ডিজিটাল আমলনামা: অনলাইনে আমরা কী রেখে যাচ্ছি?
ভূমিকা
মাত্র দুই দশক আগেও মানুষের পরিচয়ের বড় অংশ সীমাবদ্ধ ছিল পরিবার, প্রতিবেশী, কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজের মধ্যে। আজ সেই পরিচয়ের একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে-ডিজিটাল পরিচয়। আমরা কী লিখি, কী দেখি, কী শেয়ার করি, কাদের অনুসরণ করি, কী নিয়ে মন্তব্য করি-এসবের সমষ্টিতেই গড়ে ওঠে আমাদের অনলাইন ব্যক্তিত্ব। বাস্তব জীবনের মতোই ডিজিটাল জীবনও এখন আমাদের চরিত্র, মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন।
প্রযুক্তি আল্লাহ তাআলার এক মহৎ নিয়ামত। এর মাধ্যমে জ্ঞানার্জন সহজ হয়েছে, দাওয়াহর পরিসর বিস্তৃত হয়েছে, দূরত্ব কমেছে এবং মানুষের কল্যাণে অসংখ্য নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি নিয়ামতের মতো এরও একটি পরীক্ষা রয়েছে। একই স্মার্টফোন দিয়ে কেউ কুরআন তিলাওয়াত শোনে, আবার কেউ হারাম বিষয়বস্তু দেখে। একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ মানুষের উপকারে জ্ঞান ছড়ায়, আবার কেউ মিথ্যা, বিদ্বেষ ও অপমান ছড়িয়ে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্ন প্রযুক্তিকে নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো-আমরা প্রযুক্তিকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছি?
আজ আমরা একটি মন্তব্য লিখতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিই, কিন্তু খুব কমই ভাবি-এই কয়েকটি শব্দের জন্য হয়তো একদিন আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে হবে। একটি ছবি, একটি ভিডিও বা একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। যদি তা কল্যাণের কারণ হয়, তবে সেটি সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে; আর যদি তা বিভ্রান্তি, অপবাদ বা গুনাহের কারণ হয়, তবে তার দায়ও আমাদের ওপর বর্তাবে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার নিকট একজন সদা-প্রস্তুত পর্যবেক্ষক তা লিপিবদ্ধ করে।" (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের কোনো কথাই অদৃশ্য হয়ে যায় না। আজকের বাস্তবতায় শুধু মুখের কথাই নয়, আমাদের লেখা স্ট্যাটাস, মন্তব্য, বার্তা, ই-মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি শব্দও আমাদের দায়িত্বের অংশ। আমরা হয়তো একটি পোস্ট মুছে ফেলতে পারি, কিন্তু আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আমলনামা থেকে কিছুই মুছে যায় না। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে; অন্যথায় নীরব থাকে।" (সহিহ আল-বুখারি, ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, ৪৭)
এই হাদিসের শিক্ষা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ ডিজিটাল যুগে 'কথা' শুধু মুখ দিয়ে বলা হয় না; কীবোর্ড দিয়েও বলা হয়। একটি মন্তব্য, একটি রিপ্লাই কিংবা একটি পোস্টও মানুষের হৃদয় ভাঙতে পারে, আবার একটি সুন্দর বাক্য কাউকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতেও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেক সময় বাস্তব জীবনে যে সতর্কতা অবলম্বন করি, অনলাইনে তা করি না। বাস্তবে কাউকে অপমান করতে সংকোচ বোধ করি, অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতে দ্বিধা করি না। বাস্তবে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকি, কিন্তু যাচাই না করেই সংবাদ শেয়ার করে দিই। বাস্তবে সময়ের মূল্য বুঝি, অথচ অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে কাটিয়ে দিই। এ যেন একই মানুষের দুটি ভিন্ন চরিত্র। কিন্তু ইসলাম মানুষের জন্য দ্বৈত চরিত্রের শিক্ষা দেয় না। একজন মুমিনের সততা, শালীনতা, তাকওয়া ও দায়িত্ববোধ মসজিদের ভেতরে যেমন থাকবে, তেমনি মোবাইলের স্ক্রিনের সামনেও থাকবে। কারণ আল্লাহর কাছে বাস্তব ও ভার্চুয়াল-এই বিভাজনের কোনো অস্তিত্ব নেই।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য প্রযুক্তিকে ভয় দেখানো নয়, বরং প্রযুক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। আমরা যদি আমাদের ডিজিটাল জীবনকে ইবাদতের চেতনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তবে আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি লেখা এবং প্রতিটি শেয়ারও আখিরাতের পাথেয় হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে একটি প্রশ্ন করা উচিত- আমি কি শুধু একটি ডিজিটাল পরিচয় গড়ে তুলছি, নাকি আমার ডিজিটাল আমলনামাও লিখে চলেছি?
ডিজিটাল আমলনামা: প্রতিটি ক্লিকেরও কি হিসাব আছে?
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একটি ছোট্ট স্ক্রিন আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম দৃষ্টি পড়ে মোবাইলের পর্দায়, আর রাতের শেষ মুহূর্তেও অনেকের সঙ্গী থাকে সেই একই স্ক্রিন। দিনের অসংখ্য ঘণ্টা আমরা কাটাই অনলাইনে-কখনো কাজের প্রয়োজনে, কখনো শিক্ষার জন্য, কখনো বিনোদনে, আবার কখনো সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীনভাবে।
কিন্তু একজন মুমিনের জন্য একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-আমার এই ডিজিটাল জীবন কি আল্লাহর কাছে আমার আমলের অংশ? ইসলামের উত্তর স্পষ্ট। মানুষের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি নিয়ত আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। তাই অনলাইনে করা কাজও এই জবাবদিহির বাইরে নয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا
"আর আমলনামা উপস্থিত করা হবে। তখন অপরাধীদের তুমি দেখবে, তাতে যা আছে তার কারণে তারা ভীত হয়ে বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! এ কেমন কিতাব! এটি ছোট বা বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি; সবই গণনা করে রেখেছে।’" (সূরা আল-কাহফ, ১৮:৪৯)
এই আয়াত আমাদের সামনে এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। পৃথিবীতে আমরা হয়তো অনেক কিছু ভুলে যাই, অনেক পোস্ট মুছে ফেলি, অনেক মন্তব্য সম্পাদনা করি। কিন্তু আখিরাতের আমলনামায় কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না।
আজ আমরা 'ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট' কথাটি প্রায়ই শুনি। প্রযুক্তির ভাষায় এর অর্থ-ইন্টারনেটে আমাদের রেখে যাওয়া তথ্যের চিহ্ন। কিন্তু একজন মুসলিমের দৃষ্টিতে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো 'ডিজিটাল আমলনামা'-যেখানে লিপিবদ্ধ হচ্ছে আমাদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি নিয়ত।
একটি ভেবে দেখা যাক। কাউকে অপমান করে লেখা একটি মন্তব্য হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যে ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু যার হৃদয় ভেঙে গেল, তার কষ্ট কি এত সহজে মুছে যায়? আবার একটি সুন্দর উপদেশ, একটি সহিহ হাদিস বা একটি কুরআনের আয়াত শেয়ার করার মাধ্যমে হয়তো একজন মানুষ হেদায়াতের পথে ফিরে এল। সেই কল্যাণের প্রতিদানও কি শেষ হয়ে যায়? কখনোই নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
"যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখিয়ে দেয়, সে সেই কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৯৩)
এই হাদিস আমাদের ডিজিটাল জীবনের জন্য একটি অসাধারণ দিকনির্দেশনা। আজ একটি উপকারী লেখা, একটি কুরআনের আয়াত, একটি সহিহ ইসলামী আলোচনা বা একটি শিক্ষামূলক ভিডিও হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। যদি মানুষ তা থেকে উপকৃত হয়, আল্লাহ চাইলে সেই কল্যাণের প্রতিদান আমাদের আমলনামায়ও যুক্ত হতে থাকবে।
কিন্তু এর বিপরীত দিকও রয়েছে। মিথ্যা সংবাদ, অশ্লীলতা, বিদ্বেষ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ও আমাদের ওপর বর্তাবে। তাই প্রতিটি 'শেয়ার' করার আগে আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত- "এটি কি আমার আমলনামাকে ভারী করবে, নাকি কলুষিত করবে?"
ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় সচেতনতা হওয়া উচিত-আমি শুধু একটি পোস্ট প্রকাশ করছি না; আমি আমার আখিরাতের জন্যও কিছু লিখে রাখছি। হয়তো পৃথিবীর মানুষ একদিন আমাদের নাম ভুলে যাবে। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আমলনামা কখনো হারিয়ে যাবে না। তাই একজন সচেতন মুমিনের কাছে প্রতিটি ক্লিক শুধু প্রযুক্তিগত কাজ নয়; এটি ঈমান, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিরও একটি বিষয়।
ডিজিটাল যুগের নৈতিক সংকট: স্ক্রিনের আড়ালে কি নৈতিকতা বদলে যায়?
ডিজিটাল মাধ্যম মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে নৈতিকতার নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে। দুঃখের বিষয়, বাস্তব জীবনে যেসব কাজকে আমরা অন্যায় মনে করি, অনলাইন জগতে অনেক সময় সেগুলোকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। অথচ একজন মুসলিমের নৈতিকতা স্থান, সময় বা মাধ্যমের পরিবর্তনে বদলে যায় না। ঘরে, বাজারে, মসজিদে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে-সর্বত্র সে আল্লাহর বান্দা।
সংবাদ প্রচারের আগে যাচাই
আজকের পৃথিবীতে একটি ভুয়া সংবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অনেকেই সত্যতা যাচাই না করেই "শেয়ার" বা "ফরোয়ার্ড" করে দেন। পরে যখন জানা যায় সংবাদটি মিথ্যা, তখন অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
"হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো অবাধ্য ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও; যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো, অতঃপর নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।" (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬)
যদিও এই আয়াত একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল, এর শিক্ষা সর্বজনীন। আজকের ডিজিটাল যুগে প্রতিটি মুসলিমের উচিত কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা। কারণ একটি মিথ্যা সংবাদ শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে না, অনেক সময় মানুষের সম্মান, সম্পদ এমনকি জীবনও বিপন্ন করে।
গীবত, ট্রল ও চরিত্রহনন
অনেকেই মনে করেন, অনলাইনে কাউকে ব্যঙ্গ করা বা অপমান করা তেমন গুরুতর বিষয় নয়। কিন্তু ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
"তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে।" (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)
আজ ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে কাউকে অপমান করা, বিদ্রূপ করা বা তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উপহাস করা অনেকের কাছে বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একজন মুমিনের ভাষা হওয়া উচিত শালীন, সংযত ও কল্যাণকর। আমরা ভুলে যাই, স্ক্রিনের ওপাশেও একজন মানুষ আছেন-তারও সম্মান, অনুভূতি ও মর্যাদা রয়েছে।
আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম ফাঁদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ অনেক সময় নিজের জীবনকে অন্যের প্রশংসার জন্য উপস্থাপন করতে শুরু করে। ভালো কাজও কখনো কখনো মানুষের বাহবা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় প্রকাশিত হয়।
এখানে প্রত্যেকের নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করা দরকার-আমি যা প্রকাশ করছি, তা কি মানুষের প্রশংসার জন্য, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য? এছাড়া ও ইখলাস (নিষ্ঠা) ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। যে কাজ মানুষের দৃষ্টির জন্য করা হয়, তা বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও আল্লাহর কাছে তার মূল্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অনলাইনে উপস্থিত থাকলেও নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য।
সময়: সবচেয়ে অবহেলিত আমানত
আজকের ডিজিটাল আসক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্ভবত সময়ের অপচয়। "আর পাঁচ মিনিট" ভেবে শুরু হওয়া স্ক্রলিং অনেক সময় এক বা দুই ঘণ্টায় গিয়ে শেষ হয়। এই সময়ে না হয় কোনো জ্ঞান অর্জিত হলো, না হলো ইবাদত, না হলো পরিবারকে সময় দেওয়া।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
"দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত-সুস্থতা এবং অবসর সময়।"
এই হাদিস আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা প্রতিদিন ফোনের ব্যাটারি চার্জ দিই, কিন্তু নিজের ঈমানকে কতবার নবায়ন করি? আমরা স্ক্রিন টাইম দেখি, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কত সময় ব্যয় করছি, তার হিসাব কি রাখি?
ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়; বরং এটি একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফল হবে সেই ব্যক্তি, যে স্ক্রিনকে নিজের প্রভু বানাবে না; বরং আল্লাহর আনুগত্যের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে।
ডিজিটাল তাকওয়া: যখন কেউ দেখে না, তখনও আল্লাহ দেখেন
একজন মুসলিমের প্রকৃত পরিচয় তখনই প্রকাশ পায়, যখন সে মানুষের দৃষ্টির বাইরে থাকে। কারণ তাকওয়া শুধু প্রকাশ্য ইবাদতের নাম নয়; বরং নির্জনতায়ও আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করার নাম। ডিজিটাল যুগে এই শিক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঘরে একা বসে থাকা মানুষটিকে হয়তো পৃথিবীর কেউ দেখছে না, কিন্তু আল্লাহ তাকে দেখছেন, তার নিয়ত জানেন এবং তার প্রতিটি কাজ সম্পর্কে অবগত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى
"সে কি জানে না যে, আল্লাহ সবই দেখছেন?" (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১৪)
এই সংক্ষিপ্ত আয়াতটি একজন মুমিনের জন্য আজও সবচেয়ে বড় আত্মসমালোচনার আহ্বান। যখন আমরা এমন কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করি, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন; যখন অশালীন কোনো বিষয়বস্তু দেখি; যখন রাগের বশে কাউকে অপমান করে মন্তব্য লিখতে যাই-ঠিক সেই মুহূর্তে যদি এই আয়াতটি মনে পড়ে, তাহলে হয়তো আমাদের আঙুল থেমে যাবে।
ডিজিটাল তাকওয়া কী?
ডিজিটাল তাকওয়া হলো-ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময়ও আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা। এমনভাবে অনলাইন জীবন পরিচালনা করা, যেন প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি সার্চ, প্রতিটি পোস্ট এবং প্রতিটি মন্তব্য আল্লাহর সন্তুষ্টির মানদণ্ডে যাচাই করা হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে একজন মুসলিম প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকবে। বরং সে প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করবে, যাতে তা তার দুনিয়া ও আখিরাত-উভয়ের জন্য কল্যাণকর হয়।
আমরা কী রেখে যাচ্ছি-একটি ডিজিটাল উত্তরাধিকার
একদিন আমরা সবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। আমাদের বাড়ি, সম্পদ, পদমর্যাদা-সবই অন্যের হাতে চলে যাবে। কিন্তু আমরা যা লিখে রেখে যাব, তা হয়তো বহু বছর ধরে মানুষের সামনে থাকবে।
হয়তো কোনো একদিন কেউ আমাদের পুরোনো একটি লেখা পড়ে উপকৃত হবে। হয়তো একটি কুরআনের আয়াত, একটি দোয়া বা একটি কল্যাণকর উপদেশ, যা আমরা শেয়ার করেছিলাম, তা কারও জীবন পরিবর্তন করে দেবে। আল্লাহ চাইলে সেই নেকির ধারাও চলতে থাকবে। অন্যদিকে, যদি আমরা অশ্লীলতা, বিদ্বেষ, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বিষয় ছড়িয়ে রেখে যাই, তাহলে আমাদের মৃত্যুর পরও তার ক্ষতিকর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلاَثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
"মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চলতে থাকে-সদকায়ে জারিয়া, এমন উপকারী জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।"
ডিজিটাল যুগে এই হাদিস নতুন এক তাৎপর্য বহন করে। আজ একটি উপকারী প্রবন্ধ, একটি শিক্ষামূলক ভিডিও, একটি কুরআনের ব্যাখ্যা বা একটি আন্তরিক নসিহত-এসবই উপকারী জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা মানুষের উপকারে এলে মৃত্যুর পরও নেকির ধারা অব্যাহত থাকার আশা করা যায়।
উপসংহার
ডিজিটাল যুগ আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি আমাদের ঈমান, চরিত্র ও দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা নিচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের জান্নাতেও পৌঁছে দিতে পারে, আবার গাফিলতিতে ডুবিয়েও দিতে পারে। সিদ্ধান্তটি প্রযুক্তির নয়; সিদ্ধান্তটি আমাদের।
তাই প্রতিদিন অনলাইনে প্রবেশ করার আগে একবার অন্তত নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার- আমি আজ যা লিখছি, তা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে? _ আমার শেয়ার করা বিষয় মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করছে, নাকি বিভ্রান্ত করছে?_ যদি আজই আমার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমার ডিজিটাল উত্তরাধিকার দেখে কি আমি সন্তুষ্ট হব?
মনে রাখা উচিত, একদিন আমাদের সব ডিভাইস নীরব হয়ে যাবে, সব অ্যাকাউন্ট অন্যের কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিয়ত এবং প্রতিটি কাজ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত থাকবে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি ডিজিটাল আমলনামা গড়ে তুলি, যা কিয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের পক্ষেই সাক্ষ্য দেবে। কারণ স্ক্রিনের আলো একদিন নিভে যাবে; কিন্তু নেক আমলের আলো কখনো নিভে যায় না।