর ফরয করা হয়েছিল।

قال الله تعالى: "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ" البقرة:183

মহান আল্লাহ বলেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)

কিছু উলামারা বলেন এই আয়াত টি কে মানসুখ করে দেওয়া হয়েছে এই আয়ত দারা...

قال الله تعالى: "أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ" البقرة 187

আল্লাহ তাআলা বলেন: “রোজার রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলন বৈধ।” (সূরা বাকারা ১৮৭)।

কারণ পূর্ববর্তীদের ওপর রোজা ফরয ছিল রাতে এবং দিনে আর আমাদের ওপর শুধু দিনের আলোয়। তবে উলামা গণেরা এর তাউইল (تأويل) করে বলে, যে এই আয়তে (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) পূর্ববর্তীদের রোজার সময় কে অনুমান করা হয়নি বরং রোজার ফরজিয়ত কে অনুমান করা হয়েছে।

    ইসলামের 5 টি স্তম্ভ তার মধ্যে একটি হলো রমজান মাসের রোজা,

عن ابن عمر رضي الله عنهما قال: قال رسول الله ﷺ: بني الإسلام على خمس: شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدًا رسول الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، وصوم رمضان، وحج البيت.

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন: ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমজানের রোজা রাখা এবং ঘরের হজ্জ করা।

একদা মুসা আলাইহিসালাম আল্লাহ তাআলা কে জিজ্ঞাসা করেন "ওগো আল্লাহ্ তুমি উম্ময়ে মুহাম্মদী কে কোন মাসটি বেশি ফযীলত রূপে দান উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেন "রমজান মাস। " মুসা আলাইহি সালাম আবার জিজ্ঞাসা করেন এই মাসের ফযীলত কি? আল্লাহ বলেন "এই মাসের ফযীলত সমস্ত মাসের ওপর সেইরূপ, যেরূপ আমার ফযীলত সমস্ত বান্দার ওপর।" তখন মুসা আলাইহি সালাম উম্মতের মুহাম্মদী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তারাবির নামাজ :

তারাবির নামাজ শুধু রমজান মাসে পড়া হয়। তারাবির নামাজ 20 রাকাত, এবং ইহা সুন্নত। এর সময় ইশা নামাজের পর থেকে ফজর নামাজ পর্যন্ত। হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে "যে ব্যাক্তি রমজান মাসে ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় তারাবির নামাজ পড়বে তার সমস্ত পূর্ববর্তী গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।

 (من صام رمضان إيمانا واحتسابا، غفر له ما تقدم من ذنبه)

রোজার ও রোজাদারের ফযীলত :

রোজার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম কুদুরি লিখেন " রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানি থেকে বঞ্চিত থাকা এবং সহবাস থেকে দূরে থাকা।"

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ তাআলা বলেন"الصوم لي و أنا أجزي به" রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেবো।

সমস্ত ইবাদতের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের দারা দেই কিন্তু রোজার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজে দেই, যা অগণিত।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে উলামারা বলেন যে সমস্ত ইবাদতের মধ্যে রিয়া-র সম্ভনা রয়েছে কিন্তু রোজা এমন একটি ইবাদত যার মধ্যে রিয়া-র কোনো সম্ভবনা নেয়।

এই হাদীসে কুদসির দারা রোজা কে অধিক ফযীলত দেওয়া হয়েছে, কারণ কোনো ইবাদতের সময় আল্লাহ তাআলা বলেনি যে তার প্রতিদান আমি দেবো।

  রোজাদারের সম্পর্কে বলা হয় যে ইফতার করার আগে রোজাদারের মুখের সুগন্ধ আল্লাহর নিকটে মুশকে আম্বরের চেয়েও অধিক সুগন্ধ, এবং কাল কিয়ামতের দিন তাদেরকে রাইয়ান(ريّان) নামের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে যেটি শুধু রোযাদার দের জন্য নির্ধারিত।

 রোজাদারের দোয়া প্রত্যাখ্যাতহীন, যা হাদীস দারা প্রমাণিত।

عن أنس بن مالك رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: (ثلاث دعوات لا ترد: دعوة الوالد، ودعوة الصائم، ودعوة المسافر)

আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন: "তিনটি দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না: পিতামাতার দোয়া, রোজাদারের দোয়া এবং মুসাফিরের দোয়া।"

উপসংহার :

অনেকই মুসলমান এর ভাবনায় আছে যে রমজান শুধু রোজার মাস, তাই তারা শুধু এই মাসে রোজা পর্যন্তই সীমিত থাকে। কিন্তু তাদের এই ভাবনা ভুল। রমজান মাসে রোজার সাথে সাথে তারাবির নামাজ কোরআন তিলাওয়াত এবং সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে। মুসা আলাইহি সালাম রমজানের ফযীলত সম্পর্কে আজ্ঞা হওয়ার পর তিনিও রাসূলুল্লাহর উম্মতি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, যাতে এই সব নেকি থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, আজ আমরা নবীর উম্মতী হয়েও রমজান মাস কে নিয়ে অবহেলা করছি।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter