রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল ও তার রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবে মতপার্থক্যর উপর একটি গুরু্বপুর্ন বিশ্লেষণ !

ভূমিকা:

তারাবিহ নামাজ হল রমজান মাসে আদায় করা একটি বিশেষ ইবাদত, যা সুন্নাতে মুআক্কাদা হিসেবে গণ্য হয়, এই নামাজ (প্রত্যেক সুস্থ ও সক্ষম মুসলিমের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নত) রাসুলুল্লাহ(সাঃ) নিজে এই নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবাদের উৎসাহিত করেছেন। তবে তারাবিহের রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবে মতপার্থক্য রয়েছে। এই প্রবন্ধে তারাবিহের রাকাআত, এর ফজিলত এবং বিভিন্ন মতপার্থক্যের বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ(সা.)বলেছেন :

عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: من صام رمضان إيمانا ً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه. قال الحافظ ابن حجر في " فتح الباري": المراد بالإيمان: الاعتقاد بفرضية صومه. وبالاحتساب: طلب الثواب من الله تعالى.

“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে (তারাবি) কিয়াম করে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি:২০০৮,সহিহ মুসলিম:৭৬০)।

রাসুলুল্লাহ(সা:) আরো বলেছেন: “আল্লাহ তালা রমজান মাসে তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন এবং আমি তোমাদের জন্য কিয়াম (তারাবীহ) সুন্নত করেছি। যে ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় এটি আদায় করবে, সে গুনাহ মুক্ত হয়ে যাবে এবং জান্নাতের মর্যাদা পাবে।”(নাসায়ি:১৬০৩)

তারাবিহ রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য:

তারাবিহ রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে মূলত দুটি প্রধান মত রয়েছে:

আট রাকাআতের মত

কিছু আহলে হাদিস ও অন্যান্য আলেমগণ বলেন যে, রাসুলুল্লাহ(সাঃ)মাত্র আট রাকাআত তারাবিহ আদায় করেছেন। তাদের মূল দলিল হল হযরত আয়িশা(রাঃ)-এর হাদিস, যেখানে বলা হয়েছে:

عائشة رضي الله عنها: كان رسول الله ﷺ يصلي من الليل عشر ركعات، يُسلِّم من كل اثنتين، ثم يوتر بواحدةٍ وقالت رضي الله عنها: ما كان رسول الله ﷺ يزيد في رمضان ولا في غيره على إحدى عشرة ركعة، يُصلي أربعًا، فلا تسأل عن حسنهنََّ وطولهنَّ، ثم يصلي أربعًا، فلا تسأل عن حسنهنَّ وطولهنَّ، ثم يصلي ثلاثًا متفق عليه.

“নবী (সাঃ) রমজান ও অন্যান্য সময়ে এগারো রাকাআতের বেশি নামাজ পড়তেন না (আট রাকাআত তারাবিহ এবং তিন রাকাআত বিতর)”(বুখারি:১১৪৭,মুসলিম:৭৩৮)।

কুড়ি রাকাআতের মত

অধিকাংশ আলেম, যেমন হানাফি,শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবের অনুসারীরা বিশ রাকাআতকে সুন্নত মনে করেন। এর মূল ভিত্তি হল হযরত উমর(রাঃ) এর নির্দেশে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) বিশ রাকাআতে তারাবিহের ইমামতি করেন। এছাড়া, ইমাম মালিক (রহ.) এর মতে, মদীনায় কিছু সাহাবা ৩৬ রাকাআতও আদায় করতেন।

যারা আট রাকাআত নিয়ে বিতর্ক করছে তারা আসলে ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে কারণ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আসলে রোজার মাসে ও তাছাড়াও আট রাকাত নামাজ তাহাজ্জুদ এবং তিন রাকাত বিতর আদায় করতেন, কিন্তু আহলে হাদিস ও অন্যান্য আলেমগণরা বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মাত্র আট রাকাআত তারাবিহ আদায় করেছেন এটা আসলে ভুল ধারণা কারণ তা তারাবি নামাজ ছিলনা বরং তাহাজ্জুদ এর নামাজ ছিল আর এটাই রাজীহ।

কুড়ি রাকাত তারাবীহ বিদআত নাকি সুন্নত?

কিছু আহলে হাদিস বিশ রাকাআতকে বিদআত মনে করেন, অন্যদিকে অধিকাংশ ফকিহরা বলেন, এটি খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নত। তারা রাসুলুল্লাহ(সাঃ) এর হাদিস দ্বারা প্রমাণ করেন:

عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي

“তোমরা আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নত মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো।” (আবু দাউদ:৪৬০৭)

ব্যক্তিগতভাবে নাকি জামাতে পড়া উত্তম? কেউ কেউ মনে করেন তারাবিহ ব্যক্তিগতভাবে পড়া উত্তম, কিন্তু অধিকাংশ আলেম বলেন যে, জামাতের সঙ্গে পড়ার ফজিলত বেশি। হযরত উমর (রাঃ) এর সময় সাহাবারা জামাতে বিশ রাকাআত পড়তেন। এছাড়াও তারাবিহ নামাজের অনেক ফজিলত ও বরকত রয়েছে, তার কিছু উল্লেখযোগ্য ফজিলত হলো: যেমন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছন “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে রমজানে কিয়াম করে (তারাবিহ পড়ে), তার পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (বুখারি:৩৭,মুসলিম: ৭৫৯) লাইলাতুল কদরের বরকত লাভ, যারা নিয়মিত তারাবিহ পড়েন, তারা লাইলাতুল কদরের অশেষ সওয়াব লাভের আশা করতে পারেন, যা এক হাজার মাসের ইবাদতের সমান(সূরা কদর:৩) কুরআন তিলাওয়াত ও শ্রবণ, তারাবিহ নামাজে সাধারণত পুরো কুরআন খতম করার চেষ্টা করা হয়, যা কুরআনের সাথে মানুষের সম্পর্ক দৃঢ় করে।

জামাতের সওয়াব, জামাতে তারাবিহ পড়ার বিশেষ ফজিলত আছে। রাসুলুল্লাহ(সাঃ)বলেন: “যে ব্যক্তি ইমামের সাথে কিয়াম (তারাবিহ) করে যতক্ষণ না ইমাম শেষ করে, তার জন্য পুরো রাত কিয়ামের সওয়াব লেখা হয়।” (তিরমিজি:৮০৬)

উপসংহার:

তারাবিহ নামাজ এক মহিমান্বিত ইবাদত,যা মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করে। যদিও রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, তবে মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং কুরআনের তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগী হওয়া। তাই বিতর্ক এড়িয়ে, আসল কথার উপর বিশ্বাস রেখে ইখলাস ও খুশু-খুজুর সাথে তারাবিহ পড়ার চেষ্টা করা।

আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিম ভাইদেরকে আসল কথার উপর বিশ্বাস রাখার এবং ইখলাস ও খুশু-খুজুর স্যাথে বিশ রাকাত নামাজ তারাবিহ পড়ার তৌফিক দান করুক আমিন।

Related Posts

Leave A Comment

Voting Poll

Get Newsletter