প্রজন্মের স্থপতি ইবরাহিম (আঃ): জান্নাতের মাটি ও আমাদের উত্তরাধিকার

ইসলামের ইতিহাসে মিরাজ বা শব-ই-মিরাজ একটি অভাবনীয় ঘটনা। সেই রাতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন আসমানের পর আসমান পাড়ি দিয়ে সপ্তম আসমানে পৌঁছালেন, তখন তিনি এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন। সেখানে, বায়তুল মামুর (ফেরেশতাদের কাবা)-এর দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন একজন বৃদ্ধ, তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা, হযরত ইবরাহিম (আঃ)।

সপ্তম আসমানের সেই সর্বোচ্চ স্থানে বসে তিনি শেষ নবী (সাঃ)-কে যে সম্ভাষণ জানালেন এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য যে বার্তা পাঠালেন, তা কেবল একটি সাধারণ সালাম ছিল না। এটি ছিল এক মহাকালের বার্তা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুমিনদের পথ দেখাবে। তিনি বললেন:

"হে মুহাম্মদ! তোমার উম্মতকে আমার সালাম দিও। আর তাদের এই সংবাদ দিও যে, জান্নাতের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং এর পানি সুমিষ্ট। জান্নাত হলো একটি বিশাল সমতল ভূমি (যেখানে গাছপালা নেই)। আর এর চারাগাছগুলো হলো, 'সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এবং 'আল্লাহু আকবার'।" (জামে তিরমিজি)

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জান্নাতের মতো পরম সুখের স্থানে বসে তিনি কেন মাটি, পানি আর চাষাবাদের মতো পার্থিব জিনিসের কথা বললেন? সোনার সিংহাসন বা নহরের বর্ণনা না দিয়ে কেন তিনি কৃষিকাজের রূপক ব্যবহার করলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইবরাহিম (আঃ)-এর ব্যক্তিত্ব, তাঁর সংগ্রাম এবং কুরআনে বর্ণিত তাঁর জীবনের দিকে।

ইবরাহিম (আঃ): একজন দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা

ইবরাহিম (আঃ) ছিলেন একজন ভিশনারি বা দূরদর্শী নেতা। তিনি সেই নবী, যিনি কেবল নিজের জন্য বাঁচেননি; তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি প্রার্থনা ছিল অনাগত ভবিষ্যতের জন্য। তিনি যখন তাঁর স্ত্রী হাজেরা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাইলকে মক্কার জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে আসছিলেন, তখন তিনি ফিরে তাকাননি। কিন্তু তিনি হাত তুলেছিলেন আল্লাহর দরবারে। সেই নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো তাৎক্ষণিক অলৌকিক ঘটনার জন্য দোয়া করেননি, বরং তিনি চেয়েছিলেন একটি 'নিরাপদ শহর' এবং এমন এক প্রজন্ম যারা নামাজ কায়েম করবে।

তিনি দোয়া করেছিলেন:

"হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এবং আমার সন্তানদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানাও।"

তাঁর জীবন ছিল ত্যাগের এক মহাকাব্য। কিন্তু প্রতিটি ত্যাগের পেছনে ছিল একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য—তাওহিদের বীজ বপন করা। সপ্তম আসমানে বসেও তিনি সেই একই কাজ করছিলেন। তিনি জানতেন, জান্নাত প্রস্তুত আছে, মাটি উর্বর, পানি মিষ্টি—কিন্তু সেখানে ফসল ফলানোর দায়িত্ব আমাদের। তিনি আমাদের শিখিয়ে দিলেন যে, পরকালের বাগান আসলে এই দুনিয়ার মাটিতেই রোপণ করতে হয়।

জান্নাতের চারাগাছ: একটি গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ

ইবরাহিম (আঃ) যে চারটি বাক্যের কথা বলেছেন, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, এগুলো কেবল মুখে আওড়ানোর মতো কিছু শব্দ নয়। এগুলো এক একটি বীজ, যা মানুষের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। আসুন দেখি কীভাবে এই চারটি বাক্য আমাদের জীবন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারে।

১. সুবহানাল্লাহ: পবিত্রতার বীজ

'সুবহানাল্লাহ' অর্থ আল্লাহ পবিত্র ও মহান। যখন আমরা বলি সুবহানাল্লাহ, তখন আমরা আল্লাহকে সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ঘোষণা করি। আধুনিক যুগে, যেখানে চারপাশের পরিবেশ দূষিত—মিথ্যা, অশ্লীলতা আর প্রতারণায় ভরা, সেখানে সন্তানদের 'সুবহানাল্লাহ' শেখানো মানে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পবিত্রতা শেখানো। একজন মা যখন তার সন্তানকে সুবহানাল্লাহর শিক্ষা দেন, তিনি আসলে শেখাচ্ছেন কীভাবে সততার সাথে বাঁচতে হয়। তিনি শেখাচ্ছেন যে, আল্লাহ পবিত্র, তাই তাঁর বান্দা হিসেবে আমাদেরও কর্মে ও চিন্তায় পবিত্র হতে হবে। এই বীজ যখন সন্তানের হৃদয়ে প্রোথিত হয়, তখন সে বড় হয়ে এমন একজন মানুষে পরিণত হয়, যে অন্যায়ের সাথে আপোষ করে না, যে সত্যকে সত্য হিসেবে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চিনতে পারে।

২. আলহামদুলিল্লাহ: কৃতজ্ঞতার বীজ

'আলহামদুলিল্লাহ' হলো সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এটি কৃতজ্ঞতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আজকের ভোগবাদী সমাজে, যেখানে 'আরও চাই, আরও চাই' রব, সেখানে আলহামদুলিল্লাহর শিক্ষা সবচেয়ে জরুরি। ইবরাহিম (আঃ) আমাদের শেখাচ্ছেন যে, জান্নাতের মাটিতে ফসল ফলাতে হলে কৃতজ্ঞতার বীজ বুনতে হবে। কল্পনা করুন একজন বাবা তার সন্তানকে শেখাচ্ছেন প্রতিটি ছোটখাটো প্রাপ্তিতে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে। পরীক্ষায় ভালো করলে আলহামদুলিল্লাহ, সুস্থ থাকলে আলহামদুলিল্লাহ, এমনকি কঠিন সময়েও আলহামদুলিল্লাহ। এই শিক্ষাটি সন্তানকে শেখায় যে, জীবনের সবকিছুই আল্লাহর দান। এটি তাদের হতাশা থেকে মুক্তি দেয় এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। কৃতজ্ঞ মানুষ কখনোই অসুখী হয় না; আর এই সুখই জান্নাতের পূর্বাভাস।

৩. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: একনিষ্ঠতার বীজ

এটি ইসলামের মূল ভিত্তি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। এটি আমাদের বিশ্বাস ও আন্তরিকতার (Sincerity) বীজ। বর্তমান সময়ে হাজারো মতবাদ, বিভ্রান্তি আর কৃত্রিমতার ভিড়ে সন্তানদের এই বাক্যটির প্রকৃত অর্থ শেখানো অপরিহার্য। এটি কেবল একটি ঘোষণা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এর অর্থ হলো, আমার জীবনের উদ্দেশ্য, আমার ভয়, আমার আশা, আমার ভালোবাসা, সবকিছুই কেবল আল্লাহর জন্য। যখন আমরা সন্তানদের এই বীজটি দিই, তখন আমরা তাদের শেখাই যে, লোকদেখানো কাজ বা সামাজিক স্বীকৃতির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের হৃদয়ে এমন এক আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা কোনো ঝড়ে টলে যায় না। এটি তাদের শেখায় যে, হাজারো মিথ্যার ভিড়ে সত্য একটাই এবং সেই সত্যের পথেই মুক্তি।

৪. আল্লাহু আকবার: বিনয়ের বীজ

'আল্লাহু আকবার' অর্থ আল্লাহ সবচেয়ে মহান। এটি আমাদের অহংকার চূর্ণ করার হাতিয়ার। মানুষ যখন সফল হয়, ক্ষমতা বা অর্থের মালিক হয়, তখন তার মধ্যে অহংকার আসার সম্ভাবনা থাকে। 'আল্লাহু আকবার' আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমি যত বড়ই হই না কেন, আল্লাহ আমার চেয়েও বড়। পিতামাতা হিসেবে যখন আমরা সন্তানদের শেখাই প্রতিটি বিজয়ের পর 'আল্লাহু আকবার' বলতে, তখন আমরা তাদের বিনয় শেখাই। আমরা তাদের শেখাই যে, এই সাফল্য আমার একার কৃতিত্ব নয়, এটি আল্লাহর সাহায্য। একজন বিনয়ী মানুষ সমাজের জন্য আশীর্বাদ। সে কখনো অন্যকে ছোট করে দেখে না, অত্যাচারী হয় না। এই বিনয়ের চারাগাছটিই পরকালে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে তাকে ছায়া দেবে।

প্যারেন্টিং: এক ধরনের কৃষি কাজ

ইবরাহিম (আঃ) জানতেন অপেক্ষার মাহাত্ম্য। তিনি সন্তানের জন্য বার্ধক্য পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। তিনি মক্কার অনুর্বর মাটিতে ইসমাইলকে রেখে এসেছিলেন, এই বিশ্বাসে যে একদিন এই উপত্যকা বিশ্বাসীদের ভিড়ে গমগম করবে। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কৃষক, যিনি জানতেন  সেরা ফল পেতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়।

আমাদের আধুনিক প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালনও ঠিক সেই কৃষি কাজের মতোই। আমরা যখন সন্তানদের এই চারটি বাক্যের বা জিকিরের শিক্ষা দিই, তখন আমরা আসলে তাদের চরিত্র গঠন করছি।

  • যে সন্তান আলহামদুলিল্লাহ-এর মর্ম বোঝে, সে বড় হয়ে এমন এক প্রশান্ত হৃদয়ের মানুষ হবে, যার সংস্পর্শে এসে অন্যরা শান্তি পাবে।
  • যে সন্তান সুবহানাল্লাহ-এর গভীরতা ধারণ করে, সে এমন এক চরিত্রবান নেতা হবে, যার সততা সমাজকে আলোকিত করবে।
  • যে সন্তান আল্লাহু আকবার বলে বেড়ে ওঠে, সে ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেও মাটির দিকে তাকিয়ে চলবে।

এগুলো কেবল শব্দ নয়, এগুলো হলো মূল্যবোধের বীজ। আজ হয়তো আমরা এই বীজগুলো রোপণ করছি, কিন্তু এর ফল হয়তো আমরা আমাদের জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব না। ঠিক যেমন ইবরাহিম (আঃ) হাজার বছর আগে দোয়া করেছিলেন, আর আজ আমরা সেই দোয়ার ফসল হিসেবে ইসলাম পালন করছি।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত ছায়া

সপ্তম আসমানে বসে ইবরাহিম (আঃ) হয়তো দেখেছিলেন তাঁর ধৈর্যের ফসল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মুমিন বান্দা তাঁর দেখানো পথে চলছে। তিনি আমাদের এই গোপন রহস্যটিই বলে দিতে চেয়েছিলেন:

"গভীর শিকড় ছাড়া গাছ টেকে না, আর যত্ন ছাড়া ফল মিষ্টি হয় না।"

আমরা যখন আমাদের সন্তানদের অন্তরে এই চারটি জিকিরের বীজ বুনে দিই, তখন আমরা একটি সাদাকায়ে জারিয়া (প্রবহমান দান) শুরু করি। আপনার সন্তান যখন তার সন্তানকে কৃতজ্ঞতা শেখাবে, এবং সেই সন্তান যখন তার পরবর্তী প্রজন্মকে বিনয় শেখাব, এই পুণ্য বা সওয়াবের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত আপনার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। আমরা এমন এক অরণ্য তৈরি করছি, যার ছায়া আমরা নিজেরা হয়তো পাব না, কিন্তু আমাদের বংশধররা সেখানে আশ্রয় পাবে।

উপসংহার: মাটি প্রস্তুত, এখন রোপণের পালা

ইবরাহিম (আঃ)-এর সেই বার্তাটি আজ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, জান্নাতের মাটি 'তৈয়্যেবা' (পবিত্র ও উর্বর), পানি 'আজবা' (সুমিষ্ট)। জমি প্রস্তুত হয়ে আছে। সেখানে আপনার এবং আমার জন্য প্লট বরাদ্দ করা আছে। কিন্তু সেই জমিটি এখন খালি—সেটি একটি 'ক্বিয়ান' বা সমতল ময়দান।

সেখানে কি কাঁটাঝোপ জন্মাবে, নাকি সুশীতল ছায়াযুক্ত ফলের বাগান হবে, তা নির্ভর করছে আজ আমরা এই দুনিয়ার মাটিতে কী বীজ বুনছি তার ওপর।

ইবরাহিম (আঃ) আমাদের জন্য দোয়া করে গেছেন, জমি প্রস্তুত আছে। এখন শুধু চাষাবাদের পালা। চলুন, আজ থেকেই আমাদের জান্নাতের বাগান সাজানো শুরু করি।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter